এক্সপ্লেইনার

দিল্লি রেখে মুম্বাইয়ে রুবিও, এ সফর ঘিরে ভারতে কেন এত বিতর্ক

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
দিল্লি রেখে মুম্বাইয়ে রুবিও, এ সফর ঘিরে ভারতে কেন এত বিতর্ক
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফর ঘিরে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে। মে মাসে কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দিতে ভারতের রাজধানীতে গেলেও, এবার তিনি নয়াদিল্লিতে পা রাখছেন না। সোমবার (১৯ অক্টোবর) তিনি ভারতের মুম্বাইতে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর তিনি যাবেন গুজরাটের জামনগরে, সেখানে তিনি বিশ্বের বৃহত্তম তেল শোধনাগার পরিদর্শন করবেন। এ সফরসূচি এবং তা নিয়ে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

ভারতের আগ্রায় তাজমহলে মার্কিন দূত সার্জিও গোরের সঙ্গে রুবিও ও তার স্ত্রী
ভারতের আগ্রায় তাজমহলে মার্কিন দূত সার্জিও গোরের সঙ্গে রুবিও ও তার স্ত্রী

কেন ভারতে রুবিও

উজবেকিস্তানের সমরকন্দে সি৫+১ শীর্ষ সম্মেলন শেষ করে রবিবার (১৮ অক্টোবর) ভারতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তার এ সফরের মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্ব, জ্বালানি ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করা।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, মুম্বাইয়ে দুই দেশের বৈঠকে জ্বালানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা এবং উদীয়মান প্রযুক্তি গুরুত্ব পাবে। অন্যদিকে, সফরকালে রুবিও জামনগরে ধনকুবের মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শোধনাগার ঘুরে দেখবেন এবং আম্বানি পরিবারের আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও অংশ নেবেন।

ভারতের জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের তেল শোধনাগার
ভারতের জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের তেল শোধনাগার

কেন নয়াদিল্লি যাচ্ছেন না রুবিও

রুবিও কেন ভারতের রাজধানীতে যাবেন না, সে বিষয়ে মার্কিন বা ভারতীয় পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ জানানো হয়নি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেশটিতে জ্বালানির দাম কমানোর উদ্দেশ্যে সফরটি মূলত তেল কূটনীতিকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে।

জ্বালানি খাতের অন্যতম বৃহৎ কেন্দ্র হিসেবে জামনগরের অবস্থান বৈশ্বিক বাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টেক্সাসে রিলায়েন্সের নতুন তেল শোধনাগারে বিনিয়োগের পাশাপাশি তারা ভেনিজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের বড় ক্রেতা। সম্প্রতি মার্কিন সরকার ভেনিজুয়েলার তেল শিল্প নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর থেকে বিদেশে এর বাজার খোঁজার চেষ্টা করছে। ফলে ওয়াশিংটনের জ্বালানি কৌশলে রিলায়েন্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর
ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর

কী বলেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, কেন তা নিয়ে অসন্তোষ

বিতর্কের সৃষ্টি হয় ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে তিনি বলেন, রুবিও মুম্বাইয়ে থাকবেন এবং ওয়াশিংটন আশা করছে জয়শঙ্কর সহ ভারতের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার সঙ্গে দেখা করতে সেখানে যাবেন।

ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে এ সফরের আনুষ্ঠানিক সূচি নিশ্চিত না করলেও বিরোধী দলগুলো একে ভারতের সার্বভৌমত্ব ও কূটনৈতিক মর্যাদার ওপর আঘাত বলে দাবি করছে।

কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ রাষ্ট্রদূতের এ বক্তব্যকে বেশ অস্বাভাবিক বলে অভিহিত করেছেন। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী লিখেছেন, রুবিও তার এক কর্মীকে মুম্বাইয়ে তলব করেছেন।

কংগ্রেসের অপর সংসদ সদস্য পবন খেরা এর কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ভারতের মাটিতে কোনো বিদেশি সরকারের ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তলব করাটা তলব করাটা নজিরবিহীন ঘটনা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

মার্কিন-ভারত সম্পর্কে কেন টানাপোড়েন

ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চ শুল্ক নীতি এবং রাশিয়ার তেল কেনার বিষয় নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি করেছে। গত বছর বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর অধিকাংশ ভারতীয় পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করে যুক্তরাষ্ট্র, যা পরবর্তীতে সাময়িক সমঝোতায় ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ বলেছেন, আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল জানিয়েছেন, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য উপযুক্ত শর্ত নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করবে না ভারত।

বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রযুক্তি কর্মীদের কাজের সুবিধাতেও ধাক্কা লেগেছে। সম্প্রতি মার্কিন শ্রম বিভাগ ইনফোসিস, টিসিএস, উইপ্রো ও এইচসিএলের মতো বড় ভারতীয় আইটি সংস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ ভিসা প্রকল্প থেকে বাদ দিয়েছে।

অন্যদিকে, নতুন মার্কিন লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অনুযায়ী রুশ তেল ক্রেতা দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। তবে মার্কিন নির্বাচনের আগে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্প নির্বাহী আদেশে এ নিষেধাজ্ঞা আপাতত স্থগিত করেছেন।

এত টানাপোড়েন সত্ত্বেও প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বেড়েছে। কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক সমীর লালওয়ানির মতে, দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে জনমনে ধারণার অবনতি ঘটলেও কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি এখনও টিকে আছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে ২৪০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমএকে/