এক্সপ্লেইনার

আইজেনকট কি ইসরায়েলি নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারবেন

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
আইজেনকট কি ইসরায়েলি নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারবেন
ইয়াশার দলের নেতা গাদি আইজেনকট

ইসরায়েলের রাজনীতিতে এখন বেশ বড় ধরনের টানাপোড়েন চলছে। নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারেনি। এ অচলাবস্থা কাটাতে দেশটির রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজোগ ইয়াশার দলের নেতা এবং সাবেক সেনা প্রধান গাদি আইজেনকটকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, আইজেনকট ২৮ দিন সময় পাবেন একটি স্থিতিশীল জোট সরকার গড়ার জন্য, প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন বাড়ানো হতে পারে।

তবে কাজটা মোটেও সহজ নয়। আইজেনকট ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজোগ হয়তো বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে একই সুযোগ দেবেন। আর তাতেও যদি কোনো কাজ না হয়, তবে ইসরায়েলে আবারও নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, নেতানিয়াহু যেভাবে অতি-ডানপন্থী নীতি নিয়ে এতদিন সরকার চালিয়েছেন, আইজেনকটের পক্ষে তেমন কোনো শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করা প্রায় অসম্ভব।

গাদি আইজেনকট ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু
গাদি আইজেনকট ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু

অতি-গোঁড়া ইহুদি ও আরব দলগুলোর জটিল শর্ত

ক্ষমতায় টিকতে হলে তাকে অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলোর অন্তত একটির সমর্থন পেতেই হবে—যারা এতদিন নেতানিয়াহুর বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে বিবেচিত হতো। আবার অন্যদিকে, সরকারের বাইরে থেকেও যদি ফিলিস্তিনি মূলধারার আরব দলগুলোর সমর্থন পেতে হয়, তবে নিজের বিরোধী জোটের ডানপন্থী শরিকদের রাজি করানোই হবে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ এবং কূটকৌশলে আইজেনকট কতটা পারদর্শী, তা নিয়ে সন্দিহান বিশ্লেষকেরা। নেতানিয়াহু বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক যে চতুরতা দেখিয়ে এসেছেন, তার সঙ্গে আইজেনকটের ততটা স্বাচ্ছন্দ্য নন।

গাদি আইজেনকট
গাদি আইজেনকট

আইজেনকট কি নিতান্তই এক রাজনৈতিক শিক্ষানবিশ

২৭শে অক্টোবরের নির্বাচনের ঠিক কয়েক দিন আগেই মূলত তড়িঘড়ি করে এক অস্থিতিশীল বিরোধী জোটের নেতৃত্বে আসেন আইজেনকট। তখন জোটের ভেতরে কোনো সমন্বয় ছিল না, চারপাশ থেকে আসছিল কেবল অসংলগ্ন ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য।

এখন অতি-গোঁড়া ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম পার্টি যদি তাকে সমর্থন দেয়ও, তবে তাদের প্রধান শর্ত হবে- ধর্মীয় শিক্ষার দোহাই দিয়ে তরুণদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহত ছাড় দিতে হবে। দলটি ইতোমধ্যে নেতানিয়াহুর সঙ্গ ছেড়ে তাদের পুরোনো মিত্র শাস-এর সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি নাগরিকত্বধারী ফিলিস্তিনি দলগুলোর সমর্থন পেতে হলে দেশের ভেতরের ফিলিস্তিনি এলাকায় ক্রমবর্ধমান অপরাধ ও সহিংসতা বন্ধে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি, দখলকৃত পশ্চিম তীরে কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের মদদে যে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস তাণ্ডব চলছে, তাও থামানোর নিশ্চয়তা দিতে হবে।

তবে ফিলিস্তিন-নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্টের সদস্য এবং হাদাশ পার্টির আইনপ্রণেতা আইদা তোউমা-স্লিমান মনে করেন, আইজেনকট আরবদের ওপর ভরসা করতে চাইছেন না। ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্ভরশীলতার তকমা গায়ে মাখানোর চেয়ে সামরিক নিয়োগ আইনে ছাড় দিয়ে অতি-গোঁড়া দলগুলোকে কাছে টানতেই তিনি বেশি আগ্রহী।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

যে-ই শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের মসনদে বসুক না কেন, তাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। গাজায় টানা হামলা এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি এখন ইতিহাসের সবচেয়ে তলানিতে। মার্কিনিরা মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এ যুদ্ধে নামাতে নেতানিয়াহুই প্ররোচিত করেছিলেন।

আমেরিকার সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বিশাল ভরাডুবির আগে ট্রাম্প ইসরায়েলের বার্ষিক ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা পর্যন্ত দেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ উর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তারা সব দোষ চাপিয়েছেন ইরান যুদ্ধের ওপর।

