শিরোনাম

অনিশ্চয়তায় গাজা পুনর্গঠনের উদ্যোগ

অনিশ্চয়তায় গাজা পুনর্গঠনের উদ্যোগ
গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যে ধ্বংসস্তূপের সামনে এক আহত ফিলিস্তিনি শিশু। রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে গাজা আজ কেবল একটি ভূখণ্ডের নাম নয়। এটি মানবিক বিপর্যয়, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং ব্যর্থ কূটনীতির প্রতীক। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গাজার পরিস্থিতি যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থান। গত বছর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর গাজা পুনর্গঠন ও অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ‘শান্তি পর্ষদ’ গঠন করা হয়েছে।

তবে অনেক কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোলাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে গাজা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। কারণ ইসরায়েলের নানামুখী অপতৎপরতা গাজাবাসীর জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

গাজার সার্বিক পরিস্থিতি

ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় প্রায় ১ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি বাফার জোন (সংঘাতের প্রভাব এড়াতে বিশেষ অঞ্চল) তৈরি করেছে। এই অঞ্চলের সব ভবন বুলডোজারের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দিয়ে গাজার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত এই বাফার জোন তৈরি করা হয়েছে। এখানে ফিলিস্তিনিরা পা রাখা মাত্রই ইসরায়েলি বাহিনীর বুলেটের নিশানায় পরিণত হয়।

এ ছাড়া গাজায় অবকাঠামোগত ধ্বংস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পুনর্গঠন এখন শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক শব্দে পরিণত হয়েছে। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎকেন্দ্র—সবকিছুই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। মানবিক সহায়তাও সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ত্রাণ পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও বিভিন্ন পর্যায়ে বাধা, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে সেটিও পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় গাজাকে কেবল মানবিক সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এখন আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্র। গাজার পুনর্গঠন কে করবে, কে নিরাপত্তা দেবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করবে।

গাজায় যুদ্ধবিরতির সময় একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বাবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে ফিলিস্তিনি  শিশুরা। রয়টার্স
গাজায় যুদ্ধবিরতির সময় একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বাবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে ফিলিস্তিনি শিশুরা। রয়টার্স

ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজার পুনর্গঠন ও অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থা হিসেবে ‘শান্তি পর্ষদ’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। যেটি গাজার পুনর্গঠন ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে।

শান্তি পর্ষদ-এর প্রথম বৈঠকে ৯টি দেশ গাজা পুনর্গঠন তহবিলে প্রায় ৭০০ কোটি ডলার অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ৫টি দেশ ‘শান্তি পর্ষদ’ এর অধীনে গঠিত শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সেনা পাঠাতে সম্মত হয়েছে।

গাজা পুনর্গঠন তহবিলে যুক্তরাষ্ট্র ১০ বিলিয়ন ডলার এবং বাকি দেশগুলো ৭ বিলিয়ন ডলার অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই তহবিল দিয়ে তিন বছরের মধ্যে গাজার রাফা অঞ্চলকে পুনর্গঠন করা হবে।

এতে বিনির্মাণ, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১২ হাজার পুলিশ ও ২০ হাজার শান্তিরক্ষী বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা চলছে।

কিন্তু এই পরিকল্পনায় একটি পূর্ণাঙ্গ ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন–এর স্বীকৃতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। এ ছাড়া ফিলিস্তিনের স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলোরও সায় নেই এতে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক অধিকারের বিকল্প হতে পারে না। ফিলিস্তিন প্রশ্নের মূল সংকট হচ্ছে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের অধিকার। সেটি অস্পষ্ট থাকলে কোনো শান্তি পরিকল্পনাই টেকসই হবে না।

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা

এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক উত্তেজনা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। হুমকির পাশাপাশি লোহিত সাগরে দুই দেশের সামরিক মহড়া ও প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে যুদ্ধের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত যদি সরাসরি যুদ্ধে রূপ নেয়, তাহলে গাজা ইস্যু দ্বিতীয় সারিতে চলে যাবে। কারণ তখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পাবে। এতে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্ন আরও দীর্ঘসূত্রিতায় পড়তে পারে।

কারা থাকবে গাজার নিরাপত্তায়

গাজার নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নানা প্রস্তাব ঘুরছে। কেউ বলছে ‘শান্তি পর্ষদ’ এর অধীনে শান্তিরক্ষী বাহিনী, কেউ বলছে সরাসরি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ, আবার কেউ আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানের কথা বলছে। এখানে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

গাজার নিরাপত্তা প্রশ্নটি আসলে রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্ন। যদি স্থানীয় জনগণের গ্রহণযোগ্যতা না থাকে, তাহলে কোনো বাহিনীই সেখানে দীর্ঘমেয়াদে টিকতে পারবে না। নিরাপত্তা কেবল সামরিক উপস্থিতি নয়, এটি রাজনৈতিক আস্থারও বিষয়।

