কেমন আছেন ঘড়ির ডাক্তাররা

কেমন আছেন ঘড়ির ডাক্তাররা
সিটিজেন ডেস্ক

পুরান ঢাকার সরু গলি, বাজার আর শতবর্ষী স্থাপনাগুলো যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত জাদুঘর। শহরের এই অংশে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, সময় এখানে একটু ধীর গতিতেই চলে। অগণিত অলিগলি, প্রাচীন দালানকোঠা আর মানুষের জীবনযাপনের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে বহু যুগের স্মৃতি। তাই তো পুরান ঢাকাকে অনেকে ভালোবেসে বলেন ‘বায়ান্ন বাজার তেপান্ন গলি’।
এই পুরোনো শহরের বেশ কিছু পেশা আজ বিলুপ্তির পথে। এর মধ্যে একটি পেশা হলো ঘড়ি মেকানিক বা কারিগর। একসময় ঘড়ি কেবল সময় দেখার মাধ্যম নয়, ছিলো সামাজিক মর্যাদারও প্রতীক। ব্রিটিশ আমলে পকেট ঘড়ির প্রচলন বেশ জনপ্রিয় ছিল। বুকপকেটে রাখা চেইনযুক্ত বড় আকারের সেই ঘড়ি ছিল অভিজাত শ্রেণির পরিচয়। দাম বেশি হওয়ায় সবার নাগালেও ছিল না। পরবর্তী সময়ে হাতঘড়ি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
৬০ ও ৭০ দশকে বিয়ের অনুষ্ঠানে জামাইকে ঘড়ি উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল অত্যন্ত প্রচলিত। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে সোনার চেইন, আংটি ও ঘড়ি যেমন সম্মানজনক উপহার হিসেবে বিবেচিত হতো, তেমনি নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতেও হাতঘড়ি ছিল মূল্যবান উপহার।
নব্বইয়ের দশকেও জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী কিংবা বিশেষ উপলক্ষে ঘড়ি উপহার দেওয়ার চল ছিল ব্যাপক। তখন প্রায় সব বয়সী মানুষের হাতেই দেখা যেত কোনো না কোনো ঘড়ি।
শুধু হাতঘড়িই নয়, অনেক বাড়িতে ছিল বিশাল আকৃতির দেওয়ালঘড়ি। ঘণ্টা বাজিয়ে সময় জানানোর সেই ঘড়িগুলো ছিল পরিবারের নিত্যসঙ্গী। কয়টা বাজল তা বোঝার জন্য ঘড়ির দিকে তাকানোরও প্রয়োজন হতো না; ঘণ্টার শব্দই বলে দিত সময়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তিও বদলেছে। সূর্যঘড়ি, বালিঘড়ি কিংবা জলঘড়ির যুগ পেরিয়ে আধুনিক ঘড়ি মানুষের জীবনকে করেছিল শৃঙ্খলিত। অথচ সেই আধুনিক ঘড়িরও আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে। স্মার্টফোনের যুগে সময় জানার জন্য আলাদা ঘড়ির প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে ঘড়ি মেরামতের পেশার ওপরও। যেসব মানুষ সারা জীবন ঘড়ির ভেতরের সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই এখন সংগ্রামের মুখোমুখি।
সদরঘাটের পাটুয়াটুলিতে এমনই একজন ঘড়ি মিস্ত্রি মোহাম্মদ রহমান। ১৯৮৪ সালে মাত্র পনেরো বছর বয়সে এই পেশায় আসেন তিনি। পরিবারের আর্থিক সংকট তাকে ছোটবেলা থেকেই জীবিকার সন্ধানে নামতে বাধ্য করেছিল। লেখাপড়ার সুযোগ সীমিত হলেও তিনি বুঝেছিলেন, টিকে থাকতে হলে একটি দক্ষতা অর্জন করতেই হবে। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ঘড়ি মেরামত শেখা।
দম দেওয়া ঘড়ি মেরামতের মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবনের শুরু। তখন ঘড়ির ব্যবহার ছিল ব্যাপক, ফলে কাজেরও অভাব ছিল না। শহরের প্রায় প্রতিটি এলাকায় ঘড়ি সারাইয়ের দোকান ছিল। মানুষ তাদের প্রিয় ঘড়ি নষ্ট হলে ফেলে না দিয়ে মেরামত করাতেন। কারণ অনেক ঘড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকত ব্যক্তিগত স্মৃতি, কোনোটি বন্ধুর উপহার, কোনোটি বিবাহের স্মারক।
