সরকার গঠনের পথে আইজেনকটের সামনে যত বাধা

সরকার গঠনের পথে আইজেনকটের সামনে যত বাধা
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক

ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটির সংসদ নেসেটে অচলাবস্থা কাটছে না। এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ আইনপ্রণেতার সমর্থন পাওয়ার দাবি করেছেন। আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ও ‘রা’আম’ দলের আনুষ্ঠানিক সমর্থনে তার পাল্লা ভারী হলেও শেষ পর্যন্ত এ জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজোগ স্পষ্ট করেছেন যে, এ রাজনৈতিক জট ছাড়াতে রবিবার (৮ নভেম্বর) তিনি চূড়ান্তভাবে একজন প্রার্থীকে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট দেবেন। তবে আইজেনকট বা নেতানিয়াহু- উভয় শিবিরই আরব ব্লকের ওপর নির্ভর করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না। ফিলিস্তিন সংঘাত এবং ইসরায়েলি নীতি নিয়ে এই আরব দলগুলোর কড়া অবস্থান পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও গোলমেলে করে তুলেছে।
১২০ আসনের হিসাব
ইসরায়েলি পার্লামেন্টে সরকার গড়তে হলে ৬১টি আসনের ম্যাজিক ফিগার প্রয়োজন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও অতি-গোঁড়া ইহুদি জোট পেয়েছে ৫৩ আসন। অন্যদিকে, আইজেনকটের মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টি এবং তাদের সমমনা দলগুলো পেয়েছে ৪৮ আসন।
তবে মূল নাটকটি তৈরি হয়েছে আরব ভোটারদের রেকর্ড উপস্থিতির কারণে। দুটি আরব জোট মিলে জিতেছে অভাবনীয় ১৯টি আসন। এর মধ্যে ‘রা’আম পার্টি’ ৮টি এবং ‘জয়েন্ট লিস্ট’ পেয়েছে ১১টি আসন। এ ১৯ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন যদি আইজেনকট শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করেন, তবে তার ঝুলিতে যাবে মোট ৬৭টি আসন। যা সহজেই তাকে ৬১ আসনের গণ্ডি পার করে দিতে পারে।
এদিকে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের মিত্র কট্টরপন্থী ইহুদি দল ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম’ (ইউটিজে) রাষ্ট্রপতির কাছে কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে রাজি হয়নি। ফলে নেতানিয়াহুর পক্ষে এখন মাত্র ৪৬ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন রয়েছে। রাষ্ট্রপতি হারজোগ ইতোমধ্যে নির্বাচনি ফলকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক বলে মেনে নিয়েছেন এবং নির্বাচন চুরির মতো নেতানিয়াহু ব্লকের ভিত্তিহীন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন।
আইজেনকটের সামনে যত বাধা
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইজেনকটের সামনে রয়েছে তিনটি ভিন্ন পথ, যার প্রতিটিতেই রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি ও আদর্শগত সংঘাত।
প্রথমত, আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠন। রা’আম জোটে যোগ দিতে প্রস্তুত থাকলেও, জয়েন্ট লিস্ট বাইরে থেকে সমর্থন দিতে চায় ইসরায়েলি আরবদের সুরক্ষার শর্তে। কিন্তু আইজেনকট নিজেই এর আগে আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছিলেন। ৩১ অক্টোবর দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, সামরিক বা জাতীয় সেবা বাধ্যতামূলক করা এবং গাজায় হামাসের ক্ষমতা খর্ব করাসহ বেশ কিছু কড়া শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। এছাড়া নাফতালি বেনেট বা আভিগডর লিবারম্যানের মতো কট্টর ইহুদিবাদী নেতাদের জন্যও আরবদের ওপর নির্ভরশীল সরকার মেনে নেওয়া সহজ হবে না।
দ্বিতীয়ত, অতি-গোঁড়া দল ইউটিজে-এর সঙ্গে হাত মেলানো। বিচারিক হস্তক্ষেপে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দিতে লিকুদ দলের ব্যর্থতায় বেজায় চপেটাঘাত পাওয়া ইউটিজে নেতারা বিকল্প হিসেবে আইজেনকটকে সমর্থন দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। গুঞ্জন ছিল, তাদের ৭ জন আইনপ্রণেতা আস্থা ভোটে বিরত থাকলে আরব দলগুলোকে ছাড়াই আইজেনকট সরকার গড়তে পারেন। তবে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিষয়টি-আইজেনকট যেখানে সবার জন্য সেবা চান, ইউটিজে সেখানে তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য ছাড় টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর।
তৃতীয় বিকল্প হলো একটি জাতীয় ঐক্য সরকার। বারবার নির্বাচন এড়াতে রাষ্ট্রপতি হারজোগ বরাবরই নেতানিয়াহু ও তার বিরোধীদের নিয়ে ঐক্য সরকারের পক্ষে। এর আগে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর বেনী গান্তজ ও আইজেনকট রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন সরকারে যোগও দিয়েছিলেন। তবে এবার আইজেনকট জানিয়েছেন যে তিনি নেতানিয়াহুর অধীনে কাজ করবেন না। তাছাড়া বিরোধী জোটের মূল প্রচারণাই ছিল নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
