গুলশানে ২৪ তলার অনুমোদন নিয়ে ডা. ইকবাল করলেন ৩৪ তলার হিলটন হোটেল

গুলশানে ২৪ তলার অনুমোদন নিয়ে ডা. ইকবাল করলেন ৩৪ তলার হিলটন হোটেল
আয়নাল হোসেন

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-২ নম্বরের গোল চত্বরের দক্ষিণ পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আকাশচুম্বী এক ভবন। এই ভবনেই হচ্ছে বিশ্বখ্যাত ফ্ল্যাগশিপ ব্র্যান্ডের হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার। ২৪ তলার অনুমোদন নিয়ে ভবনটি ৩৪ তলা করা হয়েছে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এই কাজ করছেন ভবনের মালিক ডা. এইচ বি এম ইকবাল। তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য। ডা. ইকবাল প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান এবং প্রিমিয়ার গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।
অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত ১০ তলা নির্মাণ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৬ জুন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছ থেকে প্রথমে হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার নির্মাণের জন্য পাঁচটি বেজমেন্টসহ ১৫ তলা ভবনের অনুমোদন নেওয়া হয়। পরে ২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল সংশোধন করে ছয়টি বেজমেন্টসহ ২৪ তলা ভবন অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু এতেও মন ভরেনি ডা. এইচবিএম ইকবালের। তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ২৪ তলার বদলে সেখানে ৩৪ তলা ভবন নির্মাণ করেন।
অনুমোদনে যারা
নকশা অনুমোদনের বিষয়ে রাজউকের প্রধান স্থপতি (চলতি দায়িত্ব) মোস্তাক আহমেদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘২৪ তলা ভবনের নকশার অনুমোদন নিয়ে সেখানে ৩৪ তলা করা হয়েছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলে সেখানে অথরাইজড অফিসার পাঠানো হয়। কিন্তু ডা.এইচ বি এম ইকবাল তাকে (অথরাইজড অফিসার) বকাঝকা করেন। কেন অথরাইজড অফিসারকে তার সাইটে পাঠানো হয়েছে- সে বিষয়টি জানতে চেয়ে ক্ষমতা দেখান এইচ বি এম ইকবাল।’
মোস্তাক আহমেদ আরও বলেন, ভবনটি ২৪ তলার অনুমোদন নেওয়া হলেও রাজউকের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী তা নির্মাণ করা হয়নি। সেখানে জমির পরিমাণ নিয়ে আপত্তি ছিল। এরপর ইকবাল সাহেব রাজউকের নিয়ম-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গড়ে তোলেন ৩৪ তলা বাণিজ্যিক ভবন।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার রাজউকের অঞ্চল–৪ (১)-এর অধীন। এ অঞ্চলের বর্তমানে অথরাইজড অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন হাসানুর রেজা। এর আগে সেখানের অথরাইজড অফিসার ছিলেন কায়সার পারভেজ ও ইমরুল কায়েস। আর বর্তমান ইমারত পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করছেন মো. সোহাগ মিয়া। এর আগে দায়িত্বে ছিলেন ইমরান হোসেন। তবে ২০১৭–২০২৬ সাল পর্যন্ত যারা ওই এলাকায় অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের তথ্য জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) শীলাব্রত কর্মকার সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, রাজউকের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ডাটাবেইজ (তথ্যভাণ্ডার) নেই। এ কারণে আগের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব নয়।

যেভাবে হলো হিলটন