কার্নেগি এনডাউমেন্টের সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, অনেকের চোখে ইসরায়েল এখন আর ডেভিড নয়, বরং গোলিয়াথ। আইজেনকটের সামনে হয়তো কঠিন মার্কিন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে আইজেনকটের ইংরেজি বলতে অনিচ্ছা এবং জনসমক্ষে আড়ষ্ট ভাব তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও গাদি আইজেনকট
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও গাদি আইজেনকট

নেতানিয়াহু বিরোধী

আইজেনকটের পক্ষে এখন সবচেয়ে বড় রসদ হলো- তিনি নেতানিয়াহুর ঠিক বিপরীত এক ব্যক্তিত্ব। মার্জিত আশকেনাজি পরিবারের সন্তান নেতানিয়াহু যেখানে বারবার মিজরাহি ইহুদিদের ক্ষোভকে পুঁজি করেছেন, সেখানে সাধারণ ঘরের সন্তান হিসেবে আইজেনকটের গ্রহণযোগ্যতা অন্য জায়গায়।

মরোক্কান বাবা-মায়ের ঘরে তিবেরিয়াসে জন্ম নেওয়া এবং লোহিত সাগরের তীরের বন্দরনগরী এইলাতে বেড়ে ওঠা মানুষটি ১৮ বছর বয়সে সেনাদলে যোগ দিয়েছিলেন। পদোন্নতি পেতে পেতে তিনি চিফ অফ স্টাফ হন এবং পরবর্তীতে ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর গঠিত জাতীয় ঐক্য সরকারে যুক্ত হন।

তার পরিচিতরা তাকে মেনশি (ভদ্রলোক) কিংবা শ্লাম্পি (অগোছালো) বলে থাকেন। তার গম্ভীর মুখাবয়ব ও চোখের নিচে চিন্তার ভাঁজ দেখে সাধারণ ইসরায়েলিরা ৭ অক্টোবরের ট্র্যাজেডি এবং গাজা যুদ্ধের ব্যক্তিগত ক্ষত খুঁজে পান। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে উত্তর গাজার জাবালিয়ায় দায়িত্ব পালনের সময় তার ছেলে গাল নিহত হন, আর তার পরদিনই মারা যান তার ভাতিজা মাওর। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আরেক ভাগ্নে ইয়োগেভ পাজিও গাজায় প্রাণ হারান। নিজের পরিবারের এ বিশাল ত্যাগ সাধারণ মানুষের চোখে আইজেনকটকে আলাদা এক মর্যাদা দিয়েছে, যা নেতানিয়াহুর বিলাসবহুল জীবনযাত্রার সম্পূর্ণ বিপরীত।

চ্যাথাম হাউসের সিনিয়র ফেলো ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, তার চালচলন বেশ সামরিক ধাঁচের, খুবই স্থির এবং এমন একজন মানুষ যার মনের কথা সবসময় বোঝা যায় না। আমার মনে হয়, তিনি সেটাই দিচ্ছেন যা এ মুহূর্তে ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। স্বাভাবিকতার অনুভূতি এবং এ উপলব্ধি যে কিছু নিয়ম রয়েছে যা সরকারসহ সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় গাদি আইজেনকট
সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় গাদি আইজেনকট

একজন কঠোর সেনাপতি নাকি শুধুই সৈনিক

আইজেনকটের ক্ষমতাগ্রহণ ফিলিস্তিনিদের জন্য বাস্তবে কতটুকু ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সামরিক প্রধান হিসেবে তিনিই ছিলেন কুখ্যাত দাহিয়েহ মতবাদ-এর রূপকার। ‌এ মতবাদটি বেসামরিক এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোকে সমর্থন করে।

জাতীয় ঐক্য সরকারে থাকার সময় স্মোত্রিচ বা বেন-গভিরের মতো চরমপন্থীদের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও, আরব প্রতিবেশীদের ওপর কঠোর সামরিক নীতির প্রয়োগে তিনি কখনও পিছু হটেননি। তিনি চিফ অফ স্টাফ থাকাকালে (২০১৫-২০১৮) ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে এবং সংঘাত-সম্পর্কিত ঘটনায় প্রায় ৬৫০ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। শুধু ২০১৮ সালের গ্রেট মার্চ অফ রিটার্ন বিক্ষোভেই প্রাণ গিয়েছিল ১৮৯ জন ফিলিস্তিনির। এর মধ্যে ৩৫ জনই ছিল শিশু। পরবর্তীকালে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন তার নির্দেশনায় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং মানবতাবিরোধী সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল। ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধেও একই কৌশলে ১ হাজার ১০৯ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ৮৬০ জনই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। ফলে, ইসরায়েলে ক্ষমতার পালাবদল হলেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না- সে উত্তর পাওয়ার জন্য ফিলিস্তিনিদের এখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

/এমএকে/