শিরোনাম

নানা উদ্যোগের পরও ঢাকা দক্ষিণে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী

নানা উদ্যোগের পরও ঢাকা দক্ষিণে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী
অবাধে বর্জ্য ফেলা ঢাকার জুরাইনের চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকার খালের পানি কালচে হয়ে গেছে। খালের কিনারে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজধানীসহ সারাদেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২৯ হাজার। এর মধ্যে মারা গেছে ৮২ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, জুলাই মাসের তুলনায় আগস্ট মাসে আক্রান্তের হার ইতোমধ্যে ২৭ শতাংশ বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগেও বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। এই বিভাগের ১১ হাজারেরও বেশি রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। এই পর্যন্ত ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর নতুন করে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ২৮৭। এদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৩৫ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৬১ জন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৯১ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী এবং এই রোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়ও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে উত্তর সিটির তুলনায় দক্ষিণ সিটিতে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে অনেক আগ থেকেই তৎপরতা শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তারা ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস, জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে এখন বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে ডিএসসিসি।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সহযোগিতা নিয়ে ডিএসসিসি নিজস্ব ব্যবস্থা্পনায় গত মে মাসে ৭৫ টি ওয়ার্ডে ‘প্রাক-বর্ষা এডিস মশার লার্ভা জরিপ’পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ডিএসসিসির ঝুঁকিপূর্ণ ২৭ ওয়ার্ড

জরিপে ডিএসসিসির ২৭টি ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভা বেশি পাওয়া গেছে। এগুলো হচ্ছে ২, ৪, ৫, ৬, ৭, ৯, ১১, ১৩, ১৫, ১৭, ২০, ২১, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৮, ৩২, ৩৬, ৩৮, ৫২, ৫৫, ৫৬, ৫৭, ৬২, ৬৮ ও ৭৩ নম্বর ওয়ার্ড।

এসব ওয়ার্ডের অধীনে খিলগাঁও, সবুজবাগ, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও রমনা অঞ্চল, লালবাগ, আজিমপুর, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া ও কোতোয়ালী অঞ্চল এবং ডেমরা, সারুলিয়া, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, জুরাইন, কদমতলী, মাতুয়াইল, শ্যামপুর ও পোস্তগোলা এলাকা।

ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছেন সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরের এই প্রতিবেদক। এর মধ্যে লালবাগের শেখ সাহেব বাজার এলাকার কিশব রায় বলেন, তাদের এলাকায় মশার উপদ্রব কিছুটা কম। তবে লালবাগ থানার সামনে এবং কামরাঙ্গীরচর এলাকায় মশার উৎপাত অনেক বেশি।

শেখ সাহেব বাজার এলাকার আরেক বাসিন্দা বলেন, আজিমপুর কবরস্থানের পেছনে এবং নিউমার্কেট এলাকায়ও মশার উপদ্রব অসহনীয় পর্যায়ে পৌছেছে।

যাত্রাবাড়ীর কলাপাড়ায় থাকেন শফিকুল ইসলাম স্বপ্ন। তিনি বলেন, ‘আমার এলাকায় মশা খুব বেশি নেই। তবে শনির আখড়া এবং জুরাইন এলাকায় মশার উপদ্রব অনেক বেশি।’

জুরাইনে ভয়াবহ চিত্র

গত ২১ আগস্ট সরেজমিনে জুরাইন এলাকায় দেখা যায়, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ও পানি জমে আছে। এতে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এলাকার সরু গলির পাশে ড্রেনের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিনের ময়লা-আবর্জনা ও পচা পারি জমে আছে। কোথাও পচা আবর্জনা, প্লাস্টিকের ব্যাগ, পলিথিন পড়ে আছে। এসব বর্জ্যের পাশে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভাও দেখা যায়।

জুরাইনের রজব আলী সরদার রোডের পাশে ড্রেনে পচা আবর্জনা, চিপসের প্যাকেট ও পলিথিনের ব্যাগের স্তূপ। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
জুরাইনের রজব আলী সরদার রোডের পাশে ড্রেনে পচা আবর্জনা, চিপসের প্যাকেট ও পলিথিনের ব্যাগের স্তূপ। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ড্রেনের বিভিন্ন অংশে কালচে ও ময়লা পানি জমে আছে। ড্রেনের মুখ ও আশপাশের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার না করায় পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টির পানিও বিভিন্ন স্থানে জমে থাকছে। একই সঙ্গে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পাত্র, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্যের ভেতরে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। এসব স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার বংশবিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

জুরাইনের চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকার পানিতে পলিথিন, প্লাস্টিক, কাগজ ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ভাসছে। কোথাও কোথাও এসব আবর্জনা স্তূপ হয়ে পানির ওপর জমে আছে। পানির রং কালচে হয়ে গেছে। খালের দুই পাশের পাড়েও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নানা ধরনের বর্জ্য। কোথাও আবর্জনা জমে পানি আটকে আছে, আবার কোথাও স্থির পানির ওপর ময়লার আস্তরণ দেখা গেছে।

