
সিটিজেন ডেস্ক


মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক এক হামলায় ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি নিহত হয়েছেন।
একই সঙ্গে ইরানের বাসিজ বাহিনীর কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানিকে হত্যার দাবিও করেছে ইসরায়েল। তবে এসব দাবির বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান।
এদিকে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননেও নতুন করে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে একটি হামলায় পাঁচজন লেবানিজ সেনা আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সংঘাতের প্রভাব অঞ্চলজুড়েও ছড়িয়ে পড়ছে। হামলার ধ্বংসাবশেষের আঘাতে আবুধাবিতে একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং কুয়েতে দুইজন স্বাস্থ্যকর্মী আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে কাতার, সৌদ আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত জানিয়েছে, তারা নিজ নিজ আকাশসীমায় প্রবেশ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক নৌ জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কায়া কালাস মন্তব্য করেছেন, এই জলপথে ঝুঁকি নিয়ে নিজেদের নাগরিকদের বিপদে ফেলতে কোনো দেশই আগ্রহী নয়।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি গতকাল এক বার্তায় মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর উদ্দেশে হতাশা, সতর্কতা ও আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতে ইরান কোনো ধরনের ছাড় দেবে না।
লারিজানি মুসলিম দেশগুলোর প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ দেশই ইরানের প্রত্যাশিত সমর্থন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তার ভাষায়, এই নীরবতা ‘বিশ্বাসঘাতক আগ্রাসনের’ বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করছে।
ধর্মীয় দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন করেন, মুসলিমদের পারস্পরিক সহযোগিতার যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা থেকে সরে আসা কি ঠিক হচ্ছে?
তিনি প্রশ্ন রাখেন, কিছু মুসলিম দেশের সরকারের অবস্থান কি নবী (মুহাম্মদ সা.) এর এই বাণীর সাথে সাংঘর্ষিক নয়: ‘যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে ‘হে মুসলিম!’ বলে ডাকতে শুনেও তার উত্তর দেয় না, সে মুসলিম নয়।’?
তিনি ইরানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, এসব পদক্ষেপকে অনেক উপসাগরীয় দেশ তাদের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আঘাত হিসেবে দেখলেও ইরান এটিকে নিজেদের নিরাপত্তার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, বর্তমান সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ খুবই সীমিত।
এক পর্যায়ে তিনি প্রশ্ন রাখেন—এই পরিস্থিতিতে কে কোন পক্ষের অবস্থান নেবে। তবে একই সঙ্গে তিনি আশ্বস্ত করেন, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে না।
লারিজানির মতে, মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে এগোতে পারলে তা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা, অগ্রগতি ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানির নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত হলে সেটিকে বড় ধরনের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখবে ইসরায়েল—এমন ধারণা বিশ্লেষকদের। এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ওপর হামলার পরবর্তী সময়ে লারিজানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন। ফলে তাকে সরিয়ে দেওয়া হলে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলেও তা ইরানের পুরো শাসনব্যবস্থার পতনের ইঙ্গিত দেয় না। কারণ দেশটির ক্ষমতা কাঠামো বিভিন্ন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল, যা অতীতেও সংকটের মধ্যে কার্যকর থেকেছে।
এ পরিস্থিতিতে লারিজানিকে ঘিরে এই ঘটনাকে ইসরায়েল নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানিকে সর্বশেষ দেখা গেছে গত শুক্রবার তেহরানে আয়োজিত আল-কুদস দিবসের সমাবেশে। ওই দিন তিনি অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় পদযাত্রায় অংশ নেন।
মিছিল চলাকালে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লারিজানি বলেন, সমাবেশকে লক্ষ্য করে যে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা ইরানের শত্রুদের হতাশার বহিঃপ্রকাশ। তার ভাষায়, ‘যারা শক্তিশালী, তারা কখনোই বিক্ষোভে হামলা চালায় না। এ ধরনের আক্রমণ দুর্বলতারই প্রমাণ।’
তিনি আরও দাবি করেন, এসব হামলা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করে লারিজানি বলেন, তিনি ইরানের জনগণের দৃঢ়তা ও সাহসিকতা বোঝেন না।
লারিজানির মতে, ইরানের জনগণ একটি শক্তিশালী ও সংকল্পবদ্ধ জাতি, এবং বাইরের চাপ যত বাড়বে, তাদের প্রতিরোধের মনোভাব ততই শক্তিশালী হবে। সূত্র: আলজাজিরা
ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে তেহরানের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিকভাবে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এই ঘটনাগুলো শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই; আহভাজ, ইসফাহান ও শিরাজসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর থেকেও একই ধরনের বিস্ফোরণের খবর মিলেছে। এতে দেশজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি দুইজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। তারা হলেন গোলামরেজা সোলাইমানি এবং আলী লারিজানি।
সামগ্রিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানজুড়ে চলমান উত্তেজনা আরও গভীর হচ্ছে। দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা অব্যাহত থাকলে পাল্টা প্রতিক্রিয়াও চলতে থাকবে। সূত্র: আলজাজিরা
আলী লারিজানি ইরানের রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত একটি নাম। তাকে ইরানের সংযত, বাস্তববাদী ও কৌশলী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি দেশের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সর্বশেষ তিনি ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
১৯৫৮ সালে ইরাকের নজফে জন্মগ্রহণ করেন লারিজানি। তার পারিবারিক শিকড় ইরানের আমোল শহরে। প্রভাবশালী এক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা লারিজানিকে একসময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছিল। তার বাবা ছিলেন একজন সুপরিচিত ধর্মীয় পণ্ডিত। ব্যক্তিজীবনে তিনি বিয়ে করেন ফারিদেহ মোতাহারিকে, যিনি ইরানের ইসলামী বিপ্লব-পরবর্তী প্রভাবশালী এক পরিবারের সদস্য।
শিক্ষাজীবনে লারিজানি ছিলেন ভিন্নধর্মী। গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি পাশ্চাত্য দর্শনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ইমানুয়েল কান্ট-এর দর্শনের উপর ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে যোগ দেন। পরবর্তীতে সরকারি দায়িত্বে যুক্ত হয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবি-র প্রধান হিসেবে কাজ করেন।
২০০৫ সালে তিনি ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব ও ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পান। যদিও ২০০৭ সালে তিনি এ পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে টানা তিন মেয়াদে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি অনুমোদনে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি আবারও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ইরানের কৌশলগত নেতৃত্বে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ফিরে আসেন।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ দাবি করেছেন, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি নিহত হয়েছেন। তিনি এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে এ তথ্য জানান।
তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান। ফলে ঘটনাটি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা গেলে পরবর্তীতে জানানো হবে।