নারীরা কখনো জামায়াতের আমির হতে পারবেন না, আল-জাজিরাকে শফিকুর রহমান

নারীরা কখনো জামায়াতের আমির হতে পারবেন না, আল-জাজিরাকে শফিকুর রহমান

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, কোনো নারী কখনো তার দলের আমির হতে পারবেন না। কেননা, আল্লাহ নারীদের ‘সেভাবে’ সৃষ্টি করেননি এবং এটা ‘পরিবর্তনযোগ্য নয়’। কাতারভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) আল-জাজিরার ইউটিউব চ্যানেলে সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়েছে। ঢাকায় জামায়াত আমিরের বাসায় সাক্ষাৎকারটি নেন সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন। প্রায় আধা ঘণ্টার এই সাক্ষাৎকারের শিরোনাম ‘বাংলাদেশ নির্বাচন: জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান’।
সাক্ষাৎকারের ভূমিকায় সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন বলেছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর এবং জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনে জামায়াত একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
আল-জাজিরার সাংবাদিক জামায়াত আমিরের কাছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা, ইসলামিক আইন চালুর বিষয়ে দলের অবস্থান, নারী, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চান।
প্রশ্ন করতে গিয়ে শ্রীনিবাসন জৈন বলেন, আপনি নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কারণ কোরআনের নীতিমালা অনুযায়ী তারা সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ২১ শতকে কেন আপনি এমন একটি প্রস্তাব দেবেন?
শফিকুর রহমান এসময় দাবি করেন, এরকম কোনো কথা তিনি বলেননি। শ্রীনিবাসন তখন বলেন, জামায়াত আমিরের দেওয়া ওই প্রস্তাব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
শফিকুর রহমান জবাবে বলেন, আমি বলেছি– একজন মা, একই সঙ্গে যখন তিনি শিশুর দেখভাল করেন, শিশুর যত্ন নেন এবং একই সময়ে যদি তাকে একজন পুরুষের মতো একই দায়িত্ব, একই সময় ধরে কাজ করতে হয়, তাহলে সেটা ন্যায়সঙ্গত হয় না।
তিনি বলেন, অন্তত স্তন্যদানকালীন সময়ের জন্য। যখন তিনি সন্তান ধারণ করছেন বা সন্তানের যত্ন নিচ্ছেন– এই সময়ে তাদের সম্মান দেখানো উচিত। আমরা আসলে দেখেছি, কিছু বোন, কিছু নারী যখন মনে করেন, যে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তখন তারা চাকরি ছেড়ে দেন। কিন্তু যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর্মঘণ্টা কমানো হয়… এটা সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। এটা একটি ঐচ্ছিক সুযোগ।
শ্রীনিবাসন বলেন, আপনি বলতে চাইছেন, আপনি কেবল স্তন্যদানকালীন সময়ের জন্যই কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলছেন? জামায়াত আমির বলেন, মূলত সেটাই। তবে যদি কোনো নারী সিদ্ধান্ত নেন, ‘না, আমি ৮ ঘণ্টাই কাজ করব’, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। এটা তার জন্য একটি বিকল্প।
কিন্তু বাংলাদেশের আইনে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ যে আগে থেকেই আছে, সে কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলে শফিকুর রহমান বলেন, ছয় মাস সময় যথেষ্ট বলে তারা মনে করেন না, কেননা একটি শিশু ছয় মাসে বড় হয়ে যায় না।
শ্রীনিবাসন বলেন, আপনার এই প্রস্তাবটি মানুষ খুব ভিন্নভাবে নিয়েছে। এ নিয়ে প্রতিবাদও হয়েছে। বাংলাদেশের নারীরা রাস্তায় নেমেছেন। তারা বলছেন, কাজ করবেন নাকি ঘরে থাকবেন– এটা তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
