এক্সপ্লেইনার

হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি কতটা ঝুঁকিতে

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি কতটা ঝুঁকিতে
হুথি বিদ্রোহীদের সমাবেশে একটি ব্যানারে লেখা, ‘সৌদি আরবের সকল তেল স্থাপনা আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু’

সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম আধুনিক। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে দেশটির হাতে। এরপরও ইয়েমেনের হুথি সশস্ত্র গোষ্ঠীর একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে পারছে না সৌদি বাহিনী। রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলার ঘটনা দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

১১ অক্টোবর প্রকাশিত আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হুথিদের অস্ত্রভান্ডারের উন্নতি, বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত ব্যবহার এবং সৌদি আরবের বিশাল ভূখণ্ডের কারণে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুত এবং একাধিক ফ্রন্টে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে, ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর লড়াইও তীব্র হচ্ছে। ফলে সৌদি আরবকে একই সঙ্গে সীমান্তের নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার ঠেকানোর চেষ্টা করতে হচ্ছে।

কেন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করছে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র

সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো, হুথিরা এক ধরনের অস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে না। তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করছে। এগুলোর গতি, উড্ডয়নপথ ও আঘাত হানার ধরন আলাদা। ফলে সব ধরনের হামলা একইভাবে শনাক্ত করা বা প্রতিহত করা সম্ভব হয় না।

হুথিরা কখনো একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করছে। এতে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। সৌদি বাহিনী কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে পারলেও সব হামলা ঠেকাতে পারছে না।

সৌদি আরবের বিশাল আয়তন ও ইয়েমেনের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্তও এই সমস্যাকে জটিল করেছে। দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানবন্দর ও তেল অবকাঠামোর চারপাশে সমান মাত্রার প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।

কিংস কলেজ লন্ডনের যুদ্ধবিদ্যা বিভাগের জ্যেষ্ঠ ফেলো নাওয়াফ ওবাইদের মতে, অত্যাধুনিক ও বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকলেও কিছু হামলা সফল হতে পারে। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রতিটি সফল হামলার বিপরীতে হুথিদের বহু হামলা প্রতিহত করা হয়ে থাকতে পারে। তবে সফল একটি হামলাও বড় ধরনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।

হুথি বিদ্রোহীদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করছেন লোকজন
হুথি বিদ্রোহীদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করছেন লোকজন

কতটা উন্নত হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র

২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর থেকে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বেড়েছে। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ শুরু করার পর থেকে গোষ্ঠীটি সৌদি আরবের দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর তারা ইসরায়েল এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা জাহাজগুলোতেও হামলা চালিয়েছে।

হুথিদের অস্ত্রভান্ডারে প্যালেস্টাইন-২ ও তুফানের মতো দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলে জানা যায়। প্যালেস্টাইন-২-এর পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার বলে ধারণা করা হয়। এটি দুই ধাপে জ্বালানি ব্যবহার করে এবং এর হাইপারসনিক সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়। তুফানের পাল্লা ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ কিলোমিটারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়। তুফানকে ইরানের গদর ক্ষেপণাস্ত্রের একটি পরিবর্তিত সংস্করণ বলে মনে করা হয়।

এসব ক্ষেপণাস্ত্রের কয়েকটিতে ক্লাস্টার ওয়ারহেড থাকার কথাও বলা হয়েছে। এ ধরনের ওয়ারহেড থেকে একাধিক ছোট বিস্ফোরক ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে লক্ষ্যবস্তুর আশপাশের বিস্তৃত এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

এ ছাড়া হুথিদের কাছে বুরকান ও বদর সিরিজের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এগুলো সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী এলাকায় হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির বড় অংশ ইরানের অস্ত্রভান্ডার থেকে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে চীনা প্রযুক্তির প্রভাবও থাকতে পারে। তবে গোষ্ঠীটির নিজস্ব প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রমাণ সীমিত। তাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা মূলত তুলনামূলক কম উন্নত কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে করেন নাওয়াফ ওবাইদ।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর অভিযোগ, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হুথিদের নতুন ধরনের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতেও সহায়তা করছে।

ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাইজে হুথি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ির ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করছেন স্থানীয়রা
ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাইজে হুথি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ির ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করছেন স্থানীয়রা

প্যাট্রিয়ট ও থাড থাকার পরও কেন ঝুঁকি

সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ও থাড ব্যবস্থা। এগুলো বিভিন্ন ধরনের আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয়। তবে কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই শতভাগ কার্যকর নয়।

নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ওলফগ্যাং পুশতাইয়ের মতে, সৌদি আরবের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরান থেকে আসা হুমকি মোকাবিলা করা। হুথিদের হামলা বেড়ে যাওয়ায় সৌদি আরবকে ইয়েমেনমুখী প্রতিরক্ষার ওপরও বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো, প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত। প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো ব্যবস্থায় প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে আলাদা ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হয়। এগুলোর উৎপাদন ও সরবরাহে সময় লাগে। অন্যদিকে, তুলনামূলক কম খরচে তৈরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বারবার হামলা চালানো সম্ভব।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতেও চাপ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সৌদি আরবের মতো দেশকে একই সঙ্গে হামলা ঠেকানো এবং ভবিষ্যতের জন্য পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

গত মাসে হুথিদের হামলা ঠেকাতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও অন্যান্য সহায়তা চেয়ে সৌদি আরব কয়েকটি মিত্র দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলেও জানা গেছে।

বিমানবন্দর কেন হুথিদের প্রধান লক্ষ্য

বিমানবন্দর একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো। সেখানে হামলা হলে শুধু ভবন বা রানওয়ের ক্ষতি হয় না, ব্যাহত হয় বিমান চলাচল, যাত্রী পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্য। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ফ্লাইট বন্ধ বা অন্য পথে ঘুরিয়ে দিতে হলে এর প্রভাব দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।

রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে বারবার লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনা এই ঝুঁকিই সামনে এনেছে। ১১ অক্টোবরের আল জাজিরা প্রতিবেদনে বিমানবন্দরটিতে এক হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। হামলার পর সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কার্যক্রম স্থগিত করে ফ্লাইট অন্য পথে পরিচালনার ব্যবস্থা নেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও নাগরিকদের জন্য নতুন ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

হুথিদের দাবি, সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের অবরোধ ও হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকার বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে বিধিনিষেধের প্রতিশোধ হিসেবেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, হামলার আরেকটি উদ্দেশ্য হলো সৌদি আরবের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা।

এ ধরনের হামলায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা প্রকাশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। বিমানবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হলে পর্যটক, ব্যবসায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও প্রবাসীদের চলাচলেও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।

সানায় একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ছবির সামনে পাহারায় দাঁড়িয়ে আছেন একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা
সানায় একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ছবির সামনে পাহারায় দাঁড়িয়ে আছেন একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা

ইয়েমেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি কেন আরও জটিল হচ্ছে

সৌদি আরবের ওপর হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের ভেতরেও সংঘাত বাড়ছে। ২২ অক্টোবর প্রকাশিত আল জাজিরার আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ প্রদেশে হুথি ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মজিদ আল-নাজিলি জানিয়েছেন, হুথিদের বিরুদ্ধে ৮৩৫টি লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান চালানো হয়েছে। এতে গোষ্ঠীটির ২৮৫ জন সদস্য নিহত বা আহত হয়েছেন এবং তাদের ট্যাংক ও অস্ত্রের ভান্ডার ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পশ্চিম তাইজের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জাবাল হান উচ্চভূমি এবং ধুবাব ও আল-মাসরাখ এলাকাতেও লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে।

সরকারি বাহিনী হুথিদের সমাবেশে হামলা বাড়ানোর হুমকি দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এসব সমাবেশের মাধ্যমে শিশুদের যুদ্ধে নিয়োগ করা হচ্ছে। হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকার বেসামরিক নাগরিকদের সমাবেশ ও তথাকথিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলার সতর্কতাও দিয়েছে ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

তবে সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট থেকে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাদের প্রায় অর্ধেক তাইজে আশ্রয় নিয়েছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ২৫১ জন বেসামরিক নাগরিকের হতাহতের ঘটনা যাচাই করেছে। তাদের মধ্যে ৫৭ জন নিহত ও ১৯৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের প্রায় অর্ধেক শিশু বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো আগস্ট থেকে ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে পৌঁছেছে। তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যবিধির সামগ্রী ও জরুরি নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আশ্রয়, এরপর খাদ্য ও নগদ অর্থ।

সংঘাতের কারণে ইয়েমেনে ২৫ লাখের বেশি শিশু স্কুলের বাইরে রয়েছে বলেও দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ কতটা ঝুঁকিতে

সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ এবং জি-২০-এর গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি। দেশটির অর্থনীতি, জ্বালানি অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ববাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে বিমান চলাচল, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও পর্যটনে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনা বারবার হামলার মুখে পড়লে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটবে। নিরাপত্তাঝুঁকি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও নতুন করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারে।

তবে হামলার কারণে সৌদি অর্থনীতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা নির্ভর করবে হামলার মাত্রা, ক্ষয়ক্ষতি, তেল উৎপাদন ও রপ্তানিতে প্রভাব এবং পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হয় তার ওপর। এখনই দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়বে বা শাসনব্যবস্থা পতনের মুখে পড়বে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