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, যে জমিতে হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার হচ্ছে একসময় সেই জমির মালিক ছিল রাজউক। রাজউকের কাছ থেকে ১৯৫৮ সালে ওই ১৮ কাঠা ১৫ ছটাক জমি বরাদ্দ নেয় এ রউফ নামে এক প্রয়াত ব্যক্তি। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ওই জমিতে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি। এ রউফের মৃত্যুর পর তার নাতি ইফতেখার হায়াত খানের কাছ থেকে এইচ বি এম ইকবাল জমি কিনে সেখানে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবনের নির্মাণ কাজ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ২০১৬ সালের ১৩ মার্চ রাজউক হিলটন হোটের অ্যান্ড রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। নোটিশ উপেক্ষা করে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালের ১৮ আগস্ট তাদের চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরও নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালের ২ নভেম্বর বর্ধিত অংশ (১০ তলা) কেন ভাঙা হবে না তা জানতে চেয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়। ওই নোটিশ চ্যালেঞ্জ করে ভবন মালিক এইচ বি এম ইকবাল রাজউকের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজনকে বিবাদী করে উচ্চ আদালতে রিট করেন।
অনুমোদনবিহীন ভবনের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাদের তিনটি টিম মাঠে কাজ করছে। অচিরেই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
২১০ ফুটের স্থলে ৩৪০ ফুট, বেবিচকের আপত্তি
হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের ৩৪ তলা ভবন নির্মাণের বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আপত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ২০১৮ সালে হিলটন কর্তৃপক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে সেখানে সর্বোচ্চ ২১০ ফুট উঁচু ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর হিলটন কর্তৃপক্ষ ৩৭২ ফুট উচ্চতার অনুমোদন চেয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আবেদন করে। তখন বেবিচকের পক্ষ থেকে বলা হয়, ২১০ ফুটের এক ইঞ্চিরও বেশি উচ্চতার অনুমোদন দেওয়া সম্ভব নয়।
হিলটন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, গুলশান-২ অ্যাভিনিউর ৯৮ নম্বর সড়কের ৭ নম্বর প্লটের ১৪০ নম্বর বাড়ির ব্লক ‘সি’তে হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের ভবন। এই ভবনের পাঁচটি ভূগর্ভস্থ বেজমেন্ট বা পার্কিং ফ্লোর রয়েছে।
৭ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, গুলশান-২ নম্বর গোল চত্বরের ঠিক আগে হোটেল দ্য ওয়েস্টিনের পূর্বপাশে হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের সুউচ্চ ভবন। ভবনটির পশ্চিম পাশে প্রধান সড়ক। আর এর দক্ষিণ পাশ টিনশেডের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা। ভবনের উত্তর পাশে সড়ক। সড়কের উত্তর পাশে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পাকা মার্কেট। সেখানে দুইজন ব্যবসায়ী পিঠা ও ডাব বিক্রি করছেন।
ভবনের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলায় দুইজন নিরাপত্তা কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে একজনের নামদু নূর ইসলাম। তিনি বলেন, এখানে আমি কয়েক দিন আগে কাজে এসেছি। ভবনের নির্মাণকাজ কবে শুরু আর কবে শেষ হয়েছে তা আমি বলতে পারবো না।’

হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের ভবনের উত্তরপাশে ফুটপাতে চায়ের দোকান আছে রমজান আলীর। তিনি বলেন, ‘সরকার পতনের পর থেকে এই বিল্ডিংয়ের কাজ বন্ধ হইয়া গ্যাছে।’
ভবনের সামনে পিঠা বিক্রি করেন আলী হোসেন। তিনি বলেন, ‘তিন বছর ধরে কোনো কাজ দেখি না। তবে ভেতরে কাজ চলে কি না তা জানি না। এখানে দিনের বেলায় মালামাল আসার কোনো সুযোগ নেই। রাতে আসে কি না তা-ও জানি না।’
হিলটন হোটেল যা থাকবে
আন্তর্জাতিক মানের এই পাঁচতারকা হোটেলে মোট ২৫০টি বিলাসবহুল রুম ও স্যুট, একটি অল-ডে ডাইনিং রেস্তোরাঁ, দুটি বিশেষায়িত রেস্তোরাঁ ও লবি লাউঞ্জ থাকবে। এছাড়া এখানে থাকবে রুফটপ সুইমিং পুল, ফুল-সার্ভিস স্পা, ফিটনেস সেন্টার, আধুনিক বলরুম এবং বহুস্তরবিশিষ্ট কার পার্কিং সুবিধা। ভবনটির মূল নির্মাণকাজ শেষ হলেও এর অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম চালুর বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি ।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঋণ
দুদক সূত্রে দেখা গেছে, ডা. এইচবিএম ইকবালের মালিকানাধীন বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং হোটেলগুলোর নির্মাণ ব্যয়ের সিংহভাগ অর্থায়ন মূলত প্রিমিয়ার ব্যাংকের বনানী ও গুলশান শাখা থেকেই অনুমোদিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনেও দেখা যায়, শুধু প্রিমিয়ার ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের (পিবিএসএল) নামেই প্রিমিয়ার ব্যাংক ২৩০ কোটি টাকা ঋণ দেয়। এর মধ্যে ব্যাংকটির বনানী শাখা থেকে দেওয়া ১২৩ কোটি ৬২ লাখ টাকার তথ্য দেখানো হলেও বাকি টাকার তথ্য ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে সম্পূর্ণ গোপন করা হয়েছিল।
হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের ভবন নির্মাণের জন্য ডা. এইচবিএম ইকবালের কোনো ঋণ করেছেন কি না-জানতে চাইলে প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রিমিয়ার ব্যাংকের সঙ্গে হিলটন হোটেলের কোনো সম্পর্ক নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মনজুর মফিজ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের নামে ব্যাংক থেকে এক টাকাও ঋণ দেওয়া হয়নি।’
তবে
হোটেল নির্মাণের বিষয়ে রাজউকের বক্তব্য
রাজউকের আইন শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২৪ তলার অনুমোদন নিয়ে ৩৪ তলা ভবন নির্মাণ করায় রাজউক হিলটন হোটেল কর্তৃপক্ষকে একাধিক নোটিশ দিয়েছে। সেসব নোটিশের জবাব না দিয়ে উল্টো তারা রাজউকের নামে উচ্চ আদালতে রিট করেছে।
রাজউকের জোন–৪/১-এর অথরাইজড অফিসার হাসানুর রেজার কাছে নকশার ব্যত্যয় করে হোটেল হিলটন নির্মাণ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দীর্ঘ সময় রাজউক কার্যালয়ে এই প্রতিবেদককে বসিয়ে রেখে শুধু উচ্চ আদালতে হওয়া রিট নম্বরটি দেন। এই সময় অন্যান্য তথ্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো সহযোগিতা করেননি।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘রাজধানীর গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় ২৪ তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে ৩৪ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে দেশে রাজউক নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের থাকার দরকার নেই।’
হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের জন্য ২৪ তলার অনুমোদন নিয়ে ৩৪ তলা ভবন নির্মাণ এবং এই ভবন নির্মাণে ক্ষমতার অপব্যবহারে অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে ডা. এইচবিএম ইকবালের মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। এরপর এ বিষয়ে জানতে তার মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-২ নম্বরের গোল চত্বরের দক্ষিণ পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আকাশচুম্বী এক ভবন। এই ভবনেই হচ্ছে বিশ্বখ্যাত ফ্ল্যাগশিপ ব্র্যান্ডের হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার। ২৪ তলার অনুমোদন নিয়ে ভবনটি ৩৪ তলা করা হয়েছে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এই কাজ করছেন ভবনের মালিক ডা. এইচ বি এম ইকবাল। তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য। ডা. ইকবাল প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান এবং প্রিমিয়ার গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।
অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত ১০ তলা নির্মাণ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৬ জুন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছ থেকে প্রথমে হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার নির্মাণের জন্য পাঁচটি বেজমেন্টসহ ১৫ তলা ভবনের অনুমোদন নেওয়া হয়। পরে ২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল সংশোধন করে ছয়টি বেজমেন্টসহ ২৪ তলা ভবন অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু এতেও মন ভরেনি ডা. এইচবিএম ইকবালের। তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ২৪ তলার বদলে সেখানে ৩৪ তলা ভবন নির্মাণ করেন।
