মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল কি ইরান, গাজা ও ইউক্রেন সংঘাতের মোড় ঘুরাতে পারবে

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল কি ইরান, গাজা ও ইউক্রেন সংঘাতের মোড় ঘুরাতে পারবে
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ‘ব্লু ওয়েভ’-এর ঢেউ তুলে দুর্দান্ত জয় তুলে নেওয়ার পর এখন পুরো বিশ্বের চোখ ওয়াশিংটনের কংগ্রেসের দিকে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন এ রাজনৈতিক সমীকরণ কীভাবে ইরান, গাজা এবং ইউক্রেনের চলমান সংঘাতের গতিপ্রকৃতি বদলে দেবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এ নির্বাচনকে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের গণভোট হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে হঠাৎ যুদ্ধ শুরু করার বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি ভোটারদের মনে বড় ধরনের ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং এ সংঘাতে ইতোমধ্যেই মার্কিন করদাতাদের প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার গায়েব হয়ে গেছে। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মতো প্রভাবশালী রিপাবলিকান নেতারাও এখন এই যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছেন।
ইউরোপীয় নেতারা অবশ্য সতর্কতার সঙ্গে এ নির্বাচনের ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা আশা করছেন, জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব নিতে যাওয়া ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত আইনপ্রণেতারা ওয়াশিংটন ও ইউরোপের মধ্যে ভেঙে পড়া ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক জোড়া লাগাতে এবং রুশ আগ্রাসনের মুখে ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সহায়তার হাত আরও প্রসারিত করতে সক্ষম হবেন। এর আগে রাশিয়ার তেল স্থাপনায় ইউক্রেনীয় হামলার জেরে জ্বালানি সংকটের অজুহাত তুলে ট্রাম্প কিয়েভের প্রতি সমস্ত সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পদত্যাগ দাবি করার পাশাপাশি রাশিয়ান তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত স্থগিত করেছিলেন তিনি।

নির্বাচনের ফলাফল
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি এক প্রকার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে এবং প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- উভয় কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। টেক্সাস, ওহাইও, আইওয়া কিংবা কানসাসের মতো ঐতিহ্যবাহী রক্ষণশীল রাজ্যগুলোতেও হেরেছে রিপাবলিকানরা, অথচ ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ট্রাম্পকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিল।
১০০ আসনের সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা এখন ৫৪টি আসন নিয়ে চালকের আসনে রয়েছে, যেখানে রিপাবলিকানদের ঝুলিতে রয়েছে মোটে ৪৪টি আসন। বাকি দুটির ফলাফল এখনও ঘোষণা হয়নি। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা জিতেছে ২৪২টি আসন। এটি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসনের ম্যাজিক ফিগারকে সহজেই ছাড়িয়ে গেছে। বিপরীতে রিপাবলিকানরা পেয়েছে মাত্র ১৫১টি আসন। রাজ্যগুলোর গভর্নর পদের ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাটরা ২৮টিতে জয় পেয়ে এগিয়ে আছে, বিপরীতে রিপাবলিকানদের দখলে আছে ২০টি এবং দুটির ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি।
এবারের নির্বাচন ডেমোক্র্যাটদের জন্য বেশ কিছু ঐতিহাসিক প্রথমের সাক্ষী হয়ে রইল। মিশিগানের আব্দুল এল-সায়েদ দেশটির প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। জর্জিয়া তাদের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে বেছে নিয়েছে কেইশা ল্যান্স বটমসকে। অন্যদিকে টেক্সাসের প্রথম ল্যাটিনা গভর্নর হয়েছেন জিনা হিনোজোসা এবং নিউ মেক্সিকোতে প্রথম আদিবাসী মার্কিন নারী গভর্নর হিসেবে জয়ী হয়েছেন ডেব হ্যালান্ড। ডেমোক্র্যাটদের এ জোয়ারের মুখে ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের যেকোনো উন্মাদ নীতির বিরুদ্ধে তিনি তার রাষ্ট্রপতি ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেন না।

ইরান যুদ্ধে এ ফলাফলের অর্থ