এই আবেগই ঘড়ি মিস্ত্রিদের কাজকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। রহমানও সেই সময় ভালোভাবেই সংসার চালাতে পেরেছেন। ঘড়ি মেরামতের আয় দিয়েই গড়ে তুলেছেন পরিবার।
তার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ঘটে প্রায় বিশ বছর আগে। এক নৌবাহিনী কর্মকর্তা একটি পুরোনো সোনার ঘড়ি মেরামতের জন্য তার কাছে নিয়ে আসেন। বহু দোকান ঘুরে শেষ পর্যন্ত সেই কাজটি পান রহমান। ঘড়িটির সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত যত্নে কাজটি সম্পন্ন করেন তিনি।
পারিশ্রমিক হিসেবে সে সময় আট হাজার টাকা পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অর্থের চেয়েও বেশি তাকে আকৃষ্ট করেছিল ঘড়িটির ঐতিহাসিক ও নান্দনিক মূল্য। এতটাই যে তিনি নিজের সাধ্যমতো সেটি কেনারও চেষ্টা করেন। প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু মালিক ঘড়িটি বিক্রি করতে রাজি হননি। আজও সেই ঘটনা স্মরণ করলে তার চোখে ভেসে ওঠে অতীতের স্মৃতি।
রহমানের দোকানটিও যেন সময়ের সাক্ষী। ছোট্ট কাঁচঘেরা একটি ভাসমান কাঠামো, যার ওপরে কোনো ছাদ নেই। কাচের ভেতর সাজানো থাকে বিভিন্ন রঙের বেল্ট ও পুরোনো ঘড়ি। দোকানটি বয়সের ছাপ বহন করলেও এটিই তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
একসময় কলেজিয়েট স্কুলের পাশের এই এলাকাজুড়ে ছিল ঘড়ি মেরামতের একাধিক দোকান। প্রয়োজনেই শুধু নয়, আড্ডা ও সম্পর্কের টানেও সেখানে যেতেন স্থানীয় মানুষ। দোকানের সামনে বসে গল্প করা, পরিচিত কাউকে কয়েকদিন না দেখলে খোঁজ নেওয়া এসব ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। ব্যবসার বাইরেও গড়ে উঠেছিল মানবিক সম্পর্কের এক অনন্য পরিবেশ।
কিন্তু মোবাইল ফোনের বিস্তার সেই চিত্র বদলে গেছে। বিশেষ করে ২০১০ সালের পর ঘড়ির ব্যবহার দ্রুত কমতে শুরু করে। নতুন প্রজন্মের অনেক কারিগর অন্য পেশায় চলে যান। কেউ দোকান গুটিয়ে ফেলেন, কেউ অসুস্থতার কারণে কাজ ছেড়ে দেন।
রহমান বলেন, এখন আর আগের মতো কাজ নেই। তবু অনেক মানুষ এখনো তাদের পুরোনো ঘড়ি নিয়ে আসেন। বিভিন্ন জেলা থেকেও কিছু গ্রাহক আসেন। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০টি ঘড়ি মেরামত করে কোনোমতে চলছে জীবন।
তিনি বলেন, রোদ, বৃষ্টি কিংবা ঝড় সব প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিদিন নিজের দোকানে বসি। কারণ এই পেশা শুধু জীবিকার উৎস নয়, আমার ভালোবাসার জায়গাও। কোনো থেমে যাওয়া ঘড়িকে আবার সচল করতে পারলে যে আনন্দ আমি অনুভব করি, তা অন্য কোনো কাজ থেকে পাওয়া সম্ভব নয়।
সারা জীবন অন্যের ঘড়ির কাঁটা সচল রাখলেও সময় এই ঘড়ির ডাক্তারদের জন্য থেমে থাকেনি। প্রযুক্তির অগ্রগতির ভিড়ে তাদের পেশা আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবু তারা এখনো বসে থাকেন সেই পুরোনো দোকানে, কোনো থেমে যাওয়া ঘড়ির অপেক্ষায়। কারণ তারা জানেন, সময়কে হয়তো থামানো যায় না, কিন্তু তার স্মৃতিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। আর সেই কাজটিই করে চলেছেন পুরান ঢাকার এই নীরব সময় কারিগররা।

