রাজধানীতে চীনা ভ্লগারদের রহস্যময়ভাবে ভিডিও ধারণ, নেপথ্যে কী?

রাজধানীতে চীনা ভ্লগারদের রহস্যময়ভাবে ভিডিও ধারণ, নেপথ্যে কী?
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর উত্তরার সেক্টর-১২ এর টেকপাড়ায় ঢুকতেই চোখে পড়ে এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। কয়েকজন বিদেশী নাগরিক সরু গলিতে ঘুরে ঘুরে ভিডিও ধারণ করছেন। তাদের কেউ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভাষায় কথা বলছেন, আবার কেউ মোবাইল ফোন উঁচিয়ে আশপাশের পরিবেশের দৃশ্য ধারণ করছেন। প্রথম দেখায় দৃশ্যটি সাধারণ ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও তৈরির মতো মনে হলেও কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর প্রশ্ন জাগে-তাদের প্রকৃত আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু কী?
উত্তরার আধুনিক আবাসিক এলাকার পাশেই অবস্থিত এই ঘনবসতিপূর্ণ নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর বসতি যেন তাদের ক্যামেরার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের কেউ বিস্মিত চোখে তাদের কর্মকাণ্ড দেখেন, আবার কেউ দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
সেখানে উপস্থিত এক বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি নিজেকে চীনের নাগরিক বলে পরিচয় দেন। বাংলাদেশে তার অবস্থান এবং ভিডিও ধারণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন। তবে ভিডিওগুলো ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক নাকি অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা হবে এ প্রশ্নের মুখে তিনি কথোপকথন শেষ করে দ্রুত একটি রিকশায় উঠে স্থান ত্যাগ করেন।
টেকপাড়ায় নিয়মিত দেখা যাওয়া এসব চীনা কনটেন্ট নির্মাতা আসলে কী ধরনের ভিডিও তৈরি করছেন, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে চীনের জনপ্রিয় ভিডিও প্ল্যাটফর্ম বিলিবিলি ও ইউকুসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে পাওয়া ভিডিও বিশ্লেষণ করলে একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অনেক ভিডিওতেই বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছে। শিরোনামে প্রায়ই ‘দরিদ্র’, ‘বস্তি’, ‘নোংরা পরিবেশ’ কিংবা অনুরূপ শব্দ ব্যবহার করা হয়। ভিডিওগুলোর উপস্থাপনায় স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মাতাদের মানবিক বা দানশীল চরিত্র হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতাও দেখা গেছে। এ ধরনের কনটেন্ট নিয়ে গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে।
বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত থাকলেও তারা বুঝতে পারেন না যে ক্যামেরায় কী ধারণ করা হচ্ছে? কিছু ক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়া মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ কিংবা তাদের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ভিডিও করার ঘটনাও নজরে এসেছে।
একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন বাংলাদেশি তরুণের সঙ্গে চীনা কনটেন্ট নির্মাতার আচরণ বেশ আক্রমণাত্মক। সেখানে তরুণটির কলার ধরে টানাটানি করতে দেখা যায়। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এমন কনটেন্ট তৈরির নৈতিকতা এবং স্থানীয় মানুষকে ব্যবহার করার সীমা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশে অবস্থানরত অধিকাংশ চীনা নাগরিক বৈধভাবেই বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প, শিল্পকারখানা, প্রকৌশল, টেলিযোগাযোগ ও বাণিজ্যিক খাতে কাজ করছেন। ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজারো চীনা নাগরিক কর্মসূত্রে বসবাস করছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও উঠে এসেছে। বিশেষ করে সাইবার প্রতারণা, অনলাইন জুয়া, অবৈধ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, মানব পাচার, স্বর্ণ চোরাচালান এবং নকল পণ্য ব্যবসার মতো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তাদের নাম এসেছে।
চলতি বছরের মে মাসে উত্তরা ও তুরাগ এলাকায় পরিচালিত এক অভিযানে অনলাইন জুয়া ও সাইবার প্রতারণা চক্র পরিচালনার অভিযোগে ৬ জন চীনা নাগরিকসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্তে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিগ্রাম গ্রুপ এবং ভুয়া বিনিয়োগভিত্তিক ওয়েবসাইট ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হতো। অভিযানে বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল ডিভাইস ও যোগাযোগ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
