জনমানবশূন্য পূর্বাচলে রাজউকের ২৫ কোটি টাকার কাঁচাবাজার

জনমানবশূন্য পূর্বাচলে রাজউকের ২৫ কোটি টাকার কাঁচাবাজার
জুবায়ের আহমেদ

তিন দশকেরও বেশি সময় আগে শুরু হয়েছিল পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল ঢাকার অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমিয়ে পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা। অথচ ৬ হাজার ২২৭ একরের বিশাল এই এলাকার চারিদিকে তাকালে চোখে পড়ে কেবলই জনশূন্য খোলা মাঠ আর বুনো ঘাসের জঙ্গল। সন্ধ্যা নামলেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে হেটে চলাও ভীতিকর। পানি, গ্যাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা কেন্দ্রের মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধা নেই সেখানে। ফলে রাজউকের দেখানো সেই স্বপ্নের নতুন শহর প্রকল্পটি এখনো এক জনশূন্য প্রান্তরে পরিণত হয়ে আছে।
এমন বাস্তবতায় পূর্বাচলের সেক্টর-১ ও সেক্টর-৫ এ প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি আধুনিক দোতলা কাঁচাবাজার নির্মাণ করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ২০২৫ সালে শুরু হওয়া এ বাজারগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে প্রায় ছয় মাস আগে। দুটি বাজারেই রয়েছে ৭৮টি করে দোকান। কিন্তু সেখানে এখনো কোনো ব্যবসা শুরু হয়নি। দোকানগুলো পড়ে আছে খালি। ক্রেতা নেই, বিক্রেতাও নেই। এমনকি বাজার দুটির আশপাশেও গড়ে ওঠেনি বসতি। যদিও রাউজক বলছে, পূর্বাচল নতুন শহর জমাতে এই বাজার নির্মাণ। তবে যেখানে মানুষই নেই, সেখানে আগে থেকেই বাজার নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
সরেজমিন দেখা গেছে, সেক্টর-৫-এর বাজারটির কয়েক মাইলের মধ্যে মানুষের বসবাস তো দূরের কথা, হাতে গোনা দু-একটি ভবন ছাড়া তেমন স্থাপনাও নেই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার ভবনের বিপরীত পাশে নির্মিত বাজারটির সামনের সড়কের অবস্থাও বেহাল। বিভিন্ন স্থানে কাদা-পানি জমে আছে। চারপাশে গজিয়েছে ঝোপঝাড়।

সেক্টর-১-এর বাজারটির চিত্রও প্রায় একই। কয়েক মাইলজুড়ে নেই কোনো বসতি। কারা এই মার্কেটের ক্রেতা তাও নিশ্চিত নয়। ৩০০ ফিট সড়কের দক্ষিণ পাশে নির্মিত এই বাজারের কয়েক মিটার দূরেই মাজার রোডের মুখে একটি অস্থায়ী বাজার চালু রয়েছে।
মানুষ নেই, বাজার আছে- এই বাজার কিভাবে চলবে, কারা ক্রেতা হবে সেটাই এখন প্রশ্ন। যৌক্তিকতা বিবেচনা করে কাজ করার দরকার ছিলো, অন্যথায় এই ২৫ কোটি টাকা বিফলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে
অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান
নগর পরিকল্পনাবিদ
তারেক হাসান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লি. এর নকশায় স্টিল স্ট্রাকচারে এই বাজার নির্মাণে কাজ করেছে সেনা কল্যাণ সংস্থা। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
নির্মাণ শেষ হওয়ার পর প্রায় ছয় মাস ধরে বাজার দুটি কার্যত খালি পড়ে আছে। ভবনের লোহার সিঁড়িতে ইতোমধ্যে জং ধরতে শুরু করেছে। দোকানগুলোর ভেতরে জমছে ধুলাবালি ও ময়লা। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ভবনগুলোকে সচল রাখার বদলে এখন সেখানে মূলত নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন আনসার সদস্যরা। অর্থাৎ বাজার চালু না হলেও ভবন রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, যে এলাকায় এখনো মানুষ বসবাসই শুরু করেনি; সেখানে প্রায় ২৫ কোটি টাকা খরচ করে দুটি কাঁচাবাজার নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কীভাবে নির্ধারণ করেছে রাজউক?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পূর্ত সার্কেল-৩) খন্দকার মো. ওয়াহিদ সাদিক সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘বরাদ্দ পাওয়া প্লট মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলেন বাজার-ঘাট না থাকায় তারা এখানে ভবন বানাতে আগ্রহী না। তাই বাজারের আশপাশে ভবন নির্মাণ হলে ভবিষ্যতে সেখানে জনবসতি গড়ে উঠবে। মূলত এই বিবেচনাতেই বাজার দুটি নির্মাণ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাজার দুটি হাইওয়ের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে ভেতরে বসতি কম থাকলেও বাইরের মানুষ সেখান থেকে কেনাকাটা করতে পারে। স্টিল স্ট্রাকচার দিয়ে বাজারটি বানানো হয়েছে যেন ভবিষ্যতে চাহিদা বাড়লে এটি খুলে বড় বহুতল বাজার নির্মাণ করা যায়।’