শফিকুর তখন বলেন, তারা বিষয়টি ভুল বুঝেছেন। ভাই, আমি… আমি তাদের সম্মান করি। তিনি আরও বলেন, হ্যাঁ, কিছু অ্যাক্টিভিস্ট আছেন, যাদের আদর্শ আমাদের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। তারা রাস্তায় নামতে পারেন। আমরাও তাদের সম্মান করি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আমরা শ্রদ্ধা করি। তারা আসতে পারেন, কিন্তু তারা সমাজের খুবই নগণ্য একটি অংশ।
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে নারীর অবদানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শ্রীনিবাসন জৈন বলেন, সেখানে ৫০ শতাংশের বেশি নারী। এই জায়গায় পৌঁছাতে তাদের দশকের পর দশক সংগ্রাম করতে হয়েছে। নারীরা কেবল মা হবেন, সন্তান লালন-পালন করবেন– এই ধারণার বিরুদ্ধে তারা লড়েছেন। পুরুষেরাও সেই দায়িত্ব নিতে পারেন। আশঙ্কা হচ্ছে, আপনার এই প্রস্তাব সময়কে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। এখন নিয়োগকর্তারা নারীদের নিয়োগ দিতে চাইবেন না, কারণ তাদের কর্মঘণ্টার ওপর বিধিনিষেধ থাকবে।
শফিকুর রহামান উত্তরে বলেন, এটা আপনার আশঙ্কা, কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। আমার বক্তব্য দেওয়ার পর আমি কয়েকটি পোশাক কারখানা পরিদর্শন করেছি। আমি কোথাও এমন কিছু দেখিনি। কোথাও না। বরং তারা স্বস্তি বোধ করছে। তারা বলছে, ‘হ্যাঁ, আমরা দুই বছর বা আড়াই বছর পর আবার চাকরিতে ফিরতে পারব।’ কিন্তু যখন তারা এখান থেকে বাদ পড়ে যান, তখন আর ফিরে আসতে পারেন না।
আল জাজিরার সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, যারা প্রতিবাদ করেছেন, তারা সংখ্যায় কম বলে তাদের বক্তব্য জামায়াত আমির নাকচ করে দিচ্ছেন কি না। জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘জি। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।’
নারীদের নিয়ে একটি প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির জানান, এবার নির্বাচনে তাদের দল থেকে একজন নারীকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তবে তারা এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জামায়াতের প্রধান পদে নারী আসতে পারেন কি না, এ প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এটি সম্ভব নয়।’ এর কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘আল্লাহ প্রত্যেককে তার নিজস্ব সত্তায় সৃষ্টি করেছেন। একজন পুরুষ কখনো সন্তান ধারণ করতে পারবে না বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে না। আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, আমরা তা পরিবর্তন করতে পারি না।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে, তারা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কিছু শারীরিক অসুবিধা আছে, যা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। একজন মা যখন সন্তান জন্ম দেন, তিনি কীভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন? এটি সম্ভব নয়।’
আল জাজিরার সাংবাদিক মনে করিয়ে দেন, জামায়াত আমির এমন কথা বলছেন এমন এক দেশে, যেখানে গত তিন দশকে নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। শফিকুর রহমান তখন বলেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করিনি। আগেই বলেছি, আমরা অসম্মান করি না। কিন্তু আপনি যদি বিশ্বকে দেখেন, যেসব দেশ উন্নত হয়েছে, সেখানে কতজন নারী সামনে এসেছেন?
