ফ্রান্সের ছাত্র বিক্ষোভের নেপথ্যে যে সংকট, ঝুঁকিতে পুরো ইউরোপ

ফ্রান্সের ছাত্র বিক্ষোভের নেপথ্যে যে সংকট, ঝুঁকিতে পুরো ইউরোপ
সিজেডএন ডেস্ক

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এটি মূলত শিক্ষা খাতের নানা সমস্যা নিয়ে আন্দোলন। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে আরও বড় একটি সংকট, সরকারের বাড়তে থাকা ঋণ ও বাজেট ঘাটতি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্কুলে শিক্ষকসংকট রয়েছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর চাপ বেশি এবং অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোও জরাজীর্ণ। এসব সমস্যা সমাধানে তারা সরকারের কাছে আরও অর্থ বরাদ্দের দাবি জানাচ্ছেন।
কিন্তু সরকারের অবস্থান ভিন্ন। ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যেখানে ব্যয় কমানোর চাপ রয়েছে, সেখানে শিক্ষা খাতে বাড়তি অর্থ দেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফ্রান্স ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। জুনে দেশটির সরকারি ঋণ ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা দেশটির মোট অর্থনীতির আকারের চেয়েও বেশি। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়ছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ায় পেনশন খাতেও ব্যয় বাড়ছে। এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে সরকারের ওপর ব্যয়ের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
ঋণ কমাতে গিয়ে বাড়ছে চাপ
ফ্রান্সে সরকারি অর্থসংকটকে ঘিরে বিক্ষোভ নতুন নয়। ২০২৩ সালে অবসরের বয়স বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। এবারও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজপথে নেমেছেন মানুষ।
সম্প্রতি ২০২৭ সালের বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় কমানো এবং কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। কিন্তু সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলে সংসদে এসব কঠিন সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরভাবে পাস হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে আর্থিক বাজারেও।
ফ্রান্স ও জার্মানির সরকারি বন্ডের সুদের ব্যবধান ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর অর্থ হলো, জার্মানির তুলনায় ফ্রান্সকে ঋণ দিতে বিনিয়োগকারীরা এখন বেশি সুদ দাবি করছেন।
এটি সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ। কারণ, নতুন ঋণ নিতে সুদ বেশি হলে সরকারের ব্যয় আরও বাড়বে। ফলে বাজেটের বড় একটি অংশ ঋণের সুদ পরিশোধেই চলে যেতে পারে।
ফ্রান্সের সংকট ছড়াতে পারে অন্য দেশেও
ফ্রান্সের অর্থনীতি বড় হওয়ায় দেশটির আর্থিক সমস্যা শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি নেই। এর প্রভাব ইউরোপের অন্যান্য ঋণগ্রস্ত দেশের ওপরও পড়তে পারে।
ফ্রান্সের বন্ডের সুদ দ্রুত বাড়লে ইতালি ও স্পেনের মতো তুলনামূলক বেশি ঋণ থাকা দেশগুলোর বন্ড বাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে তখন জার্মানির মতো তুলনামূলক নিরাপদ বাজারে অর্থ সরিয়ে নিতে পারেন।
ইউরোর ওপরও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সোমবার ডলারের বিপরীতে ইউরোর দর ২০২৫ সালের মে মাসের পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে নেমেছিল। বুধবারও ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ইউরোর দর কমেছে।
তবে এখনই ইউরোজোনে বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে, এমন নয়। আশঙ্কা হলো, ফ্রান্স পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর
সরকারি ঋণের সুদ বাড়লে এর প্রভাব শুধু রাষ্ট্রের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পুরো অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে।
ঋণের খরচ বাড়লে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ দেওয়ার খরচও বাড়ে। এতে বাড়ি বা গাড়ি কেনার ঋণ ব্যয়বহুল হতে পারে। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধীর হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে ঋণের চাপ সামলাতে সরকার ব্যয় কমানোর পথে গেলে সামাজিক খাতগুলোতে অর্থ বরাদ্দ কমানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সরকারি কর্মচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের দাবিও পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফ্রান্সে এখন ঠিক এই দ্বিমুখী চাপই তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতে আরও অর্থ চান, আর সরকারকে একই সময়ে ব্যয় কমাতে হচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়েছে। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, এক হাজারের বেশি স্কুল কোনো না কোনোভাবে এই বিক্ষোভের প্রভাবে পড়েছে।