পুরান ঢাকার সরু গলি, বাজার আর শতবর্ষী স্থাপনাগুলো যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত জাদুঘর। শহরের এই অংশে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, সময় এখানে একটু ধীর গতিতেই চলে। অগণিত অলিগলি, প্রাচীন দালানকোঠা আর মানুষের জীবনযাপনের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে বহু যুগের স্মৃতি। তাই তো পুরান ঢাকাকে অনেকে ভালোবেসে বলেন ‘বায়ান্ন বাজার তেপান্ন গলি’।
এই পুরোনো শহরের বেশ কিছু পেশা আজ বিলুপ্তির পথে। এর মধ্যে একটি পেশা হলো ঘড়ি মেকানিক বা কারিগর। একসময় ঘড়ি কেবল সময় দেখার মাধ্যম নয়, ছিলো সামাজিক মর্যাদারও প্রতীক। ব্রিটিশ আমলে পকেট ঘড়ির প্রচলন বেশ জনপ্রিয় ছিল। বুকপকেটে রাখা চেইনযুক্ত বড় আকারের সেই ঘড়ি ছিল অভিজাত শ্রেণির পরিচয়। দাম বেশি হওয়ায় সবার নাগালেও ছিল না। পরবর্তী সময়ে হাতঘড়ি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
৬০ ও ৭০ দশকে বিয়ের অনুষ্ঠানে জামাইকে ঘড়ি উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল অত্যন্ত প্রচলিত। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে সোনার চেইন, আংটি ও ঘড়ি যেমন সম্মানজনক উপহার হিসেবে বিবেচিত হতো, তেমনি নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতেও হাতঘড়ি ছিল মূল্যবান উপহার।
নব্বইয়ের দশকেও জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী কিংবা বিশেষ উপলক্ষে ঘড়ি উপহার দেওয়ার চল ছিল ব্যাপক। তখন প্রায় সব বয়সী মানুষের হাতেই দেখা যেত কোনো না কোনো ঘড়ি।
শুধু হাতঘড়িই নয়, অনেক বাড়িতে ছিল বিশাল আকৃতির দেওয়ালঘড়ি। ঘণ্টা বাজিয়ে সময় জানানোর সেই ঘড়িগুলো ছিল পরিবারের নিত্যসঙ্গী। কয়টা বাজল তা বোঝার জন্য ঘড়ির দিকে তাকানোরও প্রয়োজন হতো না; ঘণ্টার শব্দই বলে দিত সময়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তিও বদলেছে। সূর্যঘড়ি, বালিঘড়ি কিংবা জলঘড়ির যুগ পেরিয়ে আধুনিক ঘড়ি মানুষের জীবনকে করেছিল শৃঙ্খলিত। অথচ সেই আধুনিক ঘড়িরও আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে। স্মার্টফোনের যুগে সময় জানার জন্য আলাদা ঘড়ির প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে ঘড়ি মেরামতের পেশার ওপরও। যেসব মানুষ সারা জীবন ঘড়ির ভেতরের সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই এখন সংগ্রামের মুখোমুখি।
সদরঘাটের পাটুয়াটুলিতে এমনই একজন ঘড়ি মিস্ত্রি মোহাম্মদ রহমান। ১৯৮৪ সালে মাত্র পনেরো বছর বয়সে এই পেশায় আসেন তিনি। পরিবারের আর্থিক সংকট তাকে ছোটবেলা থেকেই জীবিকার সন্ধানে নামতে বাধ্য করেছিল। লেখাপড়ার সুযোগ সীমিত হলেও তিনি বুঝেছিলেন, টিকে থাকতে হলে একটি দক্ষতা অর্জন করতেই হবে। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ঘড়ি মেরামত শেখা।
দম দেওয়া ঘড়ি মেরামতের মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবনের শুরু। তখন ঘড়ির ব্যবহার ছিল ব্যাপক, ফলে কাজেরও অভাব ছিল না। শহরের প্রায় প্রতিটি এলাকায় ঘড়ি সারাইয়ের দোকান ছিল। মানুষ তাদের প্রিয় ঘড়ি নষ্ট হলে ফেলে না দিয়ে মেরামত করাতেন। কারণ অনেক ঘড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকত ব্যক্তিগত স্মৃতি, কোনোটি বন্ধুর উপহার, কোনোটি বিবাহের স্মারক।
