শিরোনাম

প্রতিবেশীর নির্যাতনে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ৫ বোন

প্রতিবেশীর নির্যাতনে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ৫ বোন
(বাঁ থেকে) আজিজুল হকের বড় মেয়ে মরিয়ম, সন্তান কোলে ছোট মেয়ে মাহমুদা ও স্ত্রী শাহিন আরা বেগম। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ফেনীর ফাজিলপুরে প্রবীণ শিক্ষক আজিজুল হকের ৫ মেয়ে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের কোনো ভাই নেই– এমন সুযোগ নিয়ে জমি দখল করতে চাইছেন নিকটাত্মীয়রা। দুই বছর আগে এই আগস্ট মাসেই আজিজুল হকের বাড়িতে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। তার স্ত্রী-কন্যা-জামাতাকে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। বাড়ির সামনে বানানো ভাড়া দেওয়ার ঘর ভেঙে ফেলা হয়। এরপর থেকে পরিবারের কেউ আর নিজেদের ভিটায় ফিরে যেতে পারেননি। একের পর এক হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রতিকার চেয়ে ৫ বোন এখন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ ভুক্তভোগী পরিবারকে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেছেন, থানায় এসে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফেনীর ফাজিলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩৫ বছর শিক্ষকতা শেষে ২০১০ সালে অবসর নেন আজিজুল হক। চব্বিশের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের দুইদিন পর তার বাড়িতে ভয়াবহ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এতে জড়িত ছিলেন তার চাচাতো ভাই মর্তুজা ভূঁঞার তিন ছেলে। বড় ছেলে এ এস এম মঈনুল হোসেন (জ্যাকসন)। তিনি জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি এবং এনআরবিসি ব্যাংক ফেনী শাখার জুনিয়র অফিসার। মেঝো ছেলে নাজমুল হোসেন ফারাবী। ছোট ছেলে আবরার আজিম ভূঁঞা (তাইফ) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সালাম বরকত হলের এজিএস।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ৮ আগস্ট সকালে জ্যাকসনের নেতৃত্বে ৩০-৩৫ জনের একটি দল লাঠি, রড, শাবল ও কুড়াল হাতে আজিজুল হকের বাড়ির সীমানায় প্রবেশ করে। জ্যাকসনের ছোটভাই তাইফ বাড়ির সিসি ক্যামেরাগুলো ভেঙে ফেলেন। সেদিন ওই বাড়িতে ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়। ভাড়া দেওয়ার জন্য নির্মিত ৬০ ফুট দীর্ঘ টিনের ঘর ভেঙে ফেলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসময় ভাড়াটিয়াদের টেলিভিশন-ফ্রিজসহ অন্যান্য গৃহস্থালী সামগ্রীও ভাঙচুর করা হয়েছে।

মরিয়ম বলেন, হামলাকারীরা বৃষ্টির মতো পাথর নিক্ষেপ করছিল। তা দেখে আমি বড় বোনকে নিয়ে রাস্তায় চলে আসি। ফেনীতে আমার আরেক বোন নাছরিন সুলতানা থাকে, তাকে ফোন দিয়ে বলি সেনাবাহিনীকে জানাতে। বেলা ৩টার দিকে সেনাবাহিনী এসে আমাদের উদ্ধার করে।

হামলার সময় বাড়িতে ছিলেন আজিজুল হকের স্ত্রী, তার অন্তঃসত্ত্বা কন্যা ও জামাতা। তাদেরকে ঘরের বিছানার সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। হামলাকারীরা মামুনের মাথা ফাটিয়ে রক্তাক্ত করে। সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তারা জানিয়েছেন সেদিনের নির্যাতনের কথা।

‘হাতটা পিছনের দিকে বাঁধিস না’

আজিজুল হকের স্ত্রী শাহিন আরা বেগম বলেন, জ্যাকসন, তার ভাই নাজমুলসহ আরও অনেকে আমার ঘরের ঢোকে। তারা আমার হাত বাঁধে। তাদের বলেছি, বাবা আমার হাতটা পিছনের দিকে বাঁধিস না। হাতে খুব ব্যথা। কিন্তু শুনলো না, কিছুতেই শুনলো না।