কবে নাগাদ বাজারটি চালু হবে জানতে চাইলে ওয়াহিদ সাদিক বলেন, ‘এই বাজার বরাদ্দের জন্য প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আবেদন পাওয়া গেছে। ওপেন টেন্ডারে প্রতিটি বাজারের জন্য ৪০-৫০টি পর্যন্ত দরপত্র পড়েছে। একটি বাজারের জন্য মাসিক প্রায় ১১ লাখ টাকা, অন্যটির জন্য প্রায় ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন কেউ কেউ। এখন যারা বাজার দুটি পাবেন, তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দোকান চালু করতে হবে এবং তিন বছরের জন্য চুক্তি হবে। বাজার চালু হওয়ার পরই পূর্বাচলে বাস্তবে ক্রেতা-সমাগম ও ব্যবসার চাহিদা কতটা রয়েছে তা স্পষ্ট হবে।’
এদিকে পূর্বাচলে বসতি জমাতে আগে বাজার নির্মাণ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নয় বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, ‘মানুষ থাকলে এমনিতেই বাজার গড়ে উঠে। আগে বাজার বানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বসতি জমানো যায় না। তাই বাজার দরকার, কিন্তু তারও আগে দরকার ছিলো বসবাস উপযোগী করে তোলার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পানি-বিদ্যুৎ সরবরাহের লাইন, কর্মপরিবেশসহ যথাযথ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ নেই, বাজার আছে- এই বাজার কিভাবে চলবে, কারা ক্রেতা হবে সেটাই এখন প্রশ্ন। যৌক্তিকতা বিবেচনা করে কাজ করার দরকার ছিলো, অন্যথায় এই ২৫ কোটি টাকা বিফলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কেননা বাজারটিরও একটি মেয়াদকাল আছে, অর্থের পাশাপাশি সেটিরও অপচয় হবে।’
তিন দশকের প্রকল্প, ব্যয় বাড়ছেই
১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ৩ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। দফায় দফায় সংশোধনের পর প্রকল্পের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। রাজউকের সর্বশেষ প্রকল্প নথি ও সরকারের সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী মূল আবাসন অবকাঠামোয় ইতোমধ্যে প্রায় ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
অসমাপ্ত রাস্তা, পার্ক, ধর্মীয় উপাসনালয় ও ভূমি উন্নয়নসহ বিভিন্ন কাজ শেষ করতে রাজউক নতুন করে প্রায় ৮ হাজার ৮৭০ কোটি টাকার একটি রূপরেখা ও ডিপিপি প্রস্তুত করেছে। আগের ব্যয়ের সঙ্গে নতুন এই অর্থ যোগ হলে মূল আবাসন প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

