এক্সপ্লেইনার

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: কোন পথে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: কোন পথে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ
প্রতীকী ছবি

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্য। ৩ নভেম্বর মার্কিন কংগ্রেসের নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে, নাকি বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেবে-এ নিয়ে চলছে নানা হিসাব। তবে এবারের নির্বাচনের গুরুত্ব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ইরান যুদ্ধ, ইসরায়েলের নিরাপত্তা, গাজা ও লেবাননের ভবিষ্যৎ, সৌদি আরবের আঞ্চলিক অবস্থান এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজার।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে বলে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশকে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন। সংবাদ সংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আঞ্চলিক মিত্রদের সম্ভাব্য হামলা এবং এর জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। যদিও ইরানে নতুন হামলার বিষয়ে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর কংগ্রেসের দুই কক্ষ- প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একে বলা হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের ৩৫টি আসন নিয়ে ভোট হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গভর্নর ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও নির্বাচিত হবেন।

বর্তমানে দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে দলটির আসন ২১৮টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি এবং একজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন। সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে থাকা স্বতন্ত্র সদস্যদের আসন ৪৭টি। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়াতে হবে।

এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম দুই বছরের কাজের মূল্যায়ন করবেন ভোটাররা। রিপাবলিকানরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা একটি বা দুটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারবেন। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় ও ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষের কারণে কিছু আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েছে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

ইরান যুদ্ধই কি নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চাপ

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত শুরু হয়। এরপর ইরানও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয়। দীর্ঘ আট মাসের এ সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

যুদ্ধের কারণে বেড়েছে জ্বালানির দাম, ব্যাহত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়ও বেড়েছে। পেন্টাগনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। কারণ, জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে না, পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ে। ফলে ভোটারদের কাছে প্রশ্ন উঠছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এত অর্থ ব্যয় করার প্রয়োজন কতটা?

ট্রাম্প অবশ্য একদিকে যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হওয়ার কথা বলছেন, অন্যদিকে নির্বাচনের পর নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। ৮ অক্টোবর ট্রাম্প বলেছিলেন, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাবে না। কিন্তু নির্বাচনের পর পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। মার্কিন কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশকে সম্ভাব্য নতুন হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। হামলা হলে তা কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে বলে আঞ্চলিক মিত্রদের জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পাল্টা হামলায় জ্বালানি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তেহরান এখনো কূটনীতির সুযোগ দিতে চায় এবং যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখতে আগ্রহী। সংযুক্ত আরব আমিরাতও পক্ষগুলোকে রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচনের আগে যুদ্ধের উত্তাপ কমিয়ে রাখা এবং নির্বাচনের পর সামরিক বিকল্প বিবেচনা- দুটি বিষয়ই এখন ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক হিসাবের অংশ হয়ে উঠেছে।

ডেমোক্র্যাটরা জিতলে ইরান যুদ্ধ কি থামবে

এ প্রশ্ন এখন মার্কিন রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়াতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণা ও অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। ফলে যুদ্ধ পরিচালনায় নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভার মধ্যে ক্ষমতার একটি ভারসাম্য রয়েছে।

রয়টার্সের ২৫ অক্টোবরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরান যুদ্ধের জন্য প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধ চালিয়ে যেতে কংগ্রেসের অনুমোদনের দাবি এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য শুনানিতে হাজির করা। এ ছাড়া যুদ্ধের ব্যয়, সামরিক পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে তদন্তের উদ্যোগও আসতে পারে।

তবে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেই যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ট্রাম্পের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। আবার কংগ্রেসের কোনো সিদ্ধান্তে প্রেসিডেন্ট ভেটো দিতে পারেন। তাই সামরিক অভিযান বন্ধের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দরকষাকষির ওপর নির্ভর করবে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু

নেতানিয়াহুর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল। তাই মার্কিন কংগ্রেসের ক্ষমতার পরিবর্তন হলে দেশটির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের নিরাপত্তার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। কিন্তু গাজা যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে বিতর্ক বেড়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ইসরায়েলকে দেওয়া সামরিক সহায়তা সীমিত করা বা অস্ত্র সরবরাহে নতুন শর্ত আরোপের উদ্যোগ নিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ অর্থবছরে ইসরায়েল ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা পেয়েছে।

ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও এ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। দলের একটি অংশ ইসরায়েলের নিরাপত্তা বজায় রাখার পক্ষে হলেও গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ও পশ্চিম তীরে সহিংসতার কারণে নেতানিয়াহু সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর পক্ষে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের বড় অংশ ইসরায়েলের সামরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক অভিযানে জড়ানোর বিষয়ে আপত্তি রয়েছে।

এদিকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ব্লক ৫৩টি, বিরোধী জোট ৪৮টি এবং আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো ১৯টি আসন পেয়েছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন।

