এক্সপ্লেইনার

ইসরায়েলের নির্বাচনে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রভাব ফেলতে পারে

সিটিজেন ডেস্ক
সিটিজেন ডেস্ক
ইসরায়েলের নির্বাচনে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রভাব ফেলতে পারে
নির্বাচনি প্রচারণায় বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু

দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সমালোচনা আর দেশের ভেতরের তীব্র রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্য দিয়েই মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ইসরায়েলে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নতুন আইনসভা নির্বাচন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং এর পর থেকে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা প্রাণঘাতী যুদ্ধের পর এটিই দেশটির প্রথম ভোট। দেশটির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনই ঠিক করে দেবে আগামী দিনে ইসরায়েল কোন পথে হাঁটবে।

ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে জনমত জরিপ (৮ অক্টোবর)
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে জনমত জরিপ (৮ অক্টোবর)

প্রধান দল কোনগুলো

ইসরায়েলের সংসদে প্রবেশ করতে ও সরকার গঠন করতে হলে যে কোনো দলকে অন্তত ৩.২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। এবারের নির্বাচনে মূল লড়াই হচ্ছে দুটি বড় জোটের মধ্যে। একদিকে রয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি এবং বেশ কয়েকটি কট্টর-ডানপন্থী ও অতি-গোঁড়া ইহুদি দল। এর মধ্যে যেমন ইউটিজে ও শাস-এর মতো ধর্মীয় দল আছে, তেমনই রয়েছে ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের নেতৃত্বাধীন কট্টর-ডানপন্থী দল ওৎজমা ইয়েহুদি এবং রিলিজিয়াস জায়োনিজম-জেহুত।

অন্যদিকে প্রধান বিরোধী জোটে রয়েছে চারটি দল। গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি, ইয়ার গোলানের ডেমোক্র্যাটস, আভিগডর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেইনু এবং নাফতালি বেনেটের টুগেদার অ্যালায়েন্স, যেখানে যুক্ত হয়েছেন ইয়ার লাপিদও।

জনমত জরিপ কী ইঙ্গিত দিচ্ছে

সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, কোনো জোটেরই এককভাবে সরকার গড়ার মতো প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা কম। সরকারি চ্যানেল KAN-এর জরিপ অনুযায়ী, বিরোধী জোট পেতে পারে ৫২টি আসন এবং নেতানিয়াহুর দল পেতে পারে ৫০টি আসন। বাকি আসনগুলো যাবে মূলত আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলোর কাছে। তবে নেতানিয়াহু কিংবা বিরোধী- কোনো পক্ষই আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গড়ার পক্ষে নয়। ফলে নির্বাচন শেষে সরকার গঠন নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এরফলে আরও একটি নির্বাচনের সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে।

মূল বিষয়গুলো কী কী

এবারের নির্বাচনে সাধারণ মানুষের সামনে একাধিক বড় সংকট রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার জবাবদিহিতা চাওয়া হচ্ছে সব জায়গা থেকে। পাশাপাশি অতি-গোঁড়া ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছে। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর বিচার বিভাগীয় সংস্কারের প্রচেষ্টাও দেশটিকে গণতান্ত্রিক সংকটের মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মাইরাভ জোনসজেইন বলেন, ইসরায়েলের ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী বিরোধী দলগুলো মনে করে, এ নির্বাচনই ইসরায়েলি গণতন্ত্রকে বাঁচানোর এবং নেতানিয়াহুর শাসনামলে ধ্বংস হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুদ্ধার করার শেষ সুযোগ। এছাড়া টানা যুদ্ধে ক্লান্ত দেশের জনগণ নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব চায়। তবে গাজা, পশ্চিম তীর কিংবা লেবাননে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার মতো মানসিকতা নেই অনেকভোটারের ।