ভোটারদের রায়ে প্রভাব ফেলা সবচেয়ে বড় ইস্যুটি ছিল ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক পদক্ষেপ। বুধবার (৪ নভেম্বর) নিজ মুখে এ পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের বড় ভূমিকার কথা স্বীকার করলেও ট্রাম্প জানিয়েছেন যে তিনি দেশের সুরক্ষায় সঠিক কাজটিই করেছেন।
অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি যুদ্ধে না জড়ানো এবং দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েই তিনি হোয়াইট হাউসে এসেছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় বসার পর থেকেই কংগ্রেসের তোয়াক্কা না করে নির্বাহী আদেশের জোরে ইরানকে পরপর দুটি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেন তিনি। ডেমোক্র্যাটরা বারবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রেসিডেন্টের একক ক্ষমতার কারণে সুবিধা করতে পারেনি। ফলস্বরূপ, রয়টার্স ও ইপসোস-এর সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নির্বাচনের ঠিক আগে মাত্র ৩২ শতাংশ মানুষ তার নীতিকে সমর্থন করেছেন। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প একদিকে ইরানের ওপর আরও হামলা চালানোর হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার দরজাও খোলা রেখেছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দ কমানোর ক্ষমতা থাকলেই রাতারাতি এ যুদ্ধের ইতি টানা সহজ হবে না। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সেন্টার অন ইউএস পলিটিক্স-এর রিসার্চ ফেলো জেমস বয়েস আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য মোতায়েন থাকলে এটি অত্যন্ত সমস্যাজনক প্রমাণিত হবে এবং মার্কিনিদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলার শামিল বলে মনে হবে।’
এছাড়া ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাব কার্যকর করে ট্রাম্পকে নিবৃত্ত করাও বেশ কঠিন। এ আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট কোনো জরুরি আক্রমণ প্রতিহত করতে পারবেন ঠিকই, কিন্তু কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ৬০ দিনের বেশি সামরিক অভিযান চালানো যায় না। সেখানেও ট্রাম্প ভেটো দিলে তা আটকাতে দুই-তৃতীয়াংশের যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার, তা এই মুহূর্তে ডেমোক্র্যাটদের হাতে নেই। তবে রিপাবলিকানদের এ অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইরান এখন যুদ্ধ বন্ধের শর্তে ওয়াশিংটনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির মোক্ষম সুযোগ দেখছে।

নির্বাচনি ফলাফল কি গাজাকে প্রভাবিত করবে
ইসরায়েলের প্রতি অন্ধ সমর্থনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ডেমোক্র্যাটদেরও। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হওয়ার পরও ইসরায়েলকে অবিরত সামরিক সহায়তা দিয়ে গেছে।
তবে এবারের নির্বাচনে জয়ী হওয়া একদল নতুন ও তরুণ প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট প্রার্থী গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের নির্যাতন এবং তেল আবিবকে ওয়াশিংটনের খোলাখুলি সামরিক-আর্থিক সহায়তার কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত। মিশিগান থেকে এআইপিএসি সুপার প্যাকের কোটি টাকার বিদ্বেষী প্রচারণা ও বাধা পেরিয়ে সিনেট আসনে জয়ী হওয়া আব্দুল এল-সায়েদ ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির তীব্র সমালোচনা করে ইসরায়েলে মার্কিন সাহায্য পুরোপুরি বন্ধ করার জোরালো দাবি তুলেছেন।
নির্বাচনের দিন ভোটারদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে ট্রাম্প ফক্স নিউজে এক চমকপ্রদ ঘোষণা দিয়ে দাবি করেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিজেই নাকি পরামর্শ দিয়েছেন যেন যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে দেওয়া বার্ষিক ৪ বিলিয়ন ডলারের সাহায্য বন্ধ করে দেয়।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যেই সম্মত হয়েছি যে এই বছরের শেষ নাগাদ আমরা ইসরায়েলকে কোনো অর্থ প্রদান করব না।’ যদিও নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও ইউক্রেনকে সমর্থন করবে
