শিরোনাম

এক্সপ্লেইনার

কার্যকারিতা হারালো ২০ অধ্যাদেশ, থামেনি সংস্কার নিয়ে দ্বন্দ্ব

সিটিজেন ডেস্ক
কার্যকারিতা হারালো ২০ অধ্যাদেশ, থামেনি সংস্কার নিয়ে দ্বন্দ্ব
জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষ। ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি শেষ পর্যন্ত আইনে রূপ পায়নি। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ১০ এপ্রিলের পর এগুলো কার্যকারিতা হারায়। অন্যদিকে ৯৭টি হুবহু পাস হয়েছে, ১৬টি সংশোধিত আকারে অনুমোদন পেয়েছে। সব মিলিয়ে সংসদের এই অধিবেশনে ৯১টি বিল পাস হয়েছে। কারণ কিছু বিলে একাধিক অধ্যাদেশ একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সংখ্যার হিসাবে দেখলে এটি বড়সড় এক নিষ্পত্তি। কিন্তু রাজনীতির জায়গা থেকে দেখলে বিষয়টি এত সরল নয়। কারণ যেসব অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে তার মধ্যে ছিল সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, গণভোট, দুর্নীতি দমন কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য অধিকার এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মতো স্পর্শকাতর বিষয়।

এই জায়গাটিতেই বিরোধী দল তাদের প্রধান আপত্তি তুলেছে। তাদের ভাষায়, বাদ পড়ে যাওয়া অধ্যাদেশগুলোর বড় অংশ ছিল আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার উদ্যোগ। অর্থাৎ সংখ্যায় বেশি আইন পাস হওয়া মানেই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য রক্ষা হয়েছে এমন নয়। এক্ষেত্রে বিরোধী দলের অভিযোগ, তুলনামূলক কম বিতর্কিত বা প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার বিষয়গুলো এগিয়েছে, কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তনের জায়গায় সরকার পিছিয়ে গেছে।

এই আপত্তি শুধু বক্তব্যে আটকে থাকেনি। ১০ এপ্রিল সংসদে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ পাসের সময় বিরোধী দলের দেওয়া সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ না করায় তারা আবারও ওয়াকআউট করে। বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এ সময় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশগুলোর অনুমোদন নিয়ে সরকারি দলের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ তোলেন এবং বলেন, ‘আজকে আমরা দুঃখ নিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছি। ভবিষ্যতে আবার দেখা হবে।’ এটিই ছিল চলতি অধিবেশনে বিরোধী জোটের চতুর্থ ওয়াকআউট।

ওয়াকআউটের গুরুত্ব শুধু সংসদীয় প্রতিক্রিয়ায় না, এর রাজনৈতিক ইশারাতেও। কারণ বিরোধী জোট একই সঙ্গে সংসদের ভেতরে আপত্তি তুলছে, আবার সংসদের বাইরেও গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকে যাচ্ছে। ফলে ২০টি অধ্যাদেশের কার্যকারিতা হারানোর প্রশ্ন এখন আর শুধু সংসদের কাগজে-কলমে আটকে নেই; এটি মাঠের রাজনীতির ভাষাও পেয়ে গেছে।

তবে সরকারের বক্তব্য ভিন্ন। সরকারি দলের দাবি, যেসব অধ্যাদেশ এখন পাস হয়নি, সেগুলোর অন্তত কিছুসংখ্যক আরও গভীর যাচাই-বাছাই করে পরে আইনে রূপ দেওয়া হবে। প্রতিবেদনে আরও এসেছে, পর্যালোচনার পর এগুলোকে আরও শক্তিশালী করে নতুন করে আনার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সরকার এই ২০টিকে চূড়ান্ত সমাপ্তি হিসেবে দেখাতে চাইছে না; বরং একটি স্থগিত প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরছে।

আইনগতভাবে অবশ্য বাস্তবতা বেশ পরিষ্কার। বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন না থাকলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সেই অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম বৈঠকে উপস্থাপন করতে হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইনে রূপ না পেলে তা কার্যকারিতা হারায়। অর্থাৎ বর্তমান অবস্থায় ২০টি অধ্যাদেশ আর বলবৎ নেই। পরে সরকার চাইলে একই বিষয়ে নতুন বিল আনতে পারে, কিন্তু তা হবে নতুন সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।

এই জায়গাতেই রাজনীতির বড় ফারাক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল বলছে, কার্যকারিতা হারানো মানে সরকার বাস্তবে পিছিয়ে গেছে। সরকার বলছে, বিষয়গুলো বাদ দেওয়া হয়নি, বরং আরও ভালোভাবে পুনর্গঠনের জন্য সময় নেওয়া হচ্ছে। দুই পক্ষের এই ভাষাগত পার্থক্য আসলে দুই ধরনের রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করছে। একপক্ষ এটিকে সংস্কারবিমুখতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখাতে চাইছে। আরেকপক্ষ এটিকে অপরিণত উদ্যোগের পরিমার্জনের সময় হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।

এখানে আরও একটি দিক লক্ষণীয়। পাস হওয়া ১১৩টি অধ্যাদেশের ভেতরেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ৯৭টি হুবহু পাস হওয়া অধ্যাদেশের পাশাপাশি ১৬টি সংশোধিত আকারে অনুমোদন পেয়েছে। সেই সংশোধিত অংশগুলোর মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর, পুলিশ কমিশন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, শ্রম আইন, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, মানবপাচার প্রতিরোধ এবং শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয় রয়েছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াকে একরৈখিকভাবে ব্যর্থ বলা যাবে না। এক্ষেত্রে বলা যায়, সংসদ একটি বাছাই করা পথ নিয়েছে। প্রশ্ন হলো, সেই বাছাইয়ের ভিত্তি কী।

এই প্রশ্নের উত্তরই সামনে রাজনীতির গতি নির্ধারণ করতে পারে। যদি সরকার পরবর্তী অধিবেশনগুলোতে বাদ পড়ে যাওয়া অধ্যাদেশগুলোর অন্তত কিছু আবার তোলে, তাহলে বলা যাবে এটি ছিল বিলম্ব, পিছিয়ে যাওয়া নয়। কিন্তু যদি বারবার ‘পর্যালোচনা’র কথা বলা হয়, আর আইনগুলো আর সংসদে ফিরে না আসে, তাহলে বিরোধী দলের অভিযোগ আরও জোর পাবে। তখন ২০টি অধ্যাদেশ কেবল হারিয়ে যাওয়া আইনগত উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া সংস্কার-অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবেও সামনে আসবে।

/বিবি/