প্রকাশ্য চাঁদাবাজির শিকার সবজি বিক্রেতা থেকে বাড়ির মালিক

প্রকাশ্য চাঁদাবাজির শিকার সবজি বিক্রেতা থেকে বাড়ির মালিক
আয়নাল হোসেন

ঢাকার মোহাম্মদপুর এখন অপরাধপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। অনেকে মোহাম্মদপুরের কথা শুনলেই ভয় পায়। কারণ, এখানে প্রকাশ্যে হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। কোনো ঘটনারই বিচার হচ্ছে না। বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা এসব সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এমনকি পুলিশও তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। এতে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে আছেন এই এলাকার বাসিন্দারা।
স্থানীয় বিএনপির ছত্রছায়ায় অপরাধ হচ্ছে বলে অভিযোগের জবাবে মোহাম্মদপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মাসুদ কবির সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, মোহাম্মদপুরে যেসব অপরাধ হচ্ছে তার সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। অপরাধীদের কোনো দল নেই। এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় অপরাধ যারা করেছে, এখনও তারাই অপরাধে লিপ্ত রয়েছে। তবে এখানে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় অপরাধের মাত্রা বেড়েছে। পুলিশ প্রশাসন ঘুরে দাঁড়ালে অপরাধ কমে আসবে। একই সঙ্গে কিশোর–তরুণেরা যাতে অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য খেলাধুলা চালু করতে হবে।
মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটির সামনে সবজি বিক্রি করেন সারোয়ার হোসেন। সারাদিন সবজি বিক্রি করে পাওয়া পাঁচ হাজার ৮০০ টাকা নিয়ে কারওয়ান বাজার যাচ্ছিলেন তিনি। রাত পৌনে আটটার দিকে ঢাকা উদ্যানের কাছে পৌঁছালে একদল দুর্বৃত্ত অস্ত্র দেখিয়ে তার কাছে থাকা সব টাকা নিয়ে যায়। এই ঘটনা গত মে মাসের। তিনি জানালেন, মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই ছিনতাই ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ কারণে তারা আতঙ্কে থাকেন।
গত ১৬ জুন আদাবরে দিনের বেলা প্রকাশ্যে দোকান লুটের ঘটনা ঘটায় একদল সন্ত্রাসী। ওই দিন শেখেরটেক ৭ নম্বর রোডের মাথায় এক বিকাশ এজেন্টের দোকানে ঢোকে ‘কবজি কাটা আনোয়ার গ্রুপ’-এর কয়েকজন সশস্ত্র সদস্য। তারা প্রথমেই ক্যাশ বাক্স খুলে টাকা নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দিলে দোকান মালিক শফিকুল ইসলামকে তারা কুপিয়ে জখম করে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে পুলিশ। কিন্তু তারা পুলিশের ওপরও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এতে আদাবর থানার ওসিসহ পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মোহাম্মদপুরের এক গৃহিণী বলেন, নবীনগর হাউজিং এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের আখড়া। এখানে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা ও অবৈধ অস্ত্র বেচাকেনা হয়। এ ছাড়া ঢাকা উদ্যান বাজার থেকে তুরাগ নদীর পাড় পর্যন্ত ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের উৎপাতে অতিষ্ঠ মানুষ। তারা লোকজনের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, টাকা ও মূলবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
গত ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার ও বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ‘অ্যালেক্স গ্রুপের’ প্রধান অ্যালেক্স ইমন খুন হয়। তার আসল নাম ইমন হোসেন। প্রতিপক্ষ তাকে হত্যা করে। গত ১৫ এপ্রিল মাদক ব্যবসায়ী আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল খুন হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত আসাদুল একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে সাতটি মামলা ছিল। মাদক ব্যবসার টাকা ভাগাভাগি এবং পূর্বশত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষ তাকে হত্যা করে।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরে অপরাধ বাড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হচ্ছে জমি দখল, মাদক ব্যবসা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরে একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এদের মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম থেকে শুরু করে স্থানীয় অনেক নেতাকর্মীও জড়িত বলে জানা যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গড়ে ওঠে কিশোর গ্যাং। সে সময় যানবাহন থেকে শুরু করে দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রন শুরু করে কিশোরেরা। এ সময়ে একদল উশৃঙ্খল কিশোর ছাত্রদের সঙ্গে মিশে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর–আদাবরে সন্ত্রাসীদের অপরাধের কেন্দ্র হয়ে ওঠে জেনেভা ক্যাম্প।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম এবং পিচ্চি রাজাসহ কয়েকটি গ্রুপ। ভূঁইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেলের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মাদক, হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। মো. সেলিম আশরাফী ওরফে চুয়া সেলিমের নেতৃত্বে আরেকটি দল ক্যাম্পের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে।
