ট্রাম্পের খামখেয়ালি নীতিতে ক্ষুব্ধ ভারত, প্রকাশ্যেই জবাব নয়াদিল্লির

ট্রাম্পের খামখেয়ালি নীতিতে ক্ষুব্ধ ভারত, প্রকাশ্যেই জবাব নয়াদিল্লির
সিজেডএন ডেস্ক

ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কে যে বরফ জমতে শুরু করেছিল, তা এখন বেশ ভালোমতোই দৃশ্যমান। সন্ত্রাসবাদ, পাকিস্তানের প্রতি মার্কিন প্রীতি, বাণিজ্যনীতি কিংবা এইচ-১বি ভিসার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এতদিন ভারত কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে পর্দার আড়ালে অসন্তোষের কথা বললেও, সেই দিন এখন আর নেই। ওয়াশিংটনের কড়া নীতির জবাবে ভারত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সরব ও প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছে।

ভারতের খোলামেলা কূটনীতি
নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা মূলত ভারত-মার্কিন সম্পর্কের বর্তমান টালমাটাল পরিস্থিতিরই খোলামেলা মূল্যায়ন। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ওয়াশিংটনের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলেরই ব্যাপক সমর্থন ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর সেই হিসাব-নিকাশ অনেকটাই বদলে গেছে।
জয়শঙ্কর বলেন, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রতি ওয়াশিংটনের যথেষ্ট সংবেদনশীলতা নেই। একই সঙ্গে তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা এবং বিশ্বের দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি করা ‘আত্মকেন্দ্রিক’ বাণিজ্যনীতির সমালোচনা করতেও দ্বিধা করেননি। তিনি বলেন, কোনো দেশের নীতিই এমন আত্মকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয় যে, তারা নিজেদের স্বার্থের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেবে এবং পরে বলবে- ‘আপনাদের জীবন কঠিন করে তোলা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না।’
চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিয়েটিগজ বাজপেয়ীর মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ভারত শুরুতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ব্যাপারে সবচেয়ে আশাবাদী দেশগুলোর একটি ছিল। কিন্তু এখন সেই সম্পর্কের ‘চকচকে আবরণ’ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

বাণিজ্য ও শুল্কের বড় ধাক্কা
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় কাঁটা এখন বাণিজ্য। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ভারতের উদ্বৃত্ত ছিল ৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। তবে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনা চললেও কৃষিপণ্যের বাজার উন্মুক্ত করার মতো জটিল বিষয়গুলোতে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
তাছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের একের পর এক শুল্কের হুমকি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। সম্প্রতি ট্রাম্প এমন একটি বিলে স্বাক্ষর করেছেন, যার জেরে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের মতো দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
কানাডা ও পাকিস্তানে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার অজয় বিসারিয়ার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে তা হবে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘চুক্তি ভঙ্গের সীমারেখা’। এমনটা ঘটলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর সব চেষ্টাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