অনুমোদনে যারা
নকশা অনুমোদনের বিষয়ে রাজউকের প্রধান স্থপতি (চলতি দায়িত্ব) মোস্তাক আহমেদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘২৪ তলা ভবনের নকশার অনুমোদন নিয়ে সেখানে ৩৪ তলা করা হয়েছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলে সেখানে অথরাইজড অফিসার পাঠানো হয়। কিন্তু ডা.এইচ বি এম ইকবাল তাকে (অথরাইজড অফিসার) বকাঝকা করেন। কেন অথরাইজড অফিসারকে তার সাইটে পাঠানো হয়েছে- সে বিষয়টি জানতে চেয়ে ক্ষমতা দেখান এইচ বি এম ইকবাল।’
মোস্তাক আহমেদ আরও বলেন, ভবনটি ২৪ তলার অনুমোদন নেওয়া হলেও রাজউকের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী তা নির্মাণ করা হয়নি। সেখানে জমির পরিমাণ নিয়ে আপত্তি ছিল। এরপর ইকবাল সাহেব রাজউকের নিয়ম-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গড়ে তোলেন ৩৪ তলা বাণিজ্যিক ভবন।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার রাজউকের অঞ্চল–৪ (১)-এর অধীন। এ অঞ্চলের বর্তমানে অথরাইজড অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন হাসানুর রেজা। এর আগে সেখানের অথরাইজড অফিসার ছিলেন কায়সার পারভেজ ও ইমরুল কায়েস। আর বর্তমান ইমারত পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করছেন মো. সোহাগ মিয়া। এর আগে দায়িত্বে ছিলেন ইমরান হোসেন। তবে ২০১৭–২০২৬ সাল পর্যন্ত যারা ওই এলাকায় অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের তথ্য জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) শীলাব্রত কর্মকার সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, রাজউকের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ডাটাবেইজ (তথ্যভাণ্ডার) নেই। এ কারণে আগের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব নয়।

যেভাবে হলো হিলটন
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, যে জমিতে হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার হচ্ছে একসময় সেই জমির মালিক ছিল রাজউক। রাজউকের কাছ থেকে ১৯৫৮ সালে ওই ১৮ কাঠা ১৫ ছটাক জমি বরাদ্দ নেয় এ রউফ নামে এক প্রয়াত ব্যক্তি। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ওই জমিতে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি। এ রউফের মৃত্যুর পর তার নাতি ইফতেখার হায়াত খানের কাছ থেকে এইচ বি এম ইকবাল জমি কিনে সেখানে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবনের নির্মাণ কাজ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ২০১৬ সালের ১৩ মার্চ রাজউক হিলটন হোটের অ্যান্ড রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। নোটিশ উপেক্ষা করে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালের ১৮ আগস্ট তাদের চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরও নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালের ২ নভেম্বর বর্ধিত অংশ (১০ তলা) কেন ভাঙা হবে না তা জানতে চেয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়। ওই নোটিশ চ্যালেঞ্জ করে ভবন মালিক এইচ বি এম ইকবাল রাজউকের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজনকে বিবাদী করে উচ্চ আদালতে রিট করেন।
অনুমোদনবিহীন ভবনের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাদের তিনটি টিম মাঠে কাজ করছে। অচিরেই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
২১০ ফুটের স্থলে ৩৪০ ফুট, বেবিচকের আপত্তি
হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের ৩৪ তলা ভবন নির্মাণের বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আপত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ২০১৮ সালে হিলটন কর্তৃপক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে সেখানে সর্বোচ্চ ২১০ ফুট উঁচু ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর হিলটন কর্তৃপক্ষ ৩৭২ ফুট উচ্চতার অনুমোদন চেয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আবেদন করে। তখন বেবিচকের পক্ষ থেকে বলা হয়, ২১০ ফুটের এক ইঞ্চিরও বেশি উচ্চতার অনুমোদন দেওয়া সম্ভব নয়।
