হরমুজে নৌ অবরোধ, বাণিজ্যের জন্য কাস্পিয়ান সাগরের দিকে ঝুঁকছে ইরান

হরমুজে নৌ অবরোধ, বাণিজ্যের জন্য কাস্পিয়ান সাগরের দিকে ঝুঁকছে ইরান
সিজেডএন ডেস্ক

মার্কিন নৌ অবরোধে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ায় তেহরান এখন তেল রপ্তানি ও পণ্য আমদানির জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে দেশটির উত্তর উপকূলের কাস্পিয়ান সাগরকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাতিসংঘে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অচলাবস্থা কাটানোর সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে তেহরানের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর সামরিক অভিযান শুরু করেছিল, তা বন্ধে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তেহরান বাধ্য হয়ে তেল রপ্তানি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানিতে রদবদল করছে।
তবে কাস্পিয়ান সাগর হয়ে এ সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিজস্ব রসদ সরবরাহ ও অবকাঠামোগত নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা

কাস্পিয়ান চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের বৃহত্তম স্থলবেষ্টিত জলাশয় কাস্পিয়ান সাগর ইরান, রাশিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান এবং তুর্কমেনিস্তানের মধ্যে বিভক্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ সাগরের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সেখানে নৌচলাচল ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
এপ্রিলে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন জানান, ১৯৯০-এর দশক থেকে কাস্পিয়ান সাগরের জলস্তর প্রায় ২ মিটার বা ৬.৬ ফুট কমে গেছে। এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ এটি আরও ৮ থেকে ২১ মিটার বা ২৬ থেকে ৬৯ ফুট পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা শাহরাম ফাদাকার জানিয়েছেন, গত দুই থেকে তিন বছর ধরে পানির স্তর প্রতি বছর ২০ সেন্টিমিটার বা ৭.৯ ইঞ্চির বেশি হারে কমছে। ফলে সব দেশের বাণিজ্যই হুমকির মুখে পড়েছে। চলতি মাসে ইরানের শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসুদ পলমেহ জানান, উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে একসময় ৬,০০০ টন ওজনের জাহাজ নোঙর করতে পারতো। কিন্তু পানির স্তর হ্রাসের কারণে তা ৪,০০০ টনে নেমে এসেছে। রাশিয়ার ভলগা নদী হয়ে কাস্পিয়ান সাগরে প্রবেশকারী ইরানি জাহাজগুলোও প্রায়ই আটকে যাচ্ছে।
বাণিজ্য বাধা
ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্যের সিংহভাগই এতদিন দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হতো। কিন্তু মার্কিন নৌ নিষেধাজ্ঞা ও বিমান হামলায় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তেহরান বাণিজ্য কাস্পিয়ান সাগর ও স্থল সীমান্তে সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
গবেষক ভালি কালেজির মতে, বাণিজ্য ও রসদ সরবরাহ হঠাৎ উত্তর দিকে সরে যাওয়ায় স্থল সীমান্তে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। আর্মেনিয়ার নরদুজ সীমান্ত ক্রসিংয়ে ইরানে প্রবেশের অপেক্ষায় প্রায় ১,৮০০ ট্রাক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে এবং অন্যান্য টার্মিনালে অপেক্ষা ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত গড়ায়। কালেজি জানান, শুধু স্থলপথে পণ্য চলাচল বৃদ্ধিই এর একমাত্র কারণ নয়। টার্মিনালের সীমিত ধারণক্ষমতা, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং চলমান নির্মাণ কাজও এই দীর্ঘ যানজট তৈরি করছে।
পাশাপাশি ইরানি বিমান সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং যাত্রী বৃদ্ধির ফলে সীমান্তে ভোগান্তি আরও বেড়েছে। পূর্ব কাস্পিয়ান রেলপথটি তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান ও চীনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করলেও, দক্ষিণ ককেশাসের সঙ্গে ইরানের রেল যোগাযোগ প্রথম নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধের সময় থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ গবেষক আল জাজিরাকে বলেন, ‘দক্ষিণ ককেশাসের সোভিয়েত আমলের রেল নেটওয়ার্কের অংশ জুলফা-নাখচিভান রেলপথের পুনরুজ্জীবন আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যকার শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর, বিশেষ করে ট্রিপ (TRIPP) প্রকল্পের বাস্তবায়নের ওপরও নির্ভর করে।’ ফলস্বরূপ, উত্তর-দক্ষিণ করিডোরের পশ্চিম রুটের বাণিজ্যে এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বন্দরগুলোতে অংশীদারত্ব বৃদ্ধি