পাকিস্তান প্রীতি ও মধ্যস্থতার দাবি
বাণিজ্যের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতেও তৈরি হয়েছে বড় ফাটল। গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘাতের সময় ট্রাম্পের ভূমিকা নয়াদিল্লিতে ব্যাপক বিরক্তি তৈরি করেছিল। ভারতের ঘোর আপত্তি সত্ত্বেও ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে তিনিই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘটিয়েছিলেন এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির হুমকি দিয়ে তা থামিয়েছিলেন। কিন্তু কাশ্মীর ভারত-পাকিস্তানের এমন একটি দ্বিপক্ষীয় বিষয়, যেখানে তৃতীয় পক্ষের নাক গলানোর কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে সখ্য বাড়াতে ব্যস্ত। তাকে প্রকাশ্যে প্রশংসায় ভাসানোর পাশাপাশি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্যও মনোনয়ন দিয়েছে ইসলামাবাদ। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পন্ত মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘পাকিস্তান নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ’ এবং ভারতের সংবেদনশীল ইস্যুগুলোকে পাত্তা না দেওয়ার প্রবণতাই নয়াদিল্লিকে এভাবে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে বাধ্য করেছে।
ভিসানীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ
ভারতীয়দের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হলো এইচ-১বি ভিসা। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কড়াকড়ি, ফি বৃদ্ধি এবং ‘মাগা’ (MAGA) সমর্থকদের ধারাবাহিক চাপে এ সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে, যা ভারতের জনমনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পাশাপাশি, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও একটি বড় ফ্যাক্টর। বিরোধীরা অভিযোগ করে আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন। সামনেই বেশ কয়েকটি রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। ফলে ঘরোয়া রাজনীতি সামলাতেতে এবং নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে মোদি সরকারের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ট্রাম্পের সঙ্গে মোদির ফোনালাপের পর দিল্লি থেকে যে বার্তা এসেছে, তা আগের মতো উষ্ণ নয়; বেশ কিছুটা শীতল ও আনুষ্ঠানিক।
ট্রাম্পের মেয়াদ শেষের অপেক্ষা
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের খামখেয়ালি ও লেনদেনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির কারণে ভারতের মতো অনেক দেশই এখন কেবল ‘ট্রাম্পের সময়টা পার হওয়ার’ প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথাগত নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করা এমন একজন নেতার সঙ্গে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি বোঝাপড়া বজায় রাখা যায়, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
তবে এখনই দুই দেশ সম্পর্কের পুরোপুরি ইতি টানছে না। বাণিজ্য চুক্তি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখলে হয়তো কিছুটা বরফ গলতে পারে। কিন্তু আপাতত এটুকুই পরিষ্কার- ওয়াশিংটনের খামখেয়ালিপনা আর চাপিয়ে দেওয়া নীতি নীরবে হজম করার দিন ভারতের ফুরিয়ে এসেছে। নিজের স্বার্থ রক্ষায় নয়াদিল্লি এখন আর রাখঢাক না রেখে একেবারে সোজাসাপ্টা কথা বলতে শুরু করেছে।
সূত্র: আল জাজিরা

ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কে যে বরফ জমতে শুরু করেছিল, তা এখন বেশ ভালোমতোই দৃশ্যমান। সন্ত্রাসবাদ, পাকিস্তানের প্রতি মার্কিন প্রীতি, বাণিজ্যনীতি কিংবা এইচ-১বি ভিসার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এতদিন ভারত কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে পর্দার আড়ালে অসন্তোষের কথা বললেও, সেই দিন এখন আর নেই। ওয়াশিংটনের কড়া নীতির জবাবে ভারত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সরব ও প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছে।

ভারতের খোলামেলা কূটনীতি
নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা মূলত ভারত-মার্কিন সম্পর্কের বর্তমান টালমাটাল পরিস্থিতিরই খোলামেলা মূল্যায়ন। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ওয়াশিংটনের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলেরই ব্যাপক সমর্থন ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর সেই হিসাব-নিকাশ অনেকটাই বদলে গেছে।
জয়শঙ্কর বলেন, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রতি ওয়াশিংটনের যথেষ্ট সংবেদনশীলতা নেই। একই সঙ্গে তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা এবং বিশ্বের দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি করা ‘আত্মকেন্দ্রিক’ বাণিজ্যনীতির সমালোচনা করতেও দ্বিধা করেননি। তিনি বলেন, কোনো দেশের নীতিই এমন আত্মকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয় যে, তারা নিজেদের স্বার্থের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেবে এবং পরে বলবে- ‘আপনাদের জীবন কঠিন করে তোলা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না।’
চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিয়েটিগজ বাজপেয়ীর মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ভারত শুরুতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ব্যাপারে সবচেয়ে আশাবাদী দেশগুলোর একটি ছিল। কিন্তু এখন সেই সম্পর্কের ‘চকচকে আবরণ’ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

বাণিজ্য ও শুল্কের বড় ধাক্কা
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় কাঁটা এখন বাণিজ্য। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ভারতের উদ্বৃত্ত ছিল ৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। তবে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনা চললেও কৃষিপণ্যের বাজার উন্মুক্ত করার মতো জটিল বিষয়গুলোতে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
তাছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের একের পর এক শুল্কের হুমকি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। সম্প্রতি ট্রাম্প এমন একটি বিলে স্বাক্ষর করেছেন, যার জেরে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের মতো দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
কানাডা ও পাকিস্তানে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার অজয় বিসারিয়ার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে তা হবে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘চুক্তি ভঙ্গের সীমারেখা’। এমনটা ঘটলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর সব চেষ্টাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

