রাজউকের গাড়ি সার্ভিসিংয়ের নামে ‘রহস্যজনক ব্যয়’

রাজউকের গাড়ি সার্ভিসিংয়ের নামে ‘রহস্যজনক ব্যয়’
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান কার্যালয়। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ১১টি গাড়ি সার্ভিসিংয়ের ১৫টি বিলের বিপরীতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১১ লাখ ৫৩১ টাকা। এমনকি একই গাড়ি বছরে একাধিকবার সার্ভিসিং করা হয়েছে। গাড়ি সার্ভিসিংয়ের কাজ দেওয়া হয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট গ্যারেজকে। এখানে প্রতিটি গাড়ি সার্ভিসিংয়ের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি বিল আদায় করা হয়েছে। এই কারণে সার্ভিসিং ব্যয়, কাজের মান এবং একই গ্যারেজে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রাজউকের একটি সূত্রের দাবি, রাজউকের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তার আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় গাড়ি সার্ভিসিংয়ের নামে বিল-ভাউচার তৈরি করে অতিরিক্ত অর্থ নিয়েছেন গ্যারেজ মালিক।

রাজধানীর তেজগাঁও বাণিজ্যিক এলাকার অটোমোটিভ গ্যারেজ। এখানেই রাজউকের ১১টি গাড়ির সার্ভিসিং করা হয়। ছবি:সিজেডন টোয়েন্টিফোর
রাজধানীর তেজগাঁও বাণিজ্যিক এলাকার অটোমোটিভ গ্যারেজ। এখানেই রাজউকের ১১টি গাড়ির সার্ভিসিং করা হয়। ছবি:সিজেডন টোয়েন্টিফোর

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছর অক্টোবর পর্যন্ত রাজউকের এসব গাড়ি রাজধানীর তেজগাঁও বাণিজ্যিক এলাকার অটোমোটিভ গ্যারেজে সার্ভিসিং করা হয়। বিলের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ১৫টি বিলের প্রতিটির বিপরীতে ১১ গাড়ি সার্ভিসিংয়ের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। গাড়িপ্রতি সার্ভিসিং ব্যয় ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬২ হাজার ৭৮০ টাকা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে।

একই গাড়িতে তিন লাখ টাকার বেশি বিল

গাড়িভিত্তিক হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৩-৩৯২০ নম্বর গাড়ির বিপরীতে মাত্র এক বছরে তিনটি বিলে মোট ৩ লাখ ৭ হাজার ৯১০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বরের বিল ৬২ হাজার ৬৫২ টাকা, ২০২৬ সালের ২৯ মার্চের বিল ৮২ হাজার ৪৭৮ টাকা এবং ২৭ সেপ্টেম্বরের বিল ১ লাখ ৬২ হাজার ৭৮০ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বশেষ বিলের অঙ্ক আগের দুটি বিলের তুলনায় বেশি।

এছাড়া ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৪-১৭৫৭ নম্বর গাড়ির বিপরীতেও দুটি বিলে মোট ১ লাখ ১৯ হাজার ২৩২ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিলে ৬০ হাজার ৭৬৬ টাকা এবং ১১ জুনের বিলে ৫৮ হাজার ৪৬৬ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

অন্যান্য গ্যারেজে সার্ভিসিং ব্যয় কম

রাজউকের গাড়ি সার্ভিসিং ব্যয় যাচাই করতে তেজগাঁও এলাকার আশপাশের কয়েকটি গ্যারেজে খোঁজ নেওয়া হয়। গ্যারেজগুলো দেওয়া আনুমানিক দর অনুযায়ী, একটি প্যানেলে ডেন্ট-পেইন্ট, চার চাকার হুইল ব্যালেন্সিং, হুইল অ্যালাইনমেন্ট, এসি সিস্টেম সার্ভিস, ইনজেক্টর আলট্রাসনিক ক্লিনিং এবং পলিশ-ওয়াক্স করাতে মোট খরচ ১২ হাজার থেকে ২৩ হাজার টাকা পড়ে। তবে কোন যন্ত্রাংশ নতুন করে বসালে বিল বাড়বে।