শ্রীনিবাসন মনে করিয়ে দেন, এই জামায়াতই ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপির সঙ্গে জোট সরকারে ছিল। একজন নারী, খালেদা জিয়া তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
এ বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, খালেদা জিয়াকে নেতা বানানো বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্ত, জামায়াতের নয়। আমাদের দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান করা উচিত। আমরা কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না।
জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশে ইসলামি আইন চালু করা হবে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যদি দেশের মঙ্গলের জন্য এটি অপরিহার্য হয়, তবে সংসদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এটি আমি নই, সংসদই বিষয়টি স্থির করবে।’ তিনি এটাও বলেন যে তারা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করবেন না।
জামায়াতের উত্থান সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুজন নেতা দুটি সংবাদমাধ্যম এবং উদীচী ও ছায়ানটের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন উল্লেখ করে এ বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান জানতে চান সাংবাদিক।
জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, তারা এটা সমর্থন করেন না, এর নিন্দা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামী ছাত্রশিবির আমাদের কোনো অঙ্গসংগঠন নয়; এটি জামায়াতের আইনি কাঠামোর অংশ নয়। মানুষ ভুল করতে পারে, তাকে সংশোধন করতে হবে। যদি তারা এটি পুনরায় করে, তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় জামায়াতে ইসলামীর যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দলটির আমির। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জামায়াতের কেউ কখনো এ ধরনের ভাঙচুর বা হামলায় জড়িত ছিল না। গত ১৫ বছরে যা-ই ঘটেছে, তারা জামায়াতকে দায়ী করেছে, কিন্তু আদালতে কোনো একটি মামলাও প্রমাণিত হয়নি। আগস্টের অভ্যুত্থানের পরের হামলা নিয়ে জাতিসংঘের রিপোর্টটিও আমি প্রত্যাখ্যান করছি। এগুলো সব মিথ্যা অপপ্রচার।’
১৯৭১ সালে বাঙালির ওপর চালানো নৃশংসতার ঘটনায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও অস্বীকার করেন দলটির আমির। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তৎকালীন জামায়াতের সিদ্ধান্ত ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কোনো সশস্ত্র বাহিনীর সিদ্ধান্ত নয়। আমাদের নেতারা মনে করেছিলেন ভারতের সাহায্যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সেটি বাংলাদেশের ওপর ভারতের আরেকটি আধিপত্য তৈরি করবে।’
এ পর্যায়ে আল-জাজিরার সাংবাদিক জামায়াত-সংশ্লিষ্ট আধা সামরিক বাহিনীর হাতে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রমাণ থাকার কথা উল্লেখ করেন। জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সেই বাহিনীগুলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল, কোনো সংগঠনের দ্বারা নয়। যদি কেউ অপরাধ করে থাকে, তবে স্বাধীনতার পর কেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি (সাধারণ ডায়েরি) হয়নি? শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা করেছিলেন, যারা সবাই ছিল পাকিস্তানি সেনা; এই ভূখণ্ডের কেউ নয়।’
ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে অস্বীকার করলে জামায়াত কী করবে, সে প্রশ্নে দলটির আমির বলেন, আমরা ভারতের সঙ্গে ফলপ্রসূ সংলাপ করব। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, আমরা প্রতিবেশীদের কোনো অস্বস্তিতে ফেলব না এবং বিনিময়ে তাদের কাছ থেকেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস আশা করি।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, কোনো নারী কখনো তার দলের আমির হতে পারবেন না। কেননা, আল্লাহ নারীদের ‘সেভাবে’ সৃষ্টি করেননি এবং এটা ‘পরিবর্তনযোগ্য নয়’। কাতারভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) আল-জাজিরার ইউটিউব চ্যানেলে সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়েছে। ঢাকায় জামায়াত আমিরের বাসায় সাক্ষাৎকারটি নেন সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন। প্রায় আধা ঘণ্টার এই সাক্ষাৎকারের শিরোনাম ‘বাংলাদেশ নির্বাচন: জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান’।
সাক্ষাৎকারের ভূমিকায় সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন বলেছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর এবং জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনে জামায়াত একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
আল-জাজিরার সাংবাদিক জামায়াত আমিরের কাছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা, ইসলামিক আইন চালুর বিষয়ে দলের অবস্থান, নারী, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চান।
প্রশ্ন করতে গিয়ে শ্রীনিবাসন জৈন বলেন, আপনি নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কারণ কোরআনের নীতিমালা অনুযায়ী তারা সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ২১ শতকে কেন আপনি এমন একটি প্রস্তাব দেবেন?