সৌদি যুবরাজের নিরাপত্তা উদ্বেগ

সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের চলাচল ও নিরাপত্তাব্যবস্থাও আলোচনায় আসে। যুবরাজের অবস্থান বদল, সরকারি সফর বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের খবরকে ঘিরে নানা ব্যাখ্যা তৈরি হতে পারে। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র ছাড়া এসব ঘটনাকে শাসকগোষ্ঠীর আতঙ্ক বা ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

একইভাবে, ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে দেশ ছাড়ার খবর বা প্রাইভেট জেটের ভাড়া বেড়ে যাওয়ার দাবিও যাচাই করা প্রয়োজন। এমন ঘটনা ঘটলেও তা থেকে পুরো ব্যবসায়ী শ্রেণি দেশ ছাড়ছে বা সৌদি আরবে ব্যাপক পুঁজি প্রত্যাহার শুরু হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

তবে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে ধনী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এতে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের চাহিদা ও ভাড়া বাড়তে পারে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে হলে উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, বাজারের তথ্য এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রের প্রমাণ প্রয়োজন।

এই পরিস্থিতি প্রবাসীদের জন্য কী অর্থ বহন করছে

সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী কাজ করেন। দেশটির বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা বাড়লে তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে যাঁরা রিয়াদ বা অন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকেন, তাদের ভ্রমণ, কর্মস্থলে যাতায়াত ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে সতর্ক থাকতে হতে পারে।

তবে সব এলাকা একই মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ, এমন নয়। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় হামলার খবর মানেই পুরো সৌদি আরবের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বন্ধ হয়ে গেছে, তা-ও নয়। প্রবাসীদের উচিত স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা, নিজ দেশের দূতাবাসের পরামর্শ এবং বিমান সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুসরণ করা। যাচাই না করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে আতঙ্কিত হওয়া বা হঠাৎ দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি।

হুথিদের সক্ষমতা কতদিন টিকে থাকবে

হুথিরা সৌদি আরবের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও তাদের নিজেদের সামরিক সক্ষমতারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, দীর্ঘদিনের অবরোধ এবং ইয়েমেনের বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কারণে তাদের অস্ত্র ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

নাওয়াফ ওবাইদের মতে, ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলায় হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ও ড্রোন উৎপাদনকেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এতে তাদের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ওলফগ্যাং পুশতাইয়ের ধারণা, হুথিদের হাতে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সীমিত হয়ে আসতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে হুথিরা বড় আকারের সমন্বিত হামলার বদলে কম সুরক্ষিত বেসামরিক স্থাপনায় একক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দিকে ঝুঁকতে পারে। এতে তুলনামূলক কম অস্ত্র ব্যবহার করেও বিমান চলাচল ব্যাহত করা এবং রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা সম্ভব।

অন্যদিকে, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী চলতি মাসের শুরুতে ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে। এর লক্ষ্য হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা পুনরুদ্ধার করা, যার মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে। হুথিদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের ওপর চাপ বৃদ্ধি এবং লোহিত সাগরসংলগ্ন কৌশলগত এলাকায় অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা সংঘাতকে আরও জটিল করেছে।

সৌদি শাসকদের ভবিষ্যৎ কী

হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে আনছে। তবে সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পাওয়া আর একটি দেশের শাসনব্যবস্থা পতনের মুখে পড়া এক বিষয় নয়।

সৌদি আরবের হাতে আধুনিক যুদ্ধবিমান, বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিপুল আর্থিক সম্পদ এবং শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব রয়েছে। অন্যদিকে, হুথিরা তুলনামূলক কম খরচের অস্ত্র ব্যবহার করে সৌদি আরবের মতো বড় অর্থনীতিকে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে ফেলতে পারছে। এ কারণে শুধু অস্ত্রের সংখ্যা বা প্রযুক্তির উন্নততা দিয়ে সংঘাতের ফল নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

সৌদি শাসকদের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে তারা কতটা কার্যকরভাবে হামলা প্রতিহত করতে পারেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখেন এবং সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে পান তার ওপর।

সব মিলিয়ে, হুথিদের হামলা সৌদি আরবের জন্য গুরুতর নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তবে এই হামলা দেশটির শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি এখনো নেই। বরং আগামী দিনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা কতটা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, ইয়েমেনের যুদ্ধ কোন দিকে মোড় নেয় এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো সংঘাত কমাতে কী ভূমিকা রাখে, তার ওপরই সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বড় অংশ নির্ভর করবে।

/এমআর/