খালের আশপাশেও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা ও পানির কারণে এসব স্থান এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

জুরাইনের মুরাদপুর রজব আলী সরদার রোডের পাশে থাকেন মো. বাদল ইসলাম। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে সকালে মশার ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু বিকালে কোনো ওষুধ ছিটানো হয় না। রাস্তার পাশের ড্রেন অনেকদিন ধরে পরিষ্কারও করা হয় না।

তিনি আরও বলেন, তাদের এলাকায় মশার উপদ্রব অনেক বেশি। এখানে ১০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলে মশা ঘিরে ধরে। বিশেষ করে সন্ধ্যায় পরপরই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকার বাসিন্দা রজব আলী বলেন, ‘আমি এই এলাকায় ৫ বছর ধরে বস করছি। এই সময়ের মধ্যে আমি কখনোই মশার উপদ্রব কমতে দেখিনি। বর্ষা মৌসুমে মশার উৎপাত সবচেয়ে বেশি থাকে।

রজব আলী বলেন, সিটি করপোরেশনের লোকেরা মাঝেমধ্যে এসে মশার ওষুধ ছিটিয়ে যায়। কিন্তু তারপরও মশা কমছে না।

চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকার আরেক বাসিন্দা আহসান হাবিব সবুজ বলেন, ‘আমাদের এখানে মশা সবসময়ই থাকে। বাসা থেকে নিচে নামলে দাঁড়ানো যায় না। এলাকার ড্রেনগুলোও কখনো পরিষ্কার করতে দেখিনি এবং মশা মারার জন্য ওষুধ স্প্রেও করতে দেখি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাসা ৬ তলায়, তারপরও প্রায়ই মশা সেখানে গিয়েও আমাকে কামড়ায়৷’

ডিএসসিসি সুত্রে জানা গেছে, ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে ও মশক নিয়ন্ত্রনে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে ডিএসসিসি। শুধু ওষুধ ছিটানোর ওপর নির্ভর না করে এবার মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত লার্ভিসাইডিং (মশার লার্ভা ধ্বংস করা) ও এডাল্টিসাইডিং (উড়ন্ত মশা নিধন করা) এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ অভিযান এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে ডিএসসিসির চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য মোট ১২১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং শুধু মশা নিধনের ওষুধ ও কীটনাশক কেনার জন্য ৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

কয়েকমাস ধরে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কথা বলে আসছেন ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। তিনি ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতি শনিবার 'ক্লিনিং ডে' পালন করাসহ কামরাঙ্গীরচর এলাকায় সাত দিনের বিশেষ 'ক্র্যাশ প্রোগ্রাম' করার ঘোষণাও দিয়েছেন। এছাড়া নগরের বাসিন্দাদের তিনি বাসাবাড়ি, ভবনের চারপাশ, নিচতলা, গ্যারেজ ও ড্রেনে যাতে পানি জমে না থাকে- সেসব বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অডিটোরিয়ামে এক অনুষ্ঠানে ডিএসসিসি প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, ‘গতবারের তুলনায় এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম । আমরা একটা জরিপ করেছি এবং পরবর্তীতে অ্যাকশনে গিয়েছি। এখন পর্যন্ত আমরা বহু কর্মসূচি গ্রহণ করেছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, জরিপের পর ২৭ টি ওয়ার্ডে আমরা 'ক্র্যাশ প্রোগ্রাম' পরিচালনা করেছি। আমরা আবারও অক্টোবরের দিকে আরেকটি জরিপ করবো। ডেঙ্গু মোকাবিলায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক এলাকায় যেন বেশি করে মশার ওষুধ দেওয়া হয়, আমরা সেদিকেও জোর দিচ্ছি।’

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমরা স্কুলগুলোতে গিয়ে বাচ্চা এবং তাদের গার্ডিয়ানদেরকে সচেতন করছি। ডেঙ্গুর ব্যাপারে সচেতন করতে আমরা বাচ্চাদের মধ্যে লিফলেটও বিতরণ করছি।’

তবে ডিএসসিসির এই উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার। এ বিষয়ে তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যেভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিচ্ছে, তাতে হয়তো কিছুটা কাজ হবে। তবে এভাবে ডেঙ্গুর প্রকোপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’

কবিরুল বাশার আরও বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থলগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংস করা। বিশেষ করে মানুষের বাসাবাড়ি, আঙিনা, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশে জমে থাকা স্বচ্ছ পানির পাত্রসহ যেসব স্থানে এডিস মশা বংশ বিস্তার করতে পারে, সেসব জায়গায় নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি শুধু সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। নাগরিকদের সচেতন ও সম্পৃক্ত করে নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আশপাশের এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল পরিষ্কার রাখতে হবে।

/বিবি/