শফিকুর রহমান এসময় দাবি করেন, এরকম কোনো কথা তিনি বলেননি। শ্রীনিবাসন তখন বলেন, জামায়াত আমিরের দেওয়া ওই প্রস্তাব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
শফিকুর রহমান জবাবে বলেন, আমি বলেছি– একজন মা, একই সঙ্গে যখন তিনি শিশুর দেখভাল করেন, শিশুর যত্ন নেন এবং একই সময়ে যদি তাকে একজন পুরুষের মতো একই দায়িত্ব, একই সময় ধরে কাজ করতে হয়, তাহলে সেটা ন্যায়সঙ্গত হয় না।
তিনি বলেন, অন্তত স্তন্যদানকালীন সময়ের জন্য। যখন তিনি সন্তান ধারণ করছেন বা সন্তানের যত্ন নিচ্ছেন– এই সময়ে তাদের সম্মান দেখানো উচিত। আমরা আসলে দেখেছি, কিছু বোন, কিছু নারী যখন মনে করেন, যে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তখন তারা চাকরি ছেড়ে দেন। কিন্তু যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর্মঘণ্টা কমানো হয়… এটা সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। এটা একটি ঐচ্ছিক সুযোগ।
শ্রীনিবাসন বলেন, আপনি বলতে চাইছেন, আপনি কেবল স্তন্যদানকালীন সময়ের জন্যই কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলছেন? জামায়াত আমির বলেন, মূলত সেটাই। তবে যদি কোনো নারী সিদ্ধান্ত নেন, ‘না, আমি ৮ ঘণ্টাই কাজ করব’, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। এটা তার জন্য একটি বিকল্প।
কিন্তু বাংলাদেশের আইনে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ যে আগে থেকেই আছে, সে কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলে শফিকুর রহমান বলেন, ছয় মাস সময় যথেষ্ট বলে তারা মনে করেন না, কেননা একটি শিশু ছয় মাসে বড় হয়ে যায় না।
শ্রীনিবাসন বলেন, আপনার এই প্রস্তাবটি মানুষ খুব ভিন্নভাবে নিয়েছে। এ নিয়ে প্রতিবাদও হয়েছে। বাংলাদেশের নারীরা রাস্তায় নেমেছেন। তারা বলছেন, কাজ করবেন নাকি ঘরে থাকবেন– এটা তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
শফিকুর তখন বলেন, তারা বিষয়টি ভুল বুঝেছেন। ভাই, আমি… আমি তাদের সম্মান করি। তিনি আরও বলেন, হ্যাঁ, কিছু অ্যাক্টিভিস্ট আছেন, যাদের আদর্শ আমাদের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। তারা রাস্তায় নামতে পারেন। আমরাও তাদের সম্মান করি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আমরা শ্রদ্ধা করি। তারা আসতে পারেন, কিন্তু তারা সমাজের খুবই নগণ্য একটি অংশ।
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে নারীর অবদানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শ্রীনিবাসন জৈন বলেন, সেখানে ৫০ শতাংশের বেশি নারী। এই জায়গায় পৌঁছাতে তাদের দশকের পর দশক সংগ্রাম করতে হয়েছে। নারীরা কেবল মা হবেন, সন্তান লালন-পালন করবেন– এই ধারণার বিরুদ্ধে তারা লড়েছেন। পুরুষেরাও সেই দায়িত্ব নিতে পারেন। আশঙ্কা হচ্ছে, আপনার এই প্রস্তাব সময়কে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। এখন নিয়োগকর্তারা নারীদের নিয়োগ দিতে চাইবেন না, কারণ তাদের কর্মঘণ্টার ওপর বিধিনিষেধ থাকবে।
শফিকুর রহামান উত্তরে বলেন, এটা আপনার আশঙ্কা, কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। আমার বক্তব্য দেওয়ার পর আমি কয়েকটি পোশাক কারখানা পরিদর্শন করেছি। আমি কোথাও এমন কিছু দেখিনি। কোথাও না। বরং তারা স্বস্তি বোধ করছে। তারা বলছে, ‘হ্যাঁ, আমরা দুই বছর বা আড়াই বছর পর আবার চাকরিতে ফিরতে পারব।’ কিন্তু যখন তারা এখান থেকে বাদ পড়ে যান, তখন আর ফিরে আসতে পারেন না।
আল জাজিরার সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, যারা প্রতিবাদ করেছেন, তারা সংখ্যায় কম বলে তাদের বক্তব্য জামায়াত আমির নাকচ করে দিচ্ছেন কি না। জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘জি। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।’
