শিরোনাম

ভাইভায় এত বেশি নম্বর দেওয়ার যৌক্তিকতা কী: নাহিদ ইসলাম

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ভাইভায় এত বেশি নম্বর দেওয়ার যৌক্তিকতা কী: নাহিদ ইসলাম
নাহিদ ইসলাম

সরকারি চাকরির নতুন নিয়োগবিধিতে ভাইভার নম্বর কয়েক গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। ভাইভায় বেশি নম্বর রাখলে নিয়োগে নতুন করে বৈষম্যের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাতে সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড একাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এ আশঙ্কার কথা জানান তিনি।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের পাঠকদের জন্য পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

“সরকারি চাকরির ভাইভার নম্বর ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর তরুণদের প্রত্যাশা ছিল সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ হবে। পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের সুযোগ বাড়বে। তদবির, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগ যেন কারও চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা তৈরি হবে। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কয়েক গুণ বাড়ানোর প্রস্তাবের খসড়া অনুমোদন করেছে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি।

গত রবিবার মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। তবে প্রস্তাবটি এখনো গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি। অর্থাৎ সরকার চাইলে এখনো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।

বর্তমান বিধিমালায় ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের পদে ভাইভার নম্বর ১০ শতাংশ। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় তা এভাবে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে- ১১ ও ১২তম গ্রেডে ভাইভা ১০ নম্বর থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হবে। লিখিত পরীক্ষা ৯০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ নম্বর করা হবে। একইসঙ্গে লিখিত পরীক্ষায় পাশ নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডে ভাইভা ১০ নম্বর থেকে বাড়িয়ে ৪০ নম্বর এবং লিখিত পরীক্ষা ৯০ থেকে কমিয়ে ৬০ নম্বর করার প্রস্তাব রয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার কথাও বলা হয়েছে। ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে ভাইভা ১০ থেকে বাড়িয়ে ২৫ এবং লিখিত পরীক্ষা ৪০ থেকে কমিয়ে ২৫ নম্বর করার প্রস্তাব রয়েছে।

এখানে মূল প্রশ্নটা ভাইভা থাকা উচিত কি না, সেটা নয়, বরং ভাইভা পরীক্ষায় এত বেশি নম্বর দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?

লিখিত পরীক্ষার খাতা একজন প্রার্থীর উত্তর ও প্রাপ্ত নম্বরের একটি দালিলিক প্রমাণ। এখানে নম্বর নিয়ে আপত্তি থাকলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কিছু সুযোগ থাকে। কিন্তু ভাইভায় একজন প্রার্থী কেন ৪৫ পেলেন আর আরেকজন কেন ২৫ পেলেন, সেই পার্থক্য যাচাই করার সুযোগ নেই।

একটি বোর্ড কোনো প্রার্থীকে ৪৫ নম্বর দিল, আরেকটি বোর্ড একই মানের পারফরম্যান্সে তাকে ২৫ দিল। তখন এই ২০ নম্বরের পার্থক্য কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?

১০ নম্বরের ভাইভায় এই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু ভাইভা যখন ৪০ বা ৫০ নম্বরের হয়ে যায়, তখন বোর্ডের মূল্যায়নই একজন প্রার্থীর চূড়ান্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এখানেই নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

১১ থেকে ২০ গ্রেডের সরকারি পদগুলোতে এমনিতেই বিপুল সংখ্যক তরুণ আবেদন করেন। এসব নিয়োগের বড় অংশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও তাদের গঠিত নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন সময় এসব নিয়োগে তদবির, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে।

এই বাস্তবতায় ভাইভার নম্বর কয়েক গুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও অনেক বেশি সতর্ক হওয়া দরকার ছিল।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে অযোগ্য প্রার্থীরা পরীক্ষায় সুবিধা নিচ্ছে। তাই ভাইভার গুরুত্ব বাড়ানোর প্রয়োজন হয়েছে। এই যুক্তির পরেও কয়েকটি প্রশ্ন থেকে যায়। প্রক্সি পরীক্ষার্থী পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢুকছে কীভাবে? ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে পরীক্ষার্থী হলে প্রবেশ করছে কীভাবে? আবার পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাদের ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি কেন?

এসব সমস্যার সমাধান পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা আরও জোরদার করা। বায়োমেট্রিক যাচাই, পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নজরদারি, ডিভাইস শনাক্তকরণ, প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনা এবং জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো বিষয়গুলো আগে ঠিক করা দরকার। পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে তার প্রভাব চাকরিপ্রার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।

সরকার মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে চাইলে লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভা দুটিরই মূল্যায়ন পদ্ধতি এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে একজন প্রার্থীর ফলাফল যতটা সম্ভব যাচাই করা যায়।

ভাইভা থাকবে, থাকার দরকার আছে। কিন্তু ভাইভায় ৪০ বা ৫০ নম্বর দিয়ে ভাইভা বোর্ডের হাতে ফলাফলের ওপর এত বড় অংশ ছেড়ে দেওয়া কতটা নিরাপদ, সেটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে আলোচনা হওয়া দরকার।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সিভিল প্রশাসনে প্রায় ২০ লাখ পদের মধ্যে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের পদ প্রায় সোয়া ১৩ লাখ। অর্থাৎ এই পরিবর্তন কার্যকর হলে সরকারি চাকরির একটি বিশাল অংশ নতুন নিয়োগ কাঠামোর আওতায় চলে আসবে। এই পদগুলোর জন্য প্রস্তুতি নেয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণ-তরুণীরা। অনেকেই পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যেও মাসের পর মাস পড়াশোনা করেন। কেউ টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ চালান, কেউ পরিচিতজনের কাছ থেকে ধার করে বই কেনেন। তাদের জন্য একটি সরকারি চাকরির পরীক্ষা মানে তাদের নিজেদের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ। এজন্য নিয়োগের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা থাকা অত্যাবশ্যক।

আমাদের দাবি:

  1. ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে হবে এবং গেজেট প্রকাশের আগে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
  2. লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমানোর প্রস্তাব বাতিল করতে হবে।
  3. ভাইভার নম্বর যুক্তিসংগত সীমার মধ্যে রাখতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষক, প্রশাসন বিশেষজ্ঞ, চাকরিপ্রার্থী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া উচিত।
  4. প্রক্সি ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে জালিয়াতি ঠেকাতে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা সংস্কারের একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে।
  5. ভাইভা বোর্ডে নির্দিষ্ট মূল্যায়ন ছক রাখতে হবে। কোন প্রার্থী কোন মানদণ্ডে কত নম্বর পেলেন, তার লিখিত রেকর্ড রাখতে হবে। সম্ভব হলে ভাইভা ভিডিও রেকর্ডিংয়ের আওতায় আনতে হবে।
  6. ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষার জন্য একটি আরও কেন্দ্রীভূত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যেন ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড ও অতিরিক্ত ব্যক্তিনির্ভরতার সুযোগ না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

জুলাইয়ে মানুষ যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল, তার একটি বড় অংশ ছিল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক করা। সেই সময়ের পর সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থায় যদি আবার এমন কোনো কাঠামো তৈরি হয়, যেখানে একজন প্রার্থীর ভাগ্য লিখিত পরীক্ষার তুলনায় কয়েকজন মানুষের ব্যক্তিগত মূল্যায়নের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করবে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হবে।

এ সরকারকে মনে করিয়ে দিতে চাই, জুলাই অভ্যুত্থানের শুরুটা হয়েছিল চাকরিতে বৈষম্যমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেই। তাই আহ্বান করব, নতুন করে বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে এমন কোনো ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত যেনো সরকার না নেয়।”

/জেএইচ/