বাংলাদেশিদের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ৬৪৬ ডলার

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
বাংলাদেশিদের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ৬৪৬ ডলার
প্রতীকী ছবি ২০২৫ সাল শেষে বাংলাদেশের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৪৬ ডলার

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সাল শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। জনসংখ্যার ভিত্তিতে হিসাব করলে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬৪৬ ডলার। আগের বছরের তুলনায় দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

গত ৫ নভেম্বর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘আন্তর্জাতিক ঋণ প্রতিবেদন ২০২৬’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ প্রায় তিন গুণ হয়েছে। ২০১৫ সালে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৮ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার।

দেশটির ১৭ কোটি ৫৭ লাখ জনসংখ্যার ভিত্তিতে মোট বৈদেশিক ঋণ ভাগ করে মাথাপিছু ৬৪৬ ডলারের হিসাব পাওয়া গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগতভাবে এই পরিমাণ ঋণ রয়েছে। এটি দেশের মোট বৈদেশিক দায়ের একটি গড় হিসাব।

২০২৫ সাল শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ ছিল ৮৯ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের অ-গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ ছিল ৯ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ ১৪ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার।

সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের মধ্যে বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের পাওনা ৫১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া বেসরকারি ঋণদাতাদের পাওনা ৫ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার।

বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) পাওনা সবচেয়ে বেশি, ২২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। এডিবির পাওনা ১৭ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক ঋণদাতার পাওনা ১০ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার।

দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাওনাদার জাপান। দেশটির কাছে বাংলাদেশের ঋণ ১২ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে রাশিয়া, যার পাওনা ৯ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার। অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতার কাছে বাংলাদেশের ঋণ ১০ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ মোট রপ্তানি আয়ের ২১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫ সালের তুলনায় এই হার বেড়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) তুলনায় বৈদেশিক ঋণের অনুপাত ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ২৪ শতাংশ হয়েছে।

তবে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে কয়েকটি সূচকে কিছুটা স্বস্তির চিত্র দেখা গেছে। রপ্তানি আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের অনুপাত ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে। অন্যদিকে মোট জাতীয় আয়ের বিপরীতে ঋণ পরিশোধের হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ২ শতাংশ হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে বেশি বাংলাদেশের মাথাপিছু ঋণ

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৫৫ বিলিয়ন ডলার। এসব দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬৯ কোটি ২০ লাখ ধরে হিসাব করলে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৬৪ ডলার। সে হিসাবে বাংলাদেশের মাথাপিছু ঋণ আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে বেশি।

এই হিসাবের আওতায় রয়েছে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দেশগুলোর সম্মিলিত বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মোট জাতীয় আয়ের ২১ শতাংশের সমান ছিল তাদের সম্মিলিত বৈদেশিক ঋণ। আর রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে ঋণ পরিশোধে।

দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ভারত ও নেপালের চেয়ে বেশি। ভারতে এই পরিমাণ প্রায় ৫২২ ডলার এবং নেপালে ৪০১ ডলার। তবে শ্রীলঙ্কায় মাথাপিছু ঋণ প্রায় ২ হাজার ৬৪৫ ডলার, ভুটানে ৪ হাজার ২১৮ ডলার এবং মালদ্বীপে ৮ হাজার ৯৫৭ ডলার।

আঞ্চলিক মোট বৈদেশিক ঋণের সবচেয়ে বড় অংশ ভারতের। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৭৬৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে বাংলাদেশ, ১১৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার এবং শ্রীলঙ্কা, ৫৭ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার।

প্রতিবেদনে পাকিস্তানকে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটির মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল ১৩৫ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। ২৫ কোটি ৫২ লাখ জনসংখ্যার ভিত্তিতে দেশটির মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫২৯ ডলার।

একই আঞ্চলিক শ্রেণিতে থাকা আফগানিস্তানের বৈদেশিক ঋণ ছিল ৩ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। দেশটির নিবন্ধিত জনসংখ্যা ৪ কোটি ৩৮ লাখ।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণ ছাড়াল ৯ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মোট বৈদেশিক ঋণ ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২১ সালের পর এটিই এক বছরে ঋণ বৃদ্ধির সর্বোচ্চ হার।

এ সময়ে এসব দেশ ঋণের আসল ও সুদ বাবদ মোট ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। টানা পাঁচ বছর ধরে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়ার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান পরিসংখ্যানবিদ ও উন্নয়ন তথ্য বিভাগের পরিচালক হাইশান ফু বলেন, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ফিরে আসা ইতিবাচক। তবে এসব দেশকে একদিকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে, অন্যদিকে পরিশোধও করতে হচ্ছে বেশি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ অবশিষ্ট থাকছে না।

বিশ্বব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার যোগ্য দেশগুলোর ঋণের বোঝা আরও দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালে এসব দেশের বৈদেশিক ঋণ ৮ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

/এমআর/