ফিলিস্তিনের গাজায় খাবারের বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে মেয়েরা

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ফিলিস্তিনের গাজায় খাবারের বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে মেয়েরা
গাজা শহরে একটি গণবিবাহ অনুষ্ঠানে ফিলিস্তিনি বর ও কনেরা। ছবি: নিউইয়র্ক পোস্ট

যুদ্ধ, চরম দুর্ভিক্ষ আর সবকিছু হারিয়ে ফেলার বেদনায় গাজায় নারী ও কিশোরীদের জীবন এখন এক অনিশ্চিত অন্ধকারের মুখে। বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপায়টুকুও যখন ফুরিয়ে আসছে, তখন সেখানে জোরপূর্বক ও বাল্যবিয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার চিত্র। সামাজিক লজ্জা বা কলঙ্ক এড়াতে অনেক সময় ধর্ষণের শিকার নারীদেরও তাদের কথিত ধর্ষকদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটছে যুদ্ধবিধ্বস্ত এ উপত্যকায়।

ইউএনএফপিএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে গাজায় জোরপূর্বক ও বাল্যবিয়ে আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১২৩ শতাংশ বেড়ে গেছে। জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত সময়টাতে এ প্রবণতা শুধু বাড়েইনি, পরিস্থিতি আরও বেশি শোচনীয় হয়ে উঠেছে। তীব্র ক্ষুধা, প্রতিদিনের আয়হীনতা আর স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে পরিবারগুলো এখন টিকে থাকার চরম লড়াইয়ে দিশেহারা। ১০টি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য এবং গাজা সিটি ও খান ইউনিসের বাস্তুচ্যুত শিবিরে থাকা ২৩০ জন নারীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় প্রতিবেদনটি।

খানের ইউনিসের শিবিরে থাকা এক নারীর জানান, গত বছরের দুর্ভিক্ষের সময় এক ব্যক্তি তার ১৪ বছর বয়সী মেয়েকে দুই বস্তা আটার বিনিময়ে বিয়ে দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি নিজের এবং নিজের অন্য সন্তানদের পেটে খাবার তুলে দিতে পেরেছিলেন। শুধু তিনিই নন, বিভিন্ন শিবিরে আশ্রয় নেওয়া আরও ছয়জন নারীও এমন আরও বেশ কিছু গল্প শুনিয়েছেন। যুদ্ধের আগে এ ধরনের ঘটনা তারা কখনো কল্পনাও করতে পারতেন না।

আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এমন একটি স্কুলের গল্প বলছিলেন আরেক নারী। তার ভাষ্যমতে, সমাজে কেলেঙ্কারি ও দুর্নাম এড়াতে ধর্ষণের শিকার নারীদের কখনো কখনো জোর করে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো লোকটির সঙ্গেই বিয়ে দেওয়া হয়। তিনি দেখেছেন, স্কুলে ধর্ষণের ঘটনাটি ফাঁস হওয়ার ঠিক পরের দিনই সেখানে জোরেশোরে বিয়ের আয়োজন হতে দেখা গেছে।

বিশেষ করে এই নৃশংস যুদ্ধের যাঁতাকলে যেসব শিশু বা কিশোরী বাবা-মাকে হারিয়েছে, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। গাজা সিটির শিবিরে এক নারী জানান, তার পরিবারের ১৪ ও ১৫ বছর বয়সী দুই মেয়ে বাবা-মাকে হারানোর পর তাদের চাচারা বাধ্য হয়ে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন।

ইউএনএফপিএ জানিয়েছে, গাজায় এ বাল্যবিয়ে বৃদ্ধির বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি মূলত সেখানকার সম্পূর্ণ জীবনযাত্রার চরম বিপর্যয়েরই একটা পরিণতি। খাদ্যসংকট, অবর্ণনীয় দারিদ্র্য আর সরকারি সব কাঠামোর ধ্বংসস্তূপ নারী ও শিশুদের সুরক্ষার শেষ বাধনটুকুও ছিঁড়ে ফেলেছে।

২০২৬ সালে গাজা উপত্যকার নারী ও মেয়েরা বর্ধিত সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ছবি: রয়টার্স
২০২৬ সালে গাজা উপত্যকার নারী ও মেয়েরা বর্ধিত সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ছবি: রয়টার্স

ফিলিস্তিনে ইউএনএফপিএর প্রতিনিধি নেস্টর ওউমুহাঙ্গি গাজার এ পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাত আর বাস্তুচ্যুতির ধাক্কায় সেখানকার সামাজিক ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। সংস্থাটির পরিসংখ্যানে মূলত ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী মেয়েদের এ বাল্যবিয়ের পরিসরের মধ্যে ধরা হয়েছে। যুদ্ধের আগে পশ্চিম তীরের তুলনায় গাজায় বাল্যবিয়ের হার কিছুটা বেশি থাকলেও তা ক্রমান্বয়ে কমছিল। কিন্তু চলমান যুদ্ধ সেই ইতিবাচক অগ্রগতিকে পুরোপুরি পেছনে ফেলে দিয়েছে।

শুধু বাল্যবিয়েই নয়, একই সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে যৌন সহিংসতার ঘটনাও। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে নথিভুক্ত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ২ দশমিক ৭ শতাংশই ছিল ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধ। শুধু তাই নয়, এই সময়ে যৌন সহিংসতার মোট ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৬ই শতাংশের বেশি।

তবে সংস্থাটি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছে, এ সংখ্যাগুলো গাজার মূল চিত্রের সামান্য অংশমাত্র। সামাজিক লজ্জা, প্রতিশোধের হুমকি এবং গোপনীয়তা বজায় রেখে আইনি সহায়তা বা অভিযোগ জানানোর সুযোগ প্রায় না থাকায় বহু ঘটনাই বাইরে আসে না। এখন পর্যন্ত যেসব ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সী নারী। এরপরের অবস্থানেই রয়েছে কমবয়সী কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষেরা।

সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট

/এমএকে/