পাকিস্তান প্রীতি ও মধ্যস্থতার দাবি
বাণিজ্যের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতেও তৈরি হয়েছে বড় ফাটল। গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘাতের সময় ট্রাম্পের ভূমিকা নয়াদিল্লিতে ব্যাপক বিরক্তি তৈরি করেছিল। ভারতের ঘোর আপত্তি সত্ত্বেও ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে তিনিই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘটিয়েছিলেন এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির হুমকি দিয়ে তা থামিয়েছিলেন। কিন্তু কাশ্মীর ভারত-পাকিস্তানের এমন একটি দ্বিপক্ষীয় বিষয়, যেখানে তৃতীয় পক্ষের নাক গলানোর কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে সখ্য বাড়াতে ব্যস্ত। তাকে প্রকাশ্যে প্রশংসায় ভাসানোর পাশাপাশি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্যও মনোনয়ন দিয়েছে ইসলামাবাদ। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পন্ত মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘পাকিস্তান নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ’ এবং ভারতের সংবেদনশীল ইস্যুগুলোকে পাত্তা না দেওয়ার প্রবণতাই নয়াদিল্লিকে এভাবে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে বাধ্য করেছে।
ভিসানীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ
ভারতীয়দের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হলো এইচ-১বি ভিসা। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কড়াকড়ি, ফি বৃদ্ধি এবং ‘মাগা’ (MAGA) সমর্থকদের ধারাবাহিক চাপে এ সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে, যা ভারতের জনমনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পাশাপাশি, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও একটি বড় ফ্যাক্টর। বিরোধীরা অভিযোগ করে আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন। সামনেই বেশ কয়েকটি রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। ফলে ঘরোয়া রাজনীতি সামলাতেতে এবং নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে মোদি সরকারের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ট্রাম্পের সঙ্গে মোদির ফোনালাপের পর দিল্লি থেকে যে বার্তা এসেছে, তা আগের মতো উষ্ণ নয়; বেশ কিছুটা শীতল ও আনুষ্ঠানিক।
ট্রাম্পের মেয়াদ শেষের অপেক্ষা
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের খামখেয়ালি ও লেনদেনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির কারণে ভারতের মতো অনেক দেশই এখন কেবল ‘ট্রাম্পের সময়টা পার হওয়ার’ প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথাগত নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করা এমন একজন নেতার সঙ্গে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি বোঝাপড়া বজায় রাখা যায়, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
তবে এখনই দুই দেশ সম্পর্কের পুরোপুরি ইতি টানছে না। বাণিজ্য চুক্তি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখলে হয়তো কিছুটা বরফ গলতে পারে। কিন্তু আপাতত এটুকুই পরিষ্কার- ওয়াশিংটনের খামখেয়ালিপনা আর চাপিয়ে দেওয়া নীতি নীরবে হজম করার দিন ভারতের ফুরিয়ে এসেছে। নিজের স্বার্থ রক্ষায় নয়াদিল্লি এখন আর রাখঢাক না রেখে একেবারে সোজাসাপ্টা কথা বলতে শুরু করেছে।
সূত্র: আল জাজিরা

ট্রাম্পের খামখেয়ালি নীতিতে ক্ষুব্ধ ভারত, প্রকাশ্যেই জবাব নয়াদিল্লির
সিজেডএন ডেস্ক

ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কে যে বরফ জমতে শুরু করেছিল, তা এখন বেশ ভালোমতোই দৃশ্যমান। সন্ত্রাসবাদ, পাকিস্তানের প্রতি মার্কিন প্রীতি, বাণিজ্যনীতি কিংবা এইচ-১বি ভিসার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এতদিন ভারত কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে পর্দার আড়ালে অসন্তোষের কথা বললেও, সেই দিন এখন আর নেই। ওয়াশিংটনের কড়া নীতির জবাবে ভারত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সরব ও প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছে।

ভারতের খোলামেলা কূটনীতি
নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা মূলত ভারত-মার্কিন সম্পর্কের বর্তমান টালমাটাল পরিস্থিতিরই খোলামেলা মূল্যায়ন। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ওয়াশিংটনের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলেরই ব্যাপক সমর্থন ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর সেই হিসাব-নিকাশ অনেকটাই বদলে গেছে।
জয়শঙ্কর বলেন, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রতি ওয়াশিংটনের যথেষ্ট সংবেদনশীলতা নেই। একই সঙ্গে তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা এবং বিশ্বের দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি করা ‘আত্মকেন্দ্রিক’ বাণিজ্যনীতির সমালোচনা করতেও দ্বিধা করেননি। তিনি বলেন, কোনো দেশের নীতিই এমন আত্মকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয় যে, তারা নিজেদের স্বার্থের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেবে এবং পরে বলবে- ‘আপনাদের জীবন কঠিন করে তোলা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না।’
চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিয়েটিগজ বাজপেয়ীর মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ভারত শুরুতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ব্যাপারে সবচেয়ে আশাবাদী দেশগুলোর একটি ছিল। কিন্তু এখন সেই সম্পর্কের ‘চকচকে আবরণ’ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

