পর্যাপ্ত আমদানির পরেও রমজানের আগে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

পর্যাপ্ত আমদানির পরেও রমজানের আগে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম
মরিয়ম সেঁজুতি

পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে বাজারে কিছু নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। অথচ এই মাসে অধিক চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভোগ্যপণ্যের আমদানি গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে সরকার। রোজা শুরুর আগেই এভাবে দাম বাড়ায় সাধারণ ক্রেতারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রমজান ঘিরে পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। তবে পর্যাপ্ত এলসি খোলার পরেও বাজারে ছোলা, ভোজ্যতেল, ফল, সবজি ও খেজুরের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে খেজুরের দাম ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
আমদানিকারকদের একটি অংশ এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজার এখনও অদৃশ্য সিন্ডিকেট’-এর নিয়ন্ত্রণে। এ কারণে রমজানের আগেই কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে।
আবার কয়েকজন ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে যথাসময়ে পণ্য খালাস না হওয়ায় এবং নির্বাচন উপলক্ষে ছুটি থাকায় পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এ কারণে বাজারে পণ্যের সাময়িক ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
রমজানের আগে বাজারের চিত্র
রবি, সোম ও মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর ও মালিবাগ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দাম বাড়ার কারণে রমজানে খেজুর সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। এ কারণে গত ডিসেম্বর খেজুর আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এতে আমদানি বাড়বে এবং দাম কমবে বলে আশা করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে বাজারে দাম উল্টো বেড়েছে, যা ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। শুল্ক কমানো সত্ত্বেও সাধারণ মানের জাহিদি খেজুর এখন ২৮০-৩০০ টাকা কেজি, যা গত সপ্তাহেও ২৫০ টাকার আশপাশে ছিল। অন্যান্য খেজুরের মধ্যে বড়ই ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা, দাবাস ৭০০ টাকা, কালমি ৭০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, মরিয়ম ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং মেডজুল খেজুর কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যান্য ফলের দামও বাড়তি
রমজান শুরুর আগেই নানা অজুহাতে বিভিন্ন ফলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। প্রতি কেজি আপেল ২৬০ থেকে ৩৫০ টাকা, কমলা ২৪০ থেকে ৩৫০ টাকা, মাল্টা ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, সাদা আঙুর ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকা, কালো আঙুর ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং আনার ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বেড়েছে মুরগি ও গরুর মাংসের দাম
প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা ছাড়িয়েছে, আর সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকায়। গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ১০০ টাকা বেড়ে ৮৫০ টাকা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ব্যাখ্যা, ক্রেতাদের ক্ষোভ
ফলের দাম বাড়ার বিষয়ে মতিঝিলের ফল ব্যবসায়ী সুলায়মান হোসেন বলেন, রমজান সামনে রেখে আড়ত পর্যায়েই কিছুটা দাম বাড়ানো হয়েছে, যার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে। নির্বাচনের কারণে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় অনেক পণ্য সময়মতো বাজারে আসেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
কিন্তু এসব ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন ক্রেতারা। শান্তিনগর কাঁচাবাজারে বেসরকারি চাকরিজীবী আহমেদ হোসেন বলেন, ‘শুনছি বন্দরে জাহাজ আছে, এলসি বেশি খোলা হয়েছে। কিন্তু বাজারে এসে দেখি দামই শুধু বাড়ছে। আমাদের আয় তো বাড়ছে না।’
একই বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আলী আজগর বলেন, নির্বাচনের সময় কয়েক দিন পরিবহন সীমিত থাকায় পণ্য সময়মতো বাজারে আসেনি, এতে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বেড়েছে।
কমলাপুর এজিবি কলোনী কাঁচাবাজারে দেখা হলে গৃহিণী আরিফা বেগম বলেন, অন্যান্য দেশে রমজান আসতে শুরু করলে দাম কমে যায়, কিন্তু বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র দেখা যায়। দুই দিন গাড়ি একটু কম চলেছে দেখেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা সুযোগ খোঁজে কখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যাতে দাম বাড়াতে পারে।
পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে নিত্যপণ্যবাহী ট্রাকসহ অন্য যানবাহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা গেলে রমজানজুড়ে বাজার স্থিতিশীল থাকবে বলে মনে করেন তারা।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির( এফবিসিসিআই) মতিঝিল কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব কথা বলেন ব্যবসায়ীরা। ওই সভায় অংশ নেওয়া খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ের বিভিন্ন বাজার সমিতির নেতারা জানান, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডালসহ অন্যান্য পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে দেশে। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখাতে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে চাঁদাবাজি রোধ করতে কর্তৃপক্ষকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তারা। পাশাপাশি তারা সাধারণ ভোক্তাদের প্রতি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য কিনে বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করার অনুরোধ জানান।
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, ‘মাত্র চার থেকে পাঁচটি কোম্পানি আটা, ছোলা, ভোজ্যতেল ও চিনির মতো পণ্য উৎপাদন, আমদানি এবং বিপণন নিয়ন্ত্রণ করছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা এসব বড় আমদানিকারকের কাছ থেকে পণ্য কিনে বাজারে বিক্রি করেন। অথচ মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরকার এসব বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা না করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানিকে জরিমানা করেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপমহাব্যবস্থাপক মো. তসলিম শাহরিয়ার বলেন,‘এবার মিলগেট পর্যায়ে প্রতি কেজি চিনির দাম ৯২ থেকে ৯৩ টাকা, যা গত বছরের চেয়ে অনেক কম। এবার আমরা যে পরিমাণ চিনি সরবরাহ করছি, তা মেঘনা গ্রুপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে নির্বাচনের কারণে সরকারি ছুটি ও বন্দরের আন্দোলনের প্রভাবে পণ্য সরবরাহে কিছুটা জটিলতা তৈরি হতে পারে।’
দাম বৃদ্ধি নিয়ে বিশ্লেষকদের শঙ্কা
রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষক এবং কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, এবার জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রোজায় এই সংকট আরও বাড়তে পারে। এ ছাড়া নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ‘ট্রানজিশন পিরিয়ডে’ বাজার তদারকি দুর্বল হতে পারে, যা অসাধু ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিতে পারে।
এলসি বেশি, তবুও সংকট
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রমজান উপলক্ষে চিনি, ছোলা, ডাল ও ভোজ্যতেলের এলসি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি খোলা হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পণ্যের কোনো প্রকৃত সংকট নেই; বরং সরবরাহের কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে।
আমদানির চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপণ্যের এলসি খোলার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার রোজায় চাহিদা বাড়ে-এমন আটটি পণ্যের এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রবিবার সিটিজেন জার্নালকে বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে নির্বাচনের আগেই গত বছর থেকে ৪০ শতাংশ বেশি ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হয়েছে, যা সরকারকে রমজানে স্বস্তি দেবে।
বাজার স্থিতিশীল থাকায় মূল্যস্ফীতিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে আশাবাদ প্রকাশ করে আরিফ হোসেন খান বলেন, আমদানিকারকেরা মজুত করা পণ্য সঠিকভাবে বিতরণ করলে কোনো পণ্যের ঘাটতি থাকবে না।
ছয় পণ্যের আমদানির চিত্র
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রমজান সামনে রেখে মৌসুমি চাহিদা মেটাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ও আমদানিকারকেরা ছয়টি নিত্যপণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সয়াবিন তেল আমদানি ৩৬ শতাংশ, চিনি ১১ শতাংশ, মসুর ডাল ৮৭ শতাংশ, ছোলা ২৭ শতাংশ, মটর ডাল ২৯৪ শতাংশ ও খেজুরের আমদানি ২৩১ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে মোট ৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার ও অক্টোবরে ৫ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। এই সময়ে ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৫ টন সয়াবিন তেল , ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৭২ টন চিনি , ৫০ হাজার ৩৫৫ টন ডাল এবং ৫৪ হাজার ৫১৬ টন ছোলা আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। এ ছাড়া একই সময়ে ১০ হাজার ১৬৫ টন খেজুর এবং ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮১০ টন মটর ডাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন সরকারের পদক্ষেপ কী হবে?
বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু খুচরা বাজারে অভিযান চালিয়ে সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। সরকারকে নজর দিতে হবে উৎসে। তাদের মতে, আমদানিকৃত পণ্য বন্দরে খালাসের পর কোথায় যাচ্ছে এবং কত দ্রুত বাজারে আসছে, সে বিষয়ে তদারকি বাড়াতে হবে।
এ বিষয়ে ক্যাবের সহসভাপতি নাজের হোসেইন বলেন, ‘দায়িত্ব নিয়েই নতুন সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর হয়ে যাবে। কারণ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক দিন পরেই রমজান শুরু হবে। ফলে তাদের সার্বিক বিষয়গুলো বুঝে উঠতে সময় লাগবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা খুবই চিন্তিত। যদিও ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছে। প্রচুর আমদানি করেছে, ফলে বাজারে কোন সংকট থাকার কথা নয়।’
তিনি আরও বলেন, নিত্যপণ্যের বাজার সব সময় আলোচনায় থাকে না। তদারকি মানেই হয়রানি না, এটা রুটিন চেক করার বিষয়। এটাকে মানতে হবে। তবে এ তদারকি হওয়া উচিত তিন পর্যায়ে অর্থাৎ আমদানিকারক বা উৎপাদনকারী, পাইকারি বিক্রেতা এবং খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আফরোজা রহমান বলেন, ঢাকা মহানগরসহ জেলা পর্যায়ে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। রমজান মাসে এই তদারকি আরও জোরদার করা হবে।

পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে বাজারে কিছু নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। অথচ এই মাসে অধিক চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভোগ্যপণ্যের আমদানি গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে সরকার। রোজা শুরুর আগেই এভাবে দাম বাড়ায় সাধারণ ক্রেতারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রমজান ঘিরে পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। তবে পর্যাপ্ত এলসি খোলার পরেও বাজারে ছোলা, ভোজ্যতেল, ফল, সবজি ও খেজুরের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে খেজুরের দাম ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
আমদানিকারকদের একটি অংশ এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজার এখনও অদৃশ্য সিন্ডিকেট’-এর নিয়ন্ত্রণে। এ কারণে রমজানের আগেই কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে।
আবার কয়েকজন ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে যথাসময়ে পণ্য খালাস না হওয়ায় এবং নির্বাচন উপলক্ষে ছুটি থাকায় পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এ কারণে বাজারে পণ্যের সাময়িক ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
রমজানের আগে বাজারের চিত্র
রবি, সোম ও মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর ও মালিবাগ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দাম বাড়ার কারণে রমজানে খেজুর সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। এ কারণে গত ডিসেম্বর খেজুর আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এতে আমদানি বাড়বে এবং দাম কমবে বলে আশা করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে বাজারে দাম উল্টো বেড়েছে, যা ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। শুল্ক কমানো সত্ত্বেও সাধারণ মানের জাহিদি খেজুর এখন ২৮০-৩০০ টাকা কেজি, যা গত সপ্তাহেও ২৫০ টাকার আশপাশে ছিল। অন্যান্য খেজুরের মধ্যে বড়ই ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা, দাবাস ৭০০ টাকা, কালমি ৭০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, মরিয়ম ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং মেডজুল খেজুর কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যান্য ফলের দামও বাড়তি
রমজান শুরুর আগেই নানা অজুহাতে বিভিন্ন ফলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। প্রতি কেজি আপেল ২৬০ থেকে ৩৫০ টাকা, কমলা ২৪০ থেকে ৩৫০ টাকা, মাল্টা ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, সাদা আঙুর ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকা, কালো আঙুর ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং আনার ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বেড়েছে মুরগি ও গরুর মাংসের দাম
প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা ছাড়িয়েছে, আর সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকায়। গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ১০০ টাকা বেড়ে ৮৫০ টাকা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ব্যাখ্যা, ক্রেতাদের ক্ষোভ
ফলের দাম বাড়ার বিষয়ে মতিঝিলের ফল ব্যবসায়ী সুলায়মান হোসেন বলেন, রমজান সামনে রেখে আড়ত পর্যায়েই কিছুটা দাম বাড়ানো হয়েছে, যার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে। নির্বাচনের কারণে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় অনেক পণ্য সময়মতো বাজারে আসেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
কিন্তু এসব ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন ক্রেতারা। শান্তিনগর কাঁচাবাজারে বেসরকারি চাকরিজীবী আহমেদ হোসেন বলেন, ‘শুনছি বন্দরে জাহাজ আছে, এলসি বেশি খোলা হয়েছে। কিন্তু বাজারে এসে দেখি দামই শুধু বাড়ছে। আমাদের আয় তো বাড়ছে না।’
একই বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আলী আজগর বলেন, নির্বাচনের সময় কয়েক দিন পরিবহন সীমিত থাকায় পণ্য সময়মতো বাজারে আসেনি, এতে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বেড়েছে।