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও ট্রাম্প তা রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। উল্টো কিয়েভ এবং ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর তিনি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন, তার মতে ইউরোপের উচিত নিজেদের সুরক্ষার খরচ নিজেদেরই বহন করা। এর আগে শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেনকে রাশিয়ার দখলকৃত ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প তাকে প্রকাশ্যেই অকৃতজ্ঞ বলেছিলেন।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন রাশিয়ার তেল শোধনাগারের ওপর ইউক্রেনের ড্রোন হামলার কারণে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বেড়ে যায়। এর জন্য মার্কিন কৃষক ও ট্রাকচালকদের ক্ষতির দায় জেলেনস্কির ওপরই চাপান ট্রাম্প। এমনকি কংগ্রেসে দ্বিদলীয় সমর্থনে সেপ্টেম্বরে পাস হওয়া রাশিয়ান তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞাও তিনি এক নির্বাহী আদেশে স্থগিত করে দেন। কিয়েভে রাশিয়ার সাম্প্রতিক বিমান হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য গোপন করা এবং ইলন মাস্কের স্টারলিঙ্ক নেটওয়ার্কে ইউক্রেনের অ্যাক্সেস সীমিত করার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে। অস্ত্র সরবরাহে দীর্ঘসূত্রিতা, জেলেনস্কির পদত্যাগের দাবি এবং অক্টোবরে রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি তেল আমদানি ইউরোপীয় মিত্রদের গভীর উদ্বেগের মুখে ফেলেছিল। বাইডেন প্রশাসনের ইউক্রেনকে কখনো একা ছাড়ব না নীতির ঠিক উল্টো ছিল ট্রাম্পের এ অবস্থান।
তবে এখন ওয়াশিংটনে ক্ষমতার পালাবদলের আভাস পেয়ে ইউক্রেন আশা করছে যে নতুন কংগ্রেসের হাত ধরে কিয়েভ ইস্যু আবারও মূল এজেন্ডায় ফিরবে।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ‘ব্লু ওয়েভ’-এর ঢেউ তুলে দুর্দান্ত জয় তুলে নেওয়ার পর এখন পুরো বিশ্বের চোখ ওয়াশিংটনের কংগ্রেসের দিকে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন এ রাজনৈতিক সমীকরণ কীভাবে ইরান, গাজা এবং ইউক্রেনের চলমান সংঘাতের গতিপ্রকৃতি বদলে দেবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এ নির্বাচনকে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের গণভোট হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে হঠাৎ যুদ্ধ শুরু করার বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি ভোটারদের মনে বড় ধরনের ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং এ সংঘাতে ইতোমধ্যেই মার্কিন করদাতাদের প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার গায়েব হয়ে গেছে। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মতো প্রভাবশালী রিপাবলিকান নেতারাও এখন এই যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছেন।
ইউরোপীয় নেতারা অবশ্য সতর্কতার সঙ্গে এ নির্বাচনের ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা আশা করছেন, জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব নিতে যাওয়া ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত আইনপ্রণেতারা ওয়াশিংটন ও ইউরোপের মধ্যে ভেঙে পড়া ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক জোড়া লাগাতে এবং রুশ আগ্রাসনের মুখে ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সহায়তার হাত আরও প্রসারিত করতে সক্ষম হবেন। এর আগে রাশিয়ার তেল স্থাপনায় ইউক্রেনীয় হামলার জেরে জ্বালানি সংকটের অজুহাত তুলে ট্রাম্প কিয়েভের প্রতি সমস্ত সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পদত্যাগ দাবি করার পাশাপাশি রাশিয়ান তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত স্থগিত করেছিলেন তিনি।

নির্বাচনের ফলাফল
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি এক প্রকার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে এবং প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- উভয় কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। টেক্সাস, ওহাইও, আইওয়া কিংবা কানসাসের মতো ঐতিহ্যবাহী রক্ষণশীল রাজ্যগুলোতেও হেরেছে রিপাবলিকানরা, অথচ ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ট্রাম্পকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিল।