সামনে নির্বাচন, তাই সংকট আরও কঠিন
অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে ফ্রান্সের রাজনীতিও এখন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে থাকায় ব্যয় কমানো কিংবা কর বাড়ানোর মতো জনপ্রিয়তাবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন।
সরকার যদি ব্যয় কমায়, তাহলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। আবার ব্যয় কমাতে ব্যর্থ হলে ঋণের বোঝা এবং সুদের খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই দ্বন্দ্বই এখন ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অবশ্য ইউরোপের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। উৎপাদন ও সেবা খাতে কার্যক্রম বাড়ছে। জার্মানির প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, ইউরোপীয় রপ্তানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করছে।
তবে উচ্চ সুদের হার এই পুনরুদ্ধারের গতি কমিয়ে দিতে পারে। তাই ফ্রান্সের বর্তমান বিক্ষোভকে শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর পেছনে রয়েছে ঋণ, বাজেট ঘাটতি, সরকারি ব্যয়, সামাজিক চাপ এবং আসন্ন নির্বাচন, সব মিলিয়ে একটি জটিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট।
আর সেই সংকট কতটা সামলাতে পারে ফ্রান্স, তার ওপর ইউরোপের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার একটি অংশও নির্ভর করছে।

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এটি মূলত শিক্ষা খাতের নানা সমস্যা নিয়ে আন্দোলন। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে আরও বড় একটি সংকট, সরকারের বাড়তে থাকা ঋণ ও বাজেট ঘাটতি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্কুলে শিক্ষকসংকট রয়েছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর চাপ বেশি এবং অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোও জরাজীর্ণ। এসব সমস্যা সমাধানে তারা সরকারের কাছে আরও অর্থ বরাদ্দের দাবি জানাচ্ছেন।
কিন্তু সরকারের অবস্থান ভিন্ন। ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যেখানে ব্যয় কমানোর চাপ রয়েছে, সেখানে শিক্ষা খাতে বাড়তি অর্থ দেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফ্রান্স ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। জুনে দেশটির সরকারি ঋণ ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা দেশটির মোট অর্থনীতির আকারের চেয়েও বেশি। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়ছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ায় পেনশন খাতেও ব্যয় বাড়ছে। এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে সরকারের ওপর ব্যয়ের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
ঋণ কমাতে গিয়ে বাড়ছে চাপ
ফ্রান্সে সরকারি অর্থসংকটকে ঘিরে বিক্ষোভ নতুন নয়। ২০২৩ সালে অবসরের বয়স বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। এবারও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজপথে নেমেছেন মানুষ।
সম্প্রতি ২০২৭ সালের বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় কমানো এবং কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। কিন্তু সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলে সংসদে এসব কঠিন সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরভাবে পাস হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে আর্থিক বাজারেও।
ফ্রান্স ও জার্মানির সরকারি বন্ডের সুদের ব্যবধান ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর অর্থ হলো, জার্মানির তুলনায় ফ্রান্সকে ঋণ দিতে বিনিয়োগকারীরা এখন বেশি সুদ দাবি করছেন।
এটি সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ। কারণ, নতুন ঋণ নিতে সুদ বেশি হলে সরকারের ব্যয় আরও বাড়বে। ফলে বাজেটের বড় একটি অংশ ঋণের সুদ পরিশোধেই চলে যেতে পারে।
ফ্রান্সের সংকট ছড়াতে পারে অন্য দেশেও
ফ্রান্সের অর্থনীতি বড় হওয়ায় দেশটির আর্থিক সমস্যা শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি নেই। এর প্রভাব ইউরোপের অন্যান্য ঋণগ্রস্ত দেশের ওপরও পড়তে পারে।
ফ্রান্সের বন্ডের সুদ দ্রুত বাড়লে ইতালি ও স্পেনের মতো তুলনামূলক বেশি ঋণ থাকা দেশগুলোর বন্ড বাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে তখন জার্মানির মতো তুলনামূলক নিরাপদ বাজারে অর্থ সরিয়ে নিতে পারেন।
