শিরোনাম

কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, উৎপাদন ছাড়ালো ৬০০ মেগাওয়াট

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, উৎপাদন ছাড়ালো ৬০০ মেগাওয়াট
হা-মীম গ্রুপের একটি কারখানা স্থাপন করা হয়েছে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল

দেশের শিল্পকারখানায় জ্বালানি সংকট, বিদ্যুতের বাড়তি খরচ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাহিদা পূরণে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়ছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও নিজেদের কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে তৎপর হয়েছে।

ডিবিএল গ্রুপ ইতিমধ্যে তাদের ৭টি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানার ছাদে ৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছে। আরও ১০টি কারখানায় ১৬ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট বসানোর পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে চলতি বছর ৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে আসার কথা।

প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম বলেন, জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাহিদা পূরণে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে খরচ পড়ছে প্রায় ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে আবুল খায়ের স্টিল, ওয়ালটন, হা-মীম গ্রুপ, প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ, বিএসআরএম, ইয়ংওয়ান গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই), প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ, টিম গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, রাইজিং গ্রুপ, ঊর্মি গ্রুপ, মাইক্রোফাইবার গ্রুপ, পলমল গ্রুপ, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, কর্ণফুলী শু ইন্ডাস্ট্রিজ, মাসকো গ্রুপসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের কারখানায় বিভিন্ন ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে।

সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরেই শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সবচেয়ে বেশি হয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদনক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এর বড় অংশই রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানায়।

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সাধারণত একটি কারখানার পুরো বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তবে দিনের কয়েক ঘণ্টা কারখানার কার্যক্রম চালাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক প্রতিষ্ঠানে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ থেকে পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো কারখানায় এই হার আরও বেশি। ফলে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কিছুটা কমছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) গত ৪ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সরকারি হিসাবে দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ক্ষমতা ৪১৮ মেগাওয়াট। তবে ২৩৯টি বড় শিল্পকারখানার তথ্য বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি দেখেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুতের প্রকৃত সক্ষমতা ৬৬৭ মেগাওয়াট। ছোট স্থাপনাগুলোও হিসাবে আনলে দেশের মোট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ১ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ২০টি কারখানায় ইতিমধ্যে ৩৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। প্রতিষ্ঠানটি মোট ১০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। চলতি বছর আরও প্রায় ৩০ মেগাওয়াট যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুটি কারখানা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ করা হচ্ছে।

আকিজ বশির গ্রুপের জনতা জুট মিলে ২১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এতে পাটকলটির পুরো বিদ্যুৎ চাহিদা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ হচ্ছে। হবিগঞ্জে আকিজ গ্লাসের ছাদে ১৩ মেগাওয়াটের ইউনিট বসানো হয়েছে। যার ৮ মেগাওয়াট ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা এখন ৭৫ মেগাওয়াট। আরও ২৮ মেগাওয়াট যোগ করার কাজ চলছে।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের বিভিন্ন কারখানায় বর্তমানে ৬৪ দশমিক ৮৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা রয়েছে। আরও ৫০ মেগাওয়াট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। তা বাস্তবায়িত হলে তাদের মোট সক্ষমতা প্রায় ১১৫ মেগাওয়াটে দাঁড়াবে।

খরচের দিক থেকেও সৌরবিদ্যুৎ শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। বর্তমানে বড় শিল্পে গ্রিডের বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম প্রায় ১২ টাকা ৮৫ পয়সা। সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে তা ১৬ টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। বিপরীতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে খরচ হচ্ছে প্রায় ৪ থেকে ৮ টাকা। একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর কার্যকর থাকে।

এদিকে, বিজিএমইএর ৪২৪টি কারখানার ওপর করা জরিপে সব উদ্যোক্তাই ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহ দেখালেও অর্থের সংকটকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

শিল্পমালিকদের মতে, কম সুদে ঋণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধসুবিধা দেওয়া গেলে মাঝারি ও ছোট কারখানাগুলোকেও এই ব্যবস্থায় আনা সম্ভব।

বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বেশ কিছু সুবিধা দিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সৌরবিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপকরণ আমদানিতে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও আগাম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ১৫ শতাংশ কমতে পারে। বর্তমানে এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে যেখানে প্রায় ৪ কোটি টাকা লাগে, তা কমে সাড়ে ৩ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে।

সিপিডির এক সমীক্ষায় জানা গেছে, দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার ছাদে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫০০টি কারখানা ইতিমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য প্রস্তুত। আরও প্রায় ১ হাজার ৩০০ কারখানায় প্রয়োজনীয় সুবিধা দিলে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পকারখানার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় জ্বালানি সংকটের একক সমাধান নয়। তবে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে নেওয়ার সরকারি লক্ষ্য পূরণেও শিল্পকারখানার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

/এসবি/