চতুর্থত, আইজেনকট সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারবেন। এই সময়ের মধ্যে জোটের শরিকদের সঙ্গে মন্ত্রিসভার পদ বণ্টন, নীতিগত অবস্থান ও অন্যান্য বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই সরকার গঠন করতে না পারলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
নেতানিয়াহু কী ভাবছেন
আইজেনকট ৬৭ আসনের দাবি করলেও আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে এ জোট কতদূর টিকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে কাজ চালিয়ে যান বিদায়ীরা। তাই আইজেনকট ম্যান্ডেট পেলেও নেতানিয়াহু আপাতত প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারেই থাকছেন।
অতীতেও এমন রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে ফায়দা লুটেছেন নেতানিয়াহু। ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নির্বাচন বারবার ভেস্তে গেলেও তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন। ২৭ অক্টোবরের রায়ে ভোটাররা তাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করলেও তার জোটকে কিছুটা দুর্বল করে দিয়েছে। লিকুদ পার্টি ২৭ আসন পেয়ে এককভাবে সবচেয়ে বড় দল হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে সরকার গঠন নিয়ে দরকষাকষিতে ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর ক্ষমতাকেই দীর্ঘায়িত করতে পারে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল

ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটির সংসদ নেসেটে অচলাবস্থা কাটছে না। এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ আইনপ্রণেতার সমর্থন পাওয়ার দাবি করেছেন। আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ও ‘রা’আম’ দলের আনুষ্ঠানিক সমর্থনে তার পাল্লা ভারী হলেও শেষ পর্যন্ত এ জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজোগ স্পষ্ট করেছেন যে, এ রাজনৈতিক জট ছাড়াতে রবিবার (৮ নভেম্বর) তিনি চূড়ান্তভাবে একজন প্রার্থীকে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট দেবেন। তবে আইজেনকট বা নেতানিয়াহু- উভয় শিবিরই আরব ব্লকের ওপর নির্ভর করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না। ফিলিস্তিন সংঘাত এবং ইসরায়েলি নীতি নিয়ে এই আরব দলগুলোর কড়া অবস্থান পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও গোলমেলে করে তুলেছে।
১২০ আসনের হিসাব
ইসরায়েলি পার্লামেন্টে সরকার গড়তে হলে ৬১টি আসনের ম্যাজিক ফিগার প্রয়োজন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও অতি-গোঁড়া ইহুদি জোট পেয়েছে ৫৩ আসন। অন্যদিকে, আইজেনকটের মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টি এবং তাদের সমমনা দলগুলো পেয়েছে ৪৮ আসন।
তবে মূল নাটকটি তৈরি হয়েছে আরব ভোটারদের রেকর্ড উপস্থিতির কারণে। দুটি আরব জোট মিলে জিতেছে অভাবনীয় ১৯টি আসন। এর মধ্যে ‘রা’আম পার্টি’ ৮টি এবং ‘জয়েন্ট লিস্ট’ পেয়েছে ১১টি আসন। এ ১৯ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন যদি আইজেনকট শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করেন, তবে তার ঝুলিতে যাবে মোট ৬৭টি আসন। যা সহজেই তাকে ৬১ আসনের গণ্ডি পার করে দিতে পারে।
এদিকে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের মিত্র কট্টরপন্থী ইহুদি দল ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম’ (ইউটিজে) রাষ্ট্রপতির কাছে কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে রাজি হয়নি। ফলে নেতানিয়াহুর পক্ষে এখন মাত্র ৪৬ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন রয়েছে। রাষ্ট্রপতি হারজোগ ইতোমধ্যে নির্বাচনি ফলকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক বলে মেনে নিয়েছেন এবং নির্বাচন চুরির মতো নেতানিয়াহু ব্লকের ভিত্তিহীন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন।
আইজেনকটের সামনে যত বাধা
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইজেনকটের সামনে রয়েছে তিনটি ভিন্ন পথ, যার প্রতিটিতেই রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি ও আদর্শগত সংঘাত।
প্রথমত, আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠন। রা’আম জোটে যোগ দিতে প্রস্তুত থাকলেও, জয়েন্ট লিস্ট বাইরে থেকে সমর্থন দিতে চায় ইসরায়েলি আরবদের সুরক্ষার শর্তে। কিন্তু আইজেনকট নিজেই এর আগে আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছিলেন। ৩১ অক্টোবর দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, সামরিক বা জাতীয় সেবা বাধ্যতামূলক করা এবং গাজায় হামাসের ক্ষমতা খর্ব করাসহ বেশ কিছু কড়া শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। এছাড়া নাফতালি বেনেট বা আভিগডর লিবারম্যানের মতো কট্টর ইহুদিবাদী নেতাদের জন্যও আরবদের ওপর নির্ভরশীল সরকার মেনে নেওয়া সহজ হবে না।
