শিরোনাম

মেসি নেই, ছেলেটির জীবন থেকে ফুটবলও হারিয়ে গেছে

মেসি নেই, ছেলেটির জীবন থেকে ফুটবলও হারিয়ে গেছে
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি

ঘড়ির কাটায় তখন রাত ৯টা। রাতের খাবার তখনো খাওয়া হয়নি ছেলেটির। ফেসবুকে লিওনেল মেসির ছোট্ট একটি পোস্ট দেখে সময়টা যেন থমকে গেছে তার। ৩১ আগস্ট, সোমবার–দিনপঞ্জির পাতায় লাল কালি দিয়ে তারিখটিতে গোল দাগ দিয়ে থম মেরে বসে থাকে সে।

ছেলেটি খাচ্ছে না, পড়ছে না। কিছুতেই তার মন বসছে না। গালে হাত দিয়ে শুধু ভাবছে আর ভাবছে–বলা নেই, কওয়া নেই; মেসি এভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলে দিলেন! আমাদের কথা একবারও ভাবলেন না!

ছেলেটির ভাবনায় বিরতি নেই। সে ভেবে চলে, ভাবতে ভাবতেই কবির সুমনের একটি গান বাজিয়ে দেয়–‘বিদায় পরিচিতা, এই বিদায়ের সুর…।’ গানটি শুনতে শুনতেই একটি লাইনে আটকে যায় ছেলেটি–‘বয়েস হলো আমার বুড়ো হলেন ডিলান।’ নিজের অজান্তেই লাইনটি ছেলেটি গেয়ে ওঠে এভাবে–‘বয়েস হলো আমার বুড়ো হলেন মেসি!’

মেসি
মেসি

কী এমন বয়স হয়েছে তোমার, মাত্র তো ৩৯ বছর–ছেলেটি অস্ফুটে বলে ওঠে। আসলে মেসি বলেই হয়তো তার অবসরের ঘোষণায় এমনটা ভাবছেন অনেকে। কারণ, মেসি মানেই তো অতিমানবীয় কিছু। এই বয়সেও তিনি একটা বিশ্বকাপ খেলেছেন এবং রীতিমতো মাঠে রাজদণ্ড হাতে শাসন করে গেছেন। গোলের পর গোল করেছেন, গড়েছেন রেকর্ডের পর রেকর্ড। এই ‘বুড়ো’ মেসিই তো উঠতি তারকা, ক্যারিয়ারের মধ্যগগণে থাকা তারকাদের সঙ্গে টক্কর দিয়েছেন।

খানিক পর ছেলেটি আবার বাস্তবে ফেরে। এবার তার কাছে মনে হয় সত্যিই তো মেসির বয়স হয়েছে, ফুটবলবিশ্বকে আর কত বিনোদিত করে যাবেন তিনি! তা ভাই, বয়স যখন হয়েছে, অবসর যখন নেবেই; সেটা বিশ্বকাপের ফাইনাল হারার পরই তো নিতে পারতে! তখন না হয় মনকে বোঝানো যেত। মেসি আসলে অবসরের বার্তাটা তখনই লিখে রেখেছিলেন। কিন্তু কিছু একটা ভেবে তা এখন প্রকাশ করেছেন।

অবসর বার্তায় মেসি লিখেছেন, ‘(বিশ্বকাপ) ফাইনাল শেষে এত দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর, অনেক ভেবেচিন্তে, আমি আপনাদের সবাইকে জানাতে চাই, আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি...।’ জগতে ফুটবল খেলাটি কি মেসিরও কম ভালোবাসার ছিল! প্রিয় এই খেলাটিকে বিদায় বলতে তো মেসির মনটাও দুমড়েমুচড়ে গেছে!

প্রিয় তারকার মনের অবস্থা ভেবে ছেলেটি কিছুটা শান্ত হয়। এবার সে চলে যায় মেসিকে যেদিন থেকে ভালোবাসার শুরু, সেই দিনটিতে। সেই দিন থেকে মেসির অবসর বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা পর্যন্ত একেকটি মুহূর্ত ছেলেটির মনের পর্দায় ফেসবুক রিলসের মতো একটার পর একটা চলতে থাকে।

চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে হেডে গোল করছেন মেসি
চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে হেডে গোল করছেন মেসি

এই তো তার মনের পর্দায় এখনই ভেসে উঠলো কোপা দেল রেতে হেতাফের বিপক্ষে চারজন ডিফেন্ডার ও গোলকিপারকে কাটিয়ে ১৯ বছর বয়সী মেসির ম্যারাডোনা-সুলভ গোলটি। বায়োস্কোপের মতো এরপর ভেসে এলো চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে লাফিয়ে উঠে তীরের মতো বাঁকা হয়ে হেড থেকে করা গোলটি।

আরও কত স্মৃতি, কত মুহূর্ত। এর মধ্যে কোনো কোনোটি আবার কাঁদায়ও। চোখে ভাসে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে যাওয়ার পর আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে থাকা নিঃসঙ্গ মেসির ছবি। সেই বিশ্বকাপেরই পুরস্কার মঞ্চে সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফি হাতে পাথরের মতো স্থাণু মেসি। এরপর কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর কিংকর্তব্যবিমূঢ় মেসির ছবিও কি তার ভক্তদের হতাশ করে না!

এরপর ছেলেটির মনের আকাশে উজ্জ্বল হয়ে ভাসতে শুরু করে মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোকিত মুহূর্তটি। ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতা ঘুচিয়ে ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপের ট্রফিতে তার চুম্বনের ছবি। এটা তো মেসির ভক্তদের জীবনেও সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত!

বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে মেসি
বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে মেসি

ছবিটি দেখতে দেখতে ছেলেটির চোখে স্বচ্ছ বড় এক ফোঁটা জল আসে। সেই জল কষ্টের নয়, আনন্দের। মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জনের আনন্দ। যাক, যাওয়ার আগে সব পাওয়া তো হয়ে গেছে প্রিয় তারকার। বিদায়ের আগে নিজেকে, গোটা দুনিয়াকে রাঙিয়ে তো যেতে পেরেছেন!

এটা ভাবতে ভাবতেই আবার ছেলেটির মনটা খারাপ হয়ে আসে। মেসি নেই, এখন আর কে রাঙাবেন ফুটবলকে, কে রাঙাবেন তার ভুবনটাকে! মেসি নেই, ফুটবল খেলাটা দেখেই আর কী হবে। মেসির সঙ্গে তার জীবন থেকেও যেন ফুটবলটা হারিয়ে গেছে! আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে মেসির বিদায়ে এমন অনুভূতি হয়তো বিশ্বজোড়া কোটি কোটি ভক্তের মনেই জেগেছে।

/আরএ/