নেতানিয়াহুর ছবিযুক্ত নির্বাচনি ব্যানার
নেতানিয়াহুর ছবিযুক্ত নির্বাচনি ব্যানার

নির্বাচনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলার পর এটি ইসরায়েলের প্রথম নির্বাচন। দেশের অভ্যন্তরে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভাজন এখন স্পষ্ট। সামাজিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশিষ্ট ইসরায়েলি সমাজবিজ্ঞানী ইয়াহুদা শেনহাভ-শাহরাবানি বলেছেন, ইসরায়েলি সমাজের বিভিন্ন অংশ বরাবরই সহিংসতা ও ডানপন্থী বাগাড়ম্বরে অভ্যস্ত ছিল, কিন্তু বর্তমান সরকারের অধীনে এ প্রবণতাগুলো আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইসরায়েলের ভাবমূর্তি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত। পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনের কারণে মিত্র দেশগুলো নানা নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে, আর গাজা ও লেবাননে হামলার কারণে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এমনকি জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় অনেক দেশের প্রতিনিধিরা কক্ষ ত্যাগ করেন। এবারের ভোটের ফলই ঠিক করবে ইসরায়েল বিশ্বের সঙ্গে তার অবস্থান শুধরে নেবে, নাকি বর্তমান নীতিতেই অটল থাকবে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এর প্রভাব

ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখন চরম রাজনৈতিক সংকটে। নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় এবং ২০১৯ সাল থেকে ঝুলে থাকা দুর্নীতির মামলার কারণে দেশে ও বিদেশে সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছেন। নির্বাচনে হেরে গেলে দুর্নীতির মামলায় তার কারাদণ্ড হওয়ার ঝুঁকি যেমন বাড়বে, তেমনই ৭ অক্টোবরের ঘটনা তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠন হলে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ ধসে পড়তে পারে। এর ওপর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত থেকেও তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

নির্বাচনের পর ফিলিস্তিনি নাগরিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
নির্বাচনের পর ফিলিস্তিনি নাগরিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের কী হবে

নির্বাচনে প্রায় ৭৩ লাখ ভোটারের মধ্যে অন্তত ১২ লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিক। এছাড়া গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের প্রায় ৩০ লাখেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ফিলিস্তিনির এ নির্বাচনে কোনো মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই। যদিও তাদের জীবনযাত্রা ও স্বাধীনতা ইসরায়েল সরকারের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করে।

সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে ভোটদানের হার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং অধিকাংশ ভোট আরব তালিকাগুলোর পক্ষেই যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভোটদানের হার ৬৫ শতাংশে পৌঁছালে, এ দলগুলো নেসেটে সম্ভাব্য ১৫টি আসন পর্যন্ত জিততে পারে। ফিলিস্তিনি ভোটারদের উপস্থিতির হার এবার বাড়লে নেসেটে আরব দলগুলোর অবস্থান বেশ শক্ত হতে পারে। সম্প্রতি দেশটির নির্বাচন কমিশন দুটি আরব দলকে নির্বাচন থেকে বাতিলের চেষ্টা করলেও সুপ্রিম কোর্ট তা নাকচ করে দেয়। তবে বালাদ নেতা সামি আবু শেহাদেহকে প্রার্থিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি এক লেখনী ৭ অক্টোবরের ঘটনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

নেতানিয়াহু বিরোধীদের ভয় দেখাতে বারবার বলছেন, বিরোধী দলগুলো ক্ষমতায় আসতে আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আরব দলগুলোকে এ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা নেতানিয়াহুর একটি রাজনৈতিক চাল।

ইসরায়েলি নেসেট সদস্য আইমান ওদেহর সাবেক সহযোগী জোসেফ মনসুর বিষয়টি নিয়ে বলেন, যদি ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলের সমর্থন রাজনৈতিকভাবে বিষাক্ত হয়ে ওঠে এবং বিরোধী দল ৬১টি আসন পেতে ব্যর্থ হয়, তবে এ অচলাবস্থাই নেতানিয়াহুর জন্য সর্বশেষ বিজয় হয়ে দাঁড়াবে।শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনে অচলাবস্থা তৈরি হলে তা নেতানিয়াহুকেই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাহায্য করবে।

/এমএকে/