কমলাপুর এজিবি কলোনী কাঁচাবাজারে দেখা হলে গৃহিণী আরিফা বেগম বলেন, অন্যান্য দেশে রমজান আসতে শুরু করলে দাম কমে যায়, কিন্তু বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র দেখা যায়। দুই দিন গাড়ি একটু কম চলেছে দেখেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা সুযোগ খোঁজে কখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যাতে দাম বাড়াতে পারে।
পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে নিত্যপণ্যবাহী ট্রাকসহ অন্য যানবাহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা গেলে রমজানজুড়ে বাজার স্থিতিশীল থাকবে বলে মনে করেন তারা।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির( এফবিসিসিআই) মতিঝিল কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব কথা বলেন ব্যবসায়ীরা। ওই সভায় অংশ নেওয়া খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ের বিভিন্ন বাজার সমিতির নেতারা জানান, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডালসহ অন্যান্য পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে দেশে। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখাতে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে চাঁদাবাজি রোধ করতে কর্তৃপক্ষকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তারা। পাশাপাশি তারা সাধারণ ভোক্তাদের প্রতি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য কিনে বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করার অনুরোধ জানান।
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, ‘মাত্র চার থেকে পাঁচটি কোম্পানি আটা, ছোলা, ভোজ্যতেল ও চিনির মতো পণ্য উৎপাদন, আমদানি এবং বিপণন নিয়ন্ত্রণ করছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা এসব বড় আমদানিকারকের কাছ থেকে পণ্য কিনে বাজারে বিক্রি করেন। অথচ মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরকার এসব বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা না করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানিকে জরিমানা করেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপমহাব্যবস্থাপক মো. তসলিম শাহরিয়ার বলেন,‘এবার মিলগেট পর্যায়ে প্রতি কেজি চিনির দাম ৯২ থেকে ৯৩ টাকা, যা গত বছরের চেয়ে অনেক কম। এবার আমরা যে পরিমাণ চিনি সরবরাহ করছি, তা মেঘনা গ্রুপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে নির্বাচনের কারণে সরকারি ছুটি ও বন্দরের আন্দোলনের প্রভাবে পণ্য সরবরাহে কিছুটা জটিলতা তৈরি হতে পারে।’
দাম বৃদ্ধি নিয়ে বিশ্লেষকদের শঙ্কা
রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষক এবং কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, এবার জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রোজায় এই সংকট আরও বাড়তে পারে। এ ছাড়া নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ‘ট্রানজিশন পিরিয়ডে’ বাজার তদারকি দুর্বল হতে পারে, যা অসাধু ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিতে পারে।
এলসি বেশি, তবুও সংকট
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রমজান উপলক্ষে চিনি, ছোলা, ডাল ও ভোজ্যতেলের এলসি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি খোলা হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পণ্যের কোনো প্রকৃত সংকট নেই; বরং সরবরাহের কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে।
আমদানির চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপণ্যের এলসি খোলার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার রোজায় চাহিদা বাড়ে-এমন আটটি পণ্যের এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রবিবার সিটিজেন জার্নালকে বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে নির্বাচনের আগেই গত বছর থেকে ৪০ শতাংশ বেশি ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হয়েছে, যা সরকারকে রমজানে স্বস্তি দেবে।
বাজার স্থিতিশীল থাকায় মূল্যস্ফীতিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে আশাবাদ প্রকাশ করে আরিফ হোসেন খান বলেন, আমদানিকারকেরা মজুত করা পণ্য সঠিকভাবে বিতরণ করলে কোনো পণ্যের ঘাটতি থাকবে না।
ছয় পণ্যের আমদানির চিত্র
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রমজান সামনে রেখে মৌসুমি চাহিদা মেটাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ও আমদানিকারকেরা ছয়টি নিত্যপণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সয়াবিন তেল আমদানি ৩৬ শতাংশ, চিনি ১১ শতাংশ, মসুর ডাল ৮৭ শতাংশ, ছোলা ২৭ শতাংশ, মটর ডাল ২৯৪ শতাংশ ও খেজুরের আমদানি ২৩১ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে মোট ৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার ও অক্টোবরে ৫ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। এই সময়ে ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৫ টন সয়াবিন তেল , ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৭২ টন চিনি , ৫০ হাজার ৩৫৫ টন ডাল এবং ৫৪ হাজার ৫১৬ টন ছোলা আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। এ ছাড়া একই সময়ে ১০ হাজার ১৬৫ টন খেজুর এবং ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮১০ টন মটর ডাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন সরকারের পদক্ষেপ কী হবে?
বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু খুচরা বাজারে অভিযান চালিয়ে সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। সরকারকে নজর দিতে হবে উৎসে। তাদের মতে, আমদানিকৃত পণ্য বন্দরে খালাসের পর কোথায় যাচ্ছে এবং কত দ্রুত বাজারে আসছে, সে বিষয়ে তদারকি বাড়াতে হবে।
এ বিষয়ে ক্যাবের সহসভাপতি নাজের হোসেইন বলেন, ‘দায়িত্ব নিয়েই নতুন সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর হয়ে যাবে। কারণ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক দিন পরেই রমজান শুরু হবে। ফলে তাদের সার্বিক বিষয়গুলো বুঝে উঠতে সময় লাগবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা খুবই চিন্তিত। যদিও ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছে। প্রচুর আমদানি করেছে, ফলে বাজারে কোন সংকট থাকার কথা নয়।’
তিনি আরও বলেন, নিত্যপণ্যের বাজার সব সময় আলোচনায় থাকে না। তদারকি মানেই হয়রানি না, এটা রুটিন চেক করার বিষয়। এটাকে মানতে হবে। তবে এ তদারকি হওয়া উচিত তিন পর্যায়ে অর্থাৎ আমদানিকারক বা উৎপাদনকারী, পাইকারি বিক্রেতা এবং খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আফরোজা রহমান বলেন, ঢাকা মহানগরসহ জেলা পর্যায়ে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। রমজান মাসে এই তদারকি আরও জোরদার করা হবে।

পর্যাপ্ত আমদানির পরেও রমজানের আগে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম
মরিয়ম সেঁজুতি

পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে বাজারে কিছু নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। অথচ এই মাসে অধিক চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভোগ্যপণ্যের আমদানি গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে সরকার। রোজা শুরুর আগেই এভাবে দাম বাড়ায় সাধারণ ক্রেতারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রমজান ঘিরে পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। তবে পর্যাপ্ত এলসি খোলার পরেও বাজারে ছোলা, ভোজ্যতেল, ফল, সবজি ও খেজুরের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে খেজুরের দাম ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
আমদানিকারকদের একটি অংশ এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজার এখনও অদৃশ্য সিন্ডিকেট’-এর নিয়ন্ত্রণে। এ কারণে রমজানের আগেই কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে।
আবার কয়েকজন ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে যথাসময়ে পণ্য খালাস না হওয়ায় এবং নির্বাচন উপলক্ষে ছুটি থাকায় পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এ কারণে বাজারে পণ্যের সাময়িক ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
রমজানের আগে বাজারের চিত্র
রবি, সোম ও মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর ও মালিবাগ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দাম বাড়ার কারণে রমজানে খেজুর সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। এ কারণে গত ডিসেম্বর খেজুর আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এতে আমদানি বাড়বে এবং দাম কমবে বলে আশা করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে বাজারে দাম উল্টো বেড়েছে, যা ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। শুল্ক কমানো সত্ত্বেও সাধারণ মানের জাহিদি খেজুর এখন ২৮০-৩০০ টাকা কেজি, যা গত সপ্তাহেও ২৫০ টাকার আশপাশে ছিল। অন্যান্য খেজুরের মধ্যে বড়ই ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা, দাবাস ৭০০ টাকা, কালমি ৭০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, মরিয়ম ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং মেডজুল খেজুর কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যান্য ফলের দামও বাড়তি
রমজান শুরুর আগেই নানা অজুহাতে বিভিন্ন ফলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। প্রতি কেজি আপেল ২৬০ থেকে ৩৫০ টাকা, কমলা ২৪০ থেকে ৩৫০ টাকা, মাল্টা ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, সাদা আঙুর ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকা, কালো আঙুর ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং আনার ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বেড়েছে মুরগি ও গরুর মাংসের দাম