নারীদের নিয়ে একটি প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির জানান, এবার নির্বাচনে তাদের দল থেকে একজন নারীকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তবে তারা এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জামায়াতের প্রধান পদে নারী আসতে পারেন কি না, এ প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এটি সম্ভব নয়।’ এর কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘আল্লাহ প্রত্যেককে তার নিজস্ব সত্তায় সৃষ্টি করেছেন। একজন পুরুষ কখনো সন্তান ধারণ করতে পারবে না বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে না। আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, আমরা তা পরিবর্তন করতে পারি না।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে, তারা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কিছু শারীরিক অসুবিধা আছে, যা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। একজন মা যখন সন্তান জন্ম দেন, তিনি কীভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন? এটি সম্ভব নয়।’
আল জাজিরার সাংবাদিক মনে করিয়ে দেন, জামায়াত আমির এমন কথা বলছেন এমন এক দেশে, যেখানে গত তিন দশকে নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। শফিকুর রহমান তখন বলেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করিনি। আগেই বলেছি, আমরা অসম্মান করি না। কিন্তু আপনি যদি বিশ্বকে দেখেন, যেসব দেশ উন্নত হয়েছে, সেখানে কতজন নারী সামনে এসেছেন?
শ্রীনিবাসন মনে করিয়ে দেন, এই জামায়াতই ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপির সঙ্গে জোট সরকারে ছিল। একজন নারী, খালেদা জিয়া তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
এ বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, খালেদা জিয়াকে নেতা বানানো বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্ত, জামায়াতের নয়। আমাদের দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান করা উচিত। আমরা কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না।
জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশে ইসলামি আইন চালু করা হবে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যদি দেশের মঙ্গলের জন্য এটি অপরিহার্য হয়, তবে সংসদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এটি আমি নই, সংসদই বিষয়টি স্থির করবে।’ তিনি এটাও বলেন যে তারা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করবেন না।
জামায়াতের উত্থান সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুজন নেতা দুটি সংবাদমাধ্যম এবং উদীচী ও ছায়ানটের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন উল্লেখ করে এ বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান জানতে চান সাংবাদিক।
জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, তারা এটা সমর্থন করেন না, এর নিন্দা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামী ছাত্রশিবির আমাদের কোনো অঙ্গসংগঠন নয়; এটি জামায়াতের আইনি কাঠামোর অংশ নয়। মানুষ ভুল করতে পারে, তাকে সংশোধন করতে হবে। যদি তারা এটি পুনরায় করে, তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় জামায়াতে ইসলামীর যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দলটির আমির। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জামায়াতের কেউ কখনো এ ধরনের ভাঙচুর বা হামলায় জড়িত ছিল না। গত ১৫ বছরে যা-ই ঘটেছে, তারা জামায়াতকে দায়ী করেছে, কিন্তু আদালতে কোনো একটি মামলাও প্রমাণিত হয়নি। আগস্টের অভ্যুত্থানের পরের হামলা নিয়ে জাতিসংঘের রিপোর্টটিও আমি প্রত্যাখ্যান করছি। এগুলো সব মিথ্যা অপপ্রচার।’
১৯৭১ সালে বাঙালির ওপর চালানো নৃশংসতার ঘটনায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও অস্বীকার করেন দলটির আমির। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তৎকালীন জামায়াতের সিদ্ধান্ত ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কোনো সশস্ত্র বাহিনীর সিদ্ধান্ত নয়। আমাদের নেতারা মনে করেছিলেন ভারতের সাহায্যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সেটি বাংলাদেশের ওপর ভারতের আরেকটি আধিপত্য তৈরি করবে।’
