কাশ্মিরে হত্যার দাবি ভারতের, তাকেই মিডিয়ার সামনে হাজির করলো পাকিস্তান

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
কাশ্মিরে হত্যার দাবি ভারতের, তাকেই মিডিয়ার সামনে হাজির করলো পাকিস্তান
পাকিস্তান আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী (বামে) এবং ভারতের সেনাবাহিনীর অভিযানে নিহত দাবি করা মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মূসা। ছবি: ডন

কাশ্মিরের পেহেলগাম হামলার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মূসা নামের এক পাকিস্তানি ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছিল নয়াদিল্লি। কিন্তু ভারতের সেই দাবি উড়িয়ে দিয়ে হাশিম মূসাকে সংবাদ সম্মেলনে হাজির করে ‘জীবিত ও সুস্থ’ বলে দাবি করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।

সংবাদমাধ্যম ডনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী ভারতের হাশিম মূসাকে হত্যার দাবি উড়িয়ে দিয়ে উপহাস করেছেন।

ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গত বছরের ২২ এপ্রিল পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন এক ব্যক্তি ভারতের নিয়ন্ত্রণাধীন কাশ্মিরের কোরাগ এলাকায় ‘এনকাউন্টারে’ নিহত হয়েছেন।

এই দাবির প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সংবাদ সম্মেলন করে পাকিস্তান আইএসপিআর। সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘নিষ্ক্রিয়’ বা মেরে ফেলার দাবি করা মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মূসাকে সবার সামনে হাজির করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের এই মহাপরিচালক দাবি করেন, ভারতীয় গণমাধ্যমে যাকে নিহত হিসেবে প্রচার করা হয়েছে, ‘তিনি জীবিত এবং সুস্থ আছেন।’

আহমেদ শরীফ চৌধুরী ভারতীয় দাবিকে ‘তথাকথিত সন্ত্রাসী ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি ভারতীয় রাজনৈতিক ও সামরিক বাহিনীর সাজানো একটি ‘ফলস-ফ্ল্যাগ’ অভিযান।

তিনি সংবাদ সম্মেলনে ঘটনাটির পাঁচ দফা সময়রেখা তুলে ধরেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিন্নার কোর তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, যৌথ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) কোরাগ ও ইউসমার্গের সাধারণ এলাকায় একটি অভিযান শুরু করেছে।

৩০ সেপ্টেম্বর সকালে চিন্নার কোরের আরেকটি পোস্টে দাবি করা হয়, ভারতীয় বাহিনী অভিযানের সময় লস্কর-ই-তৈয়বার এক ‘সন্ত্রাসীর’ মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই দাবি করে, নিহত ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে। তার নাম মোহাম্মদ আসিফ। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপের (এসএসজি) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোও (পিআইবি) একই ধরনের দাবি করে। তারা জানায়, ‘মুসা ওরফে আসিফ ফৌজি’কে নিষ্ক্রিয় করা মে মাসে শুরু হওয়া দীর্ঘমেয়াদি ‘অপারেশন শেরুওয়ালি’র চলমান অভিযানের অংশ। এ বিষয়ে পাকিস্তান আইএসপিআরের মহাপরিচালক ব্যঙ্গ করে বলেন, ছয় মাসের কঠোর পরিশ্রমের পর মুসা ওরফে আসিফ ফৌজিকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। এজন্য তাদের অভিনন্দন ও করতালি দেওয়া উচিত।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যম আসিফকে ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কাশ্মীরে অন্তত ৮টি হামলার সঙ্গে যুক্ত বলেও দাবি করে। আসিফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একই গোষ্ঠীর আরও তিন সদস্যকে অভিযানে ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়েছে বলেও দাবি করে ভারত সরকার।

আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেন, সংবাদ সম্মেলনের পর এসব ‘লজ্জাজনক’ প্রচারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অন্তত নিজেদের প্রচারের বিষয়ে লজ্জা পাওয়া উচিত। সেইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টগুলো মুছে ফেলা উচিত। তিনি ভারতীয় পিআইবির একটি বিবৃতিও পড়ে শোনান, যেখানে দাবি করা হয়েছিল- অভিযানে লস্কর-ই-তৈয়বার চারজন ‘জ্যেষ্ঠ কমান্ডার’ নিহত হয়েছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন নিয়েও ব্যঙ্গ করেন আইএসপিআর মহাপরিচালক। সংবাদ সম্মেলনে তিনি দ্য স্টেটসম্যান, ইন্ডিয়া টুডে, হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও স্ক্রিনশট দেখান। পরে মোহাম্মদ আসিফকে মঞ্চে আসতে বলেন এবং জানান, আসিফ পাকিস্তানের আটক জেলার বাসিন্দা। এ সময় তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে আসিফকে ‘সুপারম্যান’ হিসেবে উল্লেখ করে তার ‘কৃতিত্ব’ সম্পর্কে জানতে চান।

সংবাদ সম্মেলনে আসিফ বলেন, আগের দিন তার বন্ধুরা ফোন করে জানিয়েছিল যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়েছে, কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করেছে। তিনি ‘শহীদ’ হয়েছেন।

আসিফ আরও বলেন, ভারতীয় নম্বর থেকে তার কাছে একাধিক ফোন এসেছিল। ফোনকারীরা তার ব্যক্তিগত তথ্য, পরিচয়, অবস্থান এবং ভারতীয় বাহিনীর অভিযানে তার নাম জড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইছিল। পরে এএনআইয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম তার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে কাশ্মীরের একটি অভিযানে নিহত বা ‘শহীদ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এতে তিনি বিস্মিত হন। কারণ তখন তিনি নিজের বাড়িতেই বসে ছিলেন।

আসিফ বিষয়টি তার ইউনিটকে জানান। ইউনিট থেকে তাকে ভারতীয় নম্বর থেকে আসা সব ফোন ব্লক করতে বলা হয়। পরে জানানো হয় যে আইএসপিআরের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।

আসিফ জানান, তিনি ২০০০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ২০০৫ সালে স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপ বা এসএসজিতে যোগ দিয়ে সেখানে ১৮ বছর সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। এরপর তিন বছর একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। গত তিন থেকে চার মাস ধরে তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে বসবাস করছেন।

ভারতীয় গণমাধ্যম ও কর্তৃপক্ষের অভিযোগকে ‘মিথ্যা, লজ্জাজনক ও অসম্মানজনক’ বলে অভিহিত করেন আসিফ। তিনি এসব দাবির নিন্দা জানান। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা আরও বলেন, পাকিস্তান সামনাসামনি জবাব দেয়, আড়াল থেকে নয়।

সূত্র: ডন, এপি, টিআরটি ওয়ার্ল্ড

/জেএইচ/