মানসিক রোগ ঘিরে সমাজে যত ভুল ধারণা

মানসিক রোগ ঘিরে সমাজে যত ভুল ধারণা
সিজেডএন ডেস্ক

পারিবারিক কলহ, সামাজিক বৈষম্য, অফিসের চাপসহ বিভিন্ন কারণে মানুষের আচরণের পরিবর্তন হতে পারে। পরিচিত কারো এমন আচরণের পরিবর্তন দেখে অনেক সময় আমরা নিজেরাই মনোবিজ্ঞানী হয়ে যাই। বলে দেই তার সে ‘মানসিক রোগী’। আবার অনেকেই বলে দেন ‘জিন-ভূতের আছড়’। প্রচলিত কিছু মানদণ্ডের কারণে অনেকেই সাইকিয়াট্রিস্ট নাহয় কাউন্সিলর হয়ে যান। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে সেটা সত্য না-ও হতে পারে।
মানসিক রোগী গোটা পৃথিবীতেই আছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যা বা রোগে ভোগে। ভারতেও এ সংখ্যা বাড়ছে। আর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৮-২০ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।
চলুন দেখে নেওয়া যাক আমাদের সাধারণ ধারণা আর বৈজ্ঞানিক ধারণাটা আসলে কতটা আলাদা।
ওসিডি নিয়ে ভুল ধারণা
আজকাল অনেকেই বলে থাকেন আমার মনে হয় ওসিডি (অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার) আছে। যদিও দেশে ওসিডির লক্ষণ বেশ স্পষ্ট। অতিরিক্ত শুচিতাবায়ু (যেমন: বারবার হাত ধোয়া বা ওজু করা) এবং ধর্মীয় ধন্দ বা কুচিন্তার আকারে এটা প্রকাশ পায়। একটু গুছিয়ে থাকা বা জিনিসপত্র সারিবদ্ধ রাখা মানুষ নিজেকে ফ্যাশনেবলভাবে ‘সো ওসিডি’ বলে দাবি করেন। অনেকে আবার ভেবে বসেন, পরিচ্ছন্নতাই ওসিডির একমাত্র রূপ।
তবে গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। আন্তর্জাতিক ওসিডি ফাউন্ডেশন বলছে- ওসিডি কোনো শখ বা সৌন্দর্যচেতনা নয়। এটি মস্তিষ্কের অনিচ্ছাকৃত ভীতিকর চিন্তা। যেমন: ‘হাত না ধুলে বাজে রোগ হবে।‘ এ আতঙ্ক থেকে সাময়িক নিষ্কৃতি পেতে অনেকে যন্ত্রণাদায়ক কিছু নিয়ম বারবার পালন করেন। এটাই ওসিডি।
পজিটিভ ভাবনায় ডিপ্রেশন দূর হয়
যত দিন যাচ্ছে ততই তরুণদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। প্রেমঘটিত ব্যাপার, পারিবারিক কলহ, বিষণ্নতা ও জীবনের প্রতি চরম হতাশা থেকেও আত্মহত্যার হার বাড়ছে। অনেকে মনে করে থাকেন মন খারাপ করাটা ডিপ্রেশন। আবার অনেকে এটাকে দুর্বলতা ভেবে উপহাস করেন। অনেকে উপদেশ দেন, ইতিবাচক চিন্তা করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে বা কাজে ব্যস্ত থাকলেই হবে।
তবে হার্ভার্ট হেলথের গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। সাধারণ মন খারাপের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ থাকে এবং কিছুদিন পর তা কেটে যায়। কিন্তু ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন কোনো কারণ ছাড়াই আসতে পারে এবং দীর্ঘদিন ধরে থাকে। এটি নিউরো-কেমিক্যাল অসঙ্গতি। গবেষকরা বলছেন, ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তি চাইলেই ‘পজিটিভ’ চিন্তা করে সুস্থ হতে পারেন না; এর জন্য বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা প্রয়োজন।
এডিএইচডি বা স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা
দেশের অনেক শিশু ও তরুণ এডিএইচডিতে (অ্যাটেনশন-ডেফিসিট/হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার) আক্রান্ত। কিন্তু তাদের দুষ্টু, পড়াশোনায় ফাঁকিবাজ বা বেয়াদব তকমা দিয়ে থাকেন। অনেকেই এজন্য শাস্তিও দেন। আবার অনেকে ভাবেন চঞ্চলতা কমে গেলেই বা বয়স বাড়লেই বুঝি এডিএইচডি ভালো হয়ে যায়। অনেকে ভাবেন এটি নিছক অমনোযোগের অভ্যাস।
কিন্তু এটি কোনো স্বভাবের ত্রুটি নয়, বরং মস্তিষ্কের নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল বৈচিত্র্য। এটেনশন ডেফিসিট ডিজঅর্ডার অ্যাসোসিয়েশন (এডিডিএ) বলছে, মস্তিষ্কে মনোযোগের তথ্য প্রক্রিয়া করার পদ্ধতি এখানে ভিন্ন থাকে। বয়সের সাথে এটি চলে যায় না, বরং বড়দের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে সময়সীমা মানতে না পারা বা কাজের মধ্যে মনোযোগ হারিয়ে ফেলার কারণ হিসেবে থেকে যায়।
সিজোফ্রেনিয়া ভূতের আছড় নয়
দেশে অসংখ্য সিজোফ্রেনিয়ার রোগী আছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটা অত্যন্ত সংবেদনশীল হলেও সাধারণ মানুষ একে জিন বা ভূতের আছড় বলে থাকেন। অনেকে জাদুটোনা বা তাবিজ-কবজ করেছেন বলে মনে করেন। আবার অনেকে এটাকে দ্বৈত ব্যক্তিত্ব ভাবেন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও জরিপ চালিয়ে বলেছে, এটি মস্তিষ্কের একটি জটিল জৈবিক অবস্থা, যা বাস্তবতার স্নায়বিক সংযোগকে গুলিয়ে দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা যে কাল্পনিক শব্দ শোনেন বা ছায়া দেখেন, তা তাদের মস্তিষ্কে হুবহু সত্য হিসেবে অনুভূত হয়। উপযুক্ত ওষুধ ও থেরাপিতে এই রোগের লক্ষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারকে অহংকার ভাবা
অনেকেই সামাজিক অনুষ্ঠান বা মানুষের সামনে কথা বলতে পারেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটাকে লাজুক স্বভাব বা অহংকার হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। অনেকের ক্ষেত্রে এমন হয় যে আক্রান্ত ব্যক্তি ভাব মারছেন বা অহংকারী বলে ধরে নেন। কেউ কেউ অহংকার কম করতে বা মানুষের সঙ্গে মিশতে পরামর্শ দনে। কিন্তু এটি কোনো লাজুক স্বভাব নয়। এটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দেওয়া আতঙ্কের অবস্থা। ব্যক্তিটির মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত সিগন্যাল দিতে থাকে যে, সবাই তাকেই দেখছে, হীন চোখে বিচার করছে এবং সে লজ্জা পেতে যাচ্ছে। কেবল সাহসের ঝোঁকে এই আতঙ্ক দূর করা যায় না।
এসএসডি ঢঙ নয়
অনেকে বুক জ্বালা, তীব্র শরীর ব্যথা, বা অবশ ভাব নিয়ে ডাক্তারের কাছে যান, কিন্তু রিপোর্ট নরমাল আসে। এজন্য পরিবার ও স্বজনরা মনে করেন সে ঢঙ করছেন বা সস্তা মনোযোগ পাওয়ার ধান্দা করছেন, কিংবা রোগের ভান ধরছেন। যদি এমন মনে হয, তবে আপনি ভুল করছেন। আসলে এই রোগীদের শারীরিক কষ্ট বা যন্ত্রণা শতভাগ সত্য। মস্তিষ্কে জমে থাকা মানসিক চাপ, অবদমিত ট্রমা বা দুশ্চিন্তা যখন স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে শারীরিক ব্যথায় পরিণত হয়, তখন তাকে সোমাটিক সিম্পটম ডিসঅর্ডার বা এসএসডি বলা হয়। তারা অভিনয় করছেন না, তাদের মস্তিষ্কের সংকেত ভুল পথে প্রবাহিত হয়ে ব্যথা তৈরি করছে।
বিপিডি স্বার্থপরতা নয়