এ পর্যায়ে আল-জাজিরার সাংবাদিক জামায়াত-সংশ্লিষ্ট আধা সামরিক বাহিনীর হাতে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রমাণ থাকার কথা উল্লেখ করেন। জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সেই বাহিনীগুলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল, কোনো সংগঠনের দ্বারা নয়। যদি কেউ অপরাধ করে থাকে, তবে স্বাধীনতার পর কেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি (সাধারণ ডায়েরি) হয়নি? শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা করেছিলেন, যারা সবাই ছিল পাকিস্তানি সেনা; এই ভূখণ্ডের কেউ নয়।’
ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে অস্বীকার করলে জামায়াত কী করবে, সে প্রশ্নে দলটির আমির বলেন, আমরা ভারতের সঙ্গে ফলপ্রসূ সংলাপ করব। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, আমরা প্রতিবেশীদের কোনো অস্বস্তিতে ফেলব না এবং বিনিময়ে তাদের কাছ থেকেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস আশা করি।

নারীরা কখনো জামায়াতের আমির হতে পারবেন না, আল-জাজিরাকে শফিকুর রহমান

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, কোনো নারী কখনো তার দলের আমির হতে পারবেন না। কেননা, আল্লাহ নারীদের ‘সেভাবে’ সৃষ্টি করেননি এবং এটা ‘পরিবর্তনযোগ্য নয়’। কাতারভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) আল-জাজিরার ইউটিউব চ্যানেলে সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়েছে। ঢাকায় জামায়াত আমিরের বাসায় সাক্ষাৎকারটি নেন সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন। প্রায় আধা ঘণ্টার এই সাক্ষাৎকারের শিরোনাম ‘বাংলাদেশ নির্বাচন: জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান’।
সাক্ষাৎকারের ভূমিকায় সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন বলেছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর এবং জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনে জামায়াত একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
আল-জাজিরার সাংবাদিক জামায়াত আমিরের কাছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা, ইসলামিক আইন চালুর বিষয়ে দলের অবস্থান, নারী, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চান।
প্রশ্ন করতে গিয়ে শ্রীনিবাসন জৈন বলেন, আপনি নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কারণ কোরআনের নীতিমালা অনুযায়ী তারা সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ২১ শতকে কেন আপনি এমন একটি প্রস্তাব দেবেন?
শফিকুর রহমান এসময় দাবি করেন, এরকম কোনো কথা তিনি বলেননি। শ্রীনিবাসন তখন বলেন, জামায়াত আমিরের দেওয়া ওই প্রস্তাব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
শফিকুর রহমান জবাবে বলেন, আমি বলেছি– একজন মা, একই সঙ্গে যখন তিনি শিশুর দেখভাল করেন, শিশুর যত্ন নেন এবং একই সময়ে যদি তাকে একজন পুরুষের মতো একই দায়িত্ব, একই সময় ধরে কাজ করতে হয়, তাহলে সেটা ন্যায়সঙ্গত হয় না।
তিনি বলেন, অন্তত স্তন্যদানকালীন সময়ের জন্য। যখন তিনি সন্তান ধারণ করছেন বা সন্তানের যত্ন নিচ্ছেন– এই সময়ে তাদের সম্মান দেখানো উচিত। আমরা আসলে দেখেছি, কিছু বোন, কিছু নারী যখন মনে করেন, যে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তখন তারা চাকরি ছেড়ে দেন। কিন্তু যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর্মঘণ্টা কমানো হয়… এটা সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। এটা একটি ঐচ্ছিক সুযোগ।
শ্রীনিবাসন বলেন, আপনি বলতে চাইছেন, আপনি কেবল স্তন্যদানকালীন সময়ের জন্যই কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলছেন? জামায়াত আমির বলেন, মূলত সেটাই। তবে যদি কোনো নারী সিদ্ধান্ত নেন, ‘না, আমি ৮ ঘণ্টাই কাজ করব’, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। এটা তার জন্য একটি বিকল্প।