ইউরোর ওপরও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সোমবার ডলারের বিপরীতে ইউরোর দর ২০২৫ সালের মে মাসের পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে নেমেছিল। বুধবারও ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ইউরোর দর কমেছে।
তবে এখনই ইউরোজোনে বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে, এমন নয়। আশঙ্কা হলো, ফ্রান্স পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর
সরকারি ঋণের সুদ বাড়লে এর প্রভাব শুধু রাষ্ট্রের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পুরো অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে।
ঋণের খরচ বাড়লে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ দেওয়ার খরচও বাড়ে। এতে বাড়ি বা গাড়ি কেনার ঋণ ব্যয়বহুল হতে পারে। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধীর হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে ঋণের চাপ সামলাতে সরকার ব্যয় কমানোর পথে গেলে সামাজিক খাতগুলোতে অর্থ বরাদ্দ কমানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সরকারি কর্মচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের দাবিও পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফ্রান্সে এখন ঠিক এই দ্বিমুখী চাপই তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতে আরও অর্থ চান, আর সরকারকে একই সময়ে ব্যয় কমাতে হচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়েছে। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, এক হাজারের বেশি স্কুল কোনো না কোনোভাবে এই বিক্ষোভের প্রভাবে পড়েছে।
সামনে নির্বাচন, তাই সংকট আরও কঠিন
অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে ফ্রান্সের রাজনীতিও এখন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে থাকায় ব্যয় কমানো কিংবা কর বাড়ানোর মতো জনপ্রিয়তাবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন।
সরকার যদি ব্যয় কমায়, তাহলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। আবার ব্যয় কমাতে ব্যর্থ হলে ঋণের বোঝা এবং সুদের খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই দ্বন্দ্বই এখন ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অবশ্য ইউরোপের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। উৎপাদন ও সেবা খাতে কার্যক্রম বাড়ছে। জার্মানির প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, ইউরোপীয় রপ্তানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করছে।
তবে উচ্চ সুদের হার এই পুনরুদ্ধারের গতি কমিয়ে দিতে পারে। তাই ফ্রান্সের বর্তমান বিক্ষোভকে শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর পেছনে রয়েছে ঋণ, বাজেট ঘাটতি, সরকারি ব্যয়, সামাজিক চাপ এবং আসন্ন নির্বাচন, সব মিলিয়ে একটি জটিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট।
আর সেই সংকট কতটা সামলাতে পারে ফ্রান্স, তার ওপর ইউরোপের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার একটি অংশও নির্ভর করছে।

ফ্রান্সের ছাত্র বিক্ষোভের নেপথ্যে যে সংকট, ঝুঁকিতে পুরো ইউরোপ
সিজেডএন ডেস্ক

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এটি মূলত শিক্ষা খাতের নানা সমস্যা নিয়ে আন্দোলন। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে আরও বড় একটি সংকট, সরকারের বাড়তে থাকা ঋণ ও বাজেট ঘাটতি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্কুলে শিক্ষকসংকট রয়েছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর চাপ বেশি এবং অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোও জরাজীর্ণ। এসব সমস্যা সমাধানে তারা সরকারের কাছে আরও অর্থ বরাদ্দের দাবি জানাচ্ছেন।
কিন্তু সরকারের অবস্থান ভিন্ন। ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যেখানে ব্যয় কমানোর চাপ রয়েছে, সেখানে শিক্ষা খাতে বাড়তি অর্থ দেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফ্রান্স ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। জুনে দেশটির সরকারি ঋণ ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা দেশটির মোট অর্থনীতির আকারের চেয়েও বেশি। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়ছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ায় পেনশন খাতেও ব্যয় বাড়ছে। এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে সরকারের ওপর ব্যয়ের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
ঋণ কমাতে গিয়ে বাড়ছে চাপ