দ্বিতীয়ত, অতি-গোঁড়া দল ইউটিজে-এর সঙ্গে হাত মেলানো। বিচারিক হস্তক্ষেপে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দিতে লিকুদ দলের ব্যর্থতায় বেজায় চপেটাঘাত পাওয়া ইউটিজে নেতারা বিকল্প হিসেবে আইজেনকটকে সমর্থন দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। গুঞ্জন ছিল, তাদের ৭ জন আইনপ্রণেতা আস্থা ভোটে বিরত থাকলে আরব দলগুলোকে ছাড়াই আইজেনকট সরকার গড়তে পারেন। তবে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিষয়টি-আইজেনকট যেখানে সবার জন্য সেবা চান, ইউটিজে সেখানে তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য ছাড় টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর।
তৃতীয় বিকল্প হলো একটি জাতীয় ঐক্য সরকার। বারবার নির্বাচন এড়াতে রাষ্ট্রপতি হারজোগ বরাবরই নেতানিয়াহু ও তার বিরোধীদের নিয়ে ঐক্য সরকারের পক্ষে। এর আগে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর বেনী গান্তজ ও আইজেনকট রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন সরকারে যোগও দিয়েছিলেন। তবে এবার আইজেনকট জানিয়েছেন যে তিনি নেতানিয়াহুর অধীনে কাজ করবেন না। তাছাড়া বিরোধী জোটের মূল প্রচারণাই ছিল নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
চতুর্থত, আইজেনকট সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারবেন। এই সময়ের মধ্যে জোটের শরিকদের সঙ্গে মন্ত্রিসভার পদ বণ্টন, নীতিগত অবস্থান ও অন্যান্য বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই সরকার গঠন করতে না পারলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
নেতানিয়াহু কী ভাবছেন
আইজেনকট ৬৭ আসনের দাবি করলেও আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে এ জোট কতদূর টিকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে কাজ চালিয়ে যান বিদায়ীরা। তাই আইজেনকট ম্যান্ডেট পেলেও নেতানিয়াহু আপাতত প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারেই থাকছেন।
অতীতেও এমন রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে ফায়দা লুটেছেন নেতানিয়াহু। ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নির্বাচন বারবার ভেস্তে গেলেও তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন। ২৭ অক্টোবরের রায়ে ভোটাররা তাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করলেও তার জোটকে কিছুটা দুর্বল করে দিয়েছে। লিকুদ পার্টি ২৭ আসন পেয়ে এককভাবে সবচেয়ে বড় দল হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে সরকার গঠন নিয়ে দরকষাকষিতে ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর ক্ষমতাকেই দীর্ঘায়িত করতে পারে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল

সরকার গঠনের পথে আইজেনকটের সামনে যত বাধা
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক

ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটির সংসদ নেসেটে অচলাবস্থা কাটছে না। এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ আইনপ্রণেতার সমর্থন পাওয়ার দাবি করেছেন। আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ও ‘রা’আম’ দলের আনুষ্ঠানিক সমর্থনে তার পাল্লা ভারী হলেও শেষ পর্যন্ত এ জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজোগ স্পষ্ট করেছেন যে, এ রাজনৈতিক জট ছাড়াতে রবিবার (৮ নভেম্বর) তিনি চূড়ান্তভাবে একজন প্রার্থীকে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট দেবেন। তবে আইজেনকট বা নেতানিয়াহু- উভয় শিবিরই আরব ব্লকের ওপর নির্ভর করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না। ফিলিস্তিন সংঘাত এবং ইসরায়েলি নীতি নিয়ে এই আরব দলগুলোর কড়া অবস্থান পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও গোলমেলে করে তুলেছে।
১২০ আসনের হিসাব
ইসরায়েলি পার্লামেন্টে সরকার গড়তে হলে ৬১টি আসনের ম্যাজিক ফিগার প্রয়োজন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও অতি-গোঁড়া ইহুদি জোট পেয়েছে ৫৩ আসন। অন্যদিকে, আইজেনকটের মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টি এবং তাদের সমমনা দলগুলো পেয়েছে ৪৮ আসন।
