তীব্র গ্যাস সংকট, সহসাই মিলছে না স্বস্তি

তীব্র গ্যাস সংকট, সহসাই মিলছে না স্বস্তি
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট দেখা গিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায়। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে রাজধানীর একের পর এক বন্ধ হচ্ছে সিএনজি স্টেশন। একইসঙ্গে বাসাবাড়িতে দিনের বড় একটি সময় গ্যাস না থাকায় রান্নাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এছাড়া গ্যাস সংকটে শিল্প কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে ৩০০ কোটি ঘনফুট পেলে মোটামুটি চাহিদা মেটানো যায়। কিন্তু গত বছর থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। বর্তমানে টার্মিনালটির মেরামতকাজ শুরু হলেও চলতি মাসে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে সহসাই কাটছে না দেশের গ্যাস সংকট।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, টার্মিনালের বয়লার থেকে বের হওয়া সিগন্যালবাহী বৈদ্যুতিক তারে শর্টসার্কিট থেকে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। বর্তমানে বিদেশি প্রকৌশলীরা এটির মেরামত কাজ শুরু করেছেন। তবে চলতি সপ্তাহে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই।
পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গ্যাসের এ সংকট তৈরি হয়েছে। মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। তবে চলতি মাসের মধ্যে তা ঠিক হবে না, আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
গ্যাসের চুলা জ্বলে না, বিকল্পেই ভরসা
সংকটের বাসাবাড়িতে লাইনের গ্যাস যেন এখন সোনার হরিণ। সকাল হলেই অধিকাংশ এলাকায় চুলার তেজ কমে একদম নিভে যায়। দুপুর বা বিকেলের দিকে কিছুটা দেখা মিললেও তা দিয়ে এক পাতিল পানি ফোটাতেও লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন গৃহিণীরা। ছোট বাচ্চা কিংবা প্রবীণদের সময়মতো খাবার তৈরি করে দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই ঝুঁকছেন মাটির চুলা, ইলেকট্রিক ইনডাকশন বা এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে। তবে হঠাৎ বাজারে সিলিন্ডারের চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হয়েছে।
খিলগাও সি ব্লক এলাকার গৃহিনী ফারজানা আক্তার সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, গত তিন দিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। রাত ১১ টার পরে একটু একটু করে গ্যাসি আসে। ভোর ৬ টা পর্যন্ত থাকে। এরপর গ্যাস চলে যায়। সারাদিনে আর গ্যাসের দেখা পাওয়া যায় না।
নারায়নগঞ্জ বন্দর এলাকার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ লাল মালী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৫ দিন ধরে গ্যাসের সংকট। রাতে আসে, সকালে চলে যায়। অগত্যা হোটেলেই সকাল, দুপুর আর রাতের খাবার খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, হোটেলেও গ্যাসের সমস্যা। ফলে গ্যাসের জন্য অনেকটাই খারাপ অবস্থায় আছি।
ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন
রাজধানীতে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যাত্রাবাড়ী, সাইনবোর্ড, শ্যামপুর, মাতুয়াইল ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে শত শত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেক চালক পর্যাপ্ত গ্যাস পাননি। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকাগুলোতেও গ্যাসের স্বল্পচাপে রান্নাবান্না ব্যাহত হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ইউনাইটেড সিএনজি স্টেশন, স্পিডবার্ড সিএনজি স্টেশন, টোটাল সিএনজি লিমিটেড, ডব্লিউ জেড সিএনজি অ্যান্ড সার্ভিসিং এবং আসমা আলী সিএনজি ফুয়েলিং অ্যান্ড ওয়ার্কশপে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার দীর্ঘ লাইন পড়ে। অনেক স্টেশনে দেড়শ থেকে দুই শতাধিক গাড়ি দুই থেকে তিন ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
উত্তরা থেকে গ্যাস নিতে আসা প্রাইভেটকার চালক আল-আমিন বলেন, উত্তরায় গ্যাস না পেয়ে রায়েরবাগের ইউনাইটেড সিএনজি স্টেশনে এসেছেন। কিন্তু সেখানেও দীর্ঘ লাইনে অন্তত এক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
উবারচালক জাকির হোসেন বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস না পাওয়ায় তিনি মাতুয়াইলের একটি স্টেশনে আসেন। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর মাত্র আড়াইশ টাকার গ্যাস পেয়েছেন, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে সাত থেকে আটশ টাকার গ্যাস নেওয়া যেত।