ফ্রান্সে সরকারি অর্থসংকটকে ঘিরে বিক্ষোভ নতুন নয়। ২০২৩ সালে অবসরের বয়স বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। এবারও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজপথে নেমেছেন মানুষ।
সম্প্রতি ২০২৭ সালের বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় কমানো এবং কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। কিন্তু সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলে সংসদে এসব কঠিন সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরভাবে পাস হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে আর্থিক বাজারেও।
ফ্রান্স ও জার্মানির সরকারি বন্ডের সুদের ব্যবধান ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর অর্থ হলো, জার্মানির তুলনায় ফ্রান্সকে ঋণ দিতে বিনিয়োগকারীরা এখন বেশি সুদ দাবি করছেন।
এটি সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ। কারণ, নতুন ঋণ নিতে সুদ বেশি হলে সরকারের ব্যয় আরও বাড়বে। ফলে বাজেটের বড় একটি অংশ ঋণের সুদ পরিশোধেই চলে যেতে পারে।
ফ্রান্সের সংকট ছড়াতে পারে অন্য দেশেও
ফ্রান্সের অর্থনীতি বড় হওয়ায় দেশটির আর্থিক সমস্যা শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি নেই। এর প্রভাব ইউরোপের অন্যান্য ঋণগ্রস্ত দেশের ওপরও পড়তে পারে।
ফ্রান্সের বন্ডের সুদ দ্রুত বাড়লে ইতালি ও স্পেনের মতো তুলনামূলক বেশি ঋণ থাকা দেশগুলোর বন্ড বাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে তখন জার্মানির মতো তুলনামূলক নিরাপদ বাজারে অর্থ সরিয়ে নিতে পারেন।
ইউরোর ওপরও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সোমবার ডলারের বিপরীতে ইউরোর দর ২০২৫ সালের মে মাসের পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে নেমেছিল। বুধবারও ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ইউরোর দর কমেছে।
তবে এখনই ইউরোজোনে বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে, এমন নয়। আশঙ্কা হলো, ফ্রান্স পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর
সরকারি ঋণের সুদ বাড়লে এর প্রভাব শুধু রাষ্ট্রের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পুরো অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে।
ঋণের খরচ বাড়লে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ দেওয়ার খরচও বাড়ে। এতে বাড়ি বা গাড়ি কেনার ঋণ ব্যয়বহুল হতে পারে। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধীর হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে ঋণের চাপ সামলাতে সরকার ব্যয় কমানোর পথে গেলে সামাজিক খাতগুলোতে অর্থ বরাদ্দ কমানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সরকারি কর্মচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের দাবিও পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফ্রান্সে এখন ঠিক এই দ্বিমুখী চাপই তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতে আরও অর্থ চান, আর সরকারকে একই সময়ে ব্যয় কমাতে হচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়েছে। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, এক হাজারের বেশি স্কুল কোনো না কোনোভাবে এই বিক্ষোভের প্রভাবে পড়েছে।
সামনে নির্বাচন, তাই সংকট আরও কঠিন
অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে ফ্রান্সের রাজনীতিও এখন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে থাকায় ব্যয় কমানো কিংবা কর বাড়ানোর মতো জনপ্রিয়তাবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন।
সরকার যদি ব্যয় কমায়, তাহলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। আবার ব্যয় কমাতে ব্যর্থ হলে ঋণের বোঝা এবং সুদের খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই দ্বন্দ্বই এখন ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অবশ্য ইউরোপের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। উৎপাদন ও সেবা খাতে কার্যক্রম বাড়ছে। জার্মানির প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, ইউরোপীয় রপ্তানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করছে।
তবে উচ্চ সুদের হার এই পুনরুদ্ধারের গতি কমিয়ে দিতে পারে। তাই ফ্রান্সের বর্তমান বিক্ষোভকে শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর পেছনে রয়েছে ঋণ, বাজেট ঘাটতি, সরকারি ব্যয়, সামাজিক চাপ এবং আসন্ন নির্বাচন, সব মিলিয়ে একটি জটিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট।
আর সেই সংকট কতটা সামলাতে পারে ফ্রান্স, তার ওপর ইউরোপের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার একটি অংশও নির্ভর করছে।