১০০ আসনের সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা এখন ৫৪টি আসন নিয়ে চালকের আসনে রয়েছে, যেখানে রিপাবলিকানদের ঝুলিতে রয়েছে মোটে ৪৪টি আসন। বাকি দুটির ফলাফল এখনও ঘোষণা হয়নি। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা জিতেছে ২৪২টি আসন। এটি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসনের ম্যাজিক ফিগারকে সহজেই ছাড়িয়ে গেছে। বিপরীতে রিপাবলিকানরা পেয়েছে মাত্র ১৫১টি আসন। রাজ্যগুলোর গভর্নর পদের ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাটরা ২৮টিতে জয় পেয়ে এগিয়ে আছে, বিপরীতে রিপাবলিকানদের দখলে আছে ২০টি এবং দুটির ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি।
এবারের নির্বাচন ডেমোক্র্যাটদের জন্য বেশ কিছু ঐতিহাসিক প্রথমের সাক্ষী হয়ে রইল। মিশিগানের আব্দুল এল-সায়েদ দেশটির প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। জর্জিয়া তাদের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে বেছে নিয়েছে কেইশা ল্যান্স বটমসকে। অন্যদিকে টেক্সাসের প্রথম ল্যাটিনা গভর্নর হয়েছেন জিনা হিনোজোসা এবং নিউ মেক্সিকোতে প্রথম আদিবাসী মার্কিন নারী গভর্নর হিসেবে জয়ী হয়েছেন ডেব হ্যালান্ড। ডেমোক্র্যাটদের এ জোয়ারের মুখে ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের যেকোনো উন্মাদ নীতির বিরুদ্ধে তিনি তার রাষ্ট্রপতি ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেন না।

ইরান যুদ্ধে এ ফলাফলের অর্থ
ভোটারদের রায়ে প্রভাব ফেলা সবচেয়ে বড় ইস্যুটি ছিল ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক পদক্ষেপ। বুধবার (৪ নভেম্বর) নিজ মুখে এ পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের বড় ভূমিকার কথা স্বীকার করলেও ট্রাম্প জানিয়েছেন যে তিনি দেশের সুরক্ষায় সঠিক কাজটিই করেছেন।
অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি যুদ্ধে না জড়ানো এবং দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েই তিনি হোয়াইট হাউসে এসেছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় বসার পর থেকেই কংগ্রেসের তোয়াক্কা না করে নির্বাহী আদেশের জোরে ইরানকে পরপর দুটি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেন তিনি। ডেমোক্র্যাটরা বারবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রেসিডেন্টের একক ক্ষমতার কারণে সুবিধা করতে পারেনি। ফলস্বরূপ, রয়টার্স ও ইপসোস-এর সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নির্বাচনের ঠিক আগে মাত্র ৩২ শতাংশ মানুষ তার নীতিকে সমর্থন করেছেন। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প একদিকে ইরানের ওপর আরও হামলা চালানোর হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার দরজাও খোলা রেখেছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দ কমানোর ক্ষমতা থাকলেই রাতারাতি এ যুদ্ধের ইতি টানা সহজ হবে না। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সেন্টার অন ইউএস পলিটিক্স-এর রিসার্চ ফেলো জেমস বয়েস আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য মোতায়েন থাকলে এটি অত্যন্ত সমস্যাজনক প্রমাণিত হবে এবং মার্কিনিদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলার শামিল বলে মনে হবে।’
এছাড়া ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাব কার্যকর করে ট্রাম্পকে নিবৃত্ত করাও বেশ কঠিন। এ আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট কোনো জরুরি আক্রমণ প্রতিহত করতে পারবেন ঠিকই, কিন্তু কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ৬০ দিনের বেশি সামরিক অভিযান চালানো যায় না। সেখানেও ট্রাম্প ভেটো দিলে তা আটকাতে দুই-তৃতীয়াংশের যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার, তা এই মুহূর্তে ডেমোক্র্যাটদের হাতে নেই। তবে রিপাবলিকানদের এ অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইরান এখন যুদ্ধ বন্ধের শর্তে ওয়াশিংটনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির মোক্ষম সুযোগ দেখছে।

নির্বাচনি ফলাফল কি গাজাকে প্রভাবিত করবে
ইসরায়েলের প্রতি অন্ধ সমর্থনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ডেমোক্র্যাটদেরও। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হওয়ার পরও ইসরায়েলকে অবিরত সামরিক সহায়তা দিয়ে গেছে।
