শিরোনাম

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটে সকল পণ্যের উৎপাদনে বিপর্যয়

সিটিজেন ডেস্ক
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটে সকল পণ্যের উৎপাদনে বিপর্যয়
ফিলিপাইনের একটি গ্যাস স্টেশনে অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ছবি: সিএনএন

ইরানে যুদ্ধ শুরুর এক মাস পর অপরিশোধিত তেলের ঘাটতি বিশ্বজুড়ে প্রায় প্রতিটি পণ্যের সংকটে রূপ নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাতের কারণে শুধু জ্বালানির দামই বাড়ছে না, বরং জুতা, পোশাক, প্লাস্টিক ব্যাগসহ নানা সামগ্রী তৈরির প্রয়োজনীয় পেট্রোকেমিক্যালসের সরবরাহও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

প্লাস্টিক, রাবার এবং পলিয়েস্টারের মতো উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই চাপ এখন ভোক্তা বাজারের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়ছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে এশিয়ায়, কারণ বিশ্বের অর্ধেকের বেশি উৎপাদন এশিয়াতেই হয় এবং মহাদেশটি আমদানিকৃত তেল ও অন্যান্য পণ্যের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।

দক্ষিণ কোরিয়ায় মানুষ আবর্জনা ফেলার ব্যাগ কিনে মজুত করছে এবং সরকার ডিসপোজেবল সামগ্রীর ব্যবহার কমানোর নির্দেশ দিয়েছে। তাইওয়ানে প্লাস্টিক সংকটে পড়া প্রস্তুতকারকদের জন্য হটলাইন চালু করা হয়েছে। জাপানে চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্লাস্টিক টিউবের অভাবে রোগীদের কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মালয়েশিয়ার গ্লাভস প্রস্তুতকারকরাও জানিয়েছেন, পেট্রোলিয়াম উপজাতের অভাবে বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা গ্লাভসের সরবরাহ হুমকির মুখে পড়েছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেজান শিরা অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের কর্মকর্তা ড্যান মার্টিন জানিয়েছেন, এর প্রভাব খুব দ্রুত বিয়ার, নুডলস, খেলনা, প্রসাধন সামগ্রী থেকে শুরু করে জুতা, আসবাবপত্রের আঠা এবং যন্ত্রপাতির লুব্রিকেন্ট পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। কারণ প্লাস্টিকের ক্যাপ, ক্রেট বা স্ন্যাকসের ব্যাগ সংগ্রহ করা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির ফলে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

bigStoryContent

সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশ তাদের জরুরি তেলের মজুত ব্যবহার শুরু করলেও মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে 'ন্যাপথা' নামক একটি পেট্রোলিয়াম উপজাতের চরম ঘাটতি। সিন্থেটিক উপকরণ তৈরির প্রধান কাঁচামালটির বিকল্প না থাকায় এশিয়ার অনেক পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি উৎপাদন কমাতে বা 'ফোর্স ম্যাজিউর' ঘোষণা করে চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ঠিক রাখতে ন্যাপথা রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার শিথিলতার সুযোগ নিয়ে মস্কো থেকে ন্যাপথা কিনছে।

এদিকে কাঁচামাল সংকটে প্লাস্টিক ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন খরচ আকাশচুম্বী হচ্ছে। কমোডিটি মার্কেট ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম আইসিআইএস-এর তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারির শেষের দিক থেকে এশিয়ায় প্লাস্টিক রেজিনের (কাঁচামাল) দাম ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে রেকর্ড ছুঁয়েছে। থাইল্যান্ডে প্যাকেজিং সামগ্রীর দাম ১০ শতাংশ বেড়েছে, ভারতে পানির বোতলের ছিপির দাম চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ নুডলস প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নং শিম জানিয়েছে তাদের কাছে মাত্র এক মাসের প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের কাঁচামাল মজুত আছে।

এ সংকট কেবল প্লাস্টিকে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা সার ও সেমিকন্ডাক্টর তৈরির কাঁচামাল যেমন-সালফার, হিলিয়াম, অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়ার সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের সারের জন্য বেশি খরচ করতে হচ্ছে এবং ভারতে কনডম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও প্যাকেজিং ও অ্যামোনিয়া সংকটে পড়েছে।

bigStoryContent

বাংলাদেশেও এর নানামূখী প্রভাব পড়েছে। বেশি প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও দেশের কৃষকরা সার নিয়েও শঙ্কায় আছে। তৈরি পোশাক (RMG), টেক্সটাইল, সিমেন্ট এবং স্টিল শিল্পের মতো জ্বালানি-নিবিড় খাতগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জেপি মরগানের বিশ্লেষকদের মতে, এ সংকট অনেকটা কোভিড মহামারির মতো পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে এবং এপ্রিলে তা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

এমন পরিস্থিতিতে চীনের পলিয়েস্টার প্রস্তুতকারক কিউ জুনের মতো অনেক ব্যবসায়ী লোকসান এড়াতে কাঁচামাল কেনা স্থগিত রাখছেন। ইন্দোনেশিয়ার অনেক প্রতিষ্ঠান খরচ কমাতে প্যাকেজিংয়ের পুরুত্ব কমানোর পাশাপাশি কাগজ, গ্লাস বা রিসাইকেল করা প্লাস্টিক ব্যবহারের কথা ভাবছে।

তবে এমএলটি অ্যানালিটিকস-এর প্রতিষ্ঠাতা স্টিফেন মুর জানিয়েছেন, রিসাইকেল করা প্লাস্টিক ব্যবহার করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে যদি আগামীকালই সব স্বাভাবিক হয়ে যায়, তবুও এশিয়ার প্লাস্টিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে অন্তত আরও কয়েক মাস সময় লাগবে।

সূত্র: সিএনএন

/এমএকে/