শিরোনাম

৫৭৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ

বসুন্ধরা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদক
বসুন্ধরা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুদক
আহমেদ আকবর সোবহান। ছবি: সংগৃহীত

ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ৫৭৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

বসুন্ধরা চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের পাশাপাশি আসামির তালিকায় থাকছেন তার ছেলে বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফিয়াত সোবহান এবং পরিচালক ময়নাল হোসাইন চৌধুরী।

এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক পরিচালক পারভীন হক শিকদার, রিক হক শিকদার, রন হক শিকদার এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোস্তাক আহমেদ সি এম আহমেদকেও মামলার আসামি করা হচ্ছে।

দুদকের অভিযোগ, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ব্যাংকের প্রচলিত নিয়ম লঙ্ঘন করে অপ্রতুল জামানত, ফিক্সড ও ফ্লোটিং চার্জ এবং ফোর্টনাইট স্টক রিপোর্ট ছাড়াই ঋণ অনুমোদন করেন। বড় অংকের ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করা হয়নি।

অভিযোগে বলা হচ্ছে, অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানের দায়দেনা পর্যালোচনা না করে এবং কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন প্রতিবেদন ছাড়াই ঋণ অনুমোদন করা হয়। ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির ‘পলিসি অ্যান্ড প্রসিডিউরাল গাইডলাইনস অন ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট লঙ্ঘন করে’ বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের নামে ৫৭৫ কোটি টাকার ফান্ডেড ও ৭৫০ কোটি টাকার নন-ফান্ডেড মিলিয়ে মোট ১৩২৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে বিতরণকৃত ৫৭৫ কোটি টাকার ফান্ডেড ঋণ পরিশোধ না করে আত্মসাতের অভিযোগ আনা হচ্ছে মামলায়।

দুদকের তথ্যে বলা হয়েছে, ঋণের শর্ত অনুযায়ী কাস্টম, পোর্ট, পরিবহন, সি অ্যান্ড এফ চার্জ, অফিস ও গুদাম চার্জ, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিজ্ঞাপন, প্রশাসনিক ও সাধারণ ব্যয় এবং এলসি-সংক্রান্ত ব্যয় মেটানোর কথা থাকলেও তা করা হয়নি।

অভিযোগ অনুযায়ী, ঋণের ৫০৩ দশমিক ১২৫ কোটি টাকা বসুন্ধরা গ্রুপভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ট্রান্সফার ও অনলাইন ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জমা করা হয়। পরে বিভিন্ন বিল সমন্বয়, নগদ উত্তোলন এবং ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে তা ব্যবহার করা হয়।

এ অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪০৯ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

মামলার বাদী হবেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান ভূঁইয়া, যিনি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দলের সদস্য।

দুদক জানায়, উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে একটি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল এ বিষয়ে কাজ করছে। দলে দুদক, সিআইডি, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা রয়েছেন।

আসামির তালিকায় থাকছেন যারা

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান; বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফিয়াত সোবহান; পরিচালক ময়নাল হোসাইন চৌধুরী; বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের চলতি হিসাবের সিগনেটরি মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ মাহবুব হায়দার খান অবসরপ্রাপ্ত ও ক্যাপ্টেন মোহাম্মাদ রুহুল আমিনকে এ মামলায় আসামি করা হচ্ছে।

ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির পরিচালক মনোয়ারা শিকদার; সাবেক পরিচালক খলিলুর রহমান; পরিচালক পারভীন হক শিকদার, মোয়াজ্জেম হোসেন, রিক হক শিকদার, রন হক শিকদার, মো. আনোয়ার হোসেন ও একেএম এনামুল হক শামীম এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোস্তাক আহমেদ সি এম আহমেদের নাম থাকছে মামলায়।

ব্যাংকের দিলকুশা শাখার সাবেক এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্রাঞ্চ ম্যানেজার এবং ব্রাঞ্চ ক্রেডিট কমিটির সভাপতি মো. একরামুল হক; একই শাখার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও তৎকালীন ব্রাঞ্চ ক্রেডিট কমিটির সদস্য মো. রাজুনুর রশীদ; সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও তৎকালীন ব্রাঞ্চ ক্রেডিট কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া ও আমিরুল ইসলাম; সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও তৎকালীন ব্রাঞ্চ ক্রেডিট কমিটির সদস্য মো. এনায়েত উল্লাহ ও শারাফাত উল্ল্যা চৌধুরীকেও আসামি করা হচ্ছে।

মামলায় ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও তৎকালীন ব্রাঞ্চ ক্রেডিট কমিটির সদস্য দিলীপ কুমার দাস; সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট অবসরপ্রাপ্ত ও তৎকালীন ব্রাঞ্চ ক্রেডিট কমিটির সদস্য জাহান আরা আকতার; সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও তৎকালীন ব্রাঞ্চ ক্রেডিট কমিটির সদস্য মুনসি ছরোয়ার জানেরও নাম থাকছে।

এছাড়া ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ও তৎকালীন অ্যাডভান্সড ইনচার্জ এবং ব্রাঞ্চ ক্রেডিট কমিটির সদস্য চন্দন কুমার দাস; সাবেক এক্সিকিউটিভ অফিসার ও তৎকালীন ব্রাঞ্চ ক্রেডিট কমিটির সদস্য ইমরান মৃধা; ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন হাসিনা সুলতানাকে এ মামলায় আসামি করা হচ্ছে।

আগেও মামলা হয়েছে

এর আগে গত ১০ ডিসেম্বর বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ব্যাংকের ‘৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের’ অভিযোগে মামলা করে দুদক। দুদকের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে সংস্থার সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১ এ মামলাটি করেন।

মামলায় আহমেদ আকবর সোবহানের দুই ছেলেকেও আসামি করা হয়। তারা হলেন– বসুন্ধরা ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাদাত সোবহান এবং একই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সাফিয়াত সোবহান।

দুদকের তালিকা অনুযায়ী অন্য আসামিরা হলেন– ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালক মনোয়ারা শিকদার, পারভীন হক শিকদার, মোয়াজ্জেম হোসেন, রিক হক শিকদার, রন হক শিকদার, মো. আনোয়ার হোসেন ও একে এম এনামুল হক শামীম, ব্যাংকটির ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হাসিনা সুলতানা; সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ম্যানেজার আরিফ মো. শহিদুল হক; সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ক্রেডিট ইন-চার্জ আনিসুল হক; সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সুলতানা পারভিন; সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সুবল চন্দ্র রায় এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ কামরুল হাসান মিঠু।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী বড় বড় ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি-অনিয়মের বিষয়ে অনুসন্ধানে নামে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা। এর ধারাবাহিকতায় বসুন্ধরা চেয়ারম্যান এবং তার স্ত্রী-সন্তানদের বিরুদ্ধে ‘সরকারের রাজস্ব ফাঁকি, ভূমি জবরদখল, ঋণের অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ স্থানান্তর ও হস্তান্তর, অর্থ পাচারের’ অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক।

২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর আহমেদ আকবার সোবহান ও তার ৪ ছেলেসহ ৮ জনের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেয় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। তালিকায় থাকা চার ছেলে হলেন– সাদাত সোবহান, সাফিয়াত সোবহান, সায়েম সোবহান আনভীর ও সাফওয়ান সোবহান এবং তিন পুত্রবধূ– সোনিয়া ফেরদৌসী সোবহান, সাবরিনা সোবহান ও ইয়াশা সোবহান।

ওই মাসেই দুদকের আবেদনে আহমেদ আকবর সোবহানসহ পরিবারের আট সদস্যের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত।

/এফসি/