তিনি বলেন, ওরা আমাকে অনেক নির্যাতন করেছে। বিশ্রী গালাগালি করেছে। নাজমুল ঘরের অনেক জিনিস ভেঙে তছনছ করেছে। টিভিসহ দামি জিনিসপত্র লুটপাট করে নিয়ে গেছে।

‘আওয়াজ করবি না, গলা কেটে ফেলবো’

আজিজুল হকের ছোট মেয়ে মাহমুদা আক্তার বলেন, সেদিন সকালে আমি ঘুমাচ্ছিলাম। অতর্কিত ওরা রুমের দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকে। আমি ভয়ে কান্না শুরু করলে বলে, ‘কোনো আওয়াজ করবি না। ছুরি দিয়ে গলা কেটে ফেলবো।’ এরপর আমার হাত রশি দিয়ে বাঁধে। ওড়না দিয়ে মুখ বাঁধে। আমার গলায় চেন, কানের দুল নিয়ে যায়।

সন্তান কোলে মাহমুদা আক্তার। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
সন্তান কোলে মাহমুদা আক্তার। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

মাহমুদা বলেন, আমি তখন অন্তঃসত্ত্বা। বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারি না। অনেকক্ষণ বসে থাকার পরে আমার হাতে পানি চলে আসে। অনেক কষ্ট হচ্ছিল। ইশারায় হাতের বাঁধন হালকা করে দিতে বলি। ওরা তখন আরও শক্ত করে বেঁধে দেয়। ওদের বলেছি, আমার অসুবিধা হচ্ছে, বাথরুমে যাবো। তখন বলে, ‘নাটক করতেছিস, বাথরুমে যাওয়ার দরকার নাই।’ আমি কী করবো, বুঝতে পারছিলাম না। শুধু মনে মনে আল্লাহকে ডেকেছি।

তিনি আরও বলেন, সেদিনের পর থেকে আমার শরীর খুবই খারাপ ছিল। রাতে ঘুমাতে পারি না। চোখ বন্ধ করলেই মনে হতো কেউ দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকছে। আমি ভয়ে লাফ দিয়ে উঠতাম।

‘একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছে’

হামলার দিন আজিজুল হক বাড়িতে ছিলেন না, চিকিৎসার জন্য আগের দিন চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। খবর পেয়ে দ্রুত বাড়িতে ছুটে আসেন। তিনি বলেন, বেলা ১২টার দিকে এসে পৌঁছাই। বাড়ি সামনের অংশে বড় টিনের ঘর। সেখানে দুইটি পরিবার বসবাস করতো। আমি এসে দেখি ঘরের চালার টিন, চারদিকের পার্টিশন– সব খুলে ফেলেছে। বাড়ির বাউন্ডারি ওয়াল, গেটের কিছু অংশ ভেঙেছে।

জানা গেছে, আজিজুল হক ৯ শতাংশ জমি কিনেছিলেন। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ওই ৯ শতাংশ জমি দখলে নিতেই তাদের বাড়িতে হামলা হয়েছে।

ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদারের কাছে বিষয়টি জানানো হলে তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আজিজুল হক যদি কোনো মামলার আসামি না হয়ে থাকেন তাহলে সহযোগিতা পাবেন। সেক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারকে তিনি থানায় এসে যোগাযোগ করতে বলেন।

রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ

আজিজুল হকের বড় মেয়ে খোদেজা আক্তার ও মেঝো মেয়ে মরিয়ম আকতার চট্টগ্রামে থাকেন। হামলার খবর পেয়ে সেদিন তারাও বাড়িতে আসেন।