উত্তরের বন্দরগুলোতে ঠিক কী পরিমাণ পণ্য স্থানান্তরিত হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান ইরানি কর্তৃপক্ষ প্রকাশ না করলেও খাদ্যের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানিতে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বন্দর সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ শাকিবি-নাসাব জানান, দেশটির মোট বন্দর ধারণক্ষমতার মাত্র ৩ কোটি টন উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত।
যুদ্ধের আগে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহনে উত্তরের বন্দরগুলোর অংশ ১৮ শতাংশ থাকলেও তা এখন বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে উত্তর ও দক্ষিণের বন্দরগুলোর জাহাজ ধারণক্ষমতার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। গিলান প্রদেশের গভর্নর হাদি হাগশেনাস জানান, কাস্পিয়ান বন্দরগুলোতে কন্টেইনার আগমন গত বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উত্তরের বন্দরগুলো তেহরান, ইসফাহান ও আরাকের মতো প্রধান শহরগুলোর কাছাকাছি হওয়ায় আমদানিকৃত পণ্যের স্থল পরিবহন খরচ কমাতে সাহায্য করছে। চীন-আকতাউ-উত্তর ইরান রুটটিও বাণিজ্য প্রসারে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া রাশিয়া ও ইরানের যৌথ উদ্যোগে রাশত-আস্তারা রেলপথের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার প্রক্রিয়াও চলছে।
অতিরিক্ত রাশিয়ান নির্ভরতা
তেহরানের এ উত্তরমুখী পদক্ষেপের কারণে রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির মুখে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কাস্পিয়ান সাগর হয়ে রাশিয়া ইরানে ড্রোনের যন্ত্রাংশ ও বিস্ফোরক পাঠিয়েছে। জুলাই মাসে ইউক্রেনীয় হামলায় একটি ইরানি মাছ ধরার জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও এ উত্তেজনার প্রমাণ।
বুর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক এজানা টেডলা আল বলেছেন, ‘রাশিয়ান অবকাঠামোর সাথে একীভূত হওয়া বিঘ্নের সমস্যা বাড়িয়ে তোলে, কারণ ইউক্রেন এটিকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং এর মধ্যে বেসামরিক খুচরা বিক্রেতারাও অন্তর্ভুক্ত।’
টেডলা আরও যোগ করেন, ‘ইরানের মূল্যবান সম্পদগুলোর রপ্তানি দক্ষিণাঞ্চল দিয়েই হয়ে থাকে। এর মধ্যে খনিজ জ্বালানি, তেল ও লোহার আকরিকের মতো ভারী ও বিপুল পণ্য রয়েছে যেগুলোকে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করা সবচেয়ে সহজ।’ কিন্তু উত্তরাঞ্চলে বন্দর অবকাঠামো বাড়লেও এ কাঙ্ক্ষিত বাজার পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা

মার্কিন নৌ অবরোধে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ায় তেহরান এখন তেল রপ্তানি ও পণ্য আমদানির জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে দেশটির উত্তর উপকূলের কাস্পিয়ান সাগরকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাতিসংঘে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অচলাবস্থা কাটানোর সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে তেহরানের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর সামরিক অভিযান শুরু করেছিল, তা বন্ধে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তেহরান বাধ্য হয়ে তেল রপ্তানি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানিতে রদবদল করছে।
তবে কাস্পিয়ান সাগর হয়ে এ সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিজস্ব রসদ সরবরাহ ও অবকাঠামোগত নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা

কাস্পিয়ান চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের বৃহত্তম স্থলবেষ্টিত জলাশয় কাস্পিয়ান সাগর ইরান, রাশিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান এবং তুর্কমেনিস্তানের মধ্যে বিভক্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ সাগরের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সেখানে নৌচলাচল ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