এমন অনেক মানুষ আছে যাদেরকে ঝগড়াটে, স্বার্থপর বা মানসিক অস্থির বলে মনে হয়। অনেকেই তাদের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলেন। আবার ওই ব্যক্তিরাই দেখা যায় সামাজিকমাধ্যমে আবেগীয় স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। সেখানে তার আচরণ ও বাস্তব ব্যক্তিত্ব উল্টো। নির্দিষ্ট কিছু মানুষ যারা এমন লোকের ঘনিষ্ঠ তারা ভাবেন ব্ল্যাকমেইল বা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অনেকে এমন নাটক করে। বাস্তবে এটি আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার একটি ব্যাধি। আক্রান্ত ব্যক্তির মূল চালিকাশক্তি হলো 'পরিত্যক্ত হওয়ার তীব্র ভয়'। কাছের মানুষের সামান্য কণ্ঠস্বরের পরিবর্তনও তাদের মনে অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে। অতিরিক্ত আবেগের বহিঃপ্রকাশের পর তারা নিজেরাও প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভোগেন। এটাকে বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (বিপিডি) বলা হয়।
সমাজে অনেক ভুল ধারণা থাকবে, এটা স্বাভাবিক। তবে কাউকে একেবারে ফেলনার ভাবা উচিত নয়। হয়তো দেখা গেলো সে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, কিন্তু আপনি তাকে অহংকারী বলে ভুল করে এড়িয়ে যাচ্ছেন। আর যাদের এমন সমস্যা আছে তাদের উচিত নিয়মিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের কাছে যাওয়া।

পারিবারিক কলহ, সামাজিক বৈষম্য, অফিসের চাপসহ বিভিন্ন কারণে মানুষের আচরণের পরিবর্তন হতে পারে। পরিচিত কারো এমন আচরণের পরিবর্তন দেখে অনেক সময় আমরা নিজেরাই মনোবিজ্ঞানী হয়ে যাই। বলে দেই তার সে ‘মানসিক রোগী’। আবার অনেকেই বলে দেন ‘জিন-ভূতের আছড়’। প্রচলিত কিছু মানদণ্ডের কারণে অনেকেই সাইকিয়াট্রিস্ট নাহয় কাউন্সিলর হয়ে যান। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে সেটা সত্য না-ও হতে পারে।
মানসিক রোগী গোটা পৃথিবীতেই আছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যা বা রোগে ভোগে। ভারতেও এ সংখ্যা বাড়ছে। আর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৮-২০ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।
চলুন দেখে নেওয়া যাক আমাদের সাধারণ ধারণা আর বৈজ্ঞানিক ধারণাটা আসলে কতটা আলাদা।
ওসিডি নিয়ে ভুল ধারণা
আজকাল অনেকেই বলে থাকেন আমার মনে হয় ওসিডি (অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার) আছে। যদিও দেশে ওসিডির লক্ষণ বেশ স্পষ্ট। অতিরিক্ত শুচিতাবায়ু (যেমন: বারবার হাত ধোয়া বা ওজু করা) এবং ধর্মীয় ধন্দ বা কুচিন্তার আকারে এটা প্রকাশ পায়। একটু গুছিয়ে থাকা বা জিনিসপত্র সারিবদ্ধ রাখা মানুষ নিজেকে ফ্যাশনেবলভাবে ‘সো ওসিডি’ বলে দাবি করেন। অনেকে আবার ভেবে বসেন, পরিচ্ছন্নতাই ওসিডির একমাত্র রূপ।
তবে গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। আন্তর্জাতিক ওসিডি ফাউন্ডেশন বলছে- ওসিডি কোনো শখ বা সৌন্দর্যচেতনা নয়। এটি মস্তিষ্কের অনিচ্ছাকৃত ভীতিকর চিন্তা। যেমন: ‘হাত না ধুলে বাজে রোগ হবে।‘ এ আতঙ্ক থেকে সাময়িক নিষ্কৃতি পেতে অনেকে যন্ত্রণাদায়ক কিছু নিয়ম বারবার পালন করেন। এটাই ওসিডি।
পজিটিভ ভাবনায় ডিপ্রেশন দূর হয়
যত দিন যাচ্ছে ততই তরুণদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। প্রেমঘটিত ব্যাপার, পারিবারিক কলহ, বিষণ্নতা ও জীবনের প্রতি চরম হতাশা থেকেও আত্মহত্যার হার বাড়ছে। অনেকে মনে করে থাকেন মন খারাপ করাটা ডিপ্রেশন। আবার অনেকে এটাকে দুর্বলতা ভেবে উপহাস করেন। অনেকে উপদেশ দেন, ইতিবাচক চিন্তা করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে বা কাজে ব্যস্ত থাকলেই হবে।