মরিয়ম বলেন, হামলাকারীরা বৃষ্টির মতো পাথর নিক্ষেপ করছিল। তা দেখে আমি বড় বোনকে নিয়ে রাস্তায় চলে আসি। ফেনীতে আমার আরেক বোন নাছরিন সুলতানা থাকে, তাকে ফোন দিয়ে বলি সেনাবাহিনীকে জানাতে। বেলা ৩টার দিকে সেনাবাহিনী এসে আমাদের উদ্ধার করে।

তিনি বলেন, ৮ আগস্ট রাতে সবাইকে নিয়ে চট্টগ্রাম চলে যাই। সেনাবাহিনীর কথামতো পরেরদিন আমরা আমিনবাজার ক্যাম্পে যাই। সেখানে সেনাবাহিনী অভিযোগ করে, আমরা নাকি ওদেরকে মেরেছি, ওদের ঘর-দরজা ভেঙেছি। আমরা তখন সিসিটিভি ফুটেজ দেখালে তারা প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পারে।

মরিয়ম বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে জ্যাকসনের কাঁধে কালো ব্যাগ। সেই ব্যাগের ভেতরে চাপাতি ছিল। পুলিশ পরে সেটি জব্দ করে নিয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, জ্যাকসন ছাত্রদল করে। তার ভাই আবরার আজিম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি করে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তারা এসব করছে।

বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আজিজুল হক ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল ফেনী মডেল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এরপর ১৪ আগস্ট স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিশ বৈঠক হয়। সেদিন সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মাপার পর উভয় পক্ষকে নিজ নিজ জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সালিশনামা মেনে নিয়ে জ্যাকসন তাতে স্বাক্ষরও করেন।

তবে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি আজিজুল হক তার সীমানা প্রাচীর মেরামত করতে গেলে জ্যাকসনের লোকজন আবার বাধা দেয়। এ বিষয়ে তদন্ত করে বোগদাদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ আলী গত ১০ এপ্রিল যে প্রতিবেদন জমা ‍দিয়েছেন, তা আজিজুল হকের পক্ষে গেছে।

৮ আগস্টের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে এ এস এম মঈনুল হোসেন (জ্যাকসন) সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সেদিন তাদের লোকজন আমাদের উপরে হামলা করেছে। আমাদের পরিবারের সবাই আক্রান্ত হয়। আমার আম্মা আহত হন। আমি এবং আমার ভাই আহত হই। এ নিয়ে মামলা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ফেনীর বোগদাদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী বলেন, আজিজুল হকের জমি নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। এর তদন্ত চলছে।

হামলার পর অজিজুল হক ওই বাড়িতে আর ফিরে যেতে পারেননি। আজ এক মেয়ের ঘরে, কাল আরেকজনের ঘরে তিনি দিন পার করছেন।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারটি নিজের বাড়িতে উঠতে চাইলে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন জানাতে পারে। জেলা প্রশাসক ভূমি আইনে তাদের বাড়িতে তুলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এছাড়া নিরাপত্তার জন্য তারা পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে আবেদন জানাতে পারেন।

ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদারের কাছে বিষয়টি জানানো হলে তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আজিজুল হক যদি কোনো মামলার আসামি না হয়ে থাকেন তাহলে সহযোগিতা পাবেন। সেক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারকে তিনি থানায় এসে যোগাযোগ করতে বলেন।

এদিকে হয়রানি ও নির্যাতনের প্রতিকার চেয়ে প্রশাসনসহ বিভিন্ন মহলের শরণাপন্ন হয়েছেন আজিজুল হক। তিনি বিএনপির নেতা ও সংসদ সদস্যদের কাছেও গেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন– ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন (ভিপি জয়নাল) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম।

ভিপি জয়নাল এমপি আজিজুল হকের পরিবারকে থানায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি ওসির সঙ্গে ফোনে কথা বলবেন। তবে থানায় গেলে তাদের বলা হয় আদালতে গিয়ে মামলা করতে। এরপর তারা আদালতেও গেছেন। তবে এখনও কোনো সমাধান পাননি।

/এফসি/