তবে এবারের নির্বাচনে জয়ী হওয়া একদল নতুন ও তরুণ প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট প্রার্থী গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের নির্যাতন এবং তেল আবিবকে ওয়াশিংটনের খোলাখুলি সামরিক-আর্থিক সহায়তার কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত। মিশিগান থেকে এআইপিএসি সুপার প্যাকের কোটি টাকার বিদ্বেষী প্রচারণা ও বাধা পেরিয়ে সিনেট আসনে জয়ী হওয়া আব্দুল এল-সায়েদ ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির তীব্র সমালোচনা করে ইসরায়েলে মার্কিন সাহায্য পুরোপুরি বন্ধ করার জোরালো দাবি তুলেছেন।
নির্বাচনের দিন ভোটারদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে ট্রাম্প ফক্স নিউজে এক চমকপ্রদ ঘোষণা দিয়ে দাবি করেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিজেই নাকি পরামর্শ দিয়েছেন যেন যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে দেওয়া বার্ষিক ৪ বিলিয়ন ডলারের সাহায্য বন্ধ করে দেয়।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যেই সম্মত হয়েছি যে এই বছরের শেষ নাগাদ আমরা ইসরায়েলকে কোনো অর্থ প্রদান করব না।’ যদিও নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও ইউক্রেনকে সমর্থন করবে
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও ট্রাম্প তা রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। উল্টো কিয়েভ এবং ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর তিনি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন, তার মতে ইউরোপের উচিত নিজেদের সুরক্ষার খরচ নিজেদেরই বহন করা। এর আগে শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেনকে রাশিয়ার দখলকৃত ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প তাকে প্রকাশ্যেই অকৃতজ্ঞ বলেছিলেন।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন রাশিয়ার তেল শোধনাগারের ওপর ইউক্রেনের ড্রোন হামলার কারণে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বেড়ে যায়। এর জন্য মার্কিন কৃষক ও ট্রাকচালকদের ক্ষতির দায় জেলেনস্কির ওপরই চাপান ট্রাম্প। এমনকি কংগ্রেসে দ্বিদলীয় সমর্থনে সেপ্টেম্বরে পাস হওয়া রাশিয়ান তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞাও তিনি এক নির্বাহী আদেশে স্থগিত করে দেন। কিয়েভে রাশিয়ার সাম্প্রতিক বিমান হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য গোপন করা এবং ইলন মাস্কের স্টারলিঙ্ক নেটওয়ার্কে ইউক্রেনের অ্যাক্সেস সীমিত করার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে। অস্ত্র সরবরাহে দীর্ঘসূত্রিতা, জেলেনস্কির পদত্যাগের দাবি এবং অক্টোবরে রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি তেল আমদানি ইউরোপীয় মিত্রদের গভীর উদ্বেগের মুখে ফেলেছিল। বাইডেন প্রশাসনের ইউক্রেনকে কখনো একা ছাড়ব না নীতির ঠিক উল্টো ছিল ট্রাম্পের এ অবস্থান।
তবে এখন ওয়াশিংটনে ক্ষমতার পালাবদলের আভাস পেয়ে ইউক্রেন আশা করছে যে নতুন কংগ্রেসের হাত ধরে কিয়েভ ইস্যু আবারও মূল এজেন্ডায় ফিরবে।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল কি ইরান, গাজা ও ইউক্রেন সংঘাতের মোড় ঘুরাতে পারবে
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ‘ব্লু ওয়েভ’-এর ঢেউ তুলে দুর্দান্ত জয় তুলে নেওয়ার পর এখন পুরো বিশ্বের চোখ ওয়াশিংটনের কংগ্রেসের দিকে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন এ রাজনৈতিক সমীকরণ কীভাবে ইরান, গাজা এবং ইউক্রেনের চলমান সংঘাতের গতিপ্রকৃতি বদলে দেবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এ নির্বাচনকে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের গণভোট হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে হঠাৎ যুদ্ধ শুরু করার বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি ভোটারদের মনে বড় ধরনের ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং এ সংঘাতে ইতোমধ্যেই মার্কিন করদাতাদের প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার গায়েব হয়ে গেছে। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মতো প্রভাবশালী রিপাবলিকান নেতারাও এখন এই যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছেন।