তিন দশকেরও বেশি সময় আগে শুরু হয়েছিল পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল ঢাকার অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমিয়ে পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা। অথচ ৬ হাজার ২২৭ একরের বিশাল এই এলাকার চারিদিকে তাকালে চোখে পড়ে কেবলই জনশূন্য খোলা মাঠ আর বুনো ঘাসের জঙ্গল। সন্ধ্যা নামলেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে হেটে চলাও ভীতিকর। পানি, গ্যাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা কেন্দ্রের মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধা নেই সেখানে। ফলে রাজউকের দেখানো সেই স্বপ্নের নতুন শহর প্রকল্পটি এখনো এক জনশূন্য প্রান্তরে পরিণত হয়ে আছে।
এমন বাস্তবতায় পূর্বাচলের সেক্টর-১ ও সেক্টর-৫ এ প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি আধুনিক দোতলা কাঁচাবাজার নির্মাণ করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ২০২৫ সালে শুরু হওয়া এ বাজারগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে প্রায় ছয় মাস আগে। দুটি বাজারেই রয়েছে ৭৮টি করে দোকান। কিন্তু সেখানে এখনো কোনো ব্যবসা শুরু হয়নি। দোকানগুলো পড়ে আছে খালি। ক্রেতা নেই, বিক্রেতাও নেই। এমনকি বাজার দুটির আশপাশেও গড়ে ওঠেনি বসতি। যদিও রাউজক বলছে, পূর্বাচল নতুন শহর জমাতে এই বাজার নির্মাণ। তবে যেখানে মানুষই নেই, সেখানে আগে থেকেই বাজার নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
সরেজমিন দেখা গেছে, সেক্টর-৫-এর বাজারটির কয়েক মাইলের মধ্যে মানুষের বসবাস তো দূরের কথা, হাতে গোনা দু-একটি ভবন ছাড়া তেমন স্থাপনাও নেই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার ভবনের বিপরীত পাশে নির্মিত বাজারটির সামনের সড়কের অবস্থাও বেহাল। বিভিন্ন স্থানে কাদা-পানি জমে আছে। চারপাশে গজিয়েছে ঝোপঝাড়।

সেক্টর-১-এর বাজারটির চিত্রও প্রায় একই। কয়েক মাইলজুড়ে নেই কোনো বসতি। কারা এই মার্কেটের ক্রেতা তাও নিশ্চিত নয়। ৩০০ ফিট সড়কের দক্ষিণ পাশে নির্মিত এই বাজারের কয়েক মিটার দূরেই মাজার রোডের মুখে একটি অস্থায়ী বাজার চালু রয়েছে।
মানুষ নেই, বাজার আছে- এই বাজার কিভাবে চলবে, কারা ক্রেতা হবে সেটাই এখন প্রশ্ন। যৌক্তিকতা বিবেচনা করে কাজ করার দরকার ছিলো, অন্যথায় এই ২৫ কোটি টাকা বিফলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে
অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান
নগর পরিকল্পনাবিদ
তারেক হাসান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লি. এর নকশায় স্টিল স্ট্রাকচারে এই বাজার নির্মাণে কাজ করেছে সেনা কল্যাণ সংস্থা। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
নির্মাণ শেষ হওয়ার পর প্রায় ছয় মাস ধরে বাজার দুটি কার্যত খালি পড়ে আছে। ভবনের লোহার সিঁড়িতে ইতোমধ্যে জং ধরতে শুরু করেছে। দোকানগুলোর ভেতরে জমছে ধুলাবালি ও ময়লা। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ভবনগুলোকে সচল রাখার বদলে এখন সেখানে মূলত নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন আনসার সদস্যরা। অর্থাৎ বাজার চালু না হলেও ভবন রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, যে এলাকায় এখনো মানুষ বসবাসই শুরু করেনি; সেখানে প্রায় ২৫ কোটি টাকা খরচ করে দুটি কাঁচাবাজার নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কীভাবে নির্ধারণ করেছে রাজউক?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পূর্ত সার্কেল-৩) খন্দকার মো. ওয়াহিদ সাদিক সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘বরাদ্দ পাওয়া প্লট মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলেন বাজার-ঘাট না থাকায় তারা এখানে ভবন বানাতে আগ্রহী না। তাই বাজারের আশপাশে ভবন নির্মাণ হলে ভবিষ্যতে সেখানে জনবসতি গড়ে উঠবে। মূলত এই বিবেচনাতেই বাজার দুটি নির্মাণ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাজার দুটি হাইওয়ের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে ভেতরে বসতি কম থাকলেও বাইরের মানুষ সেখান থেকে কেনাকাটা করতে পারে। স্টিল স্ট্রাকচার দিয়ে বাজারটি বানানো হয়েছে যেন ভবিষ্যতে চাহিদা বাড়লে এটি খুলে বড় বহুতল বাজার নির্মাণ করা যায়।’