প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা ছাড়িয়েছে, আর সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকায়। গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ১০০ টাকা বেড়ে ৮৫০ টাকা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ব্যাখ্যা, ক্রেতাদের ক্ষোভ
ফলের দাম বাড়ার বিষয়ে মতিঝিলের ফল ব্যবসায়ী সুলায়মান হোসেন বলেন, রমজান সামনে রেখে আড়ত পর্যায়েই কিছুটা দাম বাড়ানো হয়েছে, যার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে। নির্বাচনের কারণে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় অনেক পণ্য সময়মতো বাজারে আসেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
কিন্তু এসব ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন ক্রেতারা। শান্তিনগর কাঁচাবাজারে বেসরকারি চাকরিজীবী আহমেদ হোসেন বলেন, ‘শুনছি বন্দরে জাহাজ আছে, এলসি বেশি খোলা হয়েছে। কিন্তু বাজারে এসে দেখি দামই শুধু বাড়ছে। আমাদের আয় তো বাড়ছে না।’
একই বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আলী আজগর বলেন, নির্বাচনের সময় কয়েক দিন পরিবহন সীমিত থাকায় পণ্য সময়মতো বাজারে আসেনি, এতে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বেড়েছে।
কমলাপুর এজিবি কলোনী কাঁচাবাজারে দেখা হলে গৃহিণী আরিফা বেগম বলেন, অন্যান্য দেশে রমজান আসতে শুরু করলে দাম কমে যায়, কিন্তু বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র দেখা যায়। দুই দিন গাড়ি একটু কম চলেছে দেখেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা সুযোগ খোঁজে কখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যাতে দাম বাড়াতে পারে।
পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে নিত্যপণ্যবাহী ট্রাকসহ অন্য যানবাহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা গেলে রমজানজুড়ে বাজার স্থিতিশীল থাকবে বলে মনে করেন তারা।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির( এফবিসিসিআই) মতিঝিল কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব কথা বলেন ব্যবসায়ীরা। ওই সভায় অংশ নেওয়া খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ের বিভিন্ন বাজার সমিতির নেতারা জানান, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডালসহ অন্যান্য পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে দেশে। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখাতে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে চাঁদাবাজি রোধ করতে কর্তৃপক্ষকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তারা। পাশাপাশি তারা সাধারণ ভোক্তাদের প্রতি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য কিনে বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করার অনুরোধ জানান।
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, ‘মাত্র চার থেকে পাঁচটি কোম্পানি আটা, ছোলা, ভোজ্যতেল ও চিনির মতো পণ্য উৎপাদন, আমদানি এবং বিপণন নিয়ন্ত্রণ করছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা এসব বড় আমদানিকারকের কাছ থেকে পণ্য কিনে বাজারে বিক্রি করেন। অথচ মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরকার এসব বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা না করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানিকে জরিমানা করেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপমহাব্যবস্থাপক মো. তসলিম শাহরিয়ার বলেন,‘এবার মিলগেট পর্যায়ে প্রতি কেজি চিনির দাম ৯২ থেকে ৯৩ টাকা, যা গত বছরের চেয়ে অনেক কম। এবার আমরা যে পরিমাণ চিনি সরবরাহ করছি, তা মেঘনা গ্রুপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে নির্বাচনের কারণে সরকারি ছুটি ও বন্দরের আন্দোলনের প্রভাবে পণ্য সরবরাহে কিছুটা জটিলতা তৈরি হতে পারে।’
দাম বৃদ্ধি নিয়ে বিশ্লেষকদের শঙ্কা
রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষক এবং কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, এবার জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রোজায় এই সংকট আরও বাড়তে পারে। এ ছাড়া নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ‘ট্রানজিশন পিরিয়ডে’ বাজার তদারকি দুর্বল হতে পারে, যা অসাধু ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিতে পারে।
এলসি বেশি, তবুও সংকট
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রমজান উপলক্ষে চিনি, ছোলা, ডাল ও ভোজ্যতেলের এলসি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি খোলা হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পণ্যের কোনো প্রকৃত সংকট নেই; বরং সরবরাহের কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে।
আমদানির চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপণ্যের এলসি খোলার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার রোজায় চাহিদা বাড়ে-এমন আটটি পণ্যের এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রবিবার সিটিজেন জার্নালকে বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে নির্বাচনের আগেই গত বছর থেকে ৪০ শতাংশ বেশি ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হয়েছে, যা সরকারকে রমজানে স্বস্তি দেবে।
বাজার স্থিতিশীল থাকায় মূল্যস্ফীতিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে আশাবাদ প্রকাশ করে আরিফ হোসেন খান বলেন, আমদানিকারকেরা মজুত করা পণ্য সঠিকভাবে বিতরণ করলে কোনো পণ্যের ঘাটতি থাকবে না।
ছয় পণ্যের আমদানির চিত্র
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রমজান সামনে রেখে মৌসুমি চাহিদা মেটাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ও আমদানিকারকেরা ছয়টি নিত্যপণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সয়াবিন তেল আমদানি ৩৬ শতাংশ, চিনি ১১ শতাংশ, মসুর ডাল ৮৭ শতাংশ, ছোলা ২৭ শতাংশ, মটর ডাল ২৯৪ শতাংশ ও খেজুরের আমদানি ২৩১ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে মোট ৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার ও অক্টোবরে ৫ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। এই সময়ে ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৫ টন সয়াবিন তেল , ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৭২ টন চিনি , ৫০ হাজার ৩৫৫ টন ডাল এবং ৫৪ হাজার ৫১৬ টন ছোলা আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। এ ছাড়া একই সময়ে ১০ হাজার ১৬৫ টন খেজুর এবং ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮১০ টন মটর ডাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন সরকারের পদক্ষেপ কী হবে?
বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু খুচরা বাজারে অভিযান চালিয়ে সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। সরকারকে নজর দিতে হবে উৎসে। তাদের মতে, আমদানিকৃত পণ্য বন্দরে খালাসের পর কোথায় যাচ্ছে এবং কত দ্রুত বাজারে আসছে, সে বিষয়ে তদারকি বাড়াতে হবে।
এ বিষয়ে ক্যাবের সহসভাপতি নাজের হোসেইন বলেন, ‘দায়িত্ব নিয়েই নতুন সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর হয়ে যাবে। কারণ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক দিন পরেই রমজান শুরু হবে। ফলে তাদের সার্বিক বিষয়গুলো বুঝে উঠতে সময় লাগবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা খুবই চিন্তিত। যদিও ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছে। প্রচুর আমদানি করেছে, ফলে বাজারে কোন সংকট থাকার কথা নয়।’
তিনি আরও বলেন, নিত্যপণ্যের বাজার সব সময় আলোচনায় থাকে না। তদারকি মানেই হয়রানি না, এটা রুটিন চেক করার বিষয়। এটাকে মানতে হবে। তবে এ তদারকি হওয়া উচিত তিন পর্যায়ে অর্থাৎ আমদানিকারক বা উৎপাদনকারী, পাইকারি বিক্রেতা এবং খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আফরোজা রহমান বলেন, ঢাকা মহানগরসহ জেলা পর্যায়ে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। রমজান মাসে এই তদারকি আরও জোরদার করা হবে।