তবে হার্ভার্ট হেলথের গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। সাধারণ মন খারাপের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ থাকে এবং কিছুদিন পর তা কেটে যায়। কিন্তু ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন কোনো কারণ ছাড়াই আসতে পারে এবং দীর্ঘদিন ধরে থাকে। এটি নিউরো-কেমিক্যাল অসঙ্গতি। গবেষকরা বলছেন, ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তি চাইলেই ‘পজিটিভ’ চিন্তা করে সুস্থ হতে পারেন না; এর জন্য বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা প্রয়োজন।
এডিএইচডি বা স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা
দেশের অনেক শিশু ও তরুণ এডিএইচডিতে (অ্যাটেনশন-ডেফিসিট/হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার) আক্রান্ত। কিন্তু তাদের দুষ্টু, পড়াশোনায় ফাঁকিবাজ বা বেয়াদব তকমা দিয়ে থাকেন। অনেকেই এজন্য শাস্তিও দেন। আবার অনেকে ভাবেন চঞ্চলতা কমে গেলেই বা বয়স বাড়লেই বুঝি এডিএইচডি ভালো হয়ে যায়। অনেকে ভাবেন এটি নিছক অমনোযোগের অভ্যাস।
কিন্তু এটি কোনো স্বভাবের ত্রুটি নয়, বরং মস্তিষ্কের নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল বৈচিত্র্য। এটেনশন ডেফিসিট ডিজঅর্ডার অ্যাসোসিয়েশন (এডিডিএ) বলছে, মস্তিষ্কে মনোযোগের তথ্য প্রক্রিয়া করার পদ্ধতি এখানে ভিন্ন থাকে। বয়সের সাথে এটি চলে যায় না, বরং বড়দের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে সময়সীমা মানতে না পারা বা কাজের মধ্যে মনোযোগ হারিয়ে ফেলার কারণ হিসেবে থেকে যায়।
সিজোফ্রেনিয়া ভূতের আছড় নয়
দেশে অসংখ্য সিজোফ্রেনিয়ার রোগী আছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটা অত্যন্ত সংবেদনশীল হলেও সাধারণ মানুষ একে জিন বা ভূতের আছড় বলে থাকেন। অনেকে জাদুটোনা বা তাবিজ-কবজ করেছেন বলে মনে করেন। আবার অনেকে এটাকে দ্বৈত ব্যক্তিত্ব ভাবেন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও জরিপ চালিয়ে বলেছে, এটি মস্তিষ্কের একটি জটিল জৈবিক অবস্থা, যা বাস্তবতার স্নায়বিক সংযোগকে গুলিয়ে দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা যে কাল্পনিক শব্দ শোনেন বা ছায়া দেখেন, তা তাদের মস্তিষ্কে হুবহু সত্য হিসেবে অনুভূত হয়। উপযুক্ত ওষুধ ও থেরাপিতে এই রোগের লক্ষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারকে অহংকার ভাবা
অনেকেই সামাজিক অনুষ্ঠান বা মানুষের সামনে কথা বলতে পারেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটাকে লাজুক স্বভাব বা অহংকার হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। অনেকের ক্ষেত্রে এমন হয় যে আক্রান্ত ব্যক্তি ভাব মারছেন বা অহংকারী বলে ধরে নেন। কেউ কেউ অহংকার কম করতে বা মানুষের সঙ্গে মিশতে পরামর্শ দনে। কিন্তু এটি কোনো লাজুক স্বভাব নয়। এটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দেওয়া আতঙ্কের অবস্থা। ব্যক্তিটির মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত সিগন্যাল দিতে থাকে যে, সবাই তাকেই দেখছে, হীন চোখে বিচার করছে এবং সে লজ্জা পেতে যাচ্ছে। কেবল সাহসের ঝোঁকে এই আতঙ্ক দূর করা যায় না।
এসএসডি ঢঙ নয়
