শিরোনাম

১০ বছর কারাদণ্ডের মুখে ভারতীয় ক্যাপ্টেন

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
১০ বছর কারাদণ্ডের মুখে ভারতীয় ক্যাপ্টেন
জুন মাস থেকে অজয় পান্থ যুক্তরাজ্যের কারাগারে রয়েছেন

রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে এখন যুক্তরাজ্যের কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন বাণিজ্যিক জাহাজের ভারতীয় ক্যাপ্টেন অজয় পান্থ। জুনে ইংলিশ চ্যানেল থেকে যুক্তরাজ্যের কমান্ডোরা তাকে গ্রেপ্তার করে। রাশিয়ার বিতর্কিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া নৌবহরের তেল বহনের অভিযোগে জাহাজের মালিককে ছাড় দিয়ে ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে মামলা ঘটনা আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তার হতে পারে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড।

১৪ জুন প্রায় ৯৮ হাজার টন তেল নিয়ে রাশিয়ার উস্ত-লুগা বন্দর থেকে মিসরের দিকে যাচ্ছিল ‘স্মিরতোস’ নামের তেলবাহী ট্যাংকারটি। পথে হেলিকপ্টার থেকে দড়ি বেয়ে নেমে জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেয় ব্রিটিশ কমান্ডোরা। যুক্তরাজ্যের দাবি, মস্কোর ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা এড়াতে অস্পষ্ট মালিকানা ও বীমাহীন যেসব ‘ছায়াবহর’ ব্যবহার করা হচ্ছে, স্মিরতোস তারই অংশ। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এ পদক্ষেপকে রাশিয়ার জন্য বড় ধাক্কা বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তবে জাহাজটির ২৫ জন ক্রুর মধ্যে বাকিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হলেও একমাত্র অভিযুক্ত হিসেবে আটক রাখা হয় ক্যাপ্টেন অজয়কে।

গ্রেপ্তারের পর থেকেই জামিন পাননি অজয়। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এই নাবিকের পরিবার এখন তাকে মুক্ত করার আকুল আকুতি জানাচ্ছে। এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তার ৩৬ বছর বয়সী স্ত্রী ঋতু পান্থ বলেন, ‘আমার স্বামীকে শুধু বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। তিনি ভুল সময়ে ভুল জায়গায় ছিলেন।’

আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষ অজয়কে জাহাজের ‘মাস্টার’ হিসেবে তেলের চালান সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত বলে দাবি করলেও তার আইনজীবী ও স্ত্রীর যুক্তি একদম ভিন্ন। তাদের মতে, একজন নাবিক হিসেবে অজয় কেবল ওপরের নির্দেশ পালন করছিলেন। ঋতু পান্থ জানান, ‘যেকোনো জাহাজে ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব হলো পণ্য নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া।’

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা কেবল একজন ক্যাপ্টেনের ব্যক্তিগত লড়াই নয়। বরং গোটা বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকদের নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাট সি ইন্টারন্যাশনালের ডেভিড হ্যামন্ডের মতে, ‘মামলাটির প্রভাব একটি জাহাজ, এর পণ্য বা এর ক্যাপ্টেনের ভাগ্যের চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত।’ তিনি মনে করেন, ‘শ্যাডো ফ্লিটের পরিচালকদের পাশাপাশি এসব জাহাজে কর্মরত নাবিকদের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে পশ্চিমা সরকারগুলো কতটা এগোতে প্রস্তুত, এ মামলা তার প্রাথমিক পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।’

ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের স্টিভ ইয়ান্ডেল সতর্ক করে বলেছেন, অনেক সময় সাধারণ নাবিকেরা বুঝতেও পারেন না তারা নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত তেল বহন করছেন কি না। ফলে না জেনেই তারা ভূরাজনৈতিক সংঘাতের শিকার হচ্ছেন। প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার নাবিক নিয়ে বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যে ভারতের ভূমিকা বিশাল। ৪০ বছর বয়সী ভারতীয় ক্যাপ্টেন সংকেত জোশির মতে, নিরাপত্তার বদলে ‘বাণিজ্যিক ইস্যুতে’ ক্যাপ্টেনের গ্রেপ্তারের এ ঘটনা গোটা নাবিক সমাজকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে অজয়ের খোঁজখবর নিতে কনস্যুলার সহায়তা দিয়েছে। ১৫ ডিসেম্বর আদালত কী রায় দেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব নৌবাণিজ্যের ভবিষ্যতের আইনি সমীকরণ। তবে আইনি লড়াইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাঝে চোখের জল ফেলছেন অজয়ের বৃদ্ধা মা দীপা। কান্নাজড়ানো কণ্ঠে তিনি শুধু চান তার ছেলের নিরাপদে ফেরা, ‘আমি শুধু দুই হাত জোড় করে সরকারের কাছে আবেদন করতে চাই, আমার ছেলেকে বাড়িতে ফিরিয়ে দিন।’

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

/এমএকে/