এর কয়েক মাস আগেই উত্তরা ও বসুন্ধরা এলাকায় পরিচালিত আরেক অভিযানে ৫ জন চীনা নাগরিক এবং ৩ জন বাংলাদেশিকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রম, অনলাইন প্রতারণা এবং ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন প্রচারের অভিযোগ আনা হয়। অভিযানে হাজার হাজার সিম কার্ড, মোবাইল ফোন ও যোগাযোগ যন্ত্র উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে অবৈধভাবে আইফোন সংযোজন ও বাজারজাত করার অভিযোগে একটি চক্রেরও সন্ধান পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্তকারীদের দাবি, চোরাই পথে আনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে কর ফাঁকি দিয়ে এসব ডিভাইস প্রস্তুত করা হতো।
মানব পাচারের অভিযোগও রয়েছে কিছু চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, বিয়ে, চাকরি কিংবা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি নারীদের বিদেশে নেওয়ার চেষ্টার একাধিক ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও উঠে এসেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে বাংলাদেশে বসবাসরত সব চীনা নাগরিককে একই দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। অধিকাংশই বৈধ পেশায় নিয়োজিত এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখছেন। তবে দ্রুত বিস্তৃত হওয়া ডিজিটাল অবকাঠামো ও বড় অনলাইন ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর কারণে আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ চক্রের কাছে বাংলাদেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
এমন প্রেক্ষাপটে উত্তরার টেকপাড়ায় বিদেশি নাগরিকদের নিয়মিত ভিডিও ধারণ স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল, সন্দেহ ও অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনো অপরাধমূলক ঘটনার সরাসরি সংযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভিডিও ধারণকারী বিদেশিদের বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি তাদের নজরে আনা হলে ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।
উত্তরার টেকপাড়ায় বিদেশি ভ্লগারদের এই উপস্থিতি আপাতত এক অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়েই রয়ে গেছে। তারা কি শুধুই ব্যতিক্রমধর্মী কনটেন্টের খোঁজে ঘুরছেন, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো উদ্দেশ্য সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

রাজধানীর উত্তরার সেক্টর-১২ এর টেকপাড়ায় ঢুকতেই চোখে পড়ে এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। কয়েকজন বিদেশী নাগরিক সরু গলিতে ঘুরে ঘুরে ভিডিও ধারণ করছেন। তাদের কেউ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভাষায় কথা বলছেন, আবার কেউ মোবাইল ফোন উঁচিয়ে আশপাশের পরিবেশের দৃশ্য ধারণ করছেন। প্রথম দেখায় দৃশ্যটি সাধারণ ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও তৈরির মতো মনে হলেও কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর প্রশ্ন জাগে-তাদের প্রকৃত আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু কী?
উত্তরার আধুনিক আবাসিক এলাকার পাশেই অবস্থিত এই ঘনবসতিপূর্ণ নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর বসতি যেন তাদের ক্যামেরার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের কেউ বিস্মিত চোখে তাদের কর্মকাণ্ড দেখেন, আবার কেউ দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
সেখানে উপস্থিত এক বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি নিজেকে চীনের নাগরিক বলে পরিচয় দেন। বাংলাদেশে তার অবস্থান এবং ভিডিও ধারণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন। তবে ভিডিওগুলো ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক নাকি অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা হবে এ প্রশ্নের মুখে তিনি কথোপকথন শেষ করে দ্রুত একটি রিকশায় উঠে স্থান ত্যাগ করেন।
টেকপাড়ায় নিয়মিত দেখা যাওয়া এসব চীনা কনটেন্ট নির্মাতা আসলে কী ধরনের ভিডিও তৈরি করছেন, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে চীনের জনপ্রিয় ভিডিও প্ল্যাটফর্ম বিলিবিলি ও ইউকুসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে পাওয়া ভিডিও বিশ্লেষণ করলে একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অনেক ভিডিওতেই বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছে। শিরোনামে প্রায়ই ‘দরিদ্র’, ‘বস্তি’, ‘নোংরা পরিবেশ’ কিংবা অনুরূপ শব্দ ব্যবহার করা হয়। ভিডিওগুলোর উপস্থাপনায় স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মাতাদের মানবিক বা দানশীল চরিত্র হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতাও দেখা গেছে। এ ধরনের কনটেন্ট নিয়ে গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে।
বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত থাকলেও তারা বুঝতে পারেন না যে ক্যামেরায় কী ধারণ করা হচ্ছে? কিছু ক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়া মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ কিংবা তাদের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ভিডিও করার ঘটনাও নজরে এসেছে।
একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন বাংলাদেশি তরুণের সঙ্গে চীনা কনটেন্ট নির্মাতার আচরণ বেশ আক্রমণাত্মক। সেখানে তরুণটির কলার ধরে টানাটানি করতে দেখা যায়। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এমন কনটেন্ট তৈরির নৈতিকতা এবং স্থানীয় মানুষকে ব্যবহার করার সীমা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশে অবস্থানরত অধিকাংশ চীনা নাগরিক বৈধভাবেই বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প, শিল্পকারখানা, প্রকৌশল, টেলিযোগাযোগ ও বাণিজ্যিক খাতে কাজ করছেন। ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজারো চীনা নাগরিক কর্মসূত্রে বসবাস করছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও উঠে এসেছে। বিশেষ করে সাইবার প্রতারণা, অনলাইন জুয়া, অবৈধ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, মানব পাচার, স্বর্ণ চোরাচালান এবং নকল পণ্য ব্যবসার মতো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তাদের নাম এসেছে।
চলতি বছরের মে মাসে উত্তরা ও তুরাগ এলাকায় পরিচালিত এক অভিযানে অনলাইন জুয়া ও সাইবার প্রতারণা চক্র পরিচালনার অভিযোগে ৬ জন চীনা নাগরিকসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্তে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিগ্রাম গ্রুপ এবং ভুয়া বিনিয়োগভিত্তিক ওয়েবসাইট ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হতো। অভিযানে বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল ডিভাইস ও যোগাযোগ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
এর কয়েক মাস আগেই উত্তরা ও বসুন্ধরা এলাকায় পরিচালিত আরেক অভিযানে ৫ জন চীনা নাগরিক এবং ৩ জন বাংলাদেশিকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রম, অনলাইন প্রতারণা এবং ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন প্রচারের অভিযোগ আনা হয়। অভিযানে হাজার হাজার সিম কার্ড, মোবাইল ফোন ও যোগাযোগ যন্ত্র উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে অবৈধভাবে আইফোন সংযোজন ও বাজারজাত করার অভিযোগে একটি চক্রেরও সন্ধান পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্তকারীদের দাবি, চোরাই পথে আনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে কর ফাঁকি দিয়ে এসব ডিভাইস প্রস্তুত করা হতো।
মানব পাচারের অভিযোগও রয়েছে কিছু চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, বিয়ে, চাকরি কিংবা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি নারীদের বিদেশে নেওয়ার চেষ্টার একাধিক ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও উঠে এসেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে বাংলাদেশে বসবাসরত সব চীনা নাগরিককে একই দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। অধিকাংশই বৈধ পেশায় নিয়োজিত এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখছেন। তবে দ্রুত বিস্তৃত হওয়া ডিজিটাল অবকাঠামো ও বড় অনলাইন ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর কারণে আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ চক্রের কাছে বাংলাদেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
এমন প্রেক্ষাপটে উত্তরার টেকপাড়ায় বিদেশি নাগরিকদের নিয়মিত ভিডিও ধারণ স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল, সন্দেহ ও অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনো অপরাধমূলক ঘটনার সরাসরি সংযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভিডিও ধারণকারী বিদেশিদের বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি তাদের নজরে আনা হলে ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।
উত্তরার টেকপাড়ায় বিদেশি ভ্লগারদের এই উপস্থিতি আপাতত এক অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়েই রয়ে গেছে। তারা কি শুধুই ব্যতিক্রমধর্মী কনটেন্টের খোঁজে ঘুরছেন, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো উদ্দেশ্য সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

রাজধানীতে চীনা ভ্লগারদের রহস্যময়ভাবে ভিডিও ধারণ, নেপথ্যে কী?
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর উত্তরার সেক্টর-১২ এর টেকপাড়ায় ঢুকতেই চোখে পড়ে এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। কয়েকজন বিদেশী নাগরিক সরু গলিতে ঘুরে ঘুরে ভিডিও ধারণ করছেন। তাদের কেউ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভাষায় কথা বলছেন, আবার কেউ মোবাইল ফোন উঁচিয়ে আশপাশের পরিবেশের দৃশ্য ধারণ করছেন। প্রথম দেখায় দৃশ্যটি সাধারণ ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও তৈরির মতো মনে হলেও কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর প্রশ্ন জাগে-তাদের প্রকৃত আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু কী?
