শিরোনাম

পেট্রোল-অকটেন দেশেই উৎপাদন, তবুও কেন সংকট

সিটিজেন ডেস্ক
পেট্রোল-অকটেন দেশেই উৎপাদন, তবুও কেন সংকট
রশিদপুর ৪০০০ বিপিডি কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট। ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধ এবং তেলের মজুদ নিয়ে নানা খবরে আতঙ্ক থেকে দেশে পেট্রোল ও অকটেনের অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হয়েছে। এই চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম অবস্থা তৈরি হয়েছে অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বরাদ্দকৃত তেল ফুরিয়ে অনেক ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকতেও দেখা যাচ্ছে।

আমদানি করা তেলের মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ডিজেলের। কিন্তু এখন শহরে-গ্রামে তেলের জন্য যে হাহাকার এবং দীর্ঘ সারি তার অধিকাংশই অকটেন ও পেট্রোলের জন্য।

বাংলাদেশে তেলের মজুদ এবং উৎপাদন সক্ষমতা মিলিয়ে পেট্রোল-অকটেনের এমন সংকট হওয়ার কথা নয়। সিলেটের গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় গ্যাসের সঙ্গে যে কনডেনসেট (গ্যাস উৎপাদনের সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া তরল হাইড্রোকার্বন) পাওয়া যায়, সেটি প্রক্রিয়াজাত করে বাংলাদেশ পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদার একটা বড় অংশ উৎপাদন করে।

বাংলাদেশে বছরে পেট্রোলের চাহিদা ৪ লাখ ৬২ হাজার টন ও অকটেনের চাহিদা ৪ লাখ ১৫ হাজার টন। বাংলাদেশে নিজস্ব উৎপাদন ও ক্রুড অয়েল থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিশোধন করে, পেট্রোল আমদানির প্রয়োজন হয় না।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত কনডেনসেট থেকে ২ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি, অর্থাৎ মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক পেট্রোল উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া অকটেনও হয়েছে মোট চাহিদার চাহিদার প্রায় চারভাগের একভাগ।

এ বিবেচনায় বিশ্ববাজার থেকে তেল আমদানি পুরো বন্ধ হয়ে গেলেও বাংলাদেশে এই মুহূর্তে পেট্রোল ও অকটেনের দিক থেকে একেবারে জ্বালানিশূন্য হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই।

এর মধ্যে পেট্রোবাংলার কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্ল্যান্টে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণ করে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৬২ মেট্রিক টন পেট্রোল এবং ৫৫ হাজার ৩৩৯ মেট্রিক টন অকটেন উৎপাদন করেছে। এর পাশাপাশি ৪টি বেসরকারি রিফাইনারিও কনডেনসেট থেকে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন করে।

দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসা কনডেনসেট থেকে সবচেয়ে বেশি পেট্রোল ও অকটেন, কেরোসিন ও ডিজেল এবং অল্প পরিমাণ এলপিজি উৎপাদন করে হবিগঞ্জ অবস্থিত সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট ও ক্যাটালাইটিক রিফর্মিং ইউনিট (সিআরইউ)।

ইস্টার্ন রিফাইনারি। ছবি: সংগৃহীত
ইস্টার্ন রিফাইনারি। ছবি: সংগৃহীত

হবিগঞ্জের প্ল্যান্টে বর্তমানে প্রতিদিন সাড়ে ৪ হাজার ব্যারেল কনডেনসেট থেকে ৬শ ব্যারেলের (৭৪ মেট্রিক টন) মতো অকটেন, ৩ হাজার ৪৫০ ব্যারেল বা ৪২০ মেট্রিক টন পেট্রোল, ১৫০ ব্যারেল বা ২০ মেট্রিক টন ডিজেল ও ১শ ব্যারেল বা ১৩ মেট্রিকটন কেরোসিন এবং ১৭ ব্যারেল বা ১.৫ মেট্রিকটন এলপিজি উৎপাদন হচ্ছে।