ইউরোপীয় নেতারা অবশ্য সতর্কতার সঙ্গে এ নির্বাচনের ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা আশা করছেন, জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব নিতে যাওয়া ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত আইনপ্রণেতারা ওয়াশিংটন ও ইউরোপের মধ্যে ভেঙে পড়া ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক জোড়া লাগাতে এবং রুশ আগ্রাসনের মুখে ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সহায়তার হাত আরও প্রসারিত করতে সক্ষম হবেন। এর আগে রাশিয়ার তেল স্থাপনায় ইউক্রেনীয় হামলার জেরে জ্বালানি সংকটের অজুহাত তুলে ট্রাম্প কিয়েভের প্রতি সমস্ত সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পদত্যাগ দাবি করার পাশাপাশি রাশিয়ান তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত স্থগিত করেছিলেন তিনি।

নির্বাচনের ফলাফল
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি এক প্রকার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে এবং প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- উভয় কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। টেক্সাস, ওহাইও, আইওয়া কিংবা কানসাসের মতো ঐতিহ্যবাহী রক্ষণশীল রাজ্যগুলোতেও হেরেছে রিপাবলিকানরা, অথচ ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ট্রাম্পকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিল।
১০০ আসনের সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা এখন ৫৪টি আসন নিয়ে চালকের আসনে রয়েছে, যেখানে রিপাবলিকানদের ঝুলিতে রয়েছে মোটে ৪৪টি আসন। বাকি দুটির ফলাফল এখনও ঘোষণা হয়নি। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা জিতেছে ২৪২টি আসন। এটি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসনের ম্যাজিক ফিগারকে সহজেই ছাড়িয়ে গেছে। বিপরীতে রিপাবলিকানরা পেয়েছে মাত্র ১৫১টি আসন। রাজ্যগুলোর গভর্নর পদের ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাটরা ২৮টিতে জয় পেয়ে এগিয়ে আছে, বিপরীতে রিপাবলিকানদের দখলে আছে ২০টি এবং দুটির ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি।
এবারের নির্বাচন ডেমোক্র্যাটদের জন্য বেশ কিছু ঐতিহাসিক প্রথমের সাক্ষী হয়ে রইল। মিশিগানের আব্দুল এল-সায়েদ দেশটির প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। জর্জিয়া তাদের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে বেছে নিয়েছে কেইশা ল্যান্স বটমসকে। অন্যদিকে টেক্সাসের প্রথম ল্যাটিনা গভর্নর হয়েছেন জিনা হিনোজোসা এবং নিউ মেক্সিকোতে প্রথম আদিবাসী মার্কিন নারী গভর্নর হিসেবে জয়ী হয়েছেন ডেব হ্যালান্ড। ডেমোক্র্যাটদের এ জোয়ারের মুখে ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের যেকোনো উন্মাদ নীতির বিরুদ্ধে তিনি তার রাষ্ট্রপতি ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেন না।

ইরান যুদ্ধে এ ফলাফলের অর্থ
ভোটারদের রায়ে প্রভাব ফেলা সবচেয়ে বড় ইস্যুটি ছিল ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক পদক্ষেপ। বুধবার (৪ নভেম্বর) নিজ মুখে এ পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের বড় ভূমিকার কথা স্বীকার করলেও ট্রাম্প জানিয়েছেন যে তিনি দেশের সুরক্ষায় সঠিক কাজটিই করেছেন।
অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি যুদ্ধে না জড়ানো এবং দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েই তিনি হোয়াইট হাউসে এসেছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় বসার পর থেকেই কংগ্রেসের তোয়াক্কা না করে নির্বাহী আদেশের জোরে ইরানকে পরপর দুটি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেন তিনি। ডেমোক্র্যাটরা বারবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রেসিডেন্টের একক ক্ষমতার কারণে সুবিধা করতে পারেনি। ফলস্বরূপ, রয়টার্স ও ইপসোস-এর সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নির্বাচনের ঠিক আগে মাত্র ৩২ শতাংশ মানুষ তার নীতিকে সমর্থন করেছেন। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প একদিকে ইরানের ওপর আরও হামলা চালানোর হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার দরজাও খোলা রেখেছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দ কমানোর ক্ষমতা থাকলেই রাতারাতি এ যুদ্ধের ইতি টানা সহজ হবে না। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সেন্টার অন ইউএস পলিটিক্স-এর রিসার্চ ফেলো জেমস বয়েস আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য মোতায়েন থাকলে এটি অত্যন্ত সমস্যাজনক প্রমাণিত হবে এবং মার্কিনিদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলার শামিল বলে মনে হবে।’
