শিরোনাম

বার্ধক্যে বন্ধু যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

সিটিজেন ডেস্ক
বার্ধক্যে বন্ধু যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ছবি: সংগৃহীত

বার্ধক্য মানেই অন্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়া—এই পুরোনো ধারণা দ্রুত বদলাচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশে এখন প্রবীণদের দৈনন্দিন জীবন সহজ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার বাড়ছে। কেউ মেডিকেল রিপোর্ট বুঝতে চ্যাটবটের সাহায্য নিচ্ছেন, কেউ স্মার্ট ডিভাইসে ওষুধ খাওয়ার রিমাইন্ডার পাচ্ছেন, আবার কোথাও বাড়ির সেন্সর পড়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক নড়াচড়া শনাক্ত করে পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করছে। একাকীত্ব দূর করতে ভার্চুয়াল সঙ্গী আর চলাফেরা ও নিরাপত্তার জন্য স্মার্ট হোম প্রযুক্তিও যুক্ত হচ্ছে এই সেবায়।

বাংলাদেশও দ্রুত প্রবীণ জনসংখ্যার দিকে এগোচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের হার প্রায় ১০ শতাংশ; ২০৫০ সালে তা ১৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিশ্বব্যাংকও বলছে, ২০২৫ সালেই বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনে ১ জনের বয়স হবে ৬০ বা তার বেশি। অর্থাৎ প্রবীণসেবা আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি এখনকার নীতিগত চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া এখনো সহজ নয়। ওষুধের খরচ, হাসপাতালে যাতায়াতের ঝামেলা, প্রশিক্ষিত সেবাদানকারীর স্বল্পতা, এমনকি বয়সভিত্তিক অবহেলাও বড় বাধা। গ্রাম ও শহরের বৈষম্য এই সংকটকে আরও বাড়ায়। ফলে এমন প্রযুক্তির দরকার, যা হাসপাতালে না গিয়েও প্রাথমিক পরামর্শ, নিয়মিত নজরদারি এবং দ্রুত রেফারাল দিতে পারে। এখানেই এআই-ভিত্তিক সেবার সম্ভাবনা সামনে আসছে।

বাংলাদেশে্র বেসরকারি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ঢাকার স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিএমইডি হেলথ তাদের সেবায় এআই ভিত্তিক টুলস, আইওটি ডিভাইস, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ২৪/৭ টেলিকমিউনিকেশন ব্যবহার করছে। তাদের মডেলে প্রবীণরাও সেবাগ্রহীতার মধ্যে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের মডেল গ্রাম বা শহরতলির পরিবারে বিশেষ কাজে লাগতে পারে, যেখানে বয়স্ক সদস্যের রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অক্সিজেন বা অন্যান্য মৌলিক স্বাস্থ্যতথ্য নিয়মিত ট্র্যাক করা গেলে জটিলতা শুরুর আগেই সতর্ক হওয়া সম্ভব।

সরকারি পরিকল্পনার দিক থেকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত এসেছে। বাংলাদেশ ২০২৬–২০৩০ জাতীয় এআই নীতি এর খসড়ায় স্বাস্থ্যখাতে এআই ব্যবহারের কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি পরিকল্পনার দিক থেকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত এসেছে। বাংলাদেশ ২০২৬–২০৩০ জাতীয় এআই নীতি এর খসড়ায় স্বাস্থ্যখাতে এআই ব্যবহারের কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে সমন্বিত জনস্বাস্থ্য তথ্যভাণ্ডার, বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি আগাম শনাক্তকরণ, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা, সরকারি হাসপাতালে রিসোর্স বণ্টন, জরুরি সাড়া, টেলিহেলথ সম্প্রসারণ এবং ওষুধের অপব্যবহার কমাতে তথ্যভিত্তিক মনিটরিং। একই খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রবীণসহ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী যাতে ডিজিটাল সেবা থেকে বাদ না পড়ে, সে বিষয়েও নজর রাখতে হবে।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য এআই এখনো মূলধারার সেবা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু টেলিমেডিসিন, হেলথ হেল্পলাইন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যপ্ল্যাটফর্ম, এইআই পরিচালিত স্ক্রিনিং মডেল সব মিলিয়ে ভিত্তিটা তৈরি হচ্ছে। এখন প্রশ্ন একটাই- আমরা কি প্রযুক্তিকে সত্যিই প্রবীণবান্ধব করব, নাকি শুধু শহুরে, স্মার্টফোন-সচেতন মানুষদের জন্য আরেকটা ডিজিটাল সুবিধা বানিয়ে থেমে যাব। বাংলাদেশের জন্য আসল পরীক্ষাটা সেখানেই।

/বিবি/