এই আবেগই ঘড়ি মিস্ত্রিদের কাজকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। রহমানও সেই সময় ভালোভাবেই সংসার চালাতে পেরেছেন। ঘড়ি মেরামতের আয় দিয়েই গড়ে তুলেছেন পরিবার।
তার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ঘটে প্রায় বিশ বছর আগে। এক নৌবাহিনী কর্মকর্তা একটি পুরোনো সোনার ঘড়ি মেরামতের জন্য তার কাছে নিয়ে আসেন। বহু দোকান ঘুরে শেষ পর্যন্ত সেই কাজটি পান রহমান। ঘড়িটির সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত যত্নে কাজটি সম্পন্ন করেন তিনি।
পারিশ্রমিক হিসেবে সে সময় আট হাজার টাকা পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অর্থের চেয়েও বেশি তাকে আকৃষ্ট করেছিল ঘড়িটির ঐতিহাসিক ও নান্দনিক মূল্য। এতটাই যে তিনি নিজের সাধ্যমতো সেটি কেনারও চেষ্টা করেন। প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু মালিক ঘড়িটি বিক্রি করতে রাজি হননি। আজও সেই ঘটনা স্মরণ করলে তার চোখে ভেসে ওঠে অতীতের স্মৃতি।
রহমানের দোকানটিও যেন সময়ের সাক্ষী। ছোট্ট কাঁচঘেরা একটি ভাসমান কাঠামো, যার ওপরে কোনো ছাদ নেই। কাচের ভেতর সাজানো থাকে বিভিন্ন রঙের বেল্ট ও পুরোনো ঘড়ি। দোকানটি বয়সের ছাপ বহন করলেও এটিই তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
একসময় কলেজিয়েট স্কুলের পাশের এই এলাকাজুড়ে ছিল ঘড়ি মেরামতের একাধিক দোকান। প্রয়োজনেই শুধু নয়, আড্ডা ও সম্পর্কের টানেও সেখানে যেতেন স্থানীয় মানুষ। দোকানের সামনে বসে গল্প করা, পরিচিত কাউকে কয়েকদিন না দেখলে খোঁজ নেওয়া এসব ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। ব্যবসার বাইরেও গড়ে উঠেছিল মানবিক সম্পর্কের এক অনন্য পরিবেশ।
কিন্তু মোবাইল ফোনের বিস্তার সেই চিত্র বদলে গেছে। বিশেষ করে ২০১০ সালের পর ঘড়ির ব্যবহার দ্রুত কমতে শুরু করে। নতুন প্রজন্মের অনেক কারিগর অন্য পেশায় চলে যান। কেউ দোকান গুটিয়ে ফেলেন, কেউ অসুস্থতার কারণে কাজ ছেড়ে দেন।
রহমান বলেন, এখন আর আগের মতো কাজ নেই। তবু অনেক মানুষ এখনো তাদের পুরোনো ঘড়ি নিয়ে আসেন। বিভিন্ন জেলা থেকেও কিছু গ্রাহক আসেন। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০টি ঘড়ি মেরামত করে কোনোমতে চলছে জীবন।
তিনি বলেন, রোদ, বৃষ্টি কিংবা ঝড় সব প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিদিন নিজের দোকানে বসি। কারণ এই পেশা শুধু জীবিকার উৎস নয়, আমার ভালোবাসার জায়গাও। কোনো থেমে যাওয়া ঘড়িকে আবার সচল করতে পারলে যে আনন্দ আমি অনুভব করি, তা অন্য কোনো কাজ থেকে পাওয়া সম্ভব নয়।
সারা জীবন অন্যের ঘড়ির কাঁটা সচল রাখলেও সময় এই ঘড়ির ডাক্তারদের জন্য থেমে থাকেনি। প্রযুক্তির অগ্রগতির ভিড়ে তাদের পেশা আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবু তারা এখনো বসে থাকেন সেই পুরোনো দোকানে, কোনো থেমে যাওয়া ঘড়ির অপেক্ষায়। কারণ তারা জানেন, সময়কে হয়তো থামানো যায় না, কিন্তু তার স্মৃতিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। আর সেই কাজটিই করে চলেছেন পুরান ঢাকার এই নীরব সময় কারিগররা।

কেমন আছেন ঘড়ির ডাক্তাররা