সৌদি আরবের পতাকা
সৌদি আরবের পতাকা

সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের নতুন হিসাব

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার সৌদি আরব। দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা। ইরান যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবের সামনে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় হামলা চালিয়েছে। ফলে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেন ও উপসাগরীয় অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখা, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বের বর্তমান সম্পর্ক অব্যাহত রাখার সুযোগ থাকবে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা প্রভাব বাড়ালে অস্ত্র বিক্রি, মানবাধিকার এবং সৌদি আরবের আঞ্চলিক ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনা হতে পারে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালি
বাব আল-মান্দেব প্রণালি

ইয়েমেনের হুথি ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা

মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট ইয়েমেন। হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু হলে হুথিদের পক্ষ থেকেও পাল্টা পদক্ষেপের আশঙ্কা রয়েছে। এতে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে। আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের ব্যয় ও বিমা খরচ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে। বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের জন্য এই নৌপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইয়েমেনের সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের কারণ।

হরমুজ প্রণালির উপগ্রহ চিত্র
হরমুজ প্রণালির উপগ্রহ চিত্র

হরমুজ প্রণালি সংকট ও তেলের বাজারে বড় উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব বুঝতে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অনুধাবন করা জরুরি। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরান যুদ্ধের কারণে এ নৌপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমে যেতে পারে। বাড়তে পারে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং শিল্প উৎপাদনের খরচ। এ কারণে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে যুদ্ধের ব্যয় ও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। নির্বাচনের পর সামরিক অভিযান শুরু হলে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে কূটনৈতিক সমাধান হলে জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসার সুযোগ থাকবে।

ভোটারদের চোখে মধ্যপ্রাচ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ

মার্কিন ভোটারদের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যে কেবল পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়, তা বিভিন্ন জরিপেও উঠে এসেছে। আশার্ক ব্লুমবার্গ/ ইপসোস জরিপের তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী ৫৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে কোনো প্রার্থীর অবস্থান তাদের ভোটের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রিপাবলিকানদের মধ্যে এই হার ৬৫ শতাংশ এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ।

একই জরিপে দেখা গেছে, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষায় নতুন শর্ত ছাড়া ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পক্ষে মাত্র ১৬ শতাংশ উত্তরদাতা। ৩০ শতাংশ সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যনীতি এখন মার্কিন ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।

অন্যদিকে ২৬ অক্টোবর শেষ হওয়া রয়টার্স/ইপসোস জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার ছিল ৩২ শতাংশ। কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ৪৭ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের পক্ষে ৩৬ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার সমর্থন জানিয়েছেন। এ জরিপই নির্বাচনের ফল নয়। তবে এগুলো থেকে বোঝা যায়, ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির দাম ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারে চাপ তৈরি করছে।

নির্বাচনের পর মধ্যপ্রাচ্যে কী হতে পারে

নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। রিপাবলিকানরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে চাপের নীতি অব্যাহত রাখার রাজনৈতিক সুযোগ পাবে। ইসরায়েলের সামরিক সহযোগিতা এবং সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্কও বর্তমান ধারায় এগোতে পারে।

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিলে ইরান যুদ্ধের ব্যয়, সামরিক অভিযান এবং ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে কংগ্রেসে তদন্ত ও বিতর্ক বাড়তে পারে। গাজায় মানবিক সহায়তা এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার বিষয়েও চাপ তৈরি হতে পারে। আর ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সামরিক ব্যয় ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও কঠিন হতে পারে। তবে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা এবং ভেটো দেওয়ার অধিকার থাকায় পুরো নীতি পরিবর্তন সহজ হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু হবে কি না।

বাংলাদেশের পতাকা
বাংলাদেশের পতাকা

বাংলাদেশের জন্যও কেন গুরুত্বপূর্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং প্রবাসী আয়ের বড় অংশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্ক রয়েছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্পকারখানা ও নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতের মতো দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। এসব দেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন ও কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাতেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কোন পথে

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন নতুন করে নিজেদের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তার হিসাব মেলাচ্ছে। ইরান যুদ্ধের পরিণতি, ইসরায়েলের নিরাপত্তা, গাজার ভবিষ্যৎ, সৌদি আরবের আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা- সবকিছুতেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে নির্বাচনে যে দলই জয়ী হোক, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রাতারাতি বদলে যাবে না। ইসরায়েলের নিরাপত্তা, উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এসব বিষয় দুই দলের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। পার্থক্য তৈরি হতে পারে এসব লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতিতে। রিপাবলিকানরা সামরিক চাপ ও ট্রাম্পের নীতির ধারাবাহিকতায় জোর দিতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নজরদারি, সামরিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং মানবিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।

তবে বড় প্রশ্ন নির্বাচনের পর ট্রাম্প কি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করবেন, নাকি কূটনৈতিক সমাধানের পথ বেছে নেবেন? আর সেই সিদ্ধান্তে সৌদি আরব, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হবে?

/এমএকে/