এক্সপ্লেইনার

হরমুজে ৪ দেশের জাহাজ চলাচলে ইরানের ছাড়পত্র, নেপথ্যে কী

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
হরমুজে ৪ দেশের জাহাজ চলাচলে ইরানের ছাড়পত্র, নেপথ্যে কী
হরমুজ প্রণালিতে পন্যবাহী জাহাজ

ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারের জাহাজগুলোকে অব্যাহতি দিয়েছে। ইরানের সংসদ সদস্য আমির হায়াত মোগাদ্দাম জানান, এ দেশগুলো থেকে আসা জাহাজগুলো অবাধে চলাচল করে এবং মার্কিনবাহিনীও সেগুলোকে আটকায় না। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরান যুদ্ধের শুরুতেই ইরান কার্যকরভাবে প্রণালিটি বন্ধ করে দেয় এবং জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় নৌ অবরোধ আরোপ করে।

কেন এ চারটি দেশকে গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিটি দিয়ে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, এবং অবরোধ বহাল থাকা অবস্থায় তাদের জাহাজগুলো কি সত্যিই অবাধে চলাচল করতে পারবে? লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষক এবং অধিভুক্ত গবেষক রুজবেহ পারসি বলেন, আইনপ্রণেতা যা-ই বলুন না কেন, সেটা তার যুক্তি- বড় প্রশ্ন হলো, তা কার্যকর হয় কি না এবং যদি হয়, তবে কতটুক হবে? তিনি বলেন, ইরান অনেক দিন ধরেই নিষেধাজ্ঞার অধীনে রয়েছে, তাই বাণিজ্যে দর কষাকষি এবং পারস্পরিক লেনদেন নতুন কিছু নয়। তার মতে, এর উদ্দেশ্য হলো নিষেধাজ্ঞার ফাঁকফোকর বের করে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও পরিষেবা আনা-নেওয়া করা।

এদিকে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহযোগী অধ্যাপক নাদের হাশেমি মনে করেন, খুব সম্ভবত ইরান জাহাজগুলোকে কোনো রকম হয়রানি ছাড়াই যেতে দেওয়ার জন্য একটি ট্রানজিট ফি অথবা পণ্যের মূল্যের একটি শতাংশ ধার্য করছে।

ইরানের পতাকা হাতে এক ব্যক্তি
ইরানের পতাকা হাতে এক ব্যক্তি

বিনিময়ে ইরান কী পাবে

হায়াত মোগাদ্দামের হিসাব অনুযায়ী, তেহরান ভারত থেকে ওষুধ এবং চীন থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাবে। অন্যদিকে কাতার ইতোমধ্যেই ইরানকে কূটনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে। দেশটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ থামানোর মধ্যস্থতা করছে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন, তেহরান ভারতীয় ও চীনা জাহাজ থেকে ট্রানজিট ফি আদায় করবে, তবে কাতারের জাহাজগুলো বিনা ফি-তেই যাতায়াত করবে। তবে ইরাকি জাহাজগুলোর টোলের বিষয়ে তিনি স্পষ্টভাবে কিছু বলেননি।

অস্ট্রিয়ার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ভলফগ্যাং পুশতাই বলেন, বেশ কয়েকটি কারণে এটি তেহরানের একটি চতুর পদক্ষেপ। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সফল হলে পদক্ষেপটি ইরানের জন্য উল্লেখযোগ্য রাজস্ব নিয়ে আসবে, কারণ চীনই এখন পর্যন্ত ইরানের অপরিশোধিত তেলের বৃহত্তম ক্রেতা এবং তারা ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ কিনে থাকে। এর পাশাপাশি, এলএনজির বিশাল বাজার থাকা কাতার ও ভারতকে এতে যুক্ত করে ইরান এ অঞ্চলে ওয়াশিংটনের কৌশলের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করছে, বিশেষত কাতারের থেকে কোনো ফি না নিয়ে।

হরমুজে ৪ দেশের জাহাজ চলাচলে ইরানের ছাড়পত্র, নেপথ্যে কী
হরমুজে ৪ দেশের জাহাজ চলাচলে ইরানের ছাড়পত্র, নেপথ্যে কী

এ চার দেশের জন্য এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

আসলে চারটি দেশই তাদের পণ্য রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক মুয়ু শু জানান, অক্টোবরে এ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন যে ১ কোটি ২ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়েছে, তার ৪২ শতাংশ চীনে এবং ১৩ শতাংশ ভারতে গিয়েছে।

পারসির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত করতে সবচেয়ে বেশি সক্ষম দেশ হলো চীন। প্রশ্ন হলো, বেইজিং এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক মূল্যকে উপযুক্ত বলে মনে করে কি না। এশিয়া পুরোপুরি উপসাগরের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তাই ছাড়ের বিনিময়ে তাদেরও ইরানকে দেওয়ার মতো অনেক কিছু আছে। পারসি বলেন, ভারতের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়াটা এক বিরাট ক্ষতি- এবং ভারত এমন সব ওষুধ উৎপাদন করে যা ইরান করতে পারে না।