কিন্তু বাংলাদেশের আইনে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ যে আগে থেকেই আছে, সে কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলে শফিকুর রহমান বলেন, ছয় মাস সময় যথেষ্ট বলে তারা মনে করেন না, কেননা একটি শিশু ছয় মাসে বড় হয়ে যায় না।
শ্রীনিবাসন বলেন, আপনার এই প্রস্তাবটি মানুষ খুব ভিন্নভাবে নিয়েছে। এ নিয়ে প্রতিবাদও হয়েছে। বাংলাদেশের নারীরা রাস্তায় নেমেছেন। তারা বলছেন, কাজ করবেন নাকি ঘরে থাকবেন– এটা তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
শফিকুর তখন বলেন, তারা বিষয়টি ভুল বুঝেছেন। ভাই, আমি… আমি তাদের সম্মান করি। তিনি আরও বলেন, হ্যাঁ, কিছু অ্যাক্টিভিস্ট আছেন, যাদের আদর্শ আমাদের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। তারা রাস্তায় নামতে পারেন। আমরাও তাদের সম্মান করি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আমরা শ্রদ্ধা করি। তারা আসতে পারেন, কিন্তু তারা সমাজের খুবই নগণ্য একটি অংশ।
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে নারীর অবদানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শ্রীনিবাসন জৈন বলেন, সেখানে ৫০ শতাংশের বেশি নারী। এই জায়গায় পৌঁছাতে তাদের দশকের পর দশক সংগ্রাম করতে হয়েছে। নারীরা কেবল মা হবেন, সন্তান লালন-পালন করবেন– এই ধারণার বিরুদ্ধে তারা লড়েছেন। পুরুষেরাও সেই দায়িত্ব নিতে পারেন। আশঙ্কা হচ্ছে, আপনার এই প্রস্তাব সময়কে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। এখন নিয়োগকর্তারা নারীদের নিয়োগ দিতে চাইবেন না, কারণ তাদের কর্মঘণ্টার ওপর বিধিনিষেধ থাকবে।
শফিকুর রহামান উত্তরে বলেন, এটা আপনার আশঙ্কা, কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। আমার বক্তব্য দেওয়ার পর আমি কয়েকটি পোশাক কারখানা পরিদর্শন করেছি। আমি কোথাও এমন কিছু দেখিনি। কোথাও না। বরং তারা স্বস্তি বোধ করছে। তারা বলছে, ‘হ্যাঁ, আমরা দুই বছর বা আড়াই বছর পর আবার চাকরিতে ফিরতে পারব।’ কিন্তু যখন তারা এখান থেকে বাদ পড়ে যান, তখন আর ফিরে আসতে পারেন না।
আল জাজিরার সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, যারা প্রতিবাদ করেছেন, তারা সংখ্যায় কম বলে তাদের বক্তব্য জামায়াত আমির নাকচ করে দিচ্ছেন কি না। জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘জি। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।’
নারীদের নিয়ে একটি প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির জানান, এবার নির্বাচনে তাদের দল থেকে একজন নারীকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তবে তারা এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জামায়াতের প্রধান পদে নারী আসতে পারেন কি না, এ প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এটি সম্ভব নয়।’ এর কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘আল্লাহ প্রত্যেককে তার নিজস্ব সত্তায় সৃষ্টি করেছেন। একজন পুরুষ কখনো সন্তান ধারণ করতে পারবে না বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে না। আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, আমরা তা পরিবর্তন করতে পারি না।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে, তারা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কিছু শারীরিক অসুবিধা আছে, যা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। একজন মা যখন সন্তান জন্ম দেন, তিনি কীভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন? এটি সম্ভব নয়।’
আল জাজিরার সাংবাদিক মনে করিয়ে দেন, জামায়াত আমির এমন কথা বলছেন এমন এক দেশে, যেখানে গত তিন দশকে নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। শফিকুর রহমান তখন বলেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করিনি। আগেই বলেছি, আমরা অসম্মান করি না। কিন্তু আপনি যদি বিশ্বকে দেখেন, যেসব দেশ উন্নত হয়েছে, সেখানে কতজন নারী সামনে এসেছেন?