হিলটন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, গুলশান-২ অ্যাভিনিউর ৯৮ নম্বর সড়কের ৭ নম্বর প্লটের ১৪০ নম্বর বাড়ির ব্লক ‘সি’তে হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের ভবন। এই ভবনের পাঁচটি ভূগর্ভস্থ বেজমেন্ট বা পার্কিং ফ্লোর রয়েছে।
৭ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, গুলশান-২ নম্বর গোল চত্বরের ঠিক আগে হোটেল দ্য ওয়েস্টিনের পূর্বপাশে হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের সুউচ্চ ভবন। ভবনটির পশ্চিম পাশে প্রধান সড়ক। আর এর দক্ষিণ পাশ টিনশেডের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা। ভবনের উত্তর পাশে সড়ক। সড়কের উত্তর পাশে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পাকা মার্কেট। সেখানে দুইজন ব্যবসায়ী পিঠা ও ডাব বিক্রি করছেন।
ভবনের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলায় দুইজন নিরাপত্তা কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে একজনের নামদু নূর ইসলাম। তিনি বলেন, এখানে আমি কয়েক দিন আগে কাজে এসেছি। ভবনের নির্মাণকাজ কবে শুরু আর কবে শেষ হয়েছে তা আমি বলতে পারবো না।’

হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের ভবনের উত্তরপাশে ফুটপাতে চায়ের দোকান আছে রমজান আলীর। তিনি বলেন, ‘সরকার পতনের পর থেকে এই বিল্ডিংয়ের কাজ বন্ধ হইয়া গ্যাছে।’
ভবনের সামনে পিঠা বিক্রি করেন আলী হোসেন। তিনি বলেন, ‘তিন বছর ধরে কোনো কাজ দেখি না। তবে ভেতরে কাজ চলে কি না তা জানি না। এখানে দিনের বেলায় মালামাল আসার কোনো সুযোগ নেই। রাতে আসে কি না তা-ও জানি না।’
হিলটন হোটেল যা থাকবে
আন্তর্জাতিক মানের এই পাঁচতারকা হোটেলে মোট ২৫০টি বিলাসবহুল রুম ও স্যুট, একটি অল-ডে ডাইনিং রেস্তোরাঁ, দুটি বিশেষায়িত রেস্তোরাঁ ও লবি লাউঞ্জ থাকবে। এছাড়া এখানে থাকবে রুফটপ সুইমিং পুল, ফুল-সার্ভিস স্পা, ফিটনেস সেন্টার, আধুনিক বলরুম এবং বহুস্তরবিশিষ্ট কার পার্কিং সুবিধা। ভবনটির মূল নির্মাণকাজ শেষ হলেও এর অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম চালুর বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি ।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঋণ
দুদক সূত্রে দেখা গেছে, ডা. এইচবিএম ইকবালের মালিকানাধীন বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং হোটেলগুলোর নির্মাণ ব্যয়ের সিংহভাগ অর্থায়ন মূলত প্রিমিয়ার ব্যাংকের বনানী ও গুলশান শাখা থেকেই অনুমোদিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনেও দেখা যায়, শুধু প্রিমিয়ার ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের (পিবিএসএল) নামেই প্রিমিয়ার ব্যাংক ২৩০ কোটি টাকা ঋণ দেয়। এর মধ্যে ব্যাংকটির বনানী শাখা থেকে দেওয়া ১২৩ কোটি ৬২ লাখ টাকার তথ্য দেখানো হলেও বাকি টাকার তথ্য ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে সম্পূর্ণ গোপন করা হয়েছিল।
হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের ভবন নির্মাণের জন্য ডা. এইচবিএম ইকবালের কোনো ঋণ করেছেন কি না-জানতে চাইলে প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রিমিয়ার ব্যাংকের সঙ্গে হিলটন হোটেলের কোনো সম্পর্ক নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মনজুর মফিজ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের নামে ব্যাংক থেকে এক টাকাও ঋণ দেওয়া হয়নি।’
তবে
হোটেল নির্মাণের বিষয়ে রাজউকের বক্তব্য
রাজউকের আইন শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২৪ তলার অনুমোদন নিয়ে ৩৪ তলা ভবন নির্মাণ করায় রাজউক হিলটন হোটেল কর্তৃপক্ষকে একাধিক নোটিশ দিয়েছে। সেসব নোটিশের জবাব না দিয়ে উল্টো তারা রাজউকের নামে উচ্চ আদালতে রিট করেছে।
