সয়াবিনের বাজারে সিন্ডিকেটের কারসাজি, সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর ছক

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
সয়াবিনের বাজারে সিন্ডিকেটের কারসাজি, সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর ছক
সয়াবিন তেল। ফাইল ছবি : সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

সরকার নির্ধারিত দামের মধ্যেই সয়াবিন তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মিলগেট থেকে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালী একটি চক্রের বিরুদ্ধে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশের লক্ষ্য লিটারে আরও ৬ টাকা দাম বাড়ানো, এমন অভিযোগও রয়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় ডিলার থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত দেখা দিয়েছে তেলের ঘাটতি। ফলে চাহিদা অনুযায়ী তেল না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন ক্রেতারা।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ তুলনামূলক কম। কোনো কোনো দোকানে এক লিটারের বোতল পাওয়া গেলেও দুই লিটারের বোতল মিলছে না। আবার কোথাও দুই ধরনের বোতলজাত তেলই সীমিত পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে। তবে পাঁচ লিটারের বোতলের সরবরাহ অনেকটা স্বাভাবিক রয়েছে।

শুক্রবার রাজধানীর নয়াবাজারের বিভিন্ন মুদি দোকানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, চারটি দোকানেই এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল ছিল না। পরে জিনজিরা কাঁচাবাজারের দোকান ঘুরে তিনটিতে এক লিটারের বোতল এবং দুটিতে দুই লিটারের বোতল পাওয়া যায়। এসব দোকানে অবশ্য পাঁচ লিটারের বোতলজাত তেলের সরবরাহ ছিল।

মুদি ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিদিন এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের চাহিদা প্রায় ২০ কার্টন। কিন্তু ডিলারদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র দুই থেকে চার কার্টন। তার অভিযোগ, আগের মতোই সরবরাহ কমিয়ে বাজারে দাম বাড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে।

অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত মূল্য কার্যকর থাকলেও খোলা সয়াবিন তেল খুচরা বাজারে লিটারপ্রতি ১৯৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অথচ নির্ধারিত দাম ১৮০ টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। ফলে নতুন করে সরকারি মূল্য নির্ধারণ না হলেও বাজারে বাড়তি দামের চাপ তৈরি হয়েছে।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক কর্মকর্তা বলেছেন, দেশের মোট সয়াবিন তেলের বাজারের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চার থেকে পাঁচটি বড় কোম্পানি। ছোট কোম্পানিগুলোর অংশ প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।

তার ভাষ্য, বড় কোম্পানিগুলো চাহিদা অনুযায়ী তেল আমদানি করে পরিশোধনের পর বাজারে সরবরাহ করে। কিন্তু বাড়তি মুনাফার আশায় বছরের বিভিন্ন সময়ে ডিলারদের মাধ্যমে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারকে মূল্য বাড়ানোর জন্য চাপের মুখে পড়তে হয় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর বাড়তি দামের বোঝা পড়ে।

গত কয়েক বছর ধরেই একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে ক্যাবের ওই কর্মকর্তার দাবি। এমনকি সরকার নির্ধারিত মূল্যের পরও বাজারে পাঁচ থেকে ১০ টাকা বেশি দামে ভোজ্যতেল বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি বন্ধে সরকারের কার্যকর নজরদারি ও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করে গত ১১ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন।

সংগঠনটির প্রস্তাবে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১০ টাকা বাড়িয়ে ২০৯ টাকা করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ১৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৮ টাকা বাড়িয়ে ১৮৮ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি খোলা পাম তেলের দাম ১৩ টাকা বাড়িয়ে ১৮৩ টাকা করার দাবিও জানানো হয়।

ওই সময় সরকার এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। প্রস্তাব দেওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক হলেও সেখানে কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।

পরে ২ সেপ্টেম্বর ব্যবসায়ীদের দাবির তুলনায় কম হারে সয়াবিন তেলের দাম সমন্বয় করে সরকার। এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, তাদের চাওয়া অনুযায়ী লিটারে ১০ টাকা দাম না বাড়ায় এখন সরবরাহ কমিয়ে বাজারে চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

কাওরান বাজারের একটি সয়াবিন তেল ব্র্যান্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডিলার বলেন, কোম্পানিগুলো আবারও তেলের দাম বাড়াতে চাইছে। এ কারণে ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোম্পানি থেকে কম তেল পাওয়ায় তারাও খুচরা ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছেন না।

ওই ডিলারের ভাষ্য, কোম্পানির কাছ থেকে যতক্ষণ তেল পাওয়া যায়, ততক্ষণ তারা বাজারে সরবরাহ করেন। কোম্পানি সরবরাহ না করলে খুচরা পর্যায়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে না। এর আগেও কয়েকবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। এর পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ে অন্যান্য ব্যয়ও বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমান বাজারদরের তুলনায় প্রতি লিটার তেলে ১৮ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে দাবি সংগঠনটির। এতে ব্যবসায়ীদের লোকসান হচ্ছে।

অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্যসংক্রান্ত টাস্কফোর্সের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করে ব্যবসায়ীরা ভোজ্যতেলের মূল্য বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাদের দাবি ছিল লিটারে ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর।

তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ভোজ্যতেলের সংকট নেই। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সরকার সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা সমন্বয় করেছে। এখন পর্যন্ত নতুন করে দাম বাড়ানোর বিষয়ে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে যদি কোনো কোম্পানি পরিকল্পিতভাবে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়, তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

/আরএ/