বাণিজ্য ও শুল্কের বড় ধাক্কা
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় কাঁটা এখন বাণিজ্য। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ভারতের উদ্বৃত্ত ছিল ৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। তবে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনা চললেও কৃষিপণ্যের বাজার উন্মুক্ত করার মতো জটিল বিষয়গুলোতে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
তাছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের একের পর এক শুল্কের হুমকি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। সম্প্রতি ট্রাম্প এমন একটি বিলে স্বাক্ষর করেছেন, যার জেরে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের মতো দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
কানাডা ও পাকিস্তানে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার অজয় বিসারিয়ার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে তা হবে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘চুক্তি ভঙ্গের সীমারেখা’। এমনটা ঘটলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর সব চেষ্টাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

পাকিস্তান প্রীতি ও মধ্যস্থতার দাবি
বাণিজ্যের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতেও তৈরি হয়েছে বড় ফাটল। গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘাতের সময় ট্রাম্পের ভূমিকা নয়াদিল্লিতে ব্যাপক বিরক্তি তৈরি করেছিল। ভারতের ঘোর আপত্তি সত্ত্বেও ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে তিনিই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘটিয়েছিলেন এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির হুমকি দিয়ে তা থামিয়েছিলেন। কিন্তু কাশ্মীর ভারত-পাকিস্তানের এমন একটি দ্বিপক্ষীয় বিষয়, যেখানে তৃতীয় পক্ষের নাক গলানোর কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতারা ট্রাম্পের সঙ্গে সখ্য বাড়াতে ব্যস্ত। তাকে প্রকাশ্যে প্রশংসায় ভাসানোর পাশাপাশি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্যও মনোনয়ন দিয়েছে ইসলামাবাদ। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পন্ত মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘পাকিস্তান নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ’ এবং ভারতের সংবেদনশীল ইস্যুগুলোকে পাত্তা না দেওয়ার প্রবণতাই নয়াদিল্লিকে এভাবে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে বাধ্য করেছে।
ভিসানীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ
ভারতীয়দের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হলো এইচ-১বি ভিসা। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কড়াকড়ি, ফি বৃদ্ধি এবং ‘মাগা’ (MAGA) সমর্থকদের ধারাবাহিক চাপে এ সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে, যা ভারতের জনমনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পাশাপাশি, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও একটি বড় ফ্যাক্টর। বিরোধীরা অভিযোগ করে আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন। সামনেই বেশ কয়েকটি রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। ফলে ঘরোয়া রাজনীতি সামলাতেতে এবং নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে মোদি সরকারের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ট্রাম্পের সঙ্গে মোদির ফোনালাপের পর দিল্লি থেকে যে বার্তা এসেছে, তা আগের মতো উষ্ণ নয়; বেশ কিছুটা শীতল ও আনুষ্ঠানিক।
ট্রাম্পের মেয়াদ শেষের অপেক্ষা
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের খামখেয়ালি ও লেনদেনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির কারণে ভারতের মতো অনেক দেশই এখন কেবল ‘ট্রাম্পের সময়টা পার হওয়ার’ প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথাগত নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করা এমন একজন নেতার সঙ্গে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি বোঝাপড়া বজায় রাখা যায়, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
তবে এখনই দুই দেশ সম্পর্কের পুরোপুরি ইতি টানছে না। বাণিজ্য চুক্তি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখলে হয়তো কিছুটা বরফ গলতে পারে। কিন্তু আপাতত এটুকুই পরিষ্কার- ওয়াশিংটনের খামখেয়ালিপনা আর চাপিয়ে দেওয়া নীতি নীরবে হজম করার দিন ভারতের ফুরিয়ে এসেছে। নিজের স্বার্থ রক্ষায় নয়াদিল্লি এখন আর রাখঢাক না রেখে একেবারে সোজাসাপ্টা কথা বলতে শুরু করেছে।
সূত্র: আল জাজিরা

বাজারের অভাবে ৭০০ কোটি লিটার ইথানল নিয়ে বিপাকে ভারত







