এক্সপ্লেইনার

সৌদি-হুথি দ্বন্দ্বে ইরানের মধ্যস্থতা: শান্তির বার্তা নাকি কৌশলগত স্বার্থের খেলা

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
সৌদি-হুথি দ্বন্দ্বে ইরানের মধ্যস্থতা: শান্তির বার্তা নাকি কৌশলগত স্বার্থের খেলা
সৌদি আরব থেকে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনকারী ট্রাকের ওপর হুথিদের হামলা

সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা যখন ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন দীর্ঘদিনের মিত্র ইয়েমেনি গোষ্ঠীটি এবং রিয়াদের মধ্যে মধ্যস্থতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ইরান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১১ অক্টোবর দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছিল তেহরান। তবে সেই প্রস্তাবের রিয়াদ বা সানার পক্ষ থেকে ইতিবাচক কোনো সাড়া মেলেনি। এমনকি অদূর ভবিষ্যতে দুই পক্ষ আলোচনার টেবিলে ফিরবে- এমন ন্যূনতম ইঙ্গিতও আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

হুথির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি
হুথির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি

হুথিদের কঠোর অবস্থান ও সৌদি অস্বীকার

হুথি গোষ্ঠী (যার আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ) তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি স্পষ্ট জানিয়েছেন, রিয়াদ ‘ইয়েমেনের জনগণের ওপর আর্থিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ’ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত সৌদি আরবে হামলা অব্যাহত থাকবে। তাদের দাবি, প্রায় ১২ বছর ধরে ইয়েমেনের বিভিন্ন বন্দরে এ অবরোধ আরোপ করে রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান সম্পূর্ণ বন্ধ না করা পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থামবে না বলেও হুশিয়ারি দিয়েছে গোষ্ঠীটি।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সৌদি আরবের পক্ষে এ শর্তগুলো মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। ইয়েমেন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ বাশা এ বিষয়ে বলেন, আমি মনে করি না যে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট কিংবা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার, ইয়েমেনের আকাশসীমা ও সামুদ্রিক পথের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং শত শত কোটি ডলার ক্ষতিপূরণের দাবিতে হুথিদের কাছে নতি স্বীকার করবে। তিনি আরও যোগ করেন, এ ধরনের ছাড়গুলো স্থায়ী শান্তির জন্য কোনো অর্থবহ নিশ্চয়তা না দিয়েই কার্যত হুথিদের সামরিক, রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করবে।

বর্তমানে তাইজ ও মারিবের মতো কৌশলগত রণক্ষেত্রগুলোতে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও হুথিদের যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করেছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে সৌদি আরব নিজের সীমান্ত রক্ষায় জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে হুথিরাও হামলার মাত্রা আরও বাড়াতে পারে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে।

অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি বনাম স্থায়ী শান্তি

কোনোভাবে দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসানো গেলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধান বয়ে আনবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিশ্লেষক অ্যালেক্স জালিলি বলেন, বিমানবন্দর ও বন্দরের ওপর বিধিনিষেধ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণের বাইরেও হুথিদের দাবির মধ্যে রয়েছে তেল ও গ্যাসের রাজস্বে প্রবেশাধিকার এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, রাজনৈতিক স্বীকৃতি। সমঝোতা হলেও তা বড়জোর সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে বলে মনে করেন এ বিশ্লেষক।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, তেহরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাবে সৌদি আরব বা হুথি- কোনো পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে জবাব পাওয়া যায়নি।

ইরান ও সৌদি আরবের পতাকা
ইরান ও সৌদি আরবের পতাকা

ইরানকে এড়াতে চায় সৌদি আরব

সৌদি আরবের জন্য ইরানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা চালানোর সিদ্ধান্তটি বেশ জটিল। ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে সামাল দেওয়ার পাশাপাশি মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষের সাথে সমন্বয় রেখে চলাই এখন রিয়াদের আঞ্চলিক অগ্রাধিকার। ২৯ জুলাই ইরাকে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর সৌদি ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলা সেই কঠোর অবস্থানেরই প্রমাণ।

পাশাপাশি, রিয়াদ সম্প্রতি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় শক্তিশালী করার দিকে মন দিয়েছে। ইয়েমেনের হুথিদের সৌদি আরব মূলত ইরানের প্রক্সি বলেই গণ্য করে, তাই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তেহরানকে মেনে নিলে কৌশলগতভাবেই সৌদি আরব পিছিয়ে পড়তে পারে।

জালিলির মতে, ওমানসহ বিভিন্ন মাধ্যমে হুথিদের সঙ্গে রিয়াদের আগে থেকেই যোগাযোগের সুব্যবস্থা রয়েছে। তেহরানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মেনে নিলে এ ধারণা আরও জোরদার হতে পারে যে, হুথিদের আচরণের চূড়ান্ত নিশ্চয়তাকারী হলো ইরান। এমন কিছুকে বৈধতা দিতে রিয়াদের কোনো আগ্রহ নেই।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরব সরাসরি তেহরানের সঙ্গে কোনো কথা বলছে না। রিয়াদের জন কূটনীতি বিষয়ক উপমন্ত্রী জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ এখনও খোলা আছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি

দর কষাকষির হাতিয়ার ও তেহরানের সমীকরণ

সামরিক কৌশলগত দিক থেকে হুথিরা বর্তমানে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে বিশ্বাস করে। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও সংবেদনশীল অবকাঠামোতে আঘাত হানার সামর্থ্য তারা প্রমাণ করেছে। জালিলির ভাষায়, হুথিরা দেখিয়েছে যে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করতে এবং সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে।

ফলে মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান পুরোপুরি মজবুত না করা পর্যন্ত হুথিরাও মধ্যস্থতায় কান দেবে না। অন্যদিকে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে ইরানের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো সিনা তুসি বলেন, ইরান সম্ভবত ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির ওপর ভিত্তি করে একটি বড় চুক্তির পক্ষে থাকবে, যেখানে ইয়েমেনের বন্দর, বিমানবন্দর, বেতন ও পুনর্গঠন সংক্রান্ত ব্যবস্থার পাশাপাশি সৌদি আরবের বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

তবে একটি দুর্বল বা নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি ইরানের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে বেশি সুবিধাজনক। এটি রিয়াদের ওপর তেহরানের চাপ বজায় রাখার চিরন্তন সুযোগ তৈরি করবে। ২০ জুলাই সানা বিমানবন্দরে সৌদি বিমান হামলার জবাবে হুথিরা লোহিত সাগরে সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। এটি হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির জ্বালানি সরবরাহ রুটে প্রভাব ফেলার জন্য তেহরানকে নতুন অস্ত্রের যোগান দিয়েছে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

আঞ্চলিক সংকটের আশঙ্কা

ইরানের মূল দ্বিমুখী সংকটটি এখানেই। এখানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। ইরান হুথিদের দেওয়া দর কষাকষির ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়, কিন্তু সেই ক্ষমতাকে একটি অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে চায় না।

নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ২০২৩ সালে সৌদি-ইরান সম্পর্কের যে বরফ গলেছিল, তা আবার জমাট বাঁধতে পারে। অন্যদিকে, সংঘাত বিস্তৃত হলে মক্কা চুক্তির জের ধরে তুরস্ক বা পাকিস্তান কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো পশ্চিমা দেশও সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে ইরাকের ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোও শান্ত থাকবে না, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ঠেলে দেবে। আর তেমন পরিস্থিতি তৈরি হলে উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন ব্লকের দিকে আরও ঝুঁকবে, যা নিশ্চিতভাবেই তেহরানের দূরপাল্লার কূটনৈতিক উদ্দেশ্যকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলবে।

/এমএকে/