এছাড়া ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাব কার্যকর করে ট্রাম্পকে নিবৃত্ত করাও বেশ কঠিন। এ আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট কোনো জরুরি আক্রমণ প্রতিহত করতে পারবেন ঠিকই, কিন্তু কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ৬০ দিনের বেশি সামরিক অভিযান চালানো যায় না। সেখানেও ট্রাম্প ভেটো দিলে তা আটকাতে দুই-তৃতীয়াংশের যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার, তা এই মুহূর্তে ডেমোক্র্যাটদের হাতে নেই। তবে রিপাবলিকানদের এ অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইরান এখন যুদ্ধ বন্ধের শর্তে ওয়াশিংটনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির মোক্ষম সুযোগ দেখছে।

নির্বাচনি ফলাফল কি গাজাকে প্রভাবিত করবে
ইসরায়েলের প্রতি অন্ধ সমর্থনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ডেমোক্র্যাটদেরও। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হওয়ার পরও ইসরায়েলকে অবিরত সামরিক সহায়তা দিয়ে গেছে।
তবে এবারের নির্বাচনে জয়ী হওয়া একদল নতুন ও তরুণ প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট প্রার্থী গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের নির্যাতন এবং তেল আবিবকে ওয়াশিংটনের খোলাখুলি সামরিক-আর্থিক সহায়তার কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত। মিশিগান থেকে এআইপিএসি সুপার প্যাকের কোটি টাকার বিদ্বেষী প্রচারণা ও বাধা পেরিয়ে সিনেট আসনে জয়ী হওয়া আব্দুল এল-সায়েদ ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির তীব্র সমালোচনা করে ইসরায়েলে মার্কিন সাহায্য পুরোপুরি বন্ধ করার জোরালো দাবি তুলেছেন।
নির্বাচনের দিন ভোটারদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে ট্রাম্প ফক্স নিউজে এক চমকপ্রদ ঘোষণা দিয়ে দাবি করেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিজেই নাকি পরামর্শ দিয়েছেন যেন যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে দেওয়া বার্ষিক ৪ বিলিয়ন ডলারের সাহায্য বন্ধ করে দেয়।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যেই সম্মত হয়েছি যে এই বছরের শেষ নাগাদ আমরা ইসরায়েলকে কোনো অর্থ প্রদান করব না।’ যদিও নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও ইউক্রেনকে সমর্থন করবে
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও ট্রাম্প তা রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। উল্টো কিয়েভ এবং ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর তিনি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন, তার মতে ইউরোপের উচিত নিজেদের সুরক্ষার খরচ নিজেদেরই বহন করা। এর আগে শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেনকে রাশিয়ার দখলকৃত ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প তাকে প্রকাশ্যেই অকৃতজ্ঞ বলেছিলেন।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন রাশিয়ার তেল শোধনাগারের ওপর ইউক্রেনের ড্রোন হামলার কারণে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বেড়ে যায়। এর জন্য মার্কিন কৃষক ও ট্রাকচালকদের ক্ষতির দায় জেলেনস্কির ওপরই চাপান ট্রাম্প। এমনকি কংগ্রেসে দ্বিদলীয় সমর্থনে সেপ্টেম্বরে পাস হওয়া রাশিয়ান তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞাও তিনি এক নির্বাহী আদেশে স্থগিত করে দেন। কিয়েভে রাশিয়ার সাম্প্রতিক বিমান হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য গোপন করা এবং ইলন মাস্কের স্টারলিঙ্ক নেটওয়ার্কে ইউক্রেনের অ্যাক্সেস সীমিত করার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে। অস্ত্র সরবরাহে দীর্ঘসূত্রিতা, জেলেনস্কির পদত্যাগের দাবি এবং অক্টোবরে রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি তেল আমদানি ইউরোপীয় মিত্রদের গভীর উদ্বেগের মুখে ফেলেছিল। বাইডেন প্রশাসনের ইউক্রেনকে কখনো একা ছাড়ব না নীতির ঠিক উল্টো ছিল ট্রাম্পের এ অবস্থান।
তবে এখন ওয়াশিংটনে ক্ষমতার পালাবদলের আভাস পেয়ে ইউক্রেন আশা করছে যে নতুন কংগ্রেসের হাত ধরে কিয়েভ ইস্যু আবারও মূল এজেন্ডায় ফিরবে।