মোহাম্মদপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কেন হয়েছে জানতে চাইলে স্থানীয় কয়েকজন বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর স্থানীয় বিএনপি নেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে পুরো এলাকা। তবে এখন জয়নাল হাজি, আবুল হাসেম হাসু ও আবুল কাশেম কাসু পরিবারের ছত্রছায়ায় নানা ধরনের অপরাধ চলছে। এই তিনটি পরিবারে সব রাজনৈতিক দলেরই লোকজন আছে। এ কারণে যে দলই ক্ষমতায় আসে, তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এলাকা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাদক ব্যবসার সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্য জড়িত থাকার মতো ঘটনাও তাদের চোখে পড়ে। তারা (পুলিশ) সোর্সের মাধ্যমে মাদক বিক্রি করছে। একটি ইয়াবা ট্যাবলেট ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়। ওই একই ট্যাবলেট পুলিশের সোর্সের কাছ থেকে কিনতে ৩৫০ টাকা দিতে হয়। তবে সোর্সের বাইরে কেউ ইয়াবা কিনলে সোর্সের সহায়তায় মাদকসেবীদের পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে স্বজনেরা ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায়, এমন ঘটনাও ঘটছে।
পুলিশের মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদ হোসেন বলেন, পুলিশ মাদক ব্যবসার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়। তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে জড়িয়ে পড়লে তাদের শাস্তি সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি হবে।
মোহাম্মদপুরের কোনো স্থানে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের চাঁদা দেওয়া ছাড়া ভবন করা যায় না। এ বিষয়ে সাইফ আলী খান নামে মোহাম্মদপুরের একজন বাসিন্দা বলেন, ‘এলাকায় নতুন বাড়ির কাজ শুরু হলেই সন্ত্রাসীরা চাঁদার জন্য হাজির হয়। তাদের চাঁদা না দিয়ে কেউ নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারে না। যেকোনো উপায়ে সন্ত্রাসীদের ম্যানেজ করে বাড়ির কাজ শেষ করতে হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জমির মালিকদের অত্যাচার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের সরকারি আদমশুমারির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা এলাকায় প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ মানুষ বাস করছে। এসব এলাকায় পুলিশের সংখ্যা মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ জন। অথচ এখানে দেড় থেকে দুই হাজারের মতো পুলিশ সদস্য দরকার। এই কারণেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
তবে পুলিশ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না- এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন। তিনি দাবি করেন, গত ছয় মাসে মোহাম্মদপুরে মাত্র দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার ২৪ ঘন্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ এলাকায় যারা অপরাধ করছে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পটি ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। ছোট একটি কক্ষে ২০ জনের মতো লোকজন বসবাস করছেন। এখানে লোকজন পালাক্রমে ঘুমায়। অনেক হাউজিং করা হলেও সেখানে এখনো রাস্তাঘাট তৈরি হয়নি। এলাকায় আটটি বস্তি রয়েছে। এসব বস্তিতে নানা অপকর্ম হচ্ছে।
আদাবর থানার ওসি জাহিদ হোসেন বলেন, এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই এলাকায় কয়েকটি পরিবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত। পরিবারগুলোর সদস্যরা নানা অপরাধে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে পুলিশ সবাইকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশনস বিভাগ) নিয়াজ মেহেদী বলেন, ‘মোহাম্মদপুরের অপরাধ নির্মূলে পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। সেখানে দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে। অপরাধী যত বড়ই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, দেশে অপরাধ সংঘটিত হয়। কিন্তু সেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। অনেক সময় আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না হলে এ ধরনের অপরাধ বেড়ে যায়। তার পাশাপাশি যথাযথ তদারকি না থাকলে এবং অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা না গেলে ওই অপরাধ বেড়ে যায়। অনেক অপরাধী অনেক সময় গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিচারিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে সহজে জামিন পেয়ে যায়। ফলে তারা আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