উত্তরার আধুনিক আবাসিক এলাকার পাশেই অবস্থিত এই ঘনবসতিপূর্ণ নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর বসতি যেন তাদের ক্যামেরার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের কেউ বিস্মিত চোখে তাদের কর্মকাণ্ড দেখেন, আবার কেউ দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
সেখানে উপস্থিত এক বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি নিজেকে চীনের নাগরিক বলে পরিচয় দেন। বাংলাদেশে তার অবস্থান এবং ভিডিও ধারণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন। তবে ভিডিওগুলো ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক নাকি অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা হবে এ প্রশ্নের মুখে তিনি কথোপকথন শেষ করে দ্রুত একটি রিকশায় উঠে স্থান ত্যাগ করেন।
টেকপাড়ায় নিয়মিত দেখা যাওয়া এসব চীনা কনটেন্ট নির্মাতা আসলে কী ধরনের ভিডিও তৈরি করছেন, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে চীনের জনপ্রিয় ভিডিও প্ল্যাটফর্ম বিলিবিলি ও ইউকুসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে পাওয়া ভিডিও বিশ্লেষণ করলে একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অনেক ভিডিওতেই বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছে। শিরোনামে প্রায়ই ‘দরিদ্র’, ‘বস্তি’, ‘নোংরা পরিবেশ’ কিংবা অনুরূপ শব্দ ব্যবহার করা হয়। ভিডিওগুলোর উপস্থাপনায় স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মাতাদের মানবিক বা দানশীল চরিত্র হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতাও দেখা গেছে। এ ধরনের কনটেন্ট নিয়ে গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে।
বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত থাকলেও তারা বুঝতে পারেন না যে ক্যামেরায় কী ধারণ করা হচ্ছে? কিছু ক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়া মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ কিংবা তাদের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ভিডিও করার ঘটনাও নজরে এসেছে।
একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন বাংলাদেশি তরুণের সঙ্গে চীনা কনটেন্ট নির্মাতার আচরণ বেশ আক্রমণাত্মক। সেখানে তরুণটির কলার ধরে টানাটানি করতে দেখা যায়। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এমন কনটেন্ট তৈরির নৈতিকতা এবং স্থানীয় মানুষকে ব্যবহার করার সীমা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশে অবস্থানরত অধিকাংশ চীনা নাগরিক বৈধভাবেই বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প, শিল্পকারখানা, প্রকৌশল, টেলিযোগাযোগ ও বাণিজ্যিক খাতে কাজ করছেন। ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজারো চীনা নাগরিক কর্মসূত্রে বসবাস করছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও উঠে এসেছে। বিশেষ করে সাইবার প্রতারণা, অনলাইন জুয়া, অবৈধ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, মানব পাচার, স্বর্ণ চোরাচালান এবং নকল পণ্য ব্যবসার মতো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তাদের নাম এসেছে।
চলতি বছরের মে মাসে উত্তরা ও তুরাগ এলাকায় পরিচালিত এক অভিযানে অনলাইন জুয়া ও সাইবার প্রতারণা চক্র পরিচালনার অভিযোগে ৬ জন চীনা নাগরিকসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্তে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিগ্রাম গ্রুপ এবং ভুয়া বিনিয়োগভিত্তিক ওয়েবসাইট ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হতো। অভিযানে বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল ডিভাইস ও যোগাযোগ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
এর কয়েক মাস আগেই উত্তরা ও বসুন্ধরা এলাকায় পরিচালিত আরেক অভিযানে ৫ জন চীনা নাগরিক এবং ৩ জন বাংলাদেশিকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রম, অনলাইন প্রতারণা এবং ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন প্রচারের অভিযোগ আনা হয়। অভিযানে হাজার হাজার সিম কার্ড, মোবাইল ফোন ও যোগাযোগ যন্ত্র উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে অবৈধভাবে আইফোন সংযোজন ও বাজারজাত করার অভিযোগে একটি চক্রেরও সন্ধান পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্তকারীদের দাবি, চোরাই পথে আনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে কর ফাঁকি দিয়ে এসব ডিভাইস প্রস্তুত করা হতো।
মানব পাচারের অভিযোগও রয়েছে কিছু চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, বিয়ে, চাকরি কিংবা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি নারীদের বিদেশে নেওয়ার চেষ্টার একাধিক ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও উঠে এসেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে বাংলাদেশে বসবাসরত সব চীনা নাগরিককে একই দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। অধিকাংশই বৈধ পেশায় নিয়োজিত এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখছেন। তবে দ্রুত বিস্তৃত হওয়া ডিজিটাল অবকাঠামো ও বড় অনলাইন ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর কারণে আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ চক্রের কাছে বাংলাদেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
এমন প্রেক্ষাপটে উত্তরার টেকপাড়ায় বিদেশি নাগরিকদের নিয়মিত ভিডিও ধারণ স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল, সন্দেহ ও অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনো অপরাধমূলক ঘটনার সরাসরি সংযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভিডিও ধারণকারী বিদেশিদের বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি তাদের নজরে আনা হলে ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।
উত্তরার টেকপাড়ায় বিদেশি ভ্লগারদের এই উপস্থিতি আপাতত এক অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়েই রয়ে গেছে। তারা কি শুধুই ব্যতিক্রমধর্মী কনটেন্টের খোঁজে ঘুরছেন, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো উদ্দেশ্য সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

চীনা নাগরিকসহ অনলাইন জুয়া চক্রের ৯ সদস্য গ্রেপ্তার