তবে মূল নাটকটি তৈরি হয়েছে আরব ভোটারদের রেকর্ড উপস্থিতির কারণে। দুটি আরব জোট মিলে জিতেছে অভাবনীয় ১৯টি আসন। এর মধ্যে ‘রা’আম পার্টি’ ৮টি এবং ‘জয়েন্ট লিস্ট’ পেয়েছে ১১টি আসন। এ ১৯ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন যদি আইজেনকট শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করেন, তবে তার ঝুলিতে যাবে মোট ৬৭টি আসন। যা সহজেই তাকে ৬১ আসনের গণ্ডি পার করে দিতে পারে।
এদিকে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের মিত্র কট্টরপন্থী ইহুদি দল ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম’ (ইউটিজে) রাষ্ট্রপতির কাছে কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে রাজি হয়নি। ফলে নেতানিয়াহুর পক্ষে এখন মাত্র ৪৬ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন রয়েছে। রাষ্ট্রপতি হারজোগ ইতোমধ্যে নির্বাচনি ফলকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক বলে মেনে নিয়েছেন এবং নির্বাচন চুরির মতো নেতানিয়াহু ব্লকের ভিত্তিহীন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন।
আইজেনকটের সামনে যত বাধা
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইজেনকটের সামনে রয়েছে তিনটি ভিন্ন পথ, যার প্রতিটিতেই রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি ও আদর্শগত সংঘাত।
প্রথমত, আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠন। রা’আম জোটে যোগ দিতে প্রস্তুত থাকলেও, জয়েন্ট লিস্ট বাইরে থেকে সমর্থন দিতে চায় ইসরায়েলি আরবদের সুরক্ষার শর্তে। কিন্তু আইজেনকট নিজেই এর আগে আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছিলেন। ৩১ অক্টোবর দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, সামরিক বা জাতীয় সেবা বাধ্যতামূলক করা এবং গাজায় হামাসের ক্ষমতা খর্ব করাসহ বেশ কিছু কড়া শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। এছাড়া নাফতালি বেনেট বা আভিগডর লিবারম্যানের মতো কট্টর ইহুদিবাদী নেতাদের জন্যও আরবদের ওপর নির্ভরশীল সরকার মেনে নেওয়া সহজ হবে না।
দ্বিতীয়ত, অতি-গোঁড়া দল ইউটিজে-এর সঙ্গে হাত মেলানো। বিচারিক হস্তক্ষেপে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দিতে লিকুদ দলের ব্যর্থতায় বেজায় চপেটাঘাত পাওয়া ইউটিজে নেতারা বিকল্প হিসেবে আইজেনকটকে সমর্থন দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। গুঞ্জন ছিল, তাদের ৭ জন আইনপ্রণেতা আস্থা ভোটে বিরত থাকলে আরব দলগুলোকে ছাড়াই আইজেনকট সরকার গড়তে পারেন। তবে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিষয়টি-আইজেনকট যেখানে সবার জন্য সেবা চান, ইউটিজে সেখানে তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য ছাড় টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর।
তৃতীয় বিকল্প হলো একটি জাতীয় ঐক্য সরকার। বারবার নির্বাচন এড়াতে রাষ্ট্রপতি হারজোগ বরাবরই নেতানিয়াহু ও তার বিরোধীদের নিয়ে ঐক্য সরকারের পক্ষে। এর আগে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর বেনী গান্তজ ও আইজেনকট রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন সরকারে যোগও দিয়েছিলেন। তবে এবার আইজেনকট জানিয়েছেন যে তিনি নেতানিয়াহুর অধীনে কাজ করবেন না। তাছাড়া বিরোধী জোটের মূল প্রচারণাই ছিল নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
চতুর্থত, আইজেনকট সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারবেন। এই সময়ের মধ্যে জোটের শরিকদের সঙ্গে মন্ত্রিসভার পদ বণ্টন, নীতিগত অবস্থান ও অন্যান্য বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই সরকার গঠন করতে না পারলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
নেতানিয়াহু কী ভাবছেন
আইজেনকট ৬৭ আসনের দাবি করলেও আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে এ জোট কতদূর টিকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে কাজ চালিয়ে যান বিদায়ীরা। তাই আইজেনকট ম্যান্ডেট পেলেও নেতানিয়াহু আপাতত প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারেই থাকছেন।
অতীতেও এমন রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে ফায়দা লুটেছেন নেতানিয়াহু। ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নির্বাচন বারবার ভেস্তে গেলেও তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন। ২৭ অক্টোবরের রায়ে ভোটাররা তাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করলেও তার জোটকে কিছুটা দুর্বল করে দিয়েছে। লিকুদ পার্টি ২৭ আসন পেয়ে এককভাবে সবচেয়ে বড় দল হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে সরকার গঠন নিয়ে দরকষাকষিতে ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর ক্ষমতাকেই দীর্ঘায়িত করতে পারে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল

ইসরায়েলের পতন হতে যাচ্ছে: নেতানিয়াহু







