শিরোনাম

কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর যুদ্ধের শঙ্কা

সিটিজেন ডেস্ক
সিটিজেন ডেস্ক
কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর যুদ্ধের শঙ্কা
বাহরাইনে ইরানি ড্রোনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত একটি আবাসিক ভবনে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা

ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং চলতি মাসে দুই দেশের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রবিবার (২৮ জুন) ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনের পোর্ট সালমানে অবস্থানরত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।

হামলার পর কুয়েত ও বাহরাইন উভয় দেশই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বাহরাইন একে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন উল্লেখ করে বলেছে, এ ধরনের হামলা অঞ্চলে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কুয়েতও হামলার নিন্দা জানিয়ে এটিকে দেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে।

এর আগে শনিবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক, বন্দর-ই-লেঙ্গেহ এবং কেশম দ্বীপে একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, হরমুজ প্রণালী এবং এর আশপাশের এলাকায় অবস্থিত অন্তত ১০টি ইরানি সামরিক স্থাপনায় বিমান ও নৌবাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

ওয়াশিংটনের দাবি, কিকু নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানি ড্রোন হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার ভোরে হরমুজ প্রণালীর কাছে পানামার পতাকাবাহী জাহাজটি আক্রান্ত হয়। জাহাজটিতে ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল ছিল।

ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, হামলায় ট্যাংকারটির ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নাবিকদের কেউ হতাহত হননি।

এদিকে কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো। কাতার বলেছে, এ ধরনের হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি এবং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। সংযুক্ত আরব আমিরাত হামলাকে দুই দেশের সার্বভৌমত্বের প্রকাশ্য লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। জর্ডানও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী।

ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। দেশটি বলেছে, উত্তেজনা বৃদ্ধি রোধ এবং আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে কূটনৈতিক সংলাপই একমাত্র কার্যকর পথ।

হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক উত্তেজনা গত কয়েক দিনে আরও বেড়েছে। বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরভিত্তিক কনটেইনার জাহাজ ‘এভার লাভলি’ ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। এতে কোনো প্রাণহানি না ঘটলেও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনার জের ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান শুরু হয়।

এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালী ব্যবহার নিয়ে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে তেহরান। ইরান জানিয়েছে, প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজকে নির্ধারিত নৌপথ অনুসরণ করতে হবে। অন্য কোনো পথ ব্যবহার করলে তা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার রাতে অভিযোগ করেন, ইরান ১৭ জুন স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।

অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে তারা নিজেদের প্রতিশ্রুতির প্রতি আন্তরিক নয়।

রবিবার ইরাকে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, আগামী ৩০ দিন হরমুজ প্রণালী ইরানের পূর্ণ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন কোনো সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে প্রণালী স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে আরও সময় লাগবে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে, তার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে প্রণালী ঘিরে যেকোনো অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ওলফগ্যাং পুশতাই মনে করেন, কোনো পক্ষই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চায় না। তবে ভুল হিসাব বা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা দ্রুত পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা বা মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির মতো পরিস্থিতি সংঘাতকে আরও বিস্তৃত রূপ দিতে পারে।

/এমআর/