রাজউকের জোন–৪/১-এর অথরাইজড অফিসার হাসানুর রেজার কাছে নকশার ব্যত্যয় করে হোটেল হিলটন নির্মাণ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দীর্ঘ সময় রাজউক কার্যালয়ে এই প্রতিবেদককে বসিয়ে রেখে শুধু উচ্চ আদালতে হওয়া রিট নম্বরটি দেন। এই সময় অন্যান্য তথ্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো সহযোগিতা করেননি।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘রাজধানীর গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় ২৪ তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে ৩৪ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে দেশে রাজউক নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের থাকার দরকার নেই।’
হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের জন্য ২৪ তলার অনুমোদন নিয়ে ৩৪ তলা ভবন নির্মাণ এবং এই ভবন নির্মাণে ক্ষমতার অপব্যবহারে অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে ডা. এইচবিএম ইকবালের মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। এরপর এ বিষয়ে জানতে তার মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

গুলশানে ২৪ তলার অনুমোদন নিয়ে ডা. ইকবাল করলেন ৩৪ তলার হিলটন হোটেল
আয়নাল হোসেন

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-২ নম্বরের গোল চত্বরের দক্ষিণ পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আকাশচুম্বী এক ভবন। এই ভবনেই হচ্ছে বিশ্বখ্যাত ফ্ল্যাগশিপ ব্র্যান্ডের হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার। ২৪ তলার অনুমোদন নিয়ে ভবনটি ৩৪ তলা করা হয়েছে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এই কাজ করছেন ভবনের মালিক ডা. এইচ বি এম ইকবাল। তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য। ডা. ইকবাল প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান এবং প্রিমিয়ার গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।
অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত ১০ তলা নির্মাণ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৬ জুন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছ থেকে প্রথমে হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার নির্মাণের জন্য পাঁচটি বেজমেন্টসহ ১৫ তলা ভবনের অনুমোদন নেওয়া হয়। পরে ২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল সংশোধন করে ছয়টি বেজমেন্টসহ ২৪ তলা ভবন অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু এতেও মন ভরেনি ডা. এইচবিএম ইকবালের। তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ২৪ তলার বদলে সেখানে ৩৪ তলা ভবন নির্মাণ করেন।
অনুমোদনে যারা
নকশা অনুমোদনের বিষয়ে রাজউকের প্রধান স্থপতি (চলতি দায়িত্ব) মোস্তাক আহমেদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘২৪ তলা ভবনের নকশার অনুমোদন নিয়ে সেখানে ৩৪ তলা করা হয়েছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলে সেখানে অথরাইজড অফিসার পাঠানো হয়। কিন্তু ডা.এইচ বি এম ইকবাল তাকে (অথরাইজড অফিসার) বকাঝকা করেন। কেন অথরাইজড অফিসারকে তার সাইটে পাঠানো হয়েছে- সে বিষয়টি জানতে চেয়ে ক্ষমতা দেখান এইচ বি এম ইকবাল।’
মোস্তাক আহমেদ আরও বলেন, ভবনটি ২৪ তলার অনুমোদন নেওয়া হলেও রাজউকের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী তা নির্মাণ করা হয়নি। সেখানে জমির পরিমাণ নিয়ে আপত্তি ছিল। এরপর ইকবাল সাহেব রাজউকের নিয়ম-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গড়ে তোলেন ৩৪ তলা বাণিজ্যিক ভবন।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার রাজউকের অঞ্চল–৪ (১)-এর অধীন। এ অঞ্চলের বর্তমানে অথরাইজড অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন হাসানুর রেজা। এর আগে সেখানের অথরাইজড অফিসার ছিলেন কায়সার পারভেজ ও ইমরুল কায়েস। আর বর্তমান ইমারত পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করছেন মো. সোহাগ মিয়া। এর আগে দায়িত্বে ছিলেন ইমরান হোসেন। তবে ২০১৭–২০২৬ সাল পর্যন্ত যারা ওই এলাকায় অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের তথ্য জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) শীলাব্রত কর্মকার সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, রাজউকের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ডাটাবেইজ (তথ্যভাণ্ডার) নেই। এ কারণে আগের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব নয়।

