শিরোনাম

জ্বালানি সংকট সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে: ড. দেবপ্রিয়

নিজস্ব প্রতিবেদক
জ্বালানি সংকট সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে: ড. দেবপ্রিয়
‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে ভাবনা’ শীর্ষক সংলাপ। ছবি: সংগৃহীত

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ বিপর্যয় ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এর সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, চলমান জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে এবং দেশের নীতিগত কাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে।

তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সংকটের ফলে রাজস্ব স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি সব ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বাড়ছে।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ঢাকার ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজিস, বাংলাদেশ আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে ভাবনা’ শীর্ষক সংলাপে এই মন্তব্য করেন তিনি।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘জ্বালানি ধাক্কা এমন একটি নীতিগত পরিবেশে এসেছে, যেখানে সরকারের প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা সীমিত।’

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তির কিছু বিধান বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি কৌশলকে সীমিত করছে। ‘নিষেধাজ্ঞা সমন্বয় এবং ‘নন-মার্কেট কান্ট্রি’ সংক্রান্ত ধারার কারণে তুলনামূলক সস্তা উৎস, যেমন রাশিয়ার তেল, ব্যবহার করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ছাড় নিতে হয়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি দামের অস্থিরতার সময় আমাদের ক্রয় সুবিধা কমে গেছে।’

ত্রিমুখী ম্যাক্রো প্রভাবের কথা উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান সংকট রাজস্ব, বৈদেশিক এবং মুদ্রানীতি—এই তিনটি ক্ষেত্রে একযোগে প্রভাব ফেলছে। বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কর্মসূচির সংস্কারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করছে। নির্ধারিত সময়ে ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণের আইএমএফ শর্ত পূরণ এবং বড় ভর্তুকি বজায় রাখার মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, বৈদেশিক খাতে জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি বছরে প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় সৃষ্টি করতে পারে, যা জিডিপির প্রায় ১.১ শতাংশের সমান। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে টাকার ওপর অবমূল্যায়নের চাপ সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চলের সম্ভাব্য অস্থিরতার কারণে, যেখানে মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেক আসে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘রাজস্ব সুরক্ষায় বিদ্যমান জ্বালানি কর কাঠামো বজায় রাখা হবে, নাকি ভোক্তাদের বোঝা কমাতে তা হ্রাস করা হবে—এই দ্বিধায় সরকার পড়েছে।’

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) প্রায় ৫৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার আর্থিক ঘাটতি সামাল দিতে জেট ফুয়েলের ক্ষেত্রে কিছু মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক দামের পুরো প্রভাব দেশীয় বাজারে প্রয়োগ করলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ড. ভট্টাচার্য বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে জিডিপির প্রায় ২২.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জ্বালানি খাতে অনিশ্চয়তা ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এমন নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যা রাজস্ব শৃঙ্খলা, বৈদেশিক স্থিতিশীলতা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবে। সতর্কভাবে পরিস্থিতি সামাল না দিলে জ্বালানি সংকট আরও বড় ধরনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে।

/টিই/