শিরোনাম

বিশ্বব্যাংকের সিটা প্রকল্প: ৬ বছর নয়, অডিট হবে ৯ মাসে

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
বিশ্বব্যাংকের সিটা প্রকল্প: ৬ বছর নয়, অডিট হবে ৯ মাসে
প্রতীকী ছবি

সরকারি কাজে গতিশীলতা আনা, দুর্নীতি ও অপচয় রোধ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সরকারি খাতের বড় পাঁচটি সংস্থায় এক বিশাল সংস্কার কর্মসূচির সূচনা হতে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা) অর্থায়নে অনুমোদিত ‘স্ট্রেন্থেনিং ইনস্টিটিউশনস ফর ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ (সিটা) প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামোতে এই যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

এই প্রকল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো– দেশের অডিট বা নিরীক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। বর্তমানে কোনো একটি অডিট রিপোর্ট চূড়ান্ত করতে দীর্ঘ ৭২ মাস বা প্রায় ৬ বছর সময় লেগে যায়, যার ফলে অনিয়মের সময়োপযোগী প্রতিকার করা সম্ভব হয় না। এই দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে সম্পূর্ণ অডিট প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল প্রযুক্তির আওতায় এনে তা মাত্র ৯ মাসে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ডিজিটাল রূপান্তরে বদলে যাবে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান

সিটা প্রকল্পের আওতায় দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সাথে জড়িত ৫টি মূল প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্বারা নতুন করে সাজানো হবে:

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস): সঠিক ও তথ্যভিত্তিক নীতি নির্ধারণের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্য ইকোসিস্টেম তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে উচ্চমানের ডেটা বা তথ্য উৎপাদন এবং তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর): কর ব্যবস্থায় আনা হচ্ছে বড় বদল। অটোমেশন, ই-ইনভয়েসিং এবং সমন্বিত ডিজিটাল সিস্টেম চালুর মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ করা হবে এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

পরিকল্পনা বিভাগ: সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত অ্যানালিটিক্স এবং রিয়েল-টাইম (তাৎক্ষণিক) মনিটরিং টুলস। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও ধীরগতি বন্ধ হবে।

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএন): সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা আনতে ইলেকট্রনিক কেনাকাটা বা ই-জিপি ব্যবস্থায় যুক্ত করা হচ্ছে অত্যন্ত আধুনিক ও উন্নত সব ডিজিটাল ফিচার, যা জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করবে।

মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয় (ওসিএজি): দেশের আর্থিক খাতের তদারকি ও জবাবদিহিতা মজবুত করতে পুরো অডিট প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করা হবে। এর মাধ্যমেই মূলত অডিটের সময় ৬ বছর থেকে ৯ মাসে নেমে আসবে।

কেন এই বিশাল সংস্কার?

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বেশ কিছু অগ্রগতি অর্জন করলেও এখনো সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ডেটা সিস্টেম, কেনাকাটা এবং রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি বা দুর্বলতা রয়ে গেছে। এই সমস্যাগুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই বাধা দূর করে দীর্ঘমেয়াদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত গড়তেই এই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যা বলছেন নীতিনির্ধারকরা

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের রাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এই প্রকল্প সম্পর্কে বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন এবং কেনাকাটা, রাজস্ব আদায় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা আনার মাধ্যমে এই প্রকল্প কার্যকর সেবা প্রদানের একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করবে। এটি সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ও জবাবদিহিতা অনেক বাড়িয়ে দেবে।’

বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশনাল ডিরেক্টর জঁ পেসমে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে শক্তিশালী ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানের ওপর, যা জনগণ এবং বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করতে পারেন। ‘সিটা’ প্রকল্প সরকারের মূল ব্যবস্থাগুলোকে আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি তথ্যের গুণগত মান বাড়াবে, যাতে যেকোনো সিদ্ধান্ত আরও সুচিন্তিতভাবে নেওয়া যায় এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।’

ডিজিটাল সিস্টেম, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির এই ত্রিমুখী প্রয়াস দেশের সুশাসন ও সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

/এফআর/