এসজিএফএলের লিকুইড পেট্রোলিয়াম মার্কেটিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী জীবন শান্তি সরকার জানান, বাংলাদেশে ফিনিশড প্রোডাক্ট হিসেবে পেট্রোলের আমদানি করা প্রয়োজন হয় না। দেশীয় যে উৎপাদিত কনডেনসেট সেটি থেকে দেশের মোট পেট্রোলের চাহিদার প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। আর বাকিটা ইআরএল (ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড), তারা ক্রুড অয়েল থেকে এবং প্রাইভেট যারা আছে তারা ইমপোর্টেড কনডেনসেট থেকে পেট্রোলের চাহিদা পূরণ করছে।

অকটেনের বিষয়ে তিনি জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি প্রায় ৬২ শতাংশ অকটেন উৎপাদন করেছে, বাকি চাহিদা দেশীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।

জানা গেছে, ইরান যুদ্ধের কারণে তেল সংকট সৃষ্টির পর পেট্রোবাংলার নির্দেশনা অনুযায়ী হবিগঞ্জ সিআরইউতে দৈনিক অকটেন উৎপাদন ১শ ব্যারেল বাড়িয়ে ৭শ ব্যারেল উৎপাদন করা হচ্ছে। সপ্তাহে ৫ দিনের পরিবর্তে ৭ দিন লরিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। হবিগঞ্জে উৎপাদিত পেট্রোল-অকটেন সিলেট অঞ্চল এবং রংপুর, পার্বতীপুর ও বাঘাবাড়ি এলাকায় সরবরাহ করা হয়।

মন্ত্রী জানান, দেশে অভিযান পরিচালনা করে তেল অবৈধ মজুত উদ্ধার করা হচ্ছে। সব পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয় করতে 'ট্যাগ অফিসার' নিয়োগ করা হয়েছে।

কালোবাজারিদের দুষলেন মন্ত্রী

বর্তমানে দেশে অকটেন ও পেট্রোলের সংকটের মূল কারণ অতিরিক্ত চাহিদা। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এবং ক্রেতাদেরও অনেকে অবৈধ মজুদ করার চেষ্টা করছে, প্রয়োজন ছাড়াও বেশি কিনছেন অনেকে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে পেট্রোল-অকটেনের এই চাহিদা অস্বাভাবিক।

সরকার বলছে, স্বাভাবিক চাহিদা পূরণের জন্য বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় মজুত ও তেল আমদানি করা হচ্ছে। মে মাস পর্যন্ত মজুত সব ধরনের তেলের মজুত নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলপাম্প মালিক সমিতি জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে গ্রাহকদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল না কেনার আহ্বান জানিয়েছেন।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, মে মাস পর্যন্ত তেলের চাহিদা পূরণ করতে সিঙ্গাপুর থেকে বেশি দামে তেল এনে স্টক করছি। ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকট নিরসনে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ পড়লেও তেলের সরবরাহ ঠিক রাখা হচ্ছে। তবে এই সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করছে কালোবাজারিরা।

মন্ত্রী জানান, দেশে অভিযান পরিচালনা করে তেল অবৈধ মজুত উদ্ধার করা হচ্ছে। সব পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয় করতে 'ট্যাগ অফিসার' নিয়োগ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সরকার এই মুহূর্তে দৈনিক ১৬০ কোটি টাকা জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দিচ্ছে। তেলের দাম এ মাসেও বাড়ানো হয়নি। জনগণ যদি একটু সাশ্রয়ী হয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত যদি তেল না কেনে তাহলে এসব ভিড়-টিড় কিছুই থাকবে না। সরবরাহও স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

ইরান যুদ্ধের কারণে সারাবিশ্বের তেলের বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। আমদানি নির্ভর জ্বালানির মধ্যে বাংলাদেশের বড় চাহিদা হচ্ছে ডিজেল ও এলএনজির। এ বিষয়ে জ্বালানিমন্ত্রীর ভাষ্য, চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল আমদানির ব্যবস্থাও সরকার করছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

/এফসি/