কবে নাগাদ বাজারটি চালু হবে জানতে চাইলে ওয়াহিদ সাদিক বলেন, ‘এই বাজার বরাদ্দের জন্য প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আবেদন পাওয়া গেছে। ওপেন টেন্ডারে প্রতিটি বাজারের জন্য ৪০-৫০টি পর্যন্ত দরপত্র পড়েছে। একটি বাজারের জন্য মাসিক প্রায় ১১ লাখ টাকা, অন্যটির জন্য প্রায় ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন কেউ কেউ। এখন যারা বাজার দুটি পাবেন, তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দোকান চালু করতে হবে এবং তিন বছরের জন্য চুক্তি হবে। বাজার চালু হওয়ার পরই পূর্বাচলে বাস্তবে ক্রেতা-সমাগম ও ব্যবসার চাহিদা কতটা রয়েছে তা স্পষ্ট হবে।’
এদিকে পূর্বাচলে বসতি জমাতে আগে বাজার নির্মাণ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নয় বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, ‘মানুষ থাকলে এমনিতেই বাজার গড়ে উঠে। আগে বাজার বানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বসতি জমানো যায় না। তাই বাজার দরকার, কিন্তু তারও আগে দরকার ছিলো বসবাস উপযোগী করে তোলার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পানি-বিদ্যুৎ সরবরাহের লাইন, কর্মপরিবেশসহ যথাযথ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ নেই, বাজার আছে- এই বাজার কিভাবে চলবে, কারা ক্রেতা হবে সেটাই এখন প্রশ্ন। যৌক্তিকতা বিবেচনা করে কাজ করার দরকার ছিলো, অন্যথায় এই ২৫ কোটি টাকা বিফলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কেননা বাজারটিরও একটি মেয়াদকাল আছে, অর্থের পাশাপাশি সেটিরও অপচয় হবে।’
তিন দশকের প্রকল্প, ব্যয় বাড়ছেই
১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ৩ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। দফায় দফায় সংশোধনের পর প্রকল্পের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। রাজউকের সর্বশেষ প্রকল্প নথি ও সরকারের সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী মূল আবাসন অবকাঠামোয় ইতোমধ্যে প্রায় ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
অসমাপ্ত রাস্তা, পার্ক, ধর্মীয় উপাসনালয় ও ভূমি উন্নয়নসহ বিভিন্ন কাজ শেষ করতে রাজউক নতুন করে প্রায় ৮ হাজার ৮৭০ কোটি টাকার একটি রূপরেখা ও ডিপিপি প্রস্তুত করেছে। আগের ব্যয়ের সঙ্গে নতুন এই অর্থ যোগ হলে মূল আবাসন প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

