শিরোনাম

বিকল্প রাজধানীর খোঁজে জাপান

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
বিকল্প রাজধানীর খোঁজে জাপান
জাপানের পার্লামেন্ট ভবন (বাঁয়ে) ও প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি (ডানে)। কোলাজ: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে যদি কোনোদিন স্তব্ধ হয়ে যায় দেশটির রাজধানী টোকিও, তবে কীভাবে চলবে সরকার? এমন এক বড় আশঙ্কার কথা মাথায় রেখেই এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে জাপান। দুর্যোগের মুহূর্তে যেন প্রশাসনিক কার্যক্রম কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেজন্য একটি বিকল্প বা দ্বিতীয় রাজধানী তৈরির আইনি কাঠামো অনুমোদন করেছেন দেশটির আইনপ্রণেতারা। জুলাই মাসে পার্লামেন্টে পাস হওয়া এ ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি ঘিরে অবশ্য এখন জাপানের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

বিকল্প রাজধানী তৈরির এ প্রস্তাব নিয়ে পার্লামেন্টে এতটাই দীর্ঘ ও উত্তপ্ত তর্কবিতর্ক হয়েছে, দেশটির আইনপ্রণেতাদের নির্ধারিত গ্রীষ্মকালীন ছুটি পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে হয়েছিল। নিম্নকক্ষে ক্ষমতাসীন জোটের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিলটি সহজেই পার পেয়ে যায়, তবে প্রধান বিরোধী দল নিয়ন্ত্রিত উচ্চকক্ষে একে পাস করাতে গিয়ে রীতিমতো ঘাম ছুটতে হয়েছে সানায়ে তাকাইচির সরকারকে। মাত্র দুই ভোটের ব্যবধানে বিলটি অনুমোদিত হওয়ায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সামনে নতুন প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির জন্য তার অন্যান্য নীতি বাস্তবায়ন করা মোটেও সহজ হবে না।

কেন বিকল্প রাজধানীর খোঁজ?

কিন্তু হঠাৎ কেন এই বিকল্প রাজধানীর ভাবনা? উত্তরটা লুকিয়ে আছে প্রাকৃতিক ঝুঁকির মধ্যে। সরকারি পরিসংখ্যান সতর্ক করে বলছে, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে টোকিও মহানগর অঞ্চলে ৭ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৭০ শতাংশ। আর এমনটা ঘটলে দেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পার্লামেন্ট, সমস্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মুহূর্তেই পঙ্গু হয়ে যেতে পারে। নতুন এই আইনের মূল উদ্দেশ্যই হলো, সেই চরম বিপদের দিনে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলকে সাময়িকভাবে দেশের মূল রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন করার ক্ষমতা দেওয়া। এছাড়া, সব কিছু টোকিও কেন্দ্রিক ধরে না রেখে দেশের অর্থনীতির অন্যান্য অঞ্চলকে চাঙ্গা করার স্বপ্নও দেখছে সরকার। বর্তমানে পুরো জাপানি অর্থনীতির প্রায় পাঁচভাগের একভাগ আসে কেবল টোকিও থেকে, আর দেশের অর্ধেকের বেশি নিবন্ধিত কোম্পানি এবং প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের বসবাস এই এলাকাতেই।

পরিকল্পনাটি কেন বিতর্কিত?

এ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা আপাতদৃষ্টিতে বৈজ্ঞানিক মনে হলেও, বিতর্ক তৈরি হয়েছে এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে। সমালোচকরা দাবি করছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি তার ক্ষমতায় টিকে থাকার সমীকরণ মেলাতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সম্প্রতি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সঙ্গে পুরোনো শরিক দল কোমেইতোর মেলবন্ধন ভেঙে যায়। নতুন করে সরকার টিকিয়ে রাখতে জাপান ইনোভেশন পার্টি বা ইশিন নামের জোট শরিককে কাছে টানেন তাকাইচি। এই ইশিন দলের প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডাই ছিল ওসাকাকে দেশের বিকল্প রাজধানী বানানো। ২০১০ সালের দিকে ওসাকার তৎকালীন গভর্নর তোরু হাশিমোতো প্রথম এই ধারণা নিয়ে আসেন। বিরোধী ও সমালোচকদের ভয়, এই আইনের অজুহাতে বিপুল অর্থ, বিশেষ কর ছাড় এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ওসাকার মতো নির্দিষ্ট কয়েকটি অঞ্চলের পকেটে চলে যেতে পারে। এর ফলে দেশের বাকি অঞ্চলগুলো বঞ্চিত হবে। তাছাড়া পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে ঠিক কত খরচ হবে, সে বিষয়ে সরকার এখনো কোনো স্পষ্ট হিসেব দেয়নি।

কোন শহরগুলো এগিয়ে?

অবশ্য পাস হওয়া আইনে সরাসরি ওসাকা বা অন্য কোনো একক শহরের নাম বসানো হয়নি। এটি মূলত একটি উন্মুক্ত আইনি কাঠামো, যার অধীনে যোগ্য শহরগুলো বিকল্প রাজধানী হওয়ার আবেদন করতে পারবে। এমনকি পরিস্থিতি বিবেচনায় একের বেশি শহরকেও এই মর্যাদা দেওয়ার পথ খোলা রাখা হয়েছে। কোনো অঞ্চলকে এই পদের দৌড়ে টিকতে হলে, তাকে টোকিওর মতো একই সময়ে দুর্যোগে আক্রান্ত না হওয়ার নিরাপদ ভৌগোলিক অবস্থানে থাকতে হবে। পাশাপাশি সেখানে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থান এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকা বাধ্যতামূলক। আইনি কাঠামো তৈরির সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। ফুকুওকা, হোক্কাইদো এবং মিয়াগির মতো প্রিফেকচারগুলো ইতোমধ্যেই আগ্রহ দেখিয়েছে। এমনকি বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটার প্রধান কেন্দ্র আইচি অঞ্চলের গভর্নর হিদেয়াকি ওমুরা প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি তার এলাকাকে জাপানের প্রথম বিকল্প রাজধানী হিসেবে দেখতে চান।

তাকাইচির রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

আইনটি পাস করিয়ে আপাতত জোট সঙ্গী ইশিন দলকে সন্তুষ্ট করতে পারলেও, প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির পথ কিন্তু সুগম হচ্ছে না। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি সময়মতো পূরণ না করা এবং মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মতো দৈনন্দিন চাপ সামলাতে না পেরে ইতোমধ্যেই জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন তিনি। এমন এক পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক হিসেব পরিষ্কার না করে বিতর্কিত নীতি বাস্তবায়নে মনোযোগ দেওয়া তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

/এমএকে/