শিরোনাম

অ্যাডিডাস হোম অব সকার: ফুটবল উৎসবে কিছুক্ষণ!

অ্যাডিডাস হোম অব সকার: ফুটবল উৎসবে কিছুক্ষণ!
অ্যাডিডাস হোম অব সকার

বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনা পুরো বিশ্বজুড়ে। তবে নিউ ইয়র্ক অন্যতম আয়োজক শহর বলে এর আবেদনকে অন্য কোনো শহরের সঙ্গে মেলানো কঠিন। নিউ ইয়র্কের ‘অ্যাডিডাস হোম অব সকার’ এ বেলজিয়াম ও সেনেগালের ম্যাচ দেখতে জড়ো হওয়া হাজারো ফুটবলপ্রেমীর ভিড় দেখে সেটিই মনে হচ্ছিলো।

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, মেক্সিকোর ভক্ত দিয়ে পূর্ণ নিউ ইয়র্কে বেলজিয়াম-সেনেগাল ম্যাচ দেখতে এক ফ্যান জোনের ভিড়ই বলে দেয়, ফুটবল বিশ্বকাপের আবেদনের সঙ্গে বিশ্বের অন্য কোনো ইভেন্টের তুলনা চলে না। বিশ্বকাপের আবহকে দারুনভাবে ‍ফুটিয়ে তুলেছে হোম অব সকার।

ম্যাচ শুরুর বেশ আগেই ভেন্যুতে দর্শকদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। প্রবেশপথে চোখে পড়ে নানা দেশের পতাকা। কেউ বেলজিয়ামের লাল জার্সি গায়ে চড়িয়েছেন, কেউ আবার সেনেগালের জাতীয় পতাকা কাঁধে জড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছেন। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন পরিচয়ের মানুষ-কিন্তু সবার গন্তব্য এক, বড় পর্দার সামনে একটি জায়গা।

বিশাল স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের ভিড় আরও ঘন হয়ে ওঠে। চারদিকে ফুটবল নিয়ে আলোচনা, সম্ভাব্য একাদশ নিয়ে তর্ক, খেলোয়াড়দের শক্তি-দুর্বলতা নিয়ে বিশ্লেষণ। বিশ্বকাপের আবহ ঠিক যেমন হওয়া উচিত, এখানে তার সব উপাদানই উপস্থিত। সাদিও মানে গোল দেবে কি না, সে নিয়েও চলেছে বাজি। দুই বন্ধুর আলোচনাও বেশ উপভোগ্য, কানে এলো, ‘এনি টাইম গোল স্কোরার হিসেবে সাদিও মানের ওপর বাজি লাগানো যেতে পারে, কি বলিস?’ এই দেশে স্পোর্টস আবার বেটিং লিগাল।

ফ্যান জোনের ভেতরে দাড়িয়েই ব্রুকলিন ব্রিজ দেখা যায়। আর ইস্ট রিভারের সৌন্দয্য তো বাড়তি পাওনা। এমন মন্ত্রমুগ্ধকর পরিবেশে অনেকে খেলা ভুলে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতেও দ্বিধা করে না।

ফ্যান জোনের ভেতরে দাড়িয়েই ব্রুকলিন ব্রিজ দেখা যায়। আর ইস্ট রিভারের সৌন্দয্য তো বাড়তি পাওনা। এমন মন্ত্রমুগ্ধকর পরিবেশে অনেকে খেলা ভুলে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতেও দ্বিধা করে না। খেলা পাগল মানুষ আমি। নিউ ইয়র্কের বিকেলের প্রকৃতির রূপ উপেক্ষা করে বড় পর্দার দিকে চোখ ফেরালাম।

সেনেগালের আক্রমণের দিশেহারা বেলজিয়াম। ঘড়ির কাটা ৫০ মিনিট ছোঁয়ার আগেই সেনেগালিজদের দারুন দুটো গোল। ২০১৮ বিশ্বকাপের স্মৃতি মনে পরে যাচ্ছিলো। সেই বিশ্বকাপে জাপানের কাছে দু’গোল হজম করে তিনটি দিয়েছিল কেভিন ডি ব্রুইনা’রা। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কি সম্ভব?