শ্রীনিবাসন মনে করিয়ে দেন, এই জামায়াতই ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপির সঙ্গে জোট সরকারে ছিল। একজন নারী, খালেদা জিয়া তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
এ বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, খালেদা জিয়াকে নেতা বানানো বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্ত, জামায়াতের নয়। আমাদের দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান করা উচিত। আমরা কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না।
জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশে ইসলামি আইন চালু করা হবে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যদি দেশের মঙ্গলের জন্য এটি অপরিহার্য হয়, তবে সংসদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এটি আমি নই, সংসদই বিষয়টি স্থির করবে।’ তিনি এটাও বলেন যে তারা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করবেন না।
জামায়াতের উত্থান সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুজন নেতা দুটি সংবাদমাধ্যম এবং উদীচী ও ছায়ানটের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন উল্লেখ করে এ বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান জানতে চান সাংবাদিক।
জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, তারা এটা সমর্থন করেন না, এর নিন্দা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামী ছাত্রশিবির আমাদের কোনো অঙ্গসংগঠন নয়; এটি জামায়াতের আইনি কাঠামোর অংশ নয়। মানুষ ভুল করতে পারে, তাকে সংশোধন করতে হবে। যদি তারা এটি পুনরায় করে, তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় জামায়াতে ইসলামীর যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দলটির আমির। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জামায়াতের কেউ কখনো এ ধরনের ভাঙচুর বা হামলায় জড়িত ছিল না। গত ১৫ বছরে যা-ই ঘটেছে, তারা জামায়াতকে দায়ী করেছে, কিন্তু আদালতে কোনো একটি মামলাও প্রমাণিত হয়নি। আগস্টের অভ্যুত্থানের পরের হামলা নিয়ে জাতিসংঘের রিপোর্টটিও আমি প্রত্যাখ্যান করছি। এগুলো সব মিথ্যা অপপ্রচার।’
১৯৭১ সালে বাঙালির ওপর চালানো নৃশংসতার ঘটনায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও অস্বীকার করেন দলটির আমির। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তৎকালীন জামায়াতের সিদ্ধান্ত ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কোনো সশস্ত্র বাহিনীর সিদ্ধান্ত নয়। আমাদের নেতারা মনে করেছিলেন ভারতের সাহায্যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সেটি বাংলাদেশের ওপর ভারতের আরেকটি আধিপত্য তৈরি করবে।’
এ পর্যায়ে আল-জাজিরার সাংবাদিক জামায়াত-সংশ্লিষ্ট আধা সামরিক বাহিনীর হাতে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রমাণ থাকার কথা উল্লেখ করেন। জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সেই বাহিনীগুলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল, কোনো সংগঠনের দ্বারা নয়। যদি কেউ অপরাধ করে থাকে, তবে স্বাধীনতার পর কেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি (সাধারণ ডায়েরি) হয়নি? শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা করেছিলেন, যারা সবাই ছিল পাকিস্তানি সেনা; এই ভূখণ্ডের কেউ নয়।’
ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে অস্বীকার করলে জামায়াত কী করবে, সে প্রশ্নে দলটির আমির বলেন, আমরা ভারতের সঙ্গে ফলপ্রসূ সংলাপ করব। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, আমরা প্রতিবেশীদের কোনো অস্বস্তিতে ফেলব না এবং বিনিময়ে তাদের কাছ থেকেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস আশা করি।




