শিরোনাম

ডিজিটাল অগ্রগতিতে ভুটান-মিয়ানমারেরও পেছনে বাংলাদেশ

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ডিজিটাল অগ্রগতিতে ভুটান-মিয়ানমারেরও পেছনে বাংলাদেশ
আইটিইউর ডিজিটাল অগ্রগতির সূচক

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কের বিস্তার দ্রুত ঘটলেও ডিজিটাল সেবার কার্যকর ব্যবহার এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে ডিজিটাল অগ্রগতির বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশ ভিয়েতনাম, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া এমনকি মিয়ানমারেরও পেছনে অবস্থান করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বাড়ানো এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত না হওয়াই এ পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ।

আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) চলতি মাসে প্রকাশিত ডিজিটাল উন্নয়ন সূচকে বিশ্বের ১৫৯টি দেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৬৮ দশমিক ৯। আগের বছর যা ছিল ৬৪ দশমিক ৯। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৬ শতাংশ উন্নতি হলেও আন্তর্জাতিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন আসেনি।

প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনামের স্কোর ৮৮ দশমিক ৪, ভুটানের ৮৬ দশমিক ৪, কম্বোডিয়ার ৭৮ দশমিক ৭, শ্রীলঙ্কার ৭৩ দশমিক ২ এবং মিয়ানমারের ৭১ দশমিক ৬। বাংলাদেশের নিচে রয়েছে পাকিস্তান, যার স্কোর ৬৭ দশমিক ৭। তালিকার সর্বশেষ অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান, যার স্কোর ৩৬ দশমিক ২।

নেটওয়ার্ক আছে, ব্যবহার কম

আইটিইউর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যেসব দেশ ডিজিটাল অগ্রগতিতে এগিয়েছে, সেখানে মানুষ শুধু ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় আসেনি; শিক্ষা, ব্যবসা, আর্থিক লেনদেন এবং সরকারি সেবায়ও প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে। বাংলাদেশে নেটওয়ার্ক বিস্তার ঘটলেও সেই সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার এখনো নিশ্চিত হয়নি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ থ্রিজি এবং ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ ফোরজি নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন রয়েছে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের হাতে।

তবে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। আইটিইউর হিসাবে, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করে। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় পাঁচজন এখনো ইন্টারনেটের বাইরে। একইভাবে মাত্র ৫৫ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে।

বিশ্ব গড়ের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যবধান আরও স্পষ্ট। বিশ্বে গড়ে ৭০ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে।

‘ইউসেজ গ্যাপ’ই বড় চ্যালেঞ্জ

আইটিইউ ডিজিটাল অগ্রগতিকে দুটি ভাগে মূল্যায়ন করেছে। প্রথমটি ‘অর্থবহ সংযোগ’, যেখানে নেটওয়ার্কের মান, গতি ও কভারেজ বিবেচনা করা হয়। এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৮৭ দশমিক ১।

অন্যদিকে ‘সর্বজনীন সংযোগ’ বা কত মানুষ বাস্তবে ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করছে—সে সূচকে বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ৫০ দশমিক ৬।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। অবকাঠামো থাকলেও সাধারণ মানুষের শিক্ষা, ব্যবসা, আয় এবং দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো সীমিত।

সমন্বয়ের অভাব বড় কারণ

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির মনে করেন, অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় এবং নাগরিকদের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।

তিনি বলেন, দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অটোমেশন, সফটওয়্যার ব্যবহার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও আন্তর্জাতিক সূচকে তার পুরো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। কারণ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে এবং অনেক মানুষ এখনো ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে দক্ষ নন।

ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর আহ্বান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, বাংলাদেশের স্কোর ধীরে ধীরে বাড়ছে, যা ইতিবাচক। তবে এখন অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সেই অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহারে।

তাঁর মতে, প্রযুক্তিকে অর্থনীতি, শিক্ষা ও নাগরিকসেবার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে সমাজের সব স্তরের মানুষকে প্রযুক্তিনির্ভর সেবার আওতায় আনা প্রয়োজন।

উত্তরণের পথ কী

আইটিইউর সুপারিশ অনুযায়ী, বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ানোর ওপর। শুধু নেটওয়ার্ক বিস্তার নয়, সাধারণ মানুষকে ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা গড়ে তোলাও জরুরি।

এ ছাড়া উচ্চগতির স্থিতিশীল ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে ফিক্সড ব্রডব্যান্ড সংযোগের সম্প্রসারণ, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং ডিজিটাল দক্ষতা বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল অগ্রগতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি সম্ভব।

/এমআর/