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যস্থতাকারী কাতার আগস্টে কোনো এলএনজি পাঠাতে না পারলেও অক্টোবরে ১৮ লাখ টন পাঠাতে পেরেছে বলে জানান শু। তবে কাতারের অপরিশোধিত তেল পরিবহন দিনে ৫ লাখ ১৭ হাজার ব্যারেল থেকে কমে ১ লাখ ৯৩ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ইরাকের তেল পরিবহনের পরিমাণ ১.৬৯ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ২.৬৫ মিলিয়ন হয়েছে।

শু উল্লেখ করেন, কেপলার প্রতিদিনের প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেলের উৎস শনাক্ত করতে পারেনি, তাই প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। পারসি আরও বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারত ও কাতারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে যা তাদের বজায় রাখতে হবে– যদিও উভয় দেশই ট্রাম্পের কারণে হতাশ। তিনি যোগ করেন, কাতারের জন্য ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি প্রতিবেশী। তাই তার মতে, ইরানের নিষেধাজ্ঞা থেকে এ অব্যাহতিগুলোর যেমন সুবিধা রয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক বিপদও আছে।

এ ছাড়ের ঘোষণাটি কি নতুন

যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরান তাদের মিত্র দেশগুলোর জাহাজে ছাড় দেওয়া শুরু করে। এপ্রিলে দেশটির সামরিক কমান্ড জানায় ভ্রাতৃপ্রতিম ইরাকও এর অন্তর্ভুক্ত। পুশতাই বলেন, ইরাককে ছাড় দিয়ে ইরান“সম্ভবত তার পশ্চিমা প্রতিবেশী, আরেকটি শিয়া-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সমর্থন দিতে চায়।

হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি

জাহাজগুলো কি মার্কিন অবরোধ অতিক্রম করতে পারবে

বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের অবরোধ ইরানের উপকূলীয় এলাকা বা বন্দরে প্রবেশকারী বা সেখান থেকে প্রস্থানকারী সকল দেশের সকল জাহাজের জন্য কার্যকর হবে, তবে ইরানের বন্দর এড়িয়ে চলা জাহাজগুলো ছাড় পাবে। তারা আরও জানায় মানবিক সাহায্য যেমন খাদ্য ও ওষুধ তল্লাশির পর যেতে দেওয়া হতে পারে।

পুশতাই উল্লেখ করেন, হায়াত মোগাদ্দাম এ সুবিধা কেবল উপসাগরীয় দেশগুলোর বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি বলেন, যদি সত্যিই এমনটা হয়ে থাকে, তবে এটি সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। তিনি মনে করেন, ওয়াশিংটন যদি ইরানের এ পদক্ষেপ মেনে নেয়, তবে এটি মার্কিন নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখাকে আরও কঠিন ও কম কার্যকর করে তুলতে পারে। তার মতে মূল পরিবর্তন হলো, যুক্তরাষ্ট্র রাজি থাকলে এই ছাড়ের মাধ্যমে ইরান থেকে বা ইরানে যাতায়াতকারী চীনা/ভারতীয় জাহাজগুলোও অন্তর্ভুক্ত হবে। অবশ্য এ দেশগুলোর জাহাজ বলতে মালিকানা, পতাকা নাকি কার্য পরিচালনার সংশ্লিষ্টতাকে বোঝানো হয়েছে- তা এখনও অস্পষ্ট।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

তেলের বাজারে কোনো পরিবর্তন আসবে কি

বর্তমানে তেলের বাজারে এর প্রভাব বেশ সীমিত বলেই মনে করেন আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বোশাম্প। তিনি বলেন, আমি মনে করি, বর্তমানে এগুলোর প্রভাব খুবই সীমিত। তিনি যোগ করেন, বাজারগুলো আবারও একটি শান্তি চুক্তির সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, কিন্তু যদি সংঘাত পুরোদমে শুরু হয়, তাহলে ইরানি কমান্ডাররা তাদের লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করার সময় নাও পেতে পারে। তার মতে, বর্তমানে, মূল মনোযোগ একটি বৃহত্তর চুক্তির সম্ভাবনার ওপরই রয়েছে।

এ ছাড়পত্র কিন্তু নিরাপত্তার পুরোপুরি নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। কাতার গ্যাস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি জানিয়েছে, ৩০ অক্টোবর পারস্য উপসাগরে তাদের এলএনজিবাহী জাহাজ আল মায়েদা এক অশনাক্ত বস্তু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা ও যুক্তরাজ্যের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১২০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে অক্টোবর মাসেই পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ ছিল।

/এমএকে/