ঢাকার মোহাম্মদপুর এখন অপরাধপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। অনেকে মোহাম্মদপুরের কথা শুনলেই ভয় পায়। কারণ, এখানে প্রকাশ্যে হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। কোনো ঘটনারই বিচার হচ্ছে না। বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা এসব সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এমনকি পুলিশও তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। এতে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে আছেন এই এলাকার বাসিন্দারা।
স্থানীয় বিএনপির ছত্রছায়ায় অপরাধ হচ্ছে বলে অভিযোগের জবাবে মোহাম্মদপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মাসুদ কবির সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, মোহাম্মদপুরে যেসব অপরাধ হচ্ছে তার সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। অপরাধীদের কোনো দল নেই। এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় অপরাধ যারা করেছে, এখনও তারাই অপরাধে লিপ্ত রয়েছে। তবে এখানে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় অপরাধের মাত্রা বেড়েছে। পুলিশ প্রশাসন ঘুরে দাঁড়ালে অপরাধ কমে আসবে। একই সঙ্গে কিশোর–তরুণেরা যাতে অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য খেলাধুলা চালু করতে হবে।
মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটির সামনে সবজি বিক্রি করেন সারোয়ার হোসেন। সারাদিন সবজি বিক্রি করে পাওয়া পাঁচ হাজার ৮০০ টাকা নিয়ে কারওয়ান বাজার যাচ্ছিলেন তিনি। রাত পৌনে আটটার দিকে ঢাকা উদ্যানের কাছে পৌঁছালে একদল দুর্বৃত্ত অস্ত্র দেখিয়ে তার কাছে থাকা সব টাকা নিয়ে যায়। এই ঘটনা গত মে মাসের। তিনি জানালেন, মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই ছিনতাই ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ কারণে তারা আতঙ্কে থাকেন।
গত ১৬ জুন আদাবরে দিনের বেলা প্রকাশ্যে দোকান লুটের ঘটনা ঘটায় একদল সন্ত্রাসী। ওই দিন শেখেরটেক ৭ নম্বর রোডের মাথায় এক বিকাশ এজেন্টের দোকানে ঢোকে ‘কবজি কাটা আনোয়ার গ্রুপ’-এর কয়েকজন সশস্ত্র সদস্য। তারা প্রথমেই ক্যাশ বাক্স খুলে টাকা নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দিলে দোকান মালিক শফিকুল ইসলামকে তারা কুপিয়ে জখম করে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে পুলিশ। কিন্তু তারা পুলিশের ওপরও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এতে আদাবর থানার ওসিসহ পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মোহাম্মদপুরের এক গৃহিণী বলেন, নবীনগর হাউজিং এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের আখড়া। এখানে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা ও অবৈধ অস্ত্র বেচাকেনা হয়। এ ছাড়া ঢাকা উদ্যান বাজার থেকে তুরাগ নদীর পাড় পর্যন্ত ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের উৎপাতে অতিষ্ঠ মানুষ। তারা লোকজনের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, টাকা ও মূলবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
গত ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার ও বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ‘অ্যালেক্স গ্রুপের’ প্রধান অ্যালেক্স ইমন খুন হয়। তার আসল নাম ইমন হোসেন। প্রতিপক্ষ তাকে হত্যা করে। গত ১৫ এপ্রিল মাদক ব্যবসায়ী আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল খুন হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত আসাদুল একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে সাতটি মামলা ছিল। মাদক ব্যবসার টাকা ভাগাভাগি এবং পূর্বশত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষ তাকে হত্যা করে।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরে অপরাধ বাড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হচ্ছে জমি দখল, মাদক ব্যবসা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরে একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এদের মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম থেকে শুরু করে স্থানীয় অনেক নেতাকর্মীও জড়িত বলে জানা যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গড়ে ওঠে কিশোর গ্যাং। সে সময় যানবাহন থেকে শুরু করে দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রন শুরু করে কিশোরেরা। এ সময়ে একদল উশৃঙ্খল কিশোর ছাত্রদের সঙ্গে মিশে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর–আদাবরে সন্ত্রাসীদের অপরাধের কেন্দ্র হয়ে ওঠে জেনেভা ক্যাম্প।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম এবং পিচ্চি রাজাসহ কয়েকটি গ্রুপ। ভূঁইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেলের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মাদক, হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। মো. সেলিম আশরাফী ওরফে চুয়া সেলিমের নেতৃত্বে আরেকটি দল ক্যাম্পের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে।