মাঝে-মধ্যে দর্শকদের গর্জনে পুরো এলাকা কেঁপে উঠছে। কেউ হাত উঁচিয়ে উদযাপন করছেন, কেউ হতাশায় মাথায় হাত দিচ্ছেন। বড় পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত মানুষের আবেগ যেন একে অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল।

Untitled design (84)
ফ্যান জোন থেকে দেখা যায় ব্রুকলিন ব্রিজের সুন্দর্য

মাথা ঘুরিয়ে চারপাশে নজর দিলাম। খাবারের স্টল, পারিবারিক আয়োজন, ফুটবল খেলার জোন, বিয়ার জোন; পুরো পরিবেশকে একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত করেছে। বেশিরভাগ ফুটবল ভক্ত বাবা-মা সন্তান নিয়েই খেলা দেখতে এসেছেন।

শেষ ভাগে নাটকীয়তা বাড়লো। তিন মিনিটে দুই গোল দিয়ে খেলায় ফিরলো বেলজিয়াম। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হওয়ার পথে। সেনোগালের ভক্তদের হতাশা দৃশ্যমান। এরই নাম ফুটবল। অনেকটা জীবনের মতো; কখন আপনাকে কি নাটক উপহার দেবে, তা আপনি নিজেও জানেন না।

একি হলো! ডি-বক্সে কামারা স্লাইড করে টিলেমান্সকে ফেলে দিলেন । রেফারিকে ঘিরে ধরেছেন দুই দেশের ফুটবলাররা। সেই উত্তাপ ছড়িয়ে গেছে নিউ ইয়র্কের হোম অব সকারে। রেফারি মার্টিনেজ ভিএআর দেখে পেনাল্টির বাঁশি বাজালেন। বেলজিয়াম ভক্তরা রীতিমতো গর্জনে ফেটে পড়লেন। সেনেগাল ভক্তদের চোখে মুখে অবিশ্বাস! ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করলো বেলজিয়াম। ২ গোলে পিছিয়ে থেকে ৩-২ গোলের জয়! আফকন ফাইনালের সেই স্মৃতি এখনও জ্বলজ্বল করছে সেনেগালিজদের বুকে। সেই জ্বলন্ত ক্ষত যেন আরও উসকে দিলো এমন পরাজয়।

নিউ ইয়র্কের এই ফ্যান জোনে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্বকাপের আসল শক্তি শুধু মাঠের ফলাফলে নয়, মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করার ক্ষমতায়।

বেলজিয়াম ফ্যানদের আনন্দ থামছেই না। পতাকা উচিয়ে ধরে রেখেছেন তারা। মোবাইল ফোনের ক্যামেরা জ্বলে উঠছে একটু পর পর। এমন আলিঙ্গনে মিশে যাচ্ছেন অপরিচিত মানুষও। ডাচ ওদের প্রথম ভাষা, বিশাল একটা অংশ ফরাসি ভাষাও ব্যবহার করে। কি ভাষায় ওরা গান গাইছে আমার জন্য বলা কঠিন! তবে শুনতে বেশ লাগছে। চলুক গান!

নিউ ইয়র্কের এই ফ্যান জোনে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্বকাপের আসল শক্তি শুধু মাঠের ফলাফলে নয়, মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করার ক্ষমতায়। একটি বল, দুটি দল আর হাজারো মানুষের আবেগ মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছিল এক ক্ষণস্থায়ী কিন্তু স্মরণীয় বিশ্বগ্রাম।

আর সেই বিশ্বগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ফুটবল- যে খেলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে মানুষকে একই আবেগে একত্র করে।

/টিই/