জনমানবশূন্য পূর্বাচলে রাজউকের ২৫ কোটি টাকার কাঁচাবাজার
জুবায়ের আহমেদ

তিন দশকেরও বেশি সময় আগে শুরু হয়েছিল পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল ঢাকার অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমিয়ে পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা। অথচ ৬ হাজার ২২৭ একরের বিশাল এই এলাকার চারিদিকে তাকালে চোখে পড়ে কেবলই জনশূন্য খোলা মাঠ আর বুনো ঘাসের জঙ্গল। সন্ধ্যা নামলেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে হেটে চলাও ভীতিকর। পানি, গ্যাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা কেন্দ্রের মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধা নেই সেখানে। ফলে রাজউকের দেখানো সেই স্বপ্নের নতুন শহর প্রকল্পটি এখনো এক জনশূন্য প্রান্তরে পরিণত হয়ে আছে।
এমন বাস্তবতায় পূর্বাচলের সেক্টর-১ ও সেক্টর-৫ এ প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি আধুনিক দোতলা কাঁচাবাজার নির্মাণ করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ২০২৫ সালে শুরু হওয়া এ বাজারগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে প্রায় ছয় মাস আগে। দুটি বাজারেই রয়েছে ৭৮টি করে দোকান। কিন্তু সেখানে এখনো কোনো ব্যবসা শুরু হয়নি। দোকানগুলো পড়ে আছে খালি। ক্রেতা নেই, বিক্রেতাও নেই। এমনকি বাজার দুটির আশপাশেও গড়ে ওঠেনি বসতি। যদিও রাউজক বলছে, পূর্বাচল নতুন শহর জমাতে এই বাজার নির্মাণ। তবে যেখানে মানুষই নেই, সেখানে আগে থেকেই বাজার নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
সরেজমিন দেখা গেছে, সেক্টর-৫-এর বাজারটির কয়েক মাইলের মধ্যে মানুষের বসবাস তো দূরের কথা, হাতে গোনা দু-একটি ভবন ছাড়া তেমন স্থাপনাও নেই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার ভবনের বিপরীত পাশে নির্মিত বাজারটির সামনের সড়কের অবস্থাও বেহাল। বিভিন্ন স্থানে কাদা-পানি জমে আছে। চারপাশে গজিয়েছে ঝোপঝাড়।

সেক্টর-১-এর বাজারটির চিত্রও প্রায় একই। কয়েক মাইলজুড়ে নেই কোনো বসতি। কারা এই মার্কেটের ক্রেতা তাও নিশ্চিত নয়। ৩০০ ফিট সড়কের দক্ষিণ পাশে নির্মিত এই বাজারের কয়েক মিটার দূরেই মাজার রোডের মুখে একটি অস্থায়ী বাজার চালু রয়েছে।
মানুষ নেই, বাজার আছে- এই বাজার কিভাবে চলবে, কারা ক্রেতা হবে সেটাই এখন প্রশ্ন। যৌক্তিকতা বিবেচনা করে কাজ করার দরকার ছিলো, অন্যথায় এই ২৫ কোটি টাকা বিফলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে
অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান
নগর পরিকল্পনাবিদ
তারেক হাসান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লি. এর নকশায় স্টিল স্ট্রাকচারে এই বাজার নির্মাণে কাজ করেছে সেনা কল্যাণ সংস্থা। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
নির্মাণ শেষ হওয়ার পর প্রায় ছয় মাস ধরে বাজার দুটি কার্যত খালি পড়ে আছে। ভবনের লোহার সিঁড়িতে ইতোমধ্যে জং ধরতে শুরু করেছে। দোকানগুলোর ভেতরে জমছে ধুলাবালি ও ময়লা। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ভবনগুলোকে সচল রাখার বদলে এখন সেখানে মূলত নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন আনসার সদস্যরা। অর্থাৎ বাজার চালু না হলেও ভবন রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, যে এলাকায় এখনো মানুষ বসবাসই শুরু করেনি; সেখানে প্রায় ২৫ কোটি টাকা খরচ করে দুটি কাঁচাবাজার নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কীভাবে নির্ধারণ করেছে রাজউক?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পূর্ত সার্কেল-৩) খন্দকার মো. ওয়াহিদ সাদিক সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘বরাদ্দ পাওয়া প্লট মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলেন বাজার-ঘাট না থাকায় তারা এখানে ভবন বানাতে আগ্রহী না। তাই বাজারের আশপাশে ভবন নির্মাণ হলে ভবিষ্যতে সেখানে জনবসতি গড়ে উঠবে। মূলত এই বিবেচনাতেই বাজার দুটি নির্মাণ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাজার দুটি হাইওয়ের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে ভেতরে বসতি কম থাকলেও বাইরের মানুষ সেখান থেকে কেনাকাটা করতে পারে। স্টিল স্ট্রাকচার দিয়ে বাজারটি বানানো হয়েছে যেন ভবিষ্যতে চাহিদা বাড়লে এটি খুলে বড় বহুতল বাজার নির্মাণ করা যায়।’