এপ্রিলে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন জানান, ১৯৯০-এর দশক থেকে কাস্পিয়ান সাগরের জলস্তর প্রায় ২ মিটার বা ৬.৬ ফুট কমে গেছে। এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ এটি আরও ৮ থেকে ২১ মিটার বা ২৬ থেকে ৬৯ ফুট পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা শাহরাম ফাদাকার জানিয়েছেন, গত দুই থেকে তিন বছর ধরে পানির স্তর প্রতি বছর ২০ সেন্টিমিটার বা ৭.৯ ইঞ্চির বেশি হারে কমছে। ফলে সব দেশের বাণিজ্যই হুমকির মুখে পড়েছে। চলতি মাসে ইরানের শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসুদ পলমেহ জানান, উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে একসময় ৬,০০০ টন ওজনের জাহাজ নোঙর করতে পারতো। কিন্তু পানির স্তর হ্রাসের কারণে তা ৪,০০০ টনে নেমে এসেছে। রাশিয়ার ভলগা নদী হয়ে কাস্পিয়ান সাগরে প্রবেশকারী ইরানি জাহাজগুলোও প্রায়ই আটকে যাচ্ছে।
বাণিজ্য বাধা
ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্যের সিংহভাগই এতদিন দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হতো। কিন্তু মার্কিন নৌ নিষেধাজ্ঞা ও বিমান হামলায় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তেহরান বাণিজ্য কাস্পিয়ান সাগর ও স্থল সীমান্তে সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
গবেষক ভালি কালেজির মতে, বাণিজ্য ও রসদ সরবরাহ হঠাৎ উত্তর দিকে সরে যাওয়ায় স্থল সীমান্তে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। আর্মেনিয়ার নরদুজ সীমান্ত ক্রসিংয়ে ইরানে প্রবেশের অপেক্ষায় প্রায় ১,৮০০ ট্রাক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে এবং অন্যান্য টার্মিনালে অপেক্ষা ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত গড়ায়। কালেজি জানান, শুধু স্থলপথে পণ্য চলাচল বৃদ্ধিই এর একমাত্র কারণ নয়। টার্মিনালের সীমিত ধারণক্ষমতা, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং চলমান নির্মাণ কাজও এই দীর্ঘ যানজট তৈরি করছে।
পাশাপাশি ইরানি বিমান সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং যাত্রী বৃদ্ধির ফলে সীমান্তে ভোগান্তি আরও বেড়েছে। পূর্ব কাস্পিয়ান রেলপথটি তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান ও চীনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করলেও, দক্ষিণ ককেশাসের সঙ্গে ইরানের রেল যোগাযোগ প্রথম নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধের সময় থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ গবেষক আল জাজিরাকে বলেন, ‘দক্ষিণ ককেশাসের সোভিয়েত আমলের রেল নেটওয়ার্কের অংশ জুলফা-নাখচিভান রেলপথের পুনরুজ্জীবন আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যকার শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর, বিশেষ করে ট্রিপ (TRIPP) প্রকল্পের বাস্তবায়নের ওপরও নির্ভর করে।’ ফলস্বরূপ, উত্তর-দক্ষিণ করিডোরের পশ্চিম রুটের বাণিজ্যে এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বন্দরগুলোতে অংশীদারত্ব বৃদ্ধি
উত্তরের বন্দরগুলোতে ঠিক কী পরিমাণ পণ্য স্থানান্তরিত হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান ইরানি কর্তৃপক্ষ প্রকাশ না করলেও খাদ্যের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানিতে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বন্দর সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ শাকিবি-নাসাব জানান, দেশটির মোট বন্দর ধারণক্ষমতার মাত্র ৩ কোটি টন উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত।
যুদ্ধের আগে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহনে উত্তরের বন্দরগুলোর অংশ ১৮ শতাংশ থাকলেও তা এখন বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে উত্তর ও দক্ষিণের বন্দরগুলোর জাহাজ ধারণক্ষমতার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। গিলান প্রদেশের গভর্নর হাদি হাগশেনাস জানান, কাস্পিয়ান বন্দরগুলোতে কন্টেইনার আগমন গত বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উত্তরের বন্দরগুলো তেহরান, ইসফাহান ও আরাকের মতো প্রধান শহরগুলোর কাছাকাছি হওয়ায় আমদানিকৃত পণ্যের স্থল পরিবহন খরচ কমাতে সাহায্য করছে। চীন-আকতাউ-উত্তর ইরান রুটটিও বাণিজ্য প্রসারে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া রাশিয়া ও ইরানের যৌথ উদ্যোগে রাশত-আস্তারা রেলপথের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার প্রক্রিয়াও চলছে।
