শিরোনাম

ইরান যুদ্ধে সেনা হতাহতের প্রকৃত তথ্য গোপন করছে পেন্টাগন

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ইরান যুদ্ধে সেনা হতাহতের প্রকৃত তথ্য গোপন করছে পেন্টাগন
ডোভার বিমান ঘাঁটিতে পতাকায় মোড়া এক মার্কিন সেনার মরদেহ গাড়িতে তোলা হচ্ছে।

ইরান যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের হতাহতের প্রকৃত চিত্র আড়াল করতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বা পেন্টাগন চরম বিভ্রান্তিকর ও লজ্জাজনক কৌশল নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব ও সিআইএ পরিচালক লিওন প্যানেটা। গত আড়াই মাস ধরে পেন্টাগনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন না হওয়ায় এই সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জনরোষ এড়াতে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী অভিযানের আসল ক্ষয়ক্ষতি ঢাকতেই পেন্টাগন তথ্য গোপনের পথ বেছে নিয়েছে।

আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের চরম উত্তেজনার সময়েও পেন্টাগনের নিয়মিত ব্রিফিং করতেন লিওন প্যানেটা। তিনি সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে জানান, মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় কতজন সেনা আহত হয়েছেন তা প্রকাশ্যে না আনা একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল। জনগণের কাছে সঠিক তথ্য না পৌঁছে দেওয়াকে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন ও লজ্জাজনক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন তিনি।

চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যবর্তী ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনের পাল্টাপাল্টি হামলায় একদিকে চিরস্থায়ী যুদ্ধ পরিহার করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, অন্যদিকে মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং চার শতাধিক আহত হয়েছেন। পেন্টাগন দাবি করেছে যে আহতদের একটি বড় অংশই কাজে ফিরে গেছেন, তবে নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে শুরুতেই পেন্টাগন এসব তথ্য প্রকাশ করেনি। পরবর্তীতে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে দেরিতে এই ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করা হয়। এমনকি এক পর্যায়ে পেন্টাগনের ওয়েবসাইটে নিহতের সংখ্যা ১৮ থেকে কমিয়ে ১৪ করা হয়, যাকে পেন্টাগনের মুখপাত্র সাময়িক কারিগরি ত্রুটি বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

ইরান যুদ্ধে সেনা হতাহতের প্রকৃত তথ্য গোপন করছে পেন্টাগন
ডোভার বিমান ঘাঁটিতে দুই মার্কিন সেনার মরদেহ। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা বলছেন, পেন্টাগনের এ আচরণ সাধারণ কোনো সংবাদমাধ্যম-বিরোধিতা নয়। এটি যুদ্ধের প্রকৃত মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য ঢেকে রাখার একটি সংঘবদ্ধ চেষ্টা। ভিয়েতনাম কিংবা ইরাক যুদ্ধের মতো বিতর্কিত যুদ্ধের সময়ও তথ্য সরবরাহের পথ খোলা রাখা হয়েছিল। কিন্তু নতুন প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকে পেন্টাগনে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত করা হয়েছে। মূলধারার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে সরিয়ে পেন্টাগনে স্থান দেওয়া হয়েছে প্রশাসনঘনিষ্ঠ মাধ্যমগুলোকে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে অনেক দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম বাধ্য হয়ে পেন্টাগন থেকে তাদের সাংবাদিকদের ফিরিয়ে নিয়েছে।

ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে পেন্টাগনের এই নজিরবিহীন আচরণকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এক ঐতিহাসিক আঘাত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ প্রায় প্রতিদিনই ক্যামেরার সামনে আসতেন। কিন্তু এখন ফটোসাংবাদিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীন সংবাদ পরিবেশনকে কটাক্ষ করা হয়েছে। বাস্তবে যুদ্ধ যে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, তা ঢাকতেই এ ধরনের নীরবতা ও নজর অন্যদিকে সরানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যেই কংগ্রেসে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়ে তীব্র প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে পেন্টাগন প্রধানকে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদী কোনো সামরিক কৌশলের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রশাসন দিতে পারেনি। যদিও পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল সব অভিযোগ অস্বীকার করে করেছেন। তার দাবি, সামরিক অভিযানের সমস্ত তথ্য সময়মতো ও স্বচ্ছতার সঙ্গেই জনগণকে জানানো হচ্ছে। তবে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা তা মেনে নিতে রাজি নন। সাবেক পেন্টাগন প্রধান লিওন প্যানেটা বলেছেন, প্রশাসন যত কৌশলই অবলম্বন করুক না কেন, ইতিহাস বলে সত্যকে শেষ পর্যন্ত কখনোই চেপে রাখা যায় না।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

/এমএকে/