অনেকে বুক জ্বালা, তীব্র শরীর ব্যথা, বা অবশ ভাব নিয়ে ডাক্তারের কাছে যান, কিন্তু রিপোর্ট নরমাল আসে। এজন্য পরিবার ও স্বজনরা মনে করেন সে ঢঙ করছেন বা সস্তা মনোযোগ পাওয়ার ধান্দা করছেন, কিংবা রোগের ভান ধরছেন। যদি এমন মনে হয, তবে আপনি ভুল করছেন। আসলে এই রোগীদের শারীরিক কষ্ট বা যন্ত্রণা শতভাগ সত্য। মস্তিষ্কে জমে থাকা মানসিক চাপ, অবদমিত ট্রমা বা দুশ্চিন্তা যখন স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে শারীরিক ব্যথায় পরিণত হয়, তখন তাকে সোমাটিক সিম্পটম ডিসঅর্ডার বা এসএসডি বলা হয়। তারা অভিনয় করছেন না, তাদের মস্তিষ্কের সংকেত ভুল পথে প্রবাহিত হয়ে ব্যথা তৈরি করছে।
বিপিডি স্বার্থপরতা নয়
এমন অনেক মানুষ আছে যাদেরকে ঝগড়াটে, স্বার্থপর বা মানসিক অস্থির বলে মনে হয়। অনেকেই তাদের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলেন। আবার ওই ব্যক্তিরাই দেখা যায় সামাজিকমাধ্যমে আবেগীয় স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। সেখানে তার আচরণ ও বাস্তব ব্যক্তিত্ব উল্টো। নির্দিষ্ট কিছু মানুষ যারা এমন লোকের ঘনিষ্ঠ তারা ভাবেন ব্ল্যাকমেইল বা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অনেকে এমন নাটক করে। বাস্তবে এটি আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার একটি ব্যাধি। আক্রান্ত ব্যক্তির মূল চালিকাশক্তি হলো 'পরিত্যক্ত হওয়ার তীব্র ভয়'। কাছের মানুষের সামান্য কণ্ঠস্বরের পরিবর্তনও তাদের মনে অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে। অতিরিক্ত আবেগের বহিঃপ্রকাশের পর তারা নিজেরাও প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভোগেন। এটাকে বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (বিপিডি) বলা হয়।
সমাজে অনেক ভুল ধারণা থাকবে, এটা স্বাভাবিক। তবে কাউকে একেবারে ফেলনার ভাবা উচিত নয়। হয়তো দেখা গেলো সে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, কিন্তু আপনি তাকে অহংকারী বলে ভুল করে এড়িয়ে যাচ্ছেন। আর যাদের এমন সমস্যা আছে তাদের উচিত নিয়মিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের কাছে যাওয়া।

মানসিক রোগ ঘিরে সমাজে যত ভুল ধারণা
সিজেডএন ডেস্ক

পারিবারিক কলহ, সামাজিক বৈষম্য, অফিসের চাপসহ বিভিন্ন কারণে মানুষের আচরণের পরিবর্তন হতে পারে। পরিচিত কারো এমন আচরণের পরিবর্তন দেখে অনেক সময় আমরা নিজেরাই মনোবিজ্ঞানী হয়ে যাই। বলে দেই তার সে ‘মানসিক রোগী’। আবার অনেকেই বলে দেন ‘জিন-ভূতের আছড়’। প্রচলিত কিছু মানদণ্ডের কারণে অনেকেই সাইকিয়াট্রিস্ট নাহয় কাউন্সিলর হয়ে যান। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে সেটা সত্য না-ও হতে পারে।
মানসিক রোগী গোটা পৃথিবীতেই আছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যা বা রোগে ভোগে। ভারতেও এ সংখ্যা বাড়ছে। আর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৮-২০ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।
চলুন দেখে নেওয়া যাক আমাদের সাধারণ ধারণা আর বৈজ্ঞানিক ধারণাটা আসলে কতটা আলাদা।
ওসিডি নিয়ে ভুল ধারণা
আজকাল অনেকেই বলে থাকেন আমার মনে হয় ওসিডি (অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার) আছে। যদিও দেশে ওসিডির লক্ষণ বেশ স্পষ্ট। অতিরিক্ত শুচিতাবায়ু (যেমন: বারবার হাত ধোয়া বা ওজু করা) এবং ধর্মীয় ধন্দ বা কুচিন্তার আকারে এটা প্রকাশ পায়। একটু গুছিয়ে থাকা বা জিনিসপত্র সারিবদ্ধ রাখা মানুষ নিজেকে ফ্যাশনেবলভাবে ‘সো ওসিডি’ বলে দাবি করেন। অনেকে আবার ভেবে বসেন, পরিচ্ছন্নতাই ওসিডির একমাত্র রূপ।