সিটিজেন ডেস্ক

পুরান ঢাকার সরু গলি, বাজার আর শতবর্ষী স্থাপনাগুলো যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত জাদুঘর। শহরের এই অংশে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, সময় এখানে একটু ধীর গতিতেই চলে। অগণিত অলিগলি, প্রাচীন দালানকোঠা আর মানুষের জীবনযাপনের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে বহু যুগের স্মৃতি। তাই তো পুরান ঢাকাকে অনেকে ভালোবেসে বলেন ‘বায়ান্ন বাজার তেপান্ন গলি’।
এই পুরোনো শহরের বেশ কিছু পেশা আজ বিলুপ্তির পথে। এর মধ্যে একটি পেশা হলো ঘড়ি মেকানিক বা কারিগর। একসময় ঘড়ি কেবল সময় দেখার মাধ্যম নয়, ছিলো সামাজিক মর্যাদারও প্রতীক। ব্রিটিশ আমলে পকেট ঘড়ির প্রচলন বেশ জনপ্রিয় ছিল। বুকপকেটে রাখা চেইনযুক্ত বড় আকারের সেই ঘড়ি ছিল অভিজাত শ্রেণির পরিচয়। দাম বেশি হওয়ায় সবার নাগালেও ছিল না। পরবর্তী সময়ে হাতঘড়ি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
৬০ ও ৭০ দশকে বিয়ের অনুষ্ঠানে জামাইকে ঘড়ি উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল অত্যন্ত প্রচলিত। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে সোনার চেইন, আংটি ও ঘড়ি যেমন সম্মানজনক উপহার হিসেবে বিবেচিত হতো, তেমনি নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতেও হাতঘড়ি ছিল মূল্যবান উপহার।
নব্বইয়ের দশকেও জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী কিংবা বিশেষ উপলক্ষে ঘড়ি উপহার দেওয়ার চল ছিল ব্যাপক। তখন প্রায় সব বয়সী মানুষের হাতেই দেখা যেত কোনো না কোনো ঘড়ি।
শুধু হাতঘড়িই নয়, অনেক বাড়িতে ছিল বিশাল আকৃতির দেওয়ালঘড়ি। ঘণ্টা বাজিয়ে সময় জানানোর সেই ঘড়িগুলো ছিল পরিবারের নিত্যসঙ্গী। কয়টা বাজল তা বোঝার জন্য ঘড়ির দিকে তাকানোরও প্রয়োজন হতো না; ঘণ্টার শব্দই বলে দিত সময়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তিও বদলেছে। সূর্যঘড়ি, বালিঘড়ি কিংবা জলঘড়ির যুগ পেরিয়ে আধুনিক ঘড়ি মানুষের জীবনকে করেছিল শৃঙ্খলিত। অথচ সেই আধুনিক ঘড়িরও আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে। স্মার্টফোনের যুগে সময় জানার জন্য আলাদা ঘড়ির প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে ঘড়ি মেরামতের পেশার ওপরও। যেসব মানুষ সারা জীবন ঘড়ির ভেতরের সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই এখন সংগ্রামের মুখোমুখি।
সদরঘাটের পাটুয়াটুলিতে এমনই একজন ঘড়ি মিস্ত্রি মোহাম্মদ রহমান। ১৯৮৪ সালে মাত্র পনেরো বছর বয়সে এই পেশায় আসেন তিনি। পরিবারের আর্থিক সংকট তাকে ছোটবেলা থেকেই জীবিকার সন্ধানে নামতে বাধ্য করেছিল। লেখাপড়ার সুযোগ সীমিত হলেও তিনি বুঝেছিলেন, টিকে থাকতে হলে একটি দক্ষতা অর্জন করতেই হবে। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ঘড়ি মেরামত শেখা।
দম দেওয়া ঘড়ি মেরামতের মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবনের শুরু। তখন ঘড়ির ব্যবহার ছিল ব্যাপক, ফলে কাজেরও অভাব ছিল না। শহরের প্রায় প্রতিটি এলাকায় ঘড়ি সারাইয়ের দোকান ছিল। মানুষ তাদের প্রিয় ঘড়ি নষ্ট হলে ফেলে না দিয়ে মেরামত করাতেন। কারণ অনেক ঘড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকত ব্যক্তিগত স্মৃতি, কোনোটি বন্ধুর উপহার, কোনোটি বিবাহের স্মারক।