মোহাম্মদপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কেন হয়েছে জানতে চাইলে স্থানীয় কয়েকজন বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর স্থানীয় বিএনপি নেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে পুরো এলাকা। তবে এখন জয়নাল হাজি, আবুল হাসেম হাসু ও আবুল কাশেম কাসু পরিবারের ছত্রছায়ায় নানা ধরনের অপরাধ চলছে। এই তিনটি পরিবারে সব রাজনৈতিক দলেরই লোকজন আছে। এ কারণে যে দলই ক্ষমতায় আসে, তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এলাকা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাদক ব্যবসার সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্য জড়িত থাকার মতো ঘটনাও তাদের চোখে পড়ে। তারা (পুলিশ) সোর্সের মাধ্যমে মাদক বিক্রি করছে। একটি ইয়াবা ট্যাবলেট ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়। ওই একই ট্যাবলেট পুলিশের সোর্সের কাছ থেকে কিনতে ৩৫০ টাকা দিতে হয়। তবে সোর্সের বাইরে কেউ ইয়াবা কিনলে সোর্সের সহায়তায় মাদকসেবীদের পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে স্বজনেরা ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায়, এমন ঘটনাও ঘটছে।
পুলিশের মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদ হোসেন বলেন, পুলিশ মাদক ব্যবসার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়। তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে জড়িয়ে পড়লে তাদের শাস্তি সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি হবে।
মোহাম্মদপুরের কোনো স্থানে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের চাঁদা দেওয়া ছাড়া ভবন করা যায় না। এ বিষয়ে সাইফ আলী খান নামে মোহাম্মদপুরের একজন বাসিন্দা বলেন, ‘এলাকায় নতুন বাড়ির কাজ শুরু হলেই সন্ত্রাসীরা চাঁদার জন্য হাজির হয়। তাদের চাঁদা না দিয়ে কেউ নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারে না। যেকোনো উপায়ে সন্ত্রাসীদের ম্যানেজ করে বাড়ির কাজ শেষ করতে হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জমির মালিকদের অত্যাচার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের সরকারি আদমশুমারির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা এলাকায় প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ মানুষ বাস করছে। এসব এলাকায় পুলিশের সংখ্যা মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ জন। অথচ এখানে দেড় থেকে দুই হাজারের মতো পুলিশ সদস্য দরকার। এই কারণেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
তবে পুলিশ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না- এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন। তিনি দাবি করেন, গত ছয় মাসে মোহাম্মদপুরে মাত্র দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার ২৪ ঘন্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ এলাকায় যারা অপরাধ করছে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পটি ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। ছোট একটি কক্ষে ২০ জনের মতো লোকজন বসবাস করছেন। এখানে লোকজন পালাক্রমে ঘুমায়। অনেক হাউজিং করা হলেও সেখানে এখনো রাস্তাঘাট তৈরি হয়নি। এলাকায় আটটি বস্তি রয়েছে। এসব বস্তিতে নানা অপকর্ম হচ্ছে।
আদাবর থানার ওসি জাহিদ হোসেন বলেন, এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই এলাকায় কয়েকটি পরিবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত। পরিবারগুলোর সদস্যরা নানা অপরাধে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে পুলিশ সবাইকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশনস বিভাগ) নিয়াজ মেহেদী বলেন, ‘মোহাম্মদপুরের অপরাধ নির্মূলে পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। সেখানে দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে। অপরাধী যত বড়ই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, দেশে অপরাধ সংঘটিত হয়। কিন্তু সেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। অনেক সময় আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না হলে এ ধরনের অপরাধ বেড়ে যায়। তার পাশাপাশি যথাযথ তদারকি না থাকলে এবং অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা না গেলে ওই অপরাধ বেড়ে যায়। অনেক অপরাধী অনেক সময় গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিচারিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে সহজে জামিন পেয়ে যায়। ফলে তারা আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