যেভাবে হলো হিলটন
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, যে জমিতে হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টার হচ্ছে একসময় সেই জমির মালিক ছিল রাজউক। রাজউকের কাছ থেকে ১৯৫৮ সালে ওই ১৮ কাঠা ১৫ ছটাক জমি বরাদ্দ নেয় এ রউফ নামে এক প্রয়াত ব্যক্তি। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ওই জমিতে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি। এ রউফের মৃত্যুর পর তার নাতি ইফতেখার হায়াত খানের কাছ থেকে এইচ বি এম ইকবাল জমি কিনে সেখানে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবনের নির্মাণ কাজ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ২০১৬ সালের ১৩ মার্চ রাজউক হিলটন হোটের অ্যান্ড রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। নোটিশ উপেক্ষা করে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালের ১৮ আগস্ট তাদের চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরও নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালের ২ নভেম্বর বর্ধিত অংশ (১০ তলা) কেন ভাঙা হবে না তা জানতে চেয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়। ওই নোটিশ চ্যালেঞ্জ করে ভবন মালিক এইচ বি এম ইকবাল রাজউকের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজনকে বিবাদী করে উচ্চ আদালতে রিট করেন।
অনুমোদনবিহীন ভবনের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাদের তিনটি টিম মাঠে কাজ করছে। অচিরেই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
২১০ ফুটের স্থলে ৩৪০ ফুট, বেবিচকের আপত্তি
হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের ৩৪ তলা ভবন নির্মাণের বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আপত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ২০১৮ সালে হিলটন কর্তৃপক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে সেখানে সর্বোচ্চ ২১০ ফুট উঁচু ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর হিলটন কর্তৃপক্ষ ৩৭২ ফুট উচ্চতার অনুমোদন চেয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আবেদন করে। তখন বেবিচকের পক্ষ থেকে বলা হয়, ২১০ ফুটের এক ইঞ্চিরও বেশি উচ্চতার অনুমোদন দেওয়া সম্ভব নয়।
হিলটন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, গুলশান-২ অ্যাভিনিউর ৯৮ নম্বর সড়কের ৭ নম্বর প্লটের ১৪০ নম্বর বাড়ির ব্লক ‘সি’তে হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের ভবন। এই ভবনের পাঁচটি ভূগর্ভস্থ বেজমেন্ট বা পার্কিং ফ্লোর রয়েছে।
৭ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, গুলশান-২ নম্বর গোল চত্বরের ঠিক আগে হোটেল দ্য ওয়েস্টিনের পূর্বপাশে হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের সুউচ্চ ভবন। ভবনটির পশ্চিম পাশে প্রধান সড়ক। আর এর দক্ষিণ পাশ টিনশেডের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা। ভবনের উত্তর পাশে সড়ক। সড়কের উত্তর পাশে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পাকা মার্কেট। সেখানে দুইজন ব্যবসায়ী পিঠা ও ডাব বিক্রি করছেন।
ভবনের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলায় দুইজন নিরাপত্তা কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে একজনের নামদু নূর ইসলাম। তিনি বলেন, এখানে আমি কয়েক দিন আগে কাজে এসেছি। ভবনের নির্মাণকাজ কবে শুরু আর কবে শেষ হয়েছে তা আমি বলতে পারবো না।’

হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের ভবনের উত্তরপাশে ফুটপাতে চায়ের দোকান আছে রমজান আলীর। তিনি বলেন, ‘সরকার পতনের পর থেকে এই বিল্ডিংয়ের কাজ বন্ধ হইয়া গ্যাছে।’
ভবনের সামনে পিঠা বিক্রি করেন আলী হোসেন। তিনি বলেন, ‘তিন বছর ধরে কোনো কাজ দেখি না। তবে ভেতরে কাজ চলে কি না তা জানি না। এখানে দিনের বেলায় মালামাল আসার কোনো সুযোগ নেই। রাতে আসে কি না তা-ও জানি না।’
হিলটন হোটেল যা থাকবে
আন্তর্জাতিক মানের এই পাঁচতারকা হোটেলে মোট ২৫০টি বিলাসবহুল রুম ও স্যুট, একটি অল-ডে ডাইনিং রেস্তোরাঁ, দুটি বিশেষায়িত রেস্তোরাঁ ও লবি লাউঞ্জ থাকবে। এছাড়া এখানে থাকবে রুফটপ সুইমিং পুল, ফুল-সার্ভিস স্পা, ফিটনেস সেন্টার, আধুনিক বলরুম এবং বহুস্তরবিশিষ্ট কার পার্কিং সুবিধা। ভবনটির মূল নির্মাণকাজ শেষ হলেও এর অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম চালুর বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি ।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঋণ
দুদক সূত্রে দেখা গেছে, ডা. এইচবিএম ইকবালের মালিকানাধীন বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং হোটেলগুলোর নির্মাণ ব্যয়ের সিংহভাগ অর্থায়ন মূলত প্রিমিয়ার ব্যাংকের বনানী ও গুলশান শাখা থেকেই অনুমোদিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনেও দেখা যায়, শুধু প্রিমিয়ার ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের (পিবিএসএল) নামেই প্রিমিয়ার ব্যাংক ২৩০ কোটি টাকা ঋণ দেয়। এর মধ্যে ব্যাংকটির বনানী শাখা থেকে দেওয়া ১২৩ কোটি ৬২ লাখ টাকার তথ্য দেখানো হলেও বাকি টাকার তথ্য ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে সম্পূর্ণ গোপন করা হয়েছিল।
হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের ভবন নির্মাণের জন্য ডা. এইচবিএম ইকবালের কোনো ঋণ করেছেন কি না-জানতে চাইলে প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রিমিয়ার ব্যাংকের সঙ্গে হিলটন হোটেলের কোনো সম্পর্ক নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মনজুর মফিজ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের নামে ব্যাংক থেকে এক টাকাও ঋণ দেওয়া হয়নি।’
তবে
হোটেল নির্মাণের বিষয়ে রাজউকের বক্তব্য
রাজউকের আইন শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২৪ তলার অনুমোদন নিয়ে ৩৪ তলা ভবন নির্মাণ করায় রাজউক হিলটন হোটেল কর্তৃপক্ষকে একাধিক নোটিশ দিয়েছে। সেসব নোটিশের জবাব না দিয়ে উল্টো তারা রাজউকের নামে উচ্চ আদালতে রিট করেছে।
রাজউকের জোন–৪/১-এর অথরাইজড অফিসার হাসানুর রেজার কাছে নকশার ব্যত্যয় করে হোটেল হিলটন নির্মাণ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দীর্ঘ সময় রাজউক কার্যালয়ে এই প্রতিবেদককে বসিয়ে রেখে শুধু উচ্চ আদালতে হওয়া রিট নম্বরটি দেন। এই সময় অন্যান্য তথ্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো সহযোগিতা করেননি।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘রাজধানীর গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় ২৪ তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে ৩৪ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে দেশে রাজউক নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের থাকার দরকার নেই।’
হিলটন হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট সেন্টারের জন্য ২৪ তলার অনুমোদন নিয়ে ৩৪ তলা ভবন নির্মাণ এবং এই ভবন নির্মাণে ক্ষমতার অপব্যবহারে অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে ডা. এইচবিএম ইকবালের মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। এরপর এ বিষয়ে জানতে তার মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

অবৈধ হোটেল শেরাটনকে বৈধতা দিতে তোড়জোড়
শেরাটন, ওয়েস্টিন, হিলটন ও জব্বার টাওয়ারের তথ্য চেয়েছে পূর্ত মন্ত্রণালয়
পদে পদে আইন ভেঙে গুলশানে হচ্ছে শান্তার বাণিজ্যিক ভবন
ফর্টিস ডাউনটাউন রিসোর্ট চলছে অনুমোদন ছাড়া
রাজউকের ১২৫ কোটি টাকার ভবনে বছর ঘুরতেই স্তরে স্তরে ত্রুটি