রাজধানীর তেজগাঁও বাণিজ্যিক এলাকার অটোমোটিভ গ্যারেজের ভেতরে সার্ভিসিংয়ের জন্য রাখা  কয়েকটি গাড়ি। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
রাজধানীর তেজগাঁও বাণিজ্যিক এলাকার অটোমোটিভ গ্যারেজের ভেতরে সার্ভিসিংয়ের জন্য রাখা কয়েকটি গাড়ি। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

গ্যারেজগুলোতে সার্ভিসিংয়ের ধরন অনুযায়ী বিলের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী, হুইল অ্যালাইনমেন্টে ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, চার চাকার হুইল ব্যালেন্সিংয়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, একটি প্যানেলে ডেন্ট-পেইন্টে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা, এসি সার্ভিসে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা, ইনজেক্টর আলট্রাসনিক ক্লিনিংয়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং পলিশ-ওয়াক্সে ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা বিল হতে পারে। এসব গ্যারেজে গাড়ি সার্ভিসিংয়ের বিলের সঙ্গে অটোমোটিভ গ্যারেজে রাজউকের কয়েকটি গাড়ির সার্ভিসিংয়ের বিলের ব্যবধান অনেক বেশি।

সম্পর্কের খাতিরে কাজ দেওয়ার অভিযোগ

সরেজমিনে দেখা যায়, অটোমোটিভ গ্যারেজের আশপাশের কয়েকটি গ্যারেজের তুলনায় এর অবকাঠামো তেমন আধুনিক নয়। পুরোনো একটি টিনশেড ভবনে গ্যারেজের কার্যক্রম চলছে। সেখানে কারখানার নাম হিসেবে ‘মেসার্স পূর্ণিমা প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি’ লেখা রয়েছে। গ্যারেজটি প্রায় চার বছর আগে চালু হয়েছে বলে জানা গেছে। রাজউকের এক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে অটোমোটিভ গ্যারেজকে নিয়মিত কাজ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে অটোমোটিভ গ্যারেজের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মো. বাহারউদ্দিন সম্পর্কের খাতিরে গাড়ি সার্ভিসিংয়ের কাজ পাচ্ছেন-এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে তিনি সোমবার (১৯ অক্টোবর) সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরকে মুঠোফোনে বলেন, ‘কোনো সম্পর্কের খাতিরে কাজ পাচ্ছি না। বরং বছরখানেক আগে আমার গ্যারেজের সামনে রাজউকের একটি গাড়ি নষ্ট হয়। সেটি আমরা বিনা মূল্যে সার্ভিস করে দিই। সেই কাজ ভালো লাগায় পরবর্তীতে আমাদের কাছে রাজউকের গাড়ি সার্ভিসের কাজ আসে।’

কাজ পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাহারউদ্দিন বলেন, ‘রাজউক থেকে যখন কোনো গাড়ি আসে, তখন সেটিতে কী কী সমস্যা, কত খরচ পড়বে - সেই বিষয়গুলোর একটা হিসাব রাজউকে জমা দিই। সেটি রাজউকের মিটিংয়ে পাস হলে আমাকে কাজ দেওয়া হয়। প্রত্যেকটা বিলের বিপরীতে আমার কাছে বিস্তারিত তথ্য আছে।’

তবে বিলের বিস্তারিত কপি বা তথ্য জানতে চেয়ে বাহারউদ্দিনের মুঠোফোন নম্বরে খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি কোনো তথ্য দেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) সাব্বির বিন তাহের মুঠোফোনে সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘অটোমোটিভ গ্যারেজকে কাজ দেওয়ার বিষয়টি জানা আছে। প্রতিষ্ঠানটিকে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই কাজ দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ফোনে কিছু বলব না, অফিসে এলে সরাসরি কথা হবে।’

/বিবি/