শিরোনাম

অণ্ডকোষ চেপে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর: যুবদল নেতা গ্রেপ্তার

বরিশাল সংবাদদাতা
বরিশাল সংবাদদাতা
অণ্ডকোষ চেপে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর: যুবদল নেতা গ্রেপ্তার
(ডানে) অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু।

বরিশাল নগরীতে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) মারধর, অণ্ডকোষ চেপে ধরে জোরপূর্বক চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায়ের অভিযোগে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনার একটি সিসিটিভি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বরিশালসহ দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। পরে ঘটনায় জড়িত মূল অভিযুক্তসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি।

এদিকে, এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটুকে যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া হলেও তার সঙ্গে সংগঠনের কোনো সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছে যুবদল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বরিশাল নগরীর সদর রোড এলাকায় অবস্থিত অগ্রণী (আবাসন) হাউজিং লিমিটেডের কার্যালয়ে এই ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি এমডি আব্দুল আজিজ হাওলাদারের অফিস কক্ষে প্রবেশ করে তাকে ঘিরে ফেলেন। একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে দুটি চেক ও কয়েকটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।

ভিডিওতে দেখা যায়, হামলাকারীরা প্রথম কক্ষে অবস্থানরত অন্যদের বের করে দেয়। পরে মোস্তাফিজুর রহমান লিটু নামে এক ব্যক্তি আব্দুল আজিজকে মারধর করেন এবং অভিযোগ অনুযায়ী, তার অণ্ডকোষ চেপে ধরে জোরপূর্বক দুটি চেক ও একটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায় করেন। এ সময় ভুক্তভোগীকে ‘বাচ্চু, বাচ্চু’ বলে কাউকে ডাকতে শোনা যায়। পরে আরেক ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশ করলে তাকেও কিছু সময় আটকে রেখে বের করে দেওয়া হয়।

সিসিটিভি ফুটেজে আরও দেখা যায়, স্বাক্ষর নেওয়ার পর চেক ও স্ট্যাম্প হস্তান্তরের সময় জোরপূর্বক হাসিমুখে ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়।

ঘটনার বিষয়ে যা বললেন ভুক্তভোগী এমডি

ভুক্তভোগী আব্দুল আজিজ হাওলাদার অভিযোগ করেন, মোস্তাফিজুর রহমান লিটু একসময় তাদের আবাসন ব্যবসার অংশীদার ছিলেন। পরবর্তীতে বিনিয়োগের বিপরীতে জমি হস্তান্তরের মাধ্যমে সব হিসাব-নিকাশ নিষ্পত্তি করা হয় এবং এ সংক্রান্ত লিখিত অঙ্গীকারনামাও রয়েছে। এরপরও লিটু দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিলেন।

তিনি বলেন, ‘গত ২৭ জুন সন্ধ্যায় অফিসে ঢুকে আমাকে মারধর করা হয়। পরে জোরপূর্বক ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক এবং দুটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ঘটনার পর আমি ব্যাংকে অভিযোগ করায় ওই চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন সম্ভব হয়নি।’

আব্দুল আজিজ হাওলাদার আরও জানান, এ ঘটনায় তিনি আদালতে একটি নালিশি মামলা দায়ের করেছেন এবং আদালত সেটিকে এফআইআর হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজও তিনিই প্রকাশ করেছেন বলে জানান।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, ভিডিওটি আংশিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে এবং পুরো ঘটনা ভিন্ন।

তিনি দাবি করে জানান, তিনি অগ্রণী হাউজিংয়ের একজন পরিচালক ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের আর্থিক বিরোধ রয়েছে। তার হিসাবে এমডি আব্দুল আজিজ হাওলাদারের কাছে প্রায় ৫৪ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে, যদিও এমডি মাত্র ৩৬ লাখ টাকা স্বীকার করছেন।

লিটু বলেন, ‘ভিডিওতে যা দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। ব্যবসায়িক বিরোধের জেরেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আমাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে।’

তিনি আরও দাবি করেন, হাউজিং ব্যবসার বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও প্রতারণা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল এবং এ বিষয়ে পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।

মূল অভিযুক্ত লিটু যুবদলের কেউ নন: যুবদল

এদিকে, ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন মহলে মোস্তাফিজুর রহমান লিটুকে যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে পোস্ট ও মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে।

এর প্রেক্ষিতে রবিবার (৫ জুলাই) দুপুরে বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন জেলা ও মহানগর যুবদলের নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে নেতারা বলেন, অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু নামের এক ব্যক্তিকে বিভিন্ন মিডিয়ায় যুবদল নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। মোস্তাফিজুর রহমান লিটু আগে যুবদলের বরিশাল মহানগরের কোনও কমিটির কোনও পদে ছিল না এবং বর্তমানেও বরিশাল মহানগর ও জেলা যুবদলের কোনও পদে নেই।’

একইদিন যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোনায়েম মুন্না নিজের ফেসবুক পোস্টে বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু বরিশাল মহানগর যুবদলের কোনো পর্যায়ের পদে কখনও ছিলেন না। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যুবদলকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে প্রকাশ্যে কাউকে এভাবে লাঞ্ছিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত লিটু নগরীর কাঠপট্টি সড়ক এলাকার বাসিন্দা। তার বড় ভাই মাহাবুবুর রহমান পিন্টু বরিশাল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি।

মূল অভিযুক্ত লিটুসহ গ্রেপ্তার ২

অন্যদিকে, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানকে নিজ কার্যালয়ে ঢুকে নির্যাতনে ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু ও তার সহযোগী আবুল কালাম আজাদকে গ্রেপ্তার করেছে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। রবিবার (৫ জুলাই) দুপুরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. আশিক সাঈদ। তিনি বলেন, মামলার অন্য আসামিকে গ্রেপ্তার এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

/এফআর/