এক্সপ্লেইনার

ইরান কি মার্কিনিদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে, কেন সতর্ক অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ইরান কি মার্কিনিদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে, কেন সতর্ক অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের তৈরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র

মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তথ্য ও সরকারি এক গোপন স্মারকলিপির বরাতে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর হামলার লক্ষ্য নিয়ে ইরান তাদের পরিকল্পনার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্কিন গোয়েন্দাদের এমন সতর্কবার্তা পাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা নিজেদের কর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রেখেছে ওয়াশিংটন।

এমন এক সময়ে এ সতর্কতার খবর সামনে এলো, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, হুথিদের ক্রমাগত হামলা এবং ইরানের পক্ষ থেকে সরাসরি এই হুমকির মূল্যায়নের পর ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের নাগরিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি দ্রুত কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক জে ক্লেটন
মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক জে ক্লেটন

ইরানের কথিত পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কী বলেছে

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস প্রথম এ তথ্য সামনে আনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো একটি স্মারকলিপিতে মার্কিন নাগরিকদের ওপর ইরানি হামলার পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

ক্লেটন উল্লেখ করেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত তথ্য পেয়েছে যে বিদেশে থাকা মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে ইরান। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে তাদের বেশ কিছু প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাষ্ট্রদূতদের ওপর হুমকির মাত্রা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। গোয়েন্দাদের তথ্য বলছে, ইরান ইতোমধ্যে ইউরোপেও বেশ কিছু সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করে রেখেছে, এমনকি কিছু ইরানি চর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও সশরীরে সক্রিয় রয়েছে।

ওয়াশিংটন কী কী প্রমাণ উপস্থাপন করেছে

এ স্মারকলিপি নিয়ে কিছুটা মেপে কথা বলছে ওয়াশিংটন। তবে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

অবশ্য আরেকজন কর্মকর্তা কিছুটা ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বা অন্যত্র বড় ধরনের হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার মতে, নিজেদের সব উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা পরিকল্পনা সত্যিকারে বাস্তবায়নের মতো সামর্থ্য তেহরানের নেই।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

মার্কিন কর্মকর্তারা এ সময়ে কেন সতর্কবার্তা দিলেন

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান নাগরিকদের ওপর হুমকি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এমনটাই দাবি মার্কিন কর্মকর্তাদের। আর এ নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করেই ওয়াশিংটন দ্রুততম সময়ে ওই অঞ্চল থেকে কর্মী সরিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ নেয়।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হলেই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে পুরোদমে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে বলে জল্পনা চলছে। সম্প্রতি ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আরও একটি মহাকাব্যিক তাণ্ডব চালাবে।

দেশগুলোর পতাকা
দেশগুলোর পতাকা

যুক্তরাষ্ট্র কোন কোন দেশ থেকে কূটনীতিক প্রত্যাহার করেছে

সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে তাদের দূতাবাস থেকে কিছু কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের সৌদি সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর একের পর এক হামলার কারণেই মূলত এ সিদ্ধান্ত।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সৌদির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি কূটনৈতিক মিশনে মার্কিন কর্মী সংখ্যা নীরবে কমিয়ে আনা হয়েছে। সিএনএন জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান এবং লেবাননের মার্কিন দূতাবাস থেকে ইতোমধ্যে কর্মী কমানো হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, হুথি হামলার ভয় এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের ষড়যন্ত্র- এ দুই কারণেই তড়িঘড়ি করে কর্মীদের সরিয়ে আনা হচ্ছে।

জাতীয় পতাকা হাতে ইরানিরা
জাতীয় পতাকা হাতে ইরানিরা

এ বিষয়ে ইরানের প্রতিক্রিয়া কী

বিদেশে মার্কিনিদের ওপর হামলার গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। তবে তেহরান ক্রমাগত বলে আসছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যেকোনো মার্কিন বা তাদের মিত্রদের ঘাঁটি তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। পেন্টাগন ইতোমধ্যে স্বীকার করেছে সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে ২১ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আবার আক্রমণ করলে তেহরান সম্পূর্ণ ‘আক্রমণাত্মক’ নীতি গ্রহণ করবে। আইআরজিসি-র মুখপাত্র হোসেন মোহেব্বি জানান, তেহরান আর শুধু পাল্টা হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, কারণ তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মান, পাল্লা ও ধ্বংসক্ষমতা আগের চেয়ে বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে।

রয়টার্স দুইজন ঊর্ধ্বতন ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানায়, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো হামলা চালালে তেহরান সরাসরি পারস্য উপসাগরের তলদেশের যোগাযোগ ও উপাত্ত আদান-প্রদানের তারগুলো কেটে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মহসিন রেজাইও বলেছেন, যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের ইন্টারনেট ক্যাবল, ডেটা সেন্টার এবং এআই (AI) হাবগুলো হামলার মুখে পড়বে।

সিআইএ-এর লোগো
সিআইএ-এর লোগো

মার্কিনিদের ওপর হামলার ষড়যন্ত্রে ইরান আগেও অভিযুক্ত হয়েছে

এর আগেও একাধিকবার মার্কিন ভূখণ্ডে ও বাইরে মার্কিন নাগরিকদের নিশানা করার অভিযোগ উঠেছে ইরানের বিরুদ্ধে। এমনকি খোদ ট্রাম্পের ওপর গুপ্তহত্যার চেষ্টার পেছনেও তেহরানের হাত ছিল বলে দাবি মার্কিন কর্তৃপক্ষের।

চলতি বছরের মার্চে ইরানের আইআরজিসি-র নির্দেশে ট্রাম্পসহ একাধিক প্রভাবশালী মার্কিন রাজনীতিবিদকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে এক পাকিস্তানি নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত দোষী সাব্যস্ত করে। এছাড়া ২০২২ সালে সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে হত্যার চেষ্টার অভিযোগে আইআরজিসির এক সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মার্কিন বিচার বিভাগ জানায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি ওয়াশিংটন ডিসি বা মেরিল্যান্ডে এ হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তিদের ৩ লাখ ডলার দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

মার্কিন গোয়েন্দারা বেশ আগে থেকেই সতর্ক করেছিল ২০২০ সালে কাসেম সোলেইমানি হত্যাকাণ্ডে জড়িত মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর বদলা নিতে ইরান বিশ্বজুড়ে হামলা চালানোর চেষ্টা করবে। এমনকি এ মাসেই ইংল্যান্ডের একটি বিমানঘাঁটিতে নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে আকস্মিকভাবে নিজেদের বোমারু বিমান সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকা এবং ইরানি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করে যুক্তরাজ্য সরকার।

/এমএকে/