প্রকাশ্য চাঁদাবাজির শিকার সবজি বিক্রেতা থেকে বাড়ির মালিক
আয়নাল হোসেন

ঢাকার মোহাম্মদপুর এখন অপরাধপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। অনেকে মোহাম্মদপুরের কথা শুনলেই ভয় পায়। কারণ, এখানে প্রকাশ্যে হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। কোনো ঘটনারই বিচার হচ্ছে না। বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা এসব সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এমনকি পুলিশও তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। এতে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে আছেন এই এলাকার বাসিন্দারা।
স্থানীয় বিএনপির ছত্রছায়ায় অপরাধ হচ্ছে বলে অভিযোগের জবাবে মোহাম্মদপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মাসুদ কবির সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, মোহাম্মদপুরে যেসব অপরাধ হচ্ছে তার সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। অপরাধীদের কোনো দল নেই। এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় অপরাধ যারা করেছে, এখনও তারাই অপরাধে লিপ্ত রয়েছে। তবে এখানে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় অপরাধের মাত্রা বেড়েছে। পুলিশ প্রশাসন ঘুরে দাঁড়ালে অপরাধ কমে আসবে। একই সঙ্গে কিশোর–তরুণেরা যাতে অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য খেলাধুলা চালু করতে হবে।
মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটির সামনে সবজি বিক্রি করেন সারোয়ার হোসেন। সারাদিন সবজি বিক্রি করে পাওয়া পাঁচ হাজার ৮০০ টাকা নিয়ে কারওয়ান বাজার যাচ্ছিলেন তিনি। রাত পৌনে আটটার দিকে ঢাকা উদ্যানের কাছে পৌঁছালে একদল দুর্বৃত্ত অস্ত্র দেখিয়ে তার কাছে থাকা সব টাকা নিয়ে যায়। এই ঘটনা গত মে মাসের। তিনি জানালেন, মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই ছিনতাই ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ কারণে তারা আতঙ্কে থাকেন।
গত ১৬ জুন আদাবরে দিনের বেলা প্রকাশ্যে দোকান লুটের ঘটনা ঘটায় একদল সন্ত্রাসী। ওই দিন শেখেরটেক ৭ নম্বর রোডের মাথায় এক বিকাশ এজেন্টের দোকানে ঢোকে ‘কবজি কাটা আনোয়ার গ্রুপ’-এর কয়েকজন সশস্ত্র সদস্য। তারা প্রথমেই ক্যাশ বাক্স খুলে টাকা নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দিলে দোকান মালিক শফিকুল ইসলামকে তারা কুপিয়ে জখম করে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে পুলিশ। কিন্তু তারা পুলিশের ওপরও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এতে আদাবর থানার ওসিসহ পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মোহাম্মদপুরের এক গৃহিণী বলেন, নবীনগর হাউজিং এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের আখড়া। এখানে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা ও অবৈধ অস্ত্র বেচাকেনা হয়। এ ছাড়া ঢাকা উদ্যান বাজার থেকে তুরাগ নদীর পাড় পর্যন্ত ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের উৎপাতে অতিষ্ঠ মানুষ। তারা লোকজনের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, টাকা ও মূলবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
গত ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার ও বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ‘অ্যালেক্স গ্রুপের’ প্রধান অ্যালেক্স ইমন খুন হয়। তার আসল নাম ইমন হোসেন। প্রতিপক্ষ তাকে হত্যা করে। গত ১৫ এপ্রিল মাদক ব্যবসায়ী আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল খুন হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত আসাদুল একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে সাতটি মামলা ছিল। মাদক ব্যবসার টাকা ভাগাভাগি এবং পূর্বশত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষ তাকে হত্যা করে।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরে অপরাধ বাড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হচ্ছে জমি দখল, মাদক ব্যবসা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরে একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এদের মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম থেকে শুরু করে স্থানীয় অনেক নেতাকর্মীও জড়িত বলে জানা যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গড়ে ওঠে কিশোর গ্যাং। সে সময় যানবাহন থেকে শুরু করে দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রন শুরু করে কিশোরেরা। এ সময়ে একদল উশৃঙ্খল কিশোর ছাত্রদের সঙ্গে মিশে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর–আদাবরে সন্ত্রাসীদের অপরাধের কেন্দ্র হয়ে ওঠে জেনেভা ক্যাম্প।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম এবং পিচ্চি রাজাসহ কয়েকটি গ্রুপ। ভূঁইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেলের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মাদক, হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। মো. সেলিম আশরাফী ওরফে চুয়া সেলিমের নেতৃত্বে আরেকটি দল ক্যাম্পের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে।