অটোরিকশাচালক শুক্কুর আলী জানান, আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি মাত্র ১২০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন। আগে একই সময়ে আড়াইশ থেকে তিনশ টাকার গ্যাস নেওয়া সম্ভব হতো।
স্টেশন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইউনাইটেড সিএনজি স্টেশনের ক্যাশিয়ার রাজু বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিক সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না।
সমস্যা সমাধানে করণীয়
এ সংকট দূর করতে একগুচ্ছ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত দেশে গ্যাস অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত পাইপলাইনের অবৈধ সংযোগ দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে সিস্টেম লস কমাতে হবে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সৌরশক্তি কিংবা অন্যান্য বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
রান্নাঘর প্রতিটি পরিবারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই রান্নাঘরের আগুন যদি দিনের পর দিন বন্ধ থাকে, তবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে দাঁড়ায়। সাধারণ নাগরিকদের জীবনের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে এবং এই নিত্যদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে প্রশাসনিক পর্যায় থেকে দ্রুত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট দেখা গিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায়। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে রাজধানীর একের পর এক বন্ধ হচ্ছে সিএনজি স্টেশন। একইসঙ্গে বাসাবাড়িতে দিনের বড় একটি সময় গ্যাস না থাকায় রান্নাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এছাড়া গ্যাস সংকটে শিল্প কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে ৩০০ কোটি ঘনফুট পেলে মোটামুটি চাহিদা মেটানো যায়। কিন্তু গত বছর থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। বর্তমানে টার্মিনালটির মেরামতকাজ শুরু হলেও চলতি মাসে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে সহসাই কাটছে না দেশের গ্যাস সংকট।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, টার্মিনালের বয়লার থেকে বের হওয়া সিগন্যালবাহী বৈদ্যুতিক তারে শর্টসার্কিট থেকে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। বর্তমানে বিদেশি প্রকৌশলীরা এটির মেরামত কাজ শুরু করেছেন। তবে চলতি সপ্তাহে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই।
পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গ্যাসের এ সংকট তৈরি হয়েছে। মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। তবে চলতি মাসের মধ্যে তা ঠিক হবে না, আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
গ্যাসের চুলা জ্বলে না, বিকল্পেই ভরসা
সংকটের বাসাবাড়িতে লাইনের গ্যাস যেন এখন সোনার হরিণ। সকাল হলেই অধিকাংশ এলাকায় চুলার তেজ কমে একদম নিভে যায়। দুপুর বা বিকেলের দিকে কিছুটা দেখা মিললেও তা দিয়ে এক পাতিল পানি ফোটাতেও লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন গৃহিণীরা। ছোট বাচ্চা কিংবা প্রবীণদের সময়মতো খাবার তৈরি করে দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই ঝুঁকছেন মাটির চুলা, ইলেকট্রিক ইনডাকশন বা এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে। তবে হঠাৎ বাজারে সিলিন্ডারের চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হয়েছে।
খিলগাও সি ব্লক এলাকার গৃহিনী ফারজানা আক্তার সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, গত তিন দিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। রাত ১১ টার পরে একটু একটু করে গ্যাসি আসে। ভোর ৬ টা পর্যন্ত থাকে। এরপর গ্যাস চলে যায়। সারাদিনে আর গ্যাসের দেখা পাওয়া যায় না।
নারায়নগঞ্জ বন্দর এলাকার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ লাল মালী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৫ দিন ধরে গ্যাসের সংকট। রাতে আসে, সকালে চলে যায়। অগত্যা হোটেলেই সকাল, দুপুর আর রাতের খাবার খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, হোটেলেও গ্যাসের সমস্যা। ফলে গ্যাসের জন্য অনেকটাই খারাপ অবস্থায় আছি।
ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন
রাজধানীতে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যাত্রাবাড়ী, সাইনবোর্ড, শ্যামপুর, মাতুয়াইল ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে শত শত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেক চালক পর্যাপ্ত গ্যাস পাননি। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকাগুলোতেও গ্যাসের স্বল্পচাপে রান্নাবান্না ব্যাহত হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ইউনাইটেড সিএনজি স্টেশন, স্পিডবার্ড সিএনজি স্টেশন, টোটাল সিএনজি লিমিটেড, ডব্লিউ জেড সিএনজি অ্যান্ড সার্ভিসিং এবং আসমা আলী সিএনজি ফুয়েলিং অ্যান্ড ওয়ার্কশপে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার দীর্ঘ লাইন পড়ে। অনেক স্টেশনে দেড়শ থেকে দুই শতাধিক গাড়ি দুই থেকে তিন ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
উত্তরা থেকে গ্যাস নিতে আসা প্রাইভেটকার চালক আল-আমিন বলেন, উত্তরায় গ্যাস না পেয়ে রায়েরবাগের ইউনাইটেড সিএনজি স্টেশনে এসেছেন। কিন্তু সেখানেও দীর্ঘ লাইনে অন্তত এক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
উবারচালক জাকির হোসেন বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস না পাওয়ায় তিনি মাতুয়াইলের একটি স্টেশনে আসেন। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর মাত্র আড়াইশ টাকার গ্যাস পেয়েছেন, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে সাত থেকে আটশ টাকার গ্যাস নেওয়া যেত।
অটোরিকশাচালক শুক্কুর আলী জানান, আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি মাত্র ১২০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন। আগে একই সময়ে আড়াইশ থেকে তিনশ টাকার গ্যাস নেওয়া সম্ভব হতো।
স্টেশন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইউনাইটেড সিএনজি স্টেশনের ক্যাশিয়ার রাজু বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিক সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না।
সমস্যা সমাধানে করণীয়
এ সংকট দূর করতে একগুচ্ছ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত দেশে গ্যাস অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত পাইপলাইনের অবৈধ সংযোগ দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে সিস্টেম লস কমাতে হবে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সৌরশক্তি কিংবা অন্যান্য বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
রান্নাঘর প্রতিটি পরিবারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই রান্নাঘরের আগুন যদি দিনের পর দিন বন্ধ থাকে, তবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে দাঁড়ায়। সাধারণ নাগরিকদের জীবনের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে এবং এই নিত্যদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে প্রশাসনিক পর্যায় থেকে দ্রুত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

তীব্র গ্যাস সংকট, সহসাই মিলছে না স্বস্তি
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট দেখা গিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায়। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে রাজধানীর একের পর এক বন্ধ হচ্ছে সিএনজি স্টেশন। একইসঙ্গে বাসাবাড়িতে দিনের বড় একটি সময় গ্যাস না থাকায় রান্নাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এছাড়া গ্যাস সংকটে শিল্প কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে ৩০০ কোটি ঘনফুট পেলে মোটামুটি চাহিদা মেটানো যায়। কিন্তু গত বছর থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। বর্তমানে টার্মিনালটির মেরামতকাজ শুরু হলেও চলতি মাসে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে সহসাই কাটছে না দেশের গ্যাস সংকট।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, টার্মিনালের বয়লার থেকে বের হওয়া সিগন্যালবাহী বৈদ্যুতিক তারে শর্টসার্কিট থেকে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। বর্তমানে বিদেশি প্রকৌশলীরা এটির মেরামত কাজ শুরু করেছেন। তবে চলতি সপ্তাহে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই।
পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গ্যাসের এ সংকট তৈরি হয়েছে। মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। তবে চলতি মাসের মধ্যে তা ঠিক হবে না, আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
গ্যাসের চুলা জ্বলে না, বিকল্পেই ভরসা