তবে গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। আন্তর্জাতিক ওসিডি ফাউন্ডেশন বলছে- ওসিডি কোনো শখ বা সৌন্দর্যচেতনা নয়। এটি মস্তিষ্কের অনিচ্ছাকৃত ভীতিকর চিন্তা। যেমন: ‘হাত না ধুলে বাজে রোগ হবে।‘ এ আতঙ্ক থেকে সাময়িক নিষ্কৃতি পেতে অনেকে যন্ত্রণাদায়ক কিছু নিয়ম বারবার পালন করেন। এটাই ওসিডি।
পজিটিভ ভাবনায় ডিপ্রেশন দূর হয়
যত দিন যাচ্ছে ততই তরুণদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। প্রেমঘটিত ব্যাপার, পারিবারিক কলহ, বিষণ্নতা ও জীবনের প্রতি চরম হতাশা থেকেও আত্মহত্যার হার বাড়ছে। অনেকে মনে করে থাকেন মন খারাপ করাটা ডিপ্রেশন। আবার অনেকে এটাকে দুর্বলতা ভেবে উপহাস করেন। অনেকে উপদেশ দেন, ইতিবাচক চিন্তা করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে বা কাজে ব্যস্ত থাকলেই হবে।
তবে হার্ভার্ট হেলথের গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। সাধারণ মন খারাপের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ থাকে এবং কিছুদিন পর তা কেটে যায়। কিন্তু ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন কোনো কারণ ছাড়াই আসতে পারে এবং দীর্ঘদিন ধরে থাকে। এটি নিউরো-কেমিক্যাল অসঙ্গতি। গবেষকরা বলছেন, ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তি চাইলেই ‘পজিটিভ’ চিন্তা করে সুস্থ হতে পারেন না; এর জন্য বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা প্রয়োজন।
এডিএইচডি বা স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা
দেশের অনেক শিশু ও তরুণ এডিএইচডিতে (অ্যাটেনশন-ডেফিসিট/হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার) আক্রান্ত। কিন্তু তাদের দুষ্টু, পড়াশোনায় ফাঁকিবাজ বা বেয়াদব তকমা দিয়ে থাকেন। অনেকেই এজন্য শাস্তিও দেন। আবার অনেকে ভাবেন চঞ্চলতা কমে গেলেই বা বয়স বাড়লেই বুঝি এডিএইচডি ভালো হয়ে যায়। অনেকে ভাবেন এটি নিছক অমনোযোগের অভ্যাস।
কিন্তু এটি কোনো স্বভাবের ত্রুটি নয়, বরং মস্তিষ্কের নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল বৈচিত্র্য। এটেনশন ডেফিসিট ডিজঅর্ডার অ্যাসোসিয়েশন (এডিডিএ) বলছে, মস্তিষ্কে মনোযোগের তথ্য প্রক্রিয়া করার পদ্ধতি এখানে ভিন্ন থাকে। বয়সের সাথে এটি চলে যায় না, বরং বড়দের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে সময়সীমা মানতে না পারা বা কাজের মধ্যে মনোযোগ হারিয়ে ফেলার কারণ হিসেবে থেকে যায়।
সিজোফ্রেনিয়া ভূতের আছড় নয়
দেশে অসংখ্য সিজোফ্রেনিয়ার রোগী আছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটা অত্যন্ত সংবেদনশীল হলেও সাধারণ মানুষ একে জিন বা ভূতের আছড় বলে থাকেন। অনেকে জাদুটোনা বা তাবিজ-কবজ করেছেন বলে মনে করেন। আবার অনেকে এটাকে দ্বৈত ব্যক্তিত্ব ভাবেন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও জরিপ চালিয়ে বলেছে, এটি মস্তিষ্কের একটি জটিল জৈবিক অবস্থা, যা বাস্তবতার স্নায়বিক সংযোগকে গুলিয়ে দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা যে কাল্পনিক শব্দ শোনেন বা ছায়া দেখেন, তা তাদের মস্তিষ্কে হুবহু সত্য হিসেবে অনুভূত হয়। উপযুক্ত ওষুধ ও থেরাপিতে এই রোগের লক্ষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারকে অহংকার ভাবা