এই আবেগই ঘড়ি মিস্ত্রিদের কাজকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। রহমানও সেই সময় ভালোভাবেই সংসার চালাতে পেরেছেন। ঘড়ি মেরামতের আয় দিয়েই গড়ে তুলেছেন পরিবার।
তার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ঘটে প্রায় বিশ বছর আগে। এক নৌবাহিনী কর্মকর্তা একটি পুরোনো সোনার ঘড়ি মেরামতের জন্য তার কাছে নিয়ে আসেন। বহু দোকান ঘুরে শেষ পর্যন্ত সেই কাজটি পান রহমান। ঘড়িটির সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত যত্নে কাজটি সম্পন্ন করেন তিনি।
পারিশ্রমিক হিসেবে সে সময় আট হাজার টাকা পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অর্থের চেয়েও বেশি তাকে আকৃষ্ট করেছিল ঘড়িটির ঐতিহাসিক ও নান্দনিক মূল্য। এতটাই যে তিনি নিজের সাধ্যমতো সেটি কেনারও চেষ্টা করেন। প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু মালিক ঘড়িটি বিক্রি করতে রাজি হননি। আজও সেই ঘটনা স্মরণ করলে তার চোখে ভেসে ওঠে অতীতের স্মৃতি।
রহমানের দোকানটিও যেন সময়ের সাক্ষী। ছোট্ট কাঁচঘেরা একটি ভাসমান কাঠামো, যার ওপরে কোনো ছাদ নেই। কাচের ভেতর সাজানো থাকে বিভিন্ন রঙের বেল্ট ও পুরোনো ঘড়ি। দোকানটি বয়সের ছাপ বহন করলেও এটিই তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
একসময় কলেজিয়েট স্কুলের পাশের এই এলাকাজুড়ে ছিল ঘড়ি মেরামতের একাধিক দোকান। প্রয়োজনেই শুধু নয়, আড্ডা ও সম্পর্কের টানেও সেখানে যেতেন স্থানীয় মানুষ। দোকানের সামনে বসে গল্প করা, পরিচিত কাউকে কয়েকদিন না দেখলে খোঁজ নেওয়া এসব ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। ব্যবসার বাইরেও গড়ে উঠেছিল মানবিক সম্পর্কের এক অনন্য পরিবেশ।
কিন্তু মোবাইল ফোনের বিস্তার সেই চিত্র বদলে গেছে। বিশেষ করে ২০১০ সালের পর ঘড়ির ব্যবহার দ্রুত কমতে শুরু করে। নতুন প্রজন্মের অনেক কারিগর অন্য পেশায় চলে যান। কেউ দোকান গুটিয়ে ফেলেন, কেউ অসুস্থতার কারণে কাজ ছেড়ে দেন।
রহমান বলেন, এখন আর আগের মতো কাজ নেই। তবু অনেক মানুষ এখনো তাদের পুরোনো ঘড়ি নিয়ে আসেন। বিভিন্ন জেলা থেকেও কিছু গ্রাহক আসেন। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০টি ঘড়ি মেরামত করে কোনোমতে চলছে জীবন।
তিনি বলেন, রোদ, বৃষ্টি কিংবা ঝড় সব প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিদিন নিজের দোকানে বসি। কারণ এই পেশা শুধু জীবিকার উৎস নয়, আমার ভালোবাসার জায়গাও। কোনো থেমে যাওয়া ঘড়িকে আবার সচল করতে পারলে যে আনন্দ আমি অনুভব করি, তা অন্য কোনো কাজ থেকে পাওয়া সম্ভব নয়।
সারা জীবন অন্যের ঘড়ির কাঁটা সচল রাখলেও সময় এই ঘড়ির ডাক্তারদের জন্য থেমে থাকেনি। প্রযুক্তির অগ্রগতির ভিড়ে তাদের পেশা আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবু তারা এখনো বসে থাকেন সেই পুরোনো দোকানে, কোনো থেমে যাওয়া ঘড়ির অপেক্ষায়। কারণ তারা জানেন, সময়কে হয়তো থামানো যায় না, কিন্তু তার স্মৃতিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। আর সেই কাজটিই করে চলেছেন পুরান ঢাকার এই নীরব সময় কারিগররা।

সদরঘাটই যাদের জীবিকার উৎস