মোহাম্মদপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কেন হয়েছে জানতে চাইলে স্থানীয় কয়েকজন বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর স্থানীয় বিএনপি নেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে পুরো এলাকা। তবে এখন জয়নাল হাজি, আবুল হাসেম হাসু ও আবুল কাশেম কাসু পরিবারের ছত্রছায়ায় নানা ধরনের অপরাধ চলছে। এই তিনটি পরিবারে সব রাজনৈতিক দলেরই লোকজন আছে। এ কারণে যে দলই ক্ষমতায় আসে, তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এলাকা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাদক ব্যবসার সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্য জড়িত থাকার মতো ঘটনাও তাদের চোখে পড়ে। তারা (পুলিশ) সোর্সের মাধ্যমে মাদক বিক্রি করছে। একটি ইয়াবা ট্যাবলেট ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়। ওই একই ট্যাবলেট পুলিশের সোর্সের কাছ থেকে কিনতে ৩৫০ টাকা দিতে হয়। তবে সোর্সের বাইরে কেউ ইয়াবা কিনলে সোর্সের সহায়তায় মাদকসেবীদের পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে স্বজনেরা ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায়, এমন ঘটনাও ঘটছে।
পুলিশের মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদ হোসেন বলেন, পুলিশ মাদক ব্যবসার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়। তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে জড়িয়ে পড়লে তাদের শাস্তি সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি হবে।
মোহাম্মদপুরের কোনো স্থানে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের চাঁদা দেওয়া ছাড়া ভবন করা যায় না। এ বিষয়ে সাইফ আলী খান নামে মোহাম্মদপুরের একজন বাসিন্দা বলেন, ‘এলাকায় নতুন বাড়ির কাজ শুরু হলেই সন্ত্রাসীরা চাঁদার জন্য হাজির হয়। তাদের চাঁদা না দিয়ে কেউ নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারে না। যেকোনো উপায়ে সন্ত্রাসীদের ম্যানেজ করে বাড়ির কাজ শেষ করতে হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জমির মালিকদের অত্যাচার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের সরকারি আদমশুমারির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা এলাকায় প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ মানুষ বাস করছে। এসব এলাকায় পুলিশের সংখ্যা মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ জন। অথচ এখানে দেড় থেকে দুই হাজারের মতো পুলিশ সদস্য দরকার। এই কারণেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
তবে পুলিশ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না- এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন। তিনি দাবি করেন, গত ছয় মাসে মোহাম্মদপুরে মাত্র দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার ২৪ ঘন্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ এলাকায় যারা অপরাধ করছে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পটি ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। ছোট একটি কক্ষে ২০ জনের মতো লোকজন বসবাস করছেন। এখানে লোকজন পালাক্রমে ঘুমায়। অনেক হাউজিং করা হলেও সেখানে এখনো রাস্তাঘাট তৈরি হয়নি। এলাকায় আটটি বস্তি রয়েছে। এসব বস্তিতে নানা অপকর্ম হচ্ছে।
আদাবর থানার ওসি জাহিদ হোসেন বলেন, এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই এলাকায় কয়েকটি পরিবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত। পরিবারগুলোর সদস্যরা নানা অপরাধে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে পুলিশ সবাইকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশনস বিভাগ) নিয়াজ মেহেদী বলেন, ‘মোহাম্মদপুরের অপরাধ নির্মূলে পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। সেখানে দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে। অপরাধী যত বড়ই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, দেশে অপরাধ সংঘটিত হয়। কিন্তু সেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। অনেক সময় আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না হলে এ ধরনের অপরাধ বেড়ে যায়। তার পাশাপাশি যথাযথ তদারকি না থাকলে এবং অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা না গেলে ওই অপরাধ বেড়ে যায়। অনেক অপরাধী অনেক সময় গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিচারিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে সহজে জামিন পেয়ে যায়। ফলে তারা আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।




