শিরোনাম
বিএনপি সরকারের ছয় মাস

ফ্যামিলি কার্ডে স্বস্তি, অর্থনীতি-জ্বালানিতে অস্বস্তি

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ফ্যামিলি কার্ডে স্বস্তি, অর্থনীতি-জ্বালানিতে অস্বস্তি
সরকার প্রধান হিসেবে তারেক রহমানকে শপথ পড়ান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পূর্ণ করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পরদিন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সরকারের তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছিল। এগুলো হলো: দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।

ছয় মাস পর সরকারের সেই অগ্রাধিকারগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ, এই তিন ক্ষেত্রেই গত কয়েক মাসে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ দেখা গেছে।

তবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু, রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং সংসদ সদস্যদের ট্যাক্সমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্তসহ কিছু পদক্ষেপ প্রশংসা পেয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি যেসব অঙ্গীকার করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তার দাবি, গত ছয় মাসে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যের অধিকাংশই পূরণ হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ছিল। বিশেষ করে অপরাধ, গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হয়নি বলে মনে করছেন অনেকে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৯টি। কারাগারে বন্দি বা বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৫৫ জন। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৫টি। একই সময়ে মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১২০ জন।

অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৮৩০টি। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৫২৯। এ ছাড়া জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৬২১ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি।

ক্যাম্পাসগুলোতেও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে এনসিপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক মনে করেন, ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে আসেনি। তার মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।

অর্থনীতিতে কিছু উদ্যোগ, তবে মূল্যস্ফীতি বড় চাপ

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি আগেই নানা সংকটে ছিল। দুর্বল ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণ এবং কর্মসংস্থানের ধীরগতির মতো বিষয়গুলো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুনের মতে, ভঙ্গুর অর্থনীতি সামাল দিতে ছয় মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়, তবে একেবারে কম সময়ও নয়। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা এবং আগের পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ ইতিবাচক।

সরকার বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করতে তহবিল গঠনের উদ্যোগও নিয়েছে। এ উদ্যোগ সফল হলে কর্মসংস্থান বাড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

তবে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ এখনো দ্রব্যমূল্য। গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তামূলক উদ্যোগ কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিলেও বাজারে নিত্যপণ্যের দাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

ফাহমিদা খাতুনের মতে, মূল্যস্ফীতি কমাতে আর্থিক নীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ-গ্যাসে সংকট

সরকারের ছয় মাসের সময়কালে সবচেয়ে বেশি আলোচিত সমস্যাগুলোর একটি ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়েছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ। জুন মাসের ব্যবহারের বিপরীতে অনেক গ্রাহক স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদের মতে, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ ও বিলের বিষয়গুলোতে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন ছিল। তার প্রশ্ন, ছয় মাসে অন্তত বিদ্যুৎ খাতকে স্থিতিশীল করা সম্ভব হলো না কেন।

তবে জ্বালানি খাতে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে গ্যাস সংকটকে কেন্দ্র করে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি এবং টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে সংকট আরও তীব্র হয়েছে বলে সরকার দাবি করছে।

জুলাইয়ের শেষ দিকে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি পর্যন্ত ভোগান্তি বেড়ে যায়। সংকটের প্রতিবাদে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট রাজপথে কর্মসূচি দেয়। বিরোধী দল সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও পালন করে।

অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুনের মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে অর্থনীতির গতি ধরে রাখা কঠিন হবে।

সরকার অবশ্য বলছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং অবকাঠামোগত সমস্যার ভূমিকা রয়েছে। রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আশা করছেন, দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

কূটনীতিতে কিছু সাফল্য

অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও সুশাসন নিয়ে সমালোচনা থাকলেও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের কিছু অর্জন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়াকে সরকারের অন্যতম কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির এটিকে বর্তমান সরকারের বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এ ছাড়া ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া ও চীন। ২১ থেকে ২৬ জুনের এ সফরে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু, বাংলাদেশ-মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডর এবং চীনের সঙ্গে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের উদ্যোগকেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হলেও শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও বিভিন্ন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ এখন প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশের অপেক্ষায় রয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

সংস্কার ও সুশাসনে প্রশ্ন

গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবিতে বিভিন্ন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে জুলাই সনদও তৈরি হয় এবং এর ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।

কিন্তু নির্বাচনের পর গণভোটের আদেশকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ না করায় বিএনপির সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিচার বিভাগকে স্বাধীন ও কার্যকর করা, পুলিশ সংস্কার, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন এবং গুমের মতো গুরুতর বিষয়ে গত ছয় মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন, বিচারক নিয়োগ ও পুলিশ সংস্কারের মতো বিষয়েও প্রত্যাশিত উদ্যোগ দেখা যায়নি।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংস্কার প্রশ্নে সরকারের অবস্থান নিয়ে এরই মধ্যে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন জোট। ফলে সরকারের সামনে শুধু অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি সংকটই নয়, রাজনৈতিক সমঝোতা ও সংস্কার বাস্তবায়নও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু সামাজিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রশংসা পেলেও দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আগামী ছয় মাসে এসব ক্ষেত্রে সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

উল্লেখ্য, বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে আজ সোমবার (১৭ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘শাপলা’ হলে সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম, অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিশেষ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ সভায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নিচ্ছেন। সকাল ১১টায় শুরু হওয়া সভায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও কৃষি উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, রাজনৈতিক ও শিল্প উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

/এমআর/