কবে নাগাদ বাজারটি চালু হবে জানতে চাইলে ওয়াহিদ সাদিক বলেন, ‘এই বাজার বরাদ্দের জন্য প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আবেদন পাওয়া গেছে। ওপেন টেন্ডারে প্রতিটি বাজারের জন্য ৪০-৫০টি পর্যন্ত দরপত্র পড়েছে। একটি বাজারের জন্য মাসিক প্রায় ১১ লাখ টাকা, অন্যটির জন্য প্রায় ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন কেউ কেউ। এখন যারা বাজার দুটি পাবেন, তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দোকান চালু করতে হবে এবং তিন বছরের জন্য চুক্তি হবে। বাজার চালু হওয়ার পরই পূর্বাচলে বাস্তবে ক্রেতা-সমাগম ও ব্যবসার চাহিদা কতটা রয়েছে তা স্পষ্ট হবে।’
এদিকে পূর্বাচলে বসতি জমাতে আগে বাজার নির্মাণ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নয় বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, ‘মানুষ থাকলে এমনিতেই বাজার গড়ে উঠে। আগে বাজার বানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বসতি জমানো যায় না। তাই বাজার দরকার, কিন্তু তারও আগে দরকার ছিলো বসবাস উপযোগী করে তোলার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পানি-বিদ্যুৎ সরবরাহের লাইন, কর্মপরিবেশসহ যথাযথ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ নেই, বাজার আছে- এই বাজার কিভাবে চলবে, কারা ক্রেতা হবে সেটাই এখন প্রশ্ন। যৌক্তিকতা বিবেচনা করে কাজ করার দরকার ছিলো, অন্যথায় এই ২৫ কোটি টাকা বিফলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কেননা বাজারটিরও একটি মেয়াদকাল আছে, অর্থের পাশাপাশি সেটিরও অপচয় হবে।’
তিন দশকের প্রকল্প, ব্যয় বাড়ছেই
১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ৩ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। দফায় দফায় সংশোধনের পর প্রকল্পের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। রাজউকের সর্বশেষ প্রকল্প নথি ও সরকারের সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী মূল আবাসন অবকাঠামোয় ইতোমধ্যে প্রায় ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
অসমাপ্ত রাস্তা, পার্ক, ধর্মীয় উপাসনালয় ও ভূমি উন্নয়নসহ বিভিন্ন কাজ শেষ করতে রাজউক নতুন করে প্রায় ৮ হাজার ৮৭০ কোটি টাকার একটি রূপরেখা ও ডিপিপি প্রস্তুত করেছে। আগের ব্যয়ের সঙ্গে নতুন এই অর্থ যোগ হলে মূল আবাসন প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার
আমিন মোহাম্মদের দুই প্রকল্প অনুমোদনহীন,
তালিকায় ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটিও
স্কলারশিপে জাপান গিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পালালেন রাজউক কর্মকর্তা, জাইকার কঠোর বার্তা
বিদেশে গেলে ফেরেন না রাজউকের অথরাইজড অফিসাররা
বিশ্বাস বিল্ডার্সকে কাজ দিয়ে ভুগছে গণপূর্ত