সংকটের বাসাবাড়িতে লাইনের গ্যাস যেন এখন সোনার হরিণ। সকাল হলেই অধিকাংশ এলাকায় চুলার তেজ কমে একদম নিভে যায়। দুপুর বা বিকেলের দিকে কিছুটা দেখা মিললেও তা দিয়ে এক পাতিল পানি ফোটাতেও লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন গৃহিণীরা। ছোট বাচ্চা কিংবা প্রবীণদের সময়মতো খাবার তৈরি করে দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই ঝুঁকছেন মাটির চুলা, ইলেকট্রিক ইনডাকশন বা এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে। তবে হঠাৎ বাজারে সিলিন্ডারের চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হয়েছে।
খিলগাও সি ব্লক এলাকার গৃহিনী ফারজানা আক্তার সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, গত তিন দিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। রাত ১১ টার পরে একটু একটু করে গ্যাসি আসে। ভোর ৬ টা পর্যন্ত থাকে। এরপর গ্যাস চলে যায়। সারাদিনে আর গ্যাসের দেখা পাওয়া যায় না।
নারায়নগঞ্জ বন্দর এলাকার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ লাল মালী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৫ দিন ধরে গ্যাসের সংকট। রাতে আসে, সকালে চলে যায়। অগত্যা হোটেলেই সকাল, দুপুর আর রাতের খাবার খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, হোটেলেও গ্যাসের সমস্যা। ফলে গ্যাসের জন্য অনেকটাই খারাপ অবস্থায় আছি।
ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন
রাজধানীতে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যাত্রাবাড়ী, সাইনবোর্ড, শ্যামপুর, মাতুয়াইল ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে শত শত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেক চালক পর্যাপ্ত গ্যাস পাননি। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকাগুলোতেও গ্যাসের স্বল্পচাপে রান্নাবান্না ব্যাহত হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ইউনাইটেড সিএনজি স্টেশন, স্পিডবার্ড সিএনজি স্টেশন, টোটাল সিএনজি লিমিটেড, ডব্লিউ জেড সিএনজি অ্যান্ড সার্ভিসিং এবং আসমা আলী সিএনজি ফুয়েলিং অ্যান্ড ওয়ার্কশপে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার দীর্ঘ লাইন পড়ে। অনেক স্টেশনে দেড়শ থেকে দুই শতাধিক গাড়ি দুই থেকে তিন ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
উত্তরা থেকে গ্যাস নিতে আসা প্রাইভেটকার চালক আল-আমিন বলেন, উত্তরায় গ্যাস না পেয়ে রায়েরবাগের ইউনাইটেড সিএনজি স্টেশনে এসেছেন। কিন্তু সেখানেও দীর্ঘ লাইনে অন্তত এক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
উবারচালক জাকির হোসেন বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস না পাওয়ায় তিনি মাতুয়াইলের একটি স্টেশনে আসেন। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর মাত্র আড়াইশ টাকার গ্যাস পেয়েছেন, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে সাত থেকে আটশ টাকার গ্যাস নেওয়া যেত।
অটোরিকশাচালক শুক্কুর আলী জানান, আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি মাত্র ১২০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন। আগে একই সময়ে আড়াইশ থেকে তিনশ টাকার গ্যাস নেওয়া সম্ভব হতো।
স্টেশন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইউনাইটেড সিএনজি স্টেশনের ক্যাশিয়ার রাজু বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিক সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না।
সমস্যা সমাধানে করণীয়
এ সংকট দূর করতে একগুচ্ছ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত দেশে গ্যাস অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত পাইপলাইনের অবৈধ সংযোগ দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে সিস্টেম লস কমাতে হবে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সৌরশক্তি কিংবা অন্যান্য বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
রান্নাঘর প্রতিটি পরিবারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই রান্নাঘরের আগুন যদি দিনের পর দিন বন্ধ থাকে, তবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে দাঁড়ায়। সাধারণ নাগরিকদের জীবনের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে এবং এই নিত্যদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে প্রশাসনিক পর্যায় থেকে দ্রুত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

গ্যাস সংকট: মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে এবার তারেক রহমানের ফোন
গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারে দুইটি রিগ কেনার উদ্যোগ
গ্যাস-সংকটের সঙ্গে বেড়েছে লোডশেডিং, ভোগান্তিতে গ্রাহক