অনেকেই সামাজিক অনুষ্ঠান বা মানুষের সামনে কথা বলতে পারেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটাকে লাজুক স্বভাব বা অহংকার হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। অনেকের ক্ষেত্রে এমন হয় যে আক্রান্ত ব্যক্তি ভাব মারছেন বা অহংকারী বলে ধরে নেন। কেউ কেউ অহংকার কম করতে বা মানুষের সঙ্গে মিশতে পরামর্শ দনে। কিন্তু এটি কোনো লাজুক স্বভাব নয়। এটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দেওয়া আতঙ্কের অবস্থা। ব্যক্তিটির মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত সিগন্যাল দিতে থাকে যে, সবাই তাকেই দেখছে, হীন চোখে বিচার করছে এবং সে লজ্জা পেতে যাচ্ছে। কেবল সাহসের ঝোঁকে এই আতঙ্ক দূর করা যায় না।
এসএসডি ঢঙ নয়
অনেকে বুক জ্বালা, তীব্র শরীর ব্যথা, বা অবশ ভাব নিয়ে ডাক্তারের কাছে যান, কিন্তু রিপোর্ট নরমাল আসে। এজন্য পরিবার ও স্বজনরা মনে করেন সে ঢঙ করছেন বা সস্তা মনোযোগ পাওয়ার ধান্দা করছেন, কিংবা রোগের ভান ধরছেন। যদি এমন মনে হয, তবে আপনি ভুল করছেন। আসলে এই রোগীদের শারীরিক কষ্ট বা যন্ত্রণা শতভাগ সত্য। মস্তিষ্কে জমে থাকা মানসিক চাপ, অবদমিত ট্রমা বা দুশ্চিন্তা যখন স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে শারীরিক ব্যথায় পরিণত হয়, তখন তাকে সোমাটিক সিম্পটম ডিসঅর্ডার বা এসএসডি বলা হয়। তারা অভিনয় করছেন না, তাদের মস্তিষ্কের সংকেত ভুল পথে প্রবাহিত হয়ে ব্যথা তৈরি করছে।
বিপিডি স্বার্থপরতা নয়
এমন অনেক মানুষ আছে যাদেরকে ঝগড়াটে, স্বার্থপর বা মানসিক অস্থির বলে মনে হয়। অনেকেই তাদের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলেন। আবার ওই ব্যক্তিরাই দেখা যায় সামাজিকমাধ্যমে আবেগীয় স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। সেখানে তার আচরণ ও বাস্তব ব্যক্তিত্ব উল্টো। নির্দিষ্ট কিছু মানুষ যারা এমন লোকের ঘনিষ্ঠ তারা ভাবেন ব্ল্যাকমেইল বা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অনেকে এমন নাটক করে। বাস্তবে এটি আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার একটি ব্যাধি। আক্রান্ত ব্যক্তির মূল চালিকাশক্তি হলো 'পরিত্যক্ত হওয়ার তীব্র ভয়'। কাছের মানুষের সামান্য কণ্ঠস্বরের পরিবর্তনও তাদের মনে অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে। অতিরিক্ত আবেগের বহিঃপ্রকাশের পর তারা নিজেরাও প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভোগেন। এটাকে বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (বিপিডি) বলা হয়।
সমাজে অনেক ভুল ধারণা থাকবে, এটা স্বাভাবিক। তবে কাউকে একেবারে ফেলনার ভাবা উচিত নয়। হয়তো দেখা গেলো সে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, কিন্তু আপনি তাকে অহংকারী বলে ভুল করে এড়িয়ে যাচ্ছেন। আর যাদের এমন সমস্যা আছে তাদের উচিত নিয়মিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের কাছে যাওয়া।

হঠাৎ প্রাক্তনের সঙ্গে দেখা হলে কী করবেন
মোবাইল ফোনে আসক্তি কমাবেন যেভাবে
গালি দিলে জরিমানা গুনতে হয় যে গ্রামে