অতিরিক্ত রাশিয়ান নির্ভরতা
তেহরানের এ উত্তরমুখী পদক্ষেপের কারণে রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির মুখে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কাস্পিয়ান সাগর হয়ে রাশিয়া ইরানে ড্রোনের যন্ত্রাংশ ও বিস্ফোরক পাঠিয়েছে। জুলাই মাসে ইউক্রেনীয় হামলায় একটি ইরানি মাছ ধরার জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও এ উত্তেজনার প্রমাণ।
বুর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক এজানা টেডলা আল বলেছেন, ‘রাশিয়ান অবকাঠামোর সাথে একীভূত হওয়া বিঘ্নের সমস্যা বাড়িয়ে তোলে, কারণ ইউক্রেন এটিকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং এর মধ্যে বেসামরিক খুচরা বিক্রেতারাও অন্তর্ভুক্ত।’
টেডলা আরও যোগ করেন, ‘ইরানের মূল্যবান সম্পদগুলোর রপ্তানি দক্ষিণাঞ্চল দিয়েই হয়ে থাকে। এর মধ্যে খনিজ জ্বালানি, তেল ও লোহার আকরিকের মতো ভারী ও বিপুল পণ্য রয়েছে যেগুলোকে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করা সবচেয়ে সহজ।’ কিন্তু উত্তরাঞ্চলে বন্দর অবকাঠামো বাড়লেও এ কাঙ্ক্ষিত বাজার পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা

হরমুজে নৌ অবরোধ, বাণিজ্যের জন্য কাস্পিয়ান সাগরের দিকে ঝুঁকছে ইরান
সিজেডএন ডেস্ক

মার্কিন নৌ অবরোধে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ায় তেহরান এখন তেল রপ্তানি ও পণ্য আমদানির জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে দেশটির উত্তর উপকূলের কাস্পিয়ান সাগরকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাতিসংঘে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অচলাবস্থা কাটানোর সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে তেহরানের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর সামরিক অভিযান শুরু করেছিল, তা বন্ধে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তেহরান বাধ্য হয়ে তেল রপ্তানি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানিতে রদবদল করছে।
তবে কাস্পিয়ান সাগর হয়ে এ সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিজস্ব রসদ সরবরাহ ও অবকাঠামোগত নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা

কাস্পিয়ান চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের বৃহত্তম স্থলবেষ্টিত জলাশয় কাস্পিয়ান সাগর ইরান, রাশিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান এবং তুর্কমেনিস্তানের মধ্যে বিভক্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ সাগরের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সেখানে নৌচলাচল ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
এপ্রিলে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন জানান, ১৯৯০-এর দশক থেকে কাস্পিয়ান সাগরের জলস্তর প্রায় ২ মিটার বা ৬.৬ ফুট কমে গেছে। এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ এটি আরও ৮ থেকে ২১ মিটার বা ২৬ থেকে ৬৯ ফুট পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা শাহরাম ফাদাকার জানিয়েছেন, গত দুই থেকে তিন বছর ধরে পানির স্তর প্রতি বছর ২০ সেন্টিমিটার বা ৭.৯ ইঞ্চির বেশি হারে কমছে। ফলে সব দেশের বাণিজ্যই হুমকির মুখে পড়েছে। চলতি মাসে ইরানের শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসুদ পলমেহ জানান, উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে একসময় ৬,০০০ টন ওজনের জাহাজ নোঙর করতে পারতো। কিন্তু পানির স্তর হ্রাসের কারণে তা ৪,০০০ টনে নেমে এসেছে। রাশিয়ার ভলগা নদী হয়ে কাস্পিয়ান সাগরে প্রবেশকারী ইরানি জাহাজগুলোও প্রায়ই আটকে যাচ্ছে।
বাণিজ্য বাধা
ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্যের সিংহভাগই এতদিন দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হতো। কিন্তু মার্কিন নৌ নিষেধাজ্ঞা ও বিমান হামলায় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তেহরান বাণিজ্য কাস্পিয়ান সাগর ও স্থল সীমান্তে সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
