শিরোনাম

রংপুরের গর্ব হাঁড়িভাঙা আম

বেরোবি সংবাদদাতা
বেরোবি সংবাদদাতা
রংপুরের গর্ব হাঁড়িভাঙা আম
বাগানের জমে থাকা পানির মধ্য দিয়ে রিকশাভ্যানে করে আম যাচ্ছে সংগ্রহকেন্দ্রে

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্য, গৌরব ও অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে রংপুরের বিখ্যাত হাঁড়িভাঙা আম। সুস্বাদু, আঁশবিহীন এবং অনন্য স্বাদের কারণে এই আম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিতি লাভ করছে। জিআই পণ্য (ভৌগোলিক নির্দেশক) হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া এই আম আজ শুধু একটি ফল নয়, বরং রংপুরের পরিচয় ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

হাঁড়িভাঙা আমের উৎপত্তিস্থল রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানি গ্রাম। প্রায় সাত দশক আগে বৃক্ষপ্রেমী নফল উদ্দিন পাইকার একটি বিশেষ জাতের আমগাছ রোপণ করেন। সে সময় গাছে পানি দেওয়ার জন্য তিনি গাছের গোড়ায় মাটির হাঁড়ি বসিয়ে একটি বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন। একদিন সেই হাঁড়িটি ভেঙে যায়। আশ্চর্যের বিষয়, ভাঙা হাঁড়ির পাশেই গাছটি বেড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে প্রচুর সুস্বাদু আম ধরে। বাজারে আম বিক্রি করতে গিয়ে নফল উদ্দিন জানান, এটি সেই ভাঙা হাঁড়ির গাছের আম। এরপর থেকেই আমটির নাম হয়ে যায় ‘হাঁড়িভাঙা’।উৎকৃষ্ট স্বাদ ও গুণমান হাঁড়িভাঙা আম উত্তর বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও মূল্যবান আমের জাত। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি অত্যন্ত মাংসল, রসালো এবং প্রায় আঁশবিহীন। স্বাদে অসাধারণ মিষ্টি এই আমের খোসা পাতলা এবং রয়েছে স্বতন্ত্র সুগন্ধ। সাধারণত একটি হাঁড়িভাঙা আমের ওজন ২০০ থেকে ৪০০ গ্রামের মধ্যে হলেও, অনেক সময় ৭০০ গ্রাম পর্যন্ত ওজনের আমও পাওয়া যায়। স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে দেশজুড়ে এর চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হাঁড়িভাঙা আম শুধু একটি ফল নয়, এটি রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। প্রতি মৌসুমে এই আমকে কেন্দ্র করে শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। জেলার হাজার হাজার কৃষক সরাসরি এর চাষাবাদের সঙ্গে জড়িত। আমের মৌসুমে বাগান মালিক, শ্রমিক, পরিবহণ কর্মী, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং অনলাইন বিক্রেতাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে হাঁড়িভাঙা আম গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক

সকালে পদাগঞ্জ এলাকা ঘুরে কথা হয়, পদাগঞ্জ বাজারের আম ব্যবসায়ী সজীব শেখ জানান, প্রতিবছর এই আমের হাট ৫০ লাখ টাকার উপরে ইজারা ডাক হয়। কিন্তু এই হাটটিকে একটি আধুনিক হাটে পরিণত করার দাবি উঠলেও সেই দাবিটি থেকেছে উপেক্ষিত, ফলে কাদামাটিতেই বিক্রি করতে হয় আম।

হাঁড়িভাঙ্গা আমের প্রবর্তক নফল উদ্দিন পাইকারের ছেলে ও আমচাষি আমজাদ হোসেন পাইকার বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শুনছি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এই আমের সংরক্ষণকাল বাড়ানোর জন্য গবেষণা করছে। কিন্তু এখনো এর বাস্তব সুফল পাইনি। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পরও উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি বলে ক্ষুব্ধ তিনি।

কৃষি বিভাগ ও চাষিদের মতে, জুনের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে বাজারে পরিপক্ব ও উন্নত মানের হাঁড়িভাঙ্গা আম পাওয়া যাবে। এর আগে বাজারে ওঠা আমের বেশিরভাগই অপরিপক্ব হতে পারে। প্রকৃত স্বাদ পেতে জুনের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রংপুরের পদাগঞ্জ হাটকে হাঁড়িভাঙা আমের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। প্রতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকার ও ব্যবসায়ীরা এখানে এসে আম ক্রয় করেন। জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাই পর্যন্ত এই হাটে জমে ওঠে হাঁড়িভাঙা আমের বৃহৎ বেচাকেনা, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করে তোলে।

রংপুর সদর, মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন হাঁড়িভাঙা আমের চাষ হচ্ছে। পরিত্যক্ত জমি, উঁচু-নিচু ভূমি এবং ফসলি জমিতেও এই আমের বাগান গড়ে উঠেছে। এর ফলে হাজারো কৃষক ও ব্যবসায়ীর জীবনমান উন্নত হয়েছে। শুধু আমের মৌসুমেই প্রায় ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

/এমআর/