গাজার পুনর্গঠন: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ উপসাগরীয় ও ইউরোপীয় দেশগুলো অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধীর। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে বাধা, প্রশাসনিক জটিলতা—সব মিলে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই।

পুনর্গঠন রাজনৈতিক সমাধানের সঙ্গে সমন্বিত না হলে এটি সাময়িক স্থিতি হয়তো আনবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নতুন করে সংঘাতের বীজ বপন করবে। কারণ ধ্বংসস্তূপের ওপর কেবল ভবন নয়, আস্থাও পুনর্নির্মাণ করতে হয়।

গাজায়  যুদ্ধবিরতির মধ্যে ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। রয়টার্স
গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যে ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। রয়টার্স

রমজানে গাজাবাসীর জীবন

ধর্মীয় সংস্কৃতি লালন গাজাবাসীর চিরাচরিত রূপ। কোনো হামলাই যেন তাদের এই চর্চাকে পরিবর্তন করতে পারে না। তবে রমজানে গাজায় ধর্মীয় আবহ থাকলেও বাস্তবতা কঠিন। সীমিত খাদ্য, নিরাপত্তাহীনতা, পরিবারের সদস্যদের হারানোর বেদনা—সব মিলে পবিত্র রমজান মাসও তাদের জন্য এক সংগ্রামের পরীক্ষা। এত প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও রমজানে মানুষের মধ্যে যে সামাজিকতা ও আধ্যাত্মিকতা দেখা যায়, সেটিই গাজাবাসীর জন্য এক বড় শক্তি।

এই মানসিক দৃঢ়তাই ফিলিস্তিনের জাতীয় চেতনার মূল ভিত্তি। রাজনৈতিক সমাধান বিলম্বিত হলেও এই চেতনা তাদের স্বাধীনতার দাবিকে জিইয়ে রাখে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি-ডব্লিওএফপি জানিয়েছে, ত্রাণ পরিবহনে বাধা দেওয়ায় গাজায় অপুষ্টি ও খাদ্য সংকট এখনো প্রবল। রমজানেও সাধারণ ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো পর্যাপ্ত খাবার ও পানি পাচ্ছে না। হামলার পর বিভিন্ন এলাকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। এতে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে একটি দাতব্য রান্নাঘর থেকে খাবার গ্রহণের জন্য ফিলিস্তিনিরা জড়ো হচ্ছে। রয়টার্স
দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে একটি দাতব্য রান্নাঘর থেকে খাবার গ্রহণের জন্য ফিলিস্তিনিরা জড়ো হচ্ছে। রয়টার্স

পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নতুন বসতি স্থাপন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক আইনে এটি অবৈধ হলেও বাস্তবে সম্প্রসারণ থামছে না। যা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা যত বাড়বে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণা তত কঠিন হবে। বসতি ইস্যু সমাধান না হলে স্বাধীনতার প্রশ্ন কেবল কূটনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকবে।

ইসরায়েল তাদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে। হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ তাদের মূলনীতি। আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও তারা এ অবস্থানে কঠোর।

গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা তাঁবুতে আশ্রয় নিচ্ছে। রয়টার্স
গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা তাঁবুতে আশ্রয় নিচ্ছে। রয়টার্স

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা কী অধরাই থেকে যাবে

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা অনিশ্চিতই বলা যায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের উদ্যোগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছিল, যেখানে ১৪২টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে এটি একটি রাজনৈতিক সমর্থন মাত্র, এতে আইনি বাধ্যবাধকতা নেই এবং বাস্তবে ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক শান্তি পর্ষদ, শান্তি রক্ষীবাহিনী ও গাজা পুনর্গঠনের উদ্যোগগুলো শুধু সার্বিক পরিস্থিতি সামান্য স্থিতিশীল করেছে মাত্র—স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি তৈরিতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

গাজার ধ্বংসস্তূপ, পশ্চিম তীরের বসতি, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। তবুও ইতিহাস বলছে, দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জাতিগুলো তাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও স্বাধীনতার প্রশ্নটি সময়ের ওপর নির্ভর করছে। তবে সেই সময় নির্ভর করছে কূটনীতি, নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।

স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হ্রাস, ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ ঐক্য সেই সময়ের নির্ধারক হবে।

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীর এই দুই ভূখণ্ডে পুরোনো রাজনৈতিক বিরোধ এবং সাম্প্রতিক মানবিক সংকট এখন বিশ্বজুড়ে আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নতুন শান্তি পর্ষদ, যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং গাজার পুনর্গঠনের পরিকল্পনা—ফিলিস্তিন কী সত্যিই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, নাকি তাদের এই স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে—তা দেখার অপেক্ষায় গোটা বিশ্ব।

/এমআর/