গবেষক ভালি কালেজির মতে, বাণিজ্য ও রসদ সরবরাহ হঠাৎ উত্তর দিকে সরে যাওয়ায় স্থল সীমান্তে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। আর্মেনিয়ার নরদুজ সীমান্ত ক্রসিংয়ে ইরানে প্রবেশের অপেক্ষায় প্রায় ১,৮০০ ট্রাক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে এবং অন্যান্য টার্মিনালে অপেক্ষা ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত গড়ায়। কালেজি জানান, শুধু স্থলপথে পণ্য চলাচল বৃদ্ধিই এর একমাত্র কারণ নয়। টার্মিনালের সীমিত ধারণক্ষমতা, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং চলমান নির্মাণ কাজও এই দীর্ঘ যানজট তৈরি করছে।
পাশাপাশি ইরানি বিমান সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং যাত্রী বৃদ্ধির ফলে সীমান্তে ভোগান্তি আরও বেড়েছে। পূর্ব কাস্পিয়ান রেলপথটি তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান ও চীনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করলেও, দক্ষিণ ককেশাসের সঙ্গে ইরানের রেল যোগাযোগ প্রথম নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধের সময় থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ গবেষক আল জাজিরাকে বলেন, ‘দক্ষিণ ককেশাসের সোভিয়েত আমলের রেল নেটওয়ার্কের অংশ জুলফা-নাখচিভান রেলপথের পুনরুজ্জীবন আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যকার শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর, বিশেষ করে ট্রিপ (TRIPP) প্রকল্পের বাস্তবায়নের ওপরও নির্ভর করে।’ ফলস্বরূপ, উত্তর-দক্ষিণ করিডোরের পশ্চিম রুটের বাণিজ্যে এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বন্দরগুলোতে অংশীদারত্ব বৃদ্ধি
উত্তরের বন্দরগুলোতে ঠিক কী পরিমাণ পণ্য স্থানান্তরিত হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান ইরানি কর্তৃপক্ষ প্রকাশ না করলেও খাদ্যের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানিতে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বন্দর সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ শাকিবি-নাসাব জানান, দেশটির মোট বন্দর ধারণক্ষমতার মাত্র ৩ কোটি টন উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত।
যুদ্ধের আগে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহনে উত্তরের বন্দরগুলোর অংশ ১৮ শতাংশ থাকলেও তা এখন বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে উত্তর ও দক্ষিণের বন্দরগুলোর জাহাজ ধারণক্ষমতার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। গিলান প্রদেশের গভর্নর হাদি হাগশেনাস জানান, কাস্পিয়ান বন্দরগুলোতে কন্টেইনার আগমন গত বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উত্তরের বন্দরগুলো তেহরান, ইসফাহান ও আরাকের মতো প্রধান শহরগুলোর কাছাকাছি হওয়ায় আমদানিকৃত পণ্যের স্থল পরিবহন খরচ কমাতে সাহায্য করছে। চীন-আকতাউ-উত্তর ইরান রুটটিও বাণিজ্য প্রসারে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া রাশিয়া ও ইরানের যৌথ উদ্যোগে রাশত-আস্তারা রেলপথের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার প্রক্রিয়াও চলছে।
অতিরিক্ত রাশিয়ান নির্ভরতা
তেহরানের এ উত্তরমুখী পদক্ষেপের কারণে রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির মুখে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কাস্পিয়ান সাগর হয়ে রাশিয়া ইরানে ড্রোনের যন্ত্রাংশ ও বিস্ফোরক পাঠিয়েছে। জুলাই মাসে ইউক্রেনীয় হামলায় একটি ইরানি মাছ ধরার জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও এ উত্তেজনার প্রমাণ।
বুর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক এজানা টেডলা আল বলেছেন, ‘রাশিয়ান অবকাঠামোর সাথে একীভূত হওয়া বিঘ্নের সমস্যা বাড়িয়ে তোলে, কারণ ইউক্রেন এটিকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং এর মধ্যে বেসামরিক খুচরা বিক্রেতারাও অন্তর্ভুক্ত।’
টেডলা আরও যোগ করেন, ‘ইরানের মূল্যবান সম্পদগুলোর রপ্তানি দক্ষিণাঞ্চল দিয়েই হয়ে থাকে। এর মধ্যে খনিজ জ্বালানি, তেল ও লোহার আকরিকের মতো ভারী ও বিপুল পণ্য রয়েছে যেগুলোকে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করা সবচেয়ে সহজ।’ কিন্তু উত্তরাঞ্চলে বন্দর অবকাঠামো বাড়লেও